উত্তর কোরিয়ার ব্যয়বহুল ঝুঁকি: রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে নিহত সেনাদের পরিবারকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি কিম জং উনের
বিরল ও আবেগঘন একাধিক অনুষ্ঠানে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রুশ বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তাঁর দেশের শত শত সেনা নিহত হয়েছেন। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে ‘সুন্দর জীবন’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কিমের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পিয়ংইয়ং ও মস্কোর গভীরতর জোটে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সূচনা করেছে—একই সঙ্গে ইউরোপীয় সংঘাতে উত্তর কোরিয়ার সম্পৃক্ততা নাটকীয়ভাবে বাড়ারও ইঙ্গিত দিয়েছে।
সূচিপত্র
- উত্তর কোরিয়ার ব্যয়বহুল ঝুঁকি: রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে নিহত সেনাদের পরিবারকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি কিম জং উনের
- রাশিয়ার হয়ে লড়তে সেনা পাঠাল উত্তর কোরিয়া কেন?
- কতজন উত্তর কোরীয় সেনা নিহত হয়েছেন?
- অনুষ্ঠানের অন্তরালে: কিমের আবেগঘন আবেদন ও রাজনৈতিক হিসাব
- প্রচার, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্য
- যুদ্ধে উত্তর কোরীয় সেনাদের ভূমিকা কী ছিল?
- নিষ্ঠুর কৌশল ও আত্মসমর্পণে অনীহা
- এর বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া কী পাচ্ছে?
- আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক প্রভাব
- উত্তর কোরীয় সেনা ও তাদের পরিবারের সামনে কী অপেক্ষা করছে?
- বৃহত্তর তাৎপর্য: সামরিক জোটের নতুন যুগ
- সংক্ষেপে
কিম যখন শোকাহত মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তানদের সামনে গভীরভাবে মাথা নত করছেন, সেই দৃশ্য উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। এতে রাশিয়ার সম্মুখযুদ্ধে হাজারো সেনা পাঠানোর পিয়ংইয়ংয়ের সিদ্ধান্তের মানবিক মূল্য সম্পর্কে বিশ্ব এক ঝলক ধারণা পায়। মরণোত্তর পদক প্রদান ও আন্তরিক সমবেদনা জানানোর এসব অনুষ্ঠান ইউক্রেনে উত্তর কোরীয় হতাহতের ব্যাপকতা নিয়ে প্রথম প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি। এগুলো উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রনীতির পেছনে থাকা ঝুঁকি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষারও ইঙ্গিত দেয়।
রাশিয়ার হয়ে লড়তে সেনা পাঠাল উত্তর কোরিয়া কেন?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। পিয়ংইয়ং দীর্ঘদিন ধরে মস্কোকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে এবং অস্ত্র সরবরাহ করেছে, তবে যুদ্ধের জন্য সেনা মোতায়েন দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দক্ষিণ কোরীয় ও পশ্চিমা গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শরৎ থেকে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ায়, মূলত কুরস্ক অঞ্চলে, ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার সেনা পাঠায়। কিম জং উন ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। চুক্তিতে দুই দেশের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে আগ্রাসন হলে সামরিক সহায়তার অঙ্গীকার করা হয়েছিল।
যুদ্ধ তৃতীয় বছরে গড়ানো এবং রাশিয়ার হতাহতের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর কোরীয় সেনাদের আগমন রাশিয়ার জনবলসংকট মোকাবিলায় সহায়তা করেছে। উত্তর কোরিয়ার জন্য এই সেনা মোতায়েনে সম্ভাব্য বেশ কিছু সুবিধা ছিল:
- উন্নত রুশ সামরিক প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার, যার মধ্যে রয়েছে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ও উপগ্রহ প্রযুক্তি
- অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ—প্রতিটি সেনার জন্য মাসিক বেতন ও রাষ্ট্রের প্রণোদনা দেওয়ার খবর রয়েছে
- কূটনৈতিক প্রভাব এবং একটি বড় বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ
- সামরিক যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা—কোরীয় যুদ্ধের পর বিদেশে উত্তর কোরীয় সেনারা আর যুদ্ধে অংশ নেয়নি
উত্তর কোরিয়ার অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক রীতিনীতি চ্যালেঞ্জ করা এবং পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্বের সুফল পাওয়ার আশায় ঝুঁকি নিয়েছে দেশটি।
