পাহাড়ি বন্যপ্রাণীর পরিচর্যায় এক বিরল দৃষ্টান্ত
ছিংহাই-তিব্বত মালভূমির উত্তর-পূর্ব প্রান্তে কিলিয়ান পর্বতমালার উঁচুতে, কিলিয়ান পর্বত জাতীয় উদ্যানের ভেতরে অবস্থিত একটি অনাড়ম্বর স্থাপনা সংরক্ষণের অন্যতম কঠিন দায়িত্ব পালন করছে। আহত বন্যপ্রাণীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করা, তাদের সুস্থতা ফিরিয়ে আনা এবং বনে ফেরার উপযোগী করে তোলাই এর কাজ। ২০২২ সালের আগস্টে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়া বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন ও প্রজননকেন্দ্রটি চীনের কোনো জাতীয় উদ্যানের ভেতরে থাকা একমাত্র বন্যপ্রাণী উদ্ধারকেন্দ্র। চালুর পর থেকে কেন্দ্রের দল তুষারচিতার মতো শীর্ষ শিকারি থেকে শুরু করে দুর্লভ ছোট বিড়ালজাতীয় প্রাণী এবং মালভূমির কালোগলা সারসসহ ৩৬ প্রজাতির ২০০টিরও বেশি প্রাণীর চিকিৎসা করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষ্য এক: প্রাণীদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অক্ষুণ্ন রেখে বনে ফিরিয়ে দেওয়া।
সূচিপত্র
- পাহাড়ি বন্যপ্রাণীর পরিচর্যায় এক বিরল দৃষ্টান্ত
- কেন্দ্রটি কে পরিচালনা করেন এবং কীভাবে কাজ চলে
- প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে বনে ফেরা: ধাপে ধাপে পরিচর্যা
- কিছু প্রজাতি অন্যদের চেয়ে দ্রুত সুস্থ হয় কেন
- বন্য পরিবেশের জন্য প্রস্তুতি
- সংখ্যার আড়ালের গল্প
- সুবিধা, সীমাবদ্ধতা ও পরিচর্যার বিজ্ঞান
- একটি উদ্যান, সুরক্ষাকবচ ও জীববৈচিত্র্যের হটস্পট
- স্থানীয়দের শেখা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি
- উদ্ধারের বাইরে সংরক্ষণ বিতর্ক
- মূল বিষয়গুলো
এই কাজের বড় অংশ সামলান মা ছুনসিন, একজন প্রাণিবিজ্ঞানী, যিনি কেন্দ্রটির দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রতিটি প্রজাতির জন্য মেপে খাবার প্রস্তুত করার মধ্য দিয়ে সকাল শুরু হয়। শিকারি পাখির খাঁচা এবং ছোট মাংসাশী প্রাণীদের থাকার জায়গার জন্য আলাদা খাবার তৈরি করতে হলে এতে কয়েক ঘণ্টাও লেগে যেতে পারে। বিকেলের কাজের মধ্যে রয়েছে আবাসস্থল পরিষ্কার, চিকিৎসাকক্ষ জীবাণুমুক্ত করা এবং ক্ষতস্থানের ব্যান্ডেজ বদলানো। কাজের গতি স্থির, কিন্তু দায়িত্বের গুরুত্ব অনেক। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ ৪০টিরও বেশি প্রাণীকে প্রাকৃতিক আবাসে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং ৫০টিরও বেশি প্রাণী পর্যবেক্ষণে থেকে সুস্থ হয়ে উঠছিল। প্রতিটি ঘটনা থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকা জ্ঞানভাণ্ডারে যুক্ত হয়, যা পরবর্তী উদ্ধারকাজকে আরও কার্যকর করে।
পরিবেশটি যেমন সুন্দর, তেমনি চ্যালেঞ্জপূর্ণ। দুর্গম ভূখণ্ডের খাড়া উপত্যকা, আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন এবং দীর্ঘ যাত্রাপথ উদ্ধারকাজকে জটিল করে তুলতে পারে। তাই কেন্দ্রটিতে অস্ত্রোপচারকক্ষ, চিকিৎসার জায়গা ও পরীক্ষাগার রয়েছে, যাতে পশুচিকিৎসক ও কারিগরি কর্মীরা ঘটনাস্থলেই তরল চিকিৎসা থেকে শুরু করে ইমেজিং পর্যন্ত সব কাজ করতে পারেন। দ্রুততা ও নির্ভুলতার কথা মাথায় রেখে তৈরি এই ব্যবস্থা; বন্য প্রাণীর বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে প্রায়ই এই দুই বিষয়ই নির্ধারক হয়ে ওঠে।
কেন্দ্রটি কে পরিচালনা করেন এবং কীভাবে কাজ চলে
প্রাণিবিজ্ঞান ও মাঠপর্যায়ের জীববিজ্ঞানে প্রশিক্ষণ শেষে মা ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কেন্দ্রটিতে যোগ দেন। এখন তিনি অল্পসংখ্যক কারিগরি কর্মীর একটি দল পরিচালনা করেন, যাদের অনেকেরই পশুচিকিৎসা বা বন্যপ্রাণীবিজ্ঞানে ডিগ্রি রয়েছে। তাদের কাজের ধরন পদ্ধতিনির্ভর। কোনো প্রাণী পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তারা তার আঘাতের নথি তৈরি করেন, জরুরি শারীরিক লক্ষণগুলো স্থিতিশীল করেন এবং প্রজাতি, বয়স ও স্বভাব অনুযায়ী ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিকল্পনা তৈরি করেন। লক্ষ্য হলো মানুষের ওপর নির্ভরশীল না করে প্রাণীর সুস্থতা ফিরিয়ে আনা।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মা দলের কাজের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠা শান্ত, নিয়মিত রুটিনের কথা বলেন।
আমার কাছে প্রাণীদের খাওয়ানো আর আবাসস্থল পরিষ্কার করার সময়টাই সবচেয়ে শান্তির। এই নির্জনতা আমার ভালো লাগে।
উদ্ধারকেন্দ্রটি ছোট হলেও বিশেষভাবে এ কাজের জন্য তৈরি। এর আয়তন ১,১৫৩.৫৯ বর্গমিটার। এখানে মাংসাশী, তৃণভোজী, সর্বভুক প্রাণী ও পাখিদের জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে। একসঙ্গে সর্বোচ্চ ৪৩টি প্রাণী রাখা যায়। চালুর প্রথম কয়েক সপ্তাহে ডানায় আঘাত পাওয়া একটি শকুন ও একটি পেঁচা এবং দুর্বল হয়ে পড়া একটি তিব্বতি বন্য গাধাকে এখানে আনা হয়। কেন্দ্রের পশুচিকিৎসক ইং হেংছিং সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে কেন্দ্রটির অবস্থানের সুফল তুলে ধরেন।
এই কেন্দ্রের মাধ্যমে উদ্যানের ভেতরে যেসব প্রাণীর সাহায্য দরকার, তাদের দ্রুত সাড়া দিতে পারি।
অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। যাতায়াতের দূরত্ব কম হলে চাপ কমে, শক বা হাইপোথার্মিয়ার মতো জটিলতার ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং উদ্ধার করা প্রাণীকে সেই পরিবেশগত পরিসরেই রাখা যায়, যেখানে শেষ পর্যন্ত তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে বনে ফেরা: ধাপে ধাপে পরিচর্যা
প্রতিটি ঘটনার শুরু হয় প্রাথমিক বাছাই দিয়ে: কোন সমস্যাগুলো সবচেয়ে জরুরি তা শনাক্ত করা, রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করা এবং সংক্রমণ ঠেকানো। এরপর প্রাণীকে ধাপে ধাপে এমন একটি পরিচর্যা পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়, যা বেঁচে থাকা থেকে স্বনির্ভরতার দিকে এগোয়। দৈনন্দিন পরিচর্যার একটি স্পষ্ট নীতি রয়েছে: খাওয়াতে হবে, পোষ মানানো যাবে না। দলটি প্রাণীকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধরাধরি করে না, মানুষের কণ্ঠস্বর শোনার সুযোগ কমায় এবং চোখে চোখে সংস্পর্শ কমাতে পর্দা ব্যবহার করে। উদ্দেশ্য হলো মানুষের উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়া ঠেকানো; এমনটা হলে প্রাণীরা মানুষকে ভয় পাওয়া বন্ধ করে এবং বনে ফেরার পর টিকে থাকতে হিমশিম খায়।
কিছু প্রজাতি অন্যদের চেয়ে দ্রুত সুস্থ হয় কেন
প্রজাতি ও বয়সভেদে কেন্দ্রটির সাফল্যের হার ভিন্ন। মা জানান, আহত শিকারি পাখির প্রায় ১০টির মধ্যে ৭টি বেঁচে যায়। দ্রুত শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করা, উপযোগী বসার দণ্ড এবং ডানার শক্তি ফেরানোর মতো জায়গা থাকায় এটি সম্ভব হয়। নীল ভেড়ার ছানা ও লাল হরিণের বাচ্চার মতো বেশির ভাগ অল্পবয়সী খুরওয়ালা প্রাণীও পানিশূন্যতা ও সংক্রমণের ঝুঁকি সামলানো গেলে ভালোভাবে সেরে ওঠে। পূর্ণবয়স্ক হরিণের চিকিৎসা বেশি কঠিন। বন্দি অবস্থায় তারা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং চাপে এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, যা সুস্থ হতে দেরি করাতে পারে বা নিজেকে আঘাত করার কারণ হতে পারে। হরিণের ক্ষেত্রে পরিচর্যাকারীরা প্রায়ই একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ধরাধরি করেন না এবং দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করে তাদের খাওয়ার আগ্রহ, দেহভঙ্গি ও হাঁটাচলা দেখেন।
বন্য পরিবেশের জন্য প্রস্তুতি
বনে ছেড়ে দেওয়ার আগে প্রাণীদের এমন একটি প্রশিক্ষণ এলাকায় নেওয়া হয়, যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশের চ্যালেঞ্জগুলো পুনরায় তৈরি করা হয়েছে। কেন্দ্রটি প্রায় ৪০০ মউ (মোটামুটি ২৬.৬৭ হেক্টর) আল্পাইন তৃণভূমি এ কাজে বরাদ্দ করেছে। সেখানে শিকারিরা শিকার ধরার অনুশীলন করতে পারে এবং তৃণভোজীরা ঝুঁকি এড়ানোর অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে পারে। প্রাণী ছাড়ার পর তাদের গতিবিধি অনুসরণে দল ক্যামেরা ট্র্যাপ এবং প্রয়োজনমতো জিপিএস বা ভিএইচএফ ট্র্যাকার ব্যবহার করে। এতে মাঠপর্যায়ে নতুন তথ্যও পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালে ট্র্যাকারের তথ্য পর্যালোচনা করে কর্মীরা মরুভূমির খরগোশের দৈনিক বিচরণক্ষেত্র ও আশ্রয় বেছে নেওয়ার ধরন সম্পর্কে আরও জানতে পেরেছেন। মালভূমির ছোট মাংসাশী প্রাণীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ শিকার।
সাফল্যের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে এমন সময়েই প্রতিটি প্রাণীকে বনে ছাড়া হয়, সাধারণত যখন খাবার প্রচুর এবং আবহাওয়া মৃদু থাকে। স্থান নির্বাচনে পানির উৎস, আড়াল এবং জনবসতি থেকে দূরত্ব বিবেচনা করা হয়। ছাড়ার পর কোনো প্রাণীর বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাও পরিকল্পনায় থাকে।
সংখ্যার আড়ালের গল্প
শীতের একটি ঘটনা এই কাজের জরুরি তাগিদ ও যত্নশীলতার মিশেল তুলে ধরে। শুধু চীনেই পাওয়া যায় বলে পরিচিত চীনা পাহাড়ি বিড়াল, যাকে চীনা মরুভূমির বিড়ালও বলা হয়, মেনইয়ুয়ান কাউন্টিতে এক রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় চারপাশ শান্ত থাকার সময় এক কৃষকের মুরগির খোঁয়াড়ে ঢুকে পড়ে। মালিক তাড়িয়ে দিতে গেলে প্রাণীটি আহত হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে কেন্দ্রটিতে প্রাণীটিকে পৌঁছে দিতে সহায়তা করে। দুই মাসের চিকিৎসা ও সতর্ক পুনর্বাসনের পর বিড়ালটিকে উপযোগী আবাসে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং সে ভালোভাবেই মানিয়ে নেয়। পরিচর্যাকারীরা এর খাবারের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় লক্ষ করেন। এ প্রজাতি কসাই করা মাংসের বদলে লোমসহ গোটা শিকার খেতে বেশি পছন্দ করে। তাই শিকারের প্রতিক্রিয়া ফিরিয়ে আনতে দলটি পেলেটজাত খাবার ও গোটা শিকারের বিকল্প ব্যবহার করে।
মায়ের কাছে প্রাণীকে বনে ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্ত একই সঙ্গে সাফল্য ও পরীক্ষার।
উদ্ধার করা বন্য প্রাণীদের বনে ছেড়ে দেওয়া আমাদের উদ্ধার প্রচেষ্টার সাফল্য বোঝায়, তবে এর মানে এটাও যে প্রকৃতিতে তারা টিকে থাকবে কি না, সেই নতুন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হবে আমাদের।
আরেকটি ঘটনা জাতীয় পর্যায়ে নজর কেড়েছিল। ২০২১ সালের শেষ দিকে হুয়াং রং নামের একটি অল্পবয়সী চীনা পাহাড়ি বিড়াল পায়ের আঙুল গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় কেন্দ্রে আসে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আঙুলটি বাদ দেওয়া এবং কয়েক মাস ধরে পুনর্বাসনের পর দলটি বিড়ালটিকে উদ্যানের ভেতরের একটি উপত্যকায় ছেড়ে দেয়। ছিংহাই বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও প্রজননকেন্দ্রের উপপরিচালক ছি সিনচাং সেই মুহূর্তের কথা বলেন।
খাঁচার দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে খুব দ্রুত দৌড়ে বেরিয়ে যায়, যা নিশ্চিত করে যে সে যথেষ্ট সুস্থ হয়ে উঠেছে এবং ঠিকমতো দৌড়াতেও পারছে।
বড় মাংসাশী প্রাণীরাও এই কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে যায়। ২০২১ সালের মার্চে লিংঝে নামে পরিচিত একটি তুষারচিতাকে গ্রামের একটি বাড়ির জানালা ভেঙে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। কেন্দ্রটি তার ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করে, বিড়ালজাতীয় প্রাণীর রোগের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করে এবং স্যাটেলাইট কলার পরিয়ে তাকে বনে ছেড়ে দেয়। কলার থেকে পাওয়া দুর্লভ তথ্য জাতীয় উদ্যানের উঁচু উপত্যকায় তুষারচিতা কীভাবে আবাসস্থল ব্যবহার করে, তা নিয়ে গবেষণায় সহায়তা করেছে।
কেন্দ্রটির কাজ এই অঞ্চলের বাইরেও পরিচিতি পেয়েছে। উদ্ধার করা ভরাল, যাদের নীল ভেড়াও বলা হয়, কেন্দ্রের খোঁয়াড়ে বিশ্রাম নিচ্ছে—এমন ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই মনোযোগ সহায়তার পাশাপাশি যাচাই-বাছাইও নিয়ে আসে। দলের মতে, এতে তাদের কাজের মানোন্নয়ন হয়।
সুবিধা, সীমাবদ্ধতা ও পরিচর্যার বিজ্ঞান
বন্যপ্রাণীর চিকিৎসায় উপযুক্ত কক্ষ ও সঠিক রুটিন ফল বদলে দিতে পারে। কেন্দ্রের অস্ত্রোপচারকক্ষে হাড়ের অস্ত্রোপচার ও ক্ষত মেরামত করা যায়, চিকিৎসার জায়গায় তরল চিকিৎসা ও ইমেজিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে এবং পরীক্ষাগারে রক্তের রাসায়নিক উপাদান ও পরজীবী পরীক্ষা করা হয়। মা ও তার দল কঠোরভাবে সুরক্ষিত বা অস্থিতিশীল অবস্থায় থাকা প্রাণীদের সবচেয়ে শান্ত ও ভালো আলোযুক্ত জায়গায় রাখে, যাতে চাপ কমে এবং সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা যায়। ডানার বিস্তার অনুযায়ী বসার দণ্ডের অবস্থান ঠিক করা হয়, আর ভীতু প্রজাতির ক্ষেত্রে চোখে পড়ার মতো উদ্দীপনা কমাতে চোখের পাশে আড়াল ব্যবহার করা হয়।
সীমাবদ্ধতা সব সময়ই রয়েছে। কর্মীরা জানান, বড় শিকারি পাখি ও তুষারচিতার জন্য খাঁচা এবং আবদ্ধ রাখার জায়গা অপ্রতুল। প্রয়োজনে অস্থায়ী বিভাজক দিয়ে কাজ চালানো হয়, তবে ব্যস্ত মাসগুলোতে এতে নমনীয়তা কমে যায়। বন্যপ্রাণীর চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত পশুচিকিৎসক ও কারিগরি কর্মীর ধারাবাহিক সরবরাহও প্রয়োজন। তাদের মাঠে প্রাণী ধরার ঝুঁকি ও বিশেষায়িত অ্যানেসথেশিয়া পদ্ধতি—দুই বিষয়েই দক্ষ হতে হয়। চাহিদা বাড়তে থাকায় আরও কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন মা।
বন্য প্রাণীরা গৃহপালিত প্রাণীর মতো ধরাধরি সহ্য করে না। হরিণকে দীর্ঘ সময় তাড়া করা বা আটকে রাখলে ক্যাপচার মায়োপ্যাথি হতে পারে, যা চাপজনিত পেশির একটি সমস্যা। বসার দণ্ড ঠিক না হলে বা তাড়াহুড়ো করে ধরাধরি করলে শিকারি পাখির উড়ার পালক ভেঙে যেতে পারে। শব্দ কমানো, শান্তভাবে চলাফেরা এবং একান্ত জরুরি না হলে ঘুমের ওষুধ ব্যবহার না করার মাধ্যমে এসব সমস্যা ঠেকানো যায়। এ কারণেই মাঠপর্যায়ে পরিবহন ও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ মিনিট ধরে পরিকল্পনা করা হয়।
একটি উদ্যান, সুরক্ষাকবচ ও জীববৈচিত্র্যের হটস্পট
কিলিয়ান পর্বতমালা ছিংহাই ও গানসু প্রদেশজুড়ে বিস্তৃত। হিমবাহ, আল্পাইন তৃণভূমি ও মরুভূমির স্তেপ খাড়া অববাহিকায় মিলিত হয়ে পশ্চিম চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সুরক্ষাকবচ তৈরি করেছে। এই উদ্যান তুষারচিতা, চীনা পাহাড়ি বিড়াল, প্যালাসের বিড়াল, সাদা ঠোঁটের হরিণ, নীল ভেড়া ও কালোগলা সারসসহ মালভূমির বিরল প্রজাতির প্রাণীদের আশ্রয়স্থল। নীল ভেড়ার মতো শিকার প্রাণীর সংখ্যা বাড়লে শীর্ষ শিকারিরাও স্থিতিশীল হতে পারে, যা বৃহত্তর খাদ্যজালের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে।
জাতীয় উদ্যানের ভেতরে উদ্ধারকেন্দ্র স্থাপন করায় সাড়া দেওয়ার ধরন বদলে যায়। বনরক্ষী, গবেষক ও পশুচিকিৎসকেরা একই এলাকায় কাজ করেন, যেখানে প্রাণীরা বাস করে ও চলাফেরা করে। এতে খবর পাওয়া থেকে চিকিৎসা শুরু করার সময় কমে, দীর্ঘ যাত্রার চাপ হ্রাস পায় এবং ছেড়ে দেওয়া প্রাণীদের পরিচিত আবাসেই রাখা যায়। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য এটি জীবন্ত শ্রেণিকক্ষ, যেখানে দেখানো যায় বিজ্ঞান, ঐতিহ্যবাহী পশুপালনজ্ঞান ও উদ্যান ব্যবস্থাপনা কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
স্থানীয়দের শেখা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি
এই কেন্দ্র সংরক্ষণবিষয়ক পাঠশালা হিসেবেও কাজ করে। দর্শনার্থীরা দূর থেকে প্রাণী দেখতে পারেন এবং এমন কেস হিস্ট্রি পড়তে পারেন, যেখানে বোঝানো হয় পেঁচার ডানা সারতে কেন কয়েক মাস লাগে, কিংবা অল্পবয়সী খুরওয়ালা প্রাণী কীভাবে যানবাহনকে ভয় পেতে শেখে। দীর্ঘদিনের পশুপালক তাশি সেরিং কেন্দ্রটিকে চারণভূমি ইজারা দিয়েছেন এবং এখন সেখানে প্রাণীর পরিচর্যাকারী হিসেবে কাজ করেন। তিনি নতুনদের অভিবাসনের ধরন ও আবহাওয়ার লক্ষণ বুঝতে সাহায্য করেন। তার ভূমিকা স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও বৈজ্ঞানিক দলের মধ্যে সেতুবন্ধ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি এক পরিদর্শনকালে মা ব্যাখ্যা করেন, জনসচেতনতামূলক কাজ কীভাবে দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনকে প্রভাবিত করে।
একজন মানুষ একটি পরিবারকে প্রভাবিত করতে পারেন, আর অনেক পরিবার মিলে পুরো সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে।
কাছের গ্রামগুলো থেকে পাওয়া খবরে ইঙ্গিত মেলে, এই বার্তা মানুষের মধ্যে পৌঁছাচ্ছে। কৃষক ও পশুপালকেরা সন্দেহজনক বন্যপ্রাণীর ঘটনা আগের চেয়ে বেশি জানাচ্ছেন এবং নিরাপদে সম্ভব হলে আহত প্রাণীদের কেন্দ্রে নিয়ে আসছেন। শীতের মরুভূমির বিড়াল উদ্ধারের ঘটনাটি শুরু হয়েছিল এক গ্রামবাসীর হাত ধরে; সুরক্ষিত প্রজাতির প্রাণী বলে বুঝতে পেরে তিনি নিজের সিদ্ধান্ত বদলান।
উদ্ধারের বাইরে সংরক্ষণ বিতর্ক
উদ্ধারকেন্দ্র একটি প্রাণীর জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু প্রজাতির সুস্থতা নির্ভর করে কেন্দ্রের বেড়ার বাইরে কী ঘটছে তার ওপর। ২০২৫ সালের মার্চে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় সুন শাংশিয়াং নামের একটি প্যালাসের বিড়াল ছিংহাই কেন্দ্রের বন্দি অবস্থায় পরিপাকতন্ত্রের জরুরি সমস্যায় মারা গেলে এই টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আসে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এবং স্বভাব সতর্ক হওয়ায় এই প্রজাতির পরিচর্যা কঠিন। ঘটনাটি কখন হস্তক্ষেপ করা উচিত এবং বন্দি অবস্থায় ঝুঁকির বিপরীতে একেকটি প্রাণীর পরিচর্যাকে কীভাবে বিবেচনা করা উচিত, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে।
ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল প্রোটেকশনের বিজ্ঞানী সুন ছুয়ানহুই প্রথমে আবাসস্থল সংরক্ষণে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
প্যালাসের বিড়ালের টিকে থাকা নিশ্চিত করার সেরা উপায় হলো এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করা এবং বাস্তুতন্ত্রে মানুষের হস্তক্ষেপ কমানো।
আবাসস্থলের ওপর চাপ বাস্তব। সংরক্ষণ সংগঠনগুলো কিলিয়ান পর্বতমালার ঝাংয়ে অংশে বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সেখানে প্যালাসের বিড়ালসহ অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীর বিচরণ রয়েছে। নতুন টারবাইন ও সড়ক আবাসস্থলকে খণ্ডিত করতে পারে এবং শিকার প্রাণীর সংখ্যা কমাতে পারে। চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের নর্থওয়েস্ট ইনস্টিটিউট অব ইকো-এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্সেসের সহযোগী অধ্যাপক লিউ জিলিয়াং প্রকল্পের স্থান নির্বাচন ও ক্ষতি প্রশমন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আরও ভালো তথ্য-উপাত্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ দ্রুত এগোচ্ছে, বন্যপ্রাণীর ওপর এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করার সক্ষমতার চেয়েও দ্রুত।
উন্নয়নকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যদি পর্যবেক্ষণে অর্থায়ন করে, গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ এড়িয়ে স্থাপনার বিন্যাস ঠিক করে এবং নির্মাণের পর ভূমির আচ্ছাদন পুনরুদ্ধার করে, তাহলে জ্বালানি রূপান্তর ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষা একসঙ্গেই এগোতে পারে। কিলিয়ান পর্বতমালায় যানবাহনের ধাক্কা, গবাদিপশুর সঙ্গে সংঘাত, ঝড় বা রোগে আহত প্রাণীদের জন্য উদ্ধারকেন্দ্রটি এখনো নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। তবে সময়ের সঙ্গে কত কম প্রাণীর এই নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারণ করবে আবাসস্থল সংরক্ষণ, স্থানীয় মানুষের খবর দেওয়া এবং কেন্দ্রের বাইরের এলাকায় সতর্ক পরিকল্পনা।
মূল বিষয়গুলো
- কিলিয়ান পর্বত জাতীয় উদ্যানের ভেতরে চীনের একমাত্র বন্যপ্রাণী উদ্ধারকেন্দ্রটি অবস্থিত।
- ২০২২ সালের আগস্ট থেকে কেন্দ্রটি ৩৬ প্রজাতির ২০০টিরও বেশি প্রাণীর চিকিৎসা করেছে; ৪০টিরও বেশি প্রাণীকে বনে ছাড়া হয়েছে এবং ৫০টিরও বেশি প্রাণী এখনো পরিচর্যায় রয়েছে।
- প্রাণিবিজ্ঞানী মা ছুনসিন প্রশিক্ষিত একটি দলের নেতৃত্ব দেন। দলটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা করে এবং বন্য প্রবৃত্তি অক্ষুণ্ন রাখতে প্রাণীদের পোষ মানানো এড়িয়ে চলে।
- কেন্দ্রে অস্ত্রোপচারকক্ষ, চিকিৎসার জায়গা ও পরীক্ষাগার রয়েছে। বিভিন্ন প্রাণীগোষ্ঠীর জন্য আলাদা আশ্রয়ের ব্যবস্থা আছে এবং একসঙ্গে সর্বোচ্চ ৪৩টি প্রাণী রাখা যায়।
- উদ্ধারের সাফল্য প্রজাতিভেদে ভিন্ন: আহত শিকারি পাখির প্রায় ৭০ শতাংশ বেঁচে যায়, বেশির ভাগ অল্পবয়সী খুরওয়ালা প্রাণী সুস্থ হয়, তবে চাপের কারণে পূর্ণবয়স্ক হরিণের চিকিৎসা কঠিন।
- ৪০০ মউয়ের একটি প্রশিক্ষণ এলাকা প্রাণীদের বনে ছাড়ার আগে শিকার করা ও ঝুঁকি এড়ানোর অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে; ট্র্যাকার থেকে বনে ছাড়ার পরের তথ্য পাওয়া যায়।
- পায়ের আঙুল বাদ দেওয়ার পর একটি চীনা পাহাড়ি বিড়ালকে বনে ছেড়ে দেওয়া এবং গবেষণার জন্য স্যাটেলাইট কলার পরিয়ে একটি তুষারচিতাকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা এর মধ্যে রয়েছে।
- কর্মীরা জানান, বড় শিকারি পাখি ও তুষারচিতার জন্য খাঁচা ও বড় জায়গার অভাব রয়েছে। আরও কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষিত কর্মীও প্রয়োজন।
- স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে: গ্রামবাসীরা আহত প্রাণীর খবর দিচ্ছেন এবং একজন স্থানীয় পশুপালক এখন কেন্দ্রে প্রাণীর পরিচর্যাকারী হিসেবে কাজ করছেন।
- বন্দি অবস্থায় একটি প্যালাসের বিড়ালের মৃত্যু আবাসস্থলকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংরক্ষণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। ঝাংয়ে বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণেও আবাসস্থল খণ্ডিত হওয়ার উদ্বেগ রয়েছে।






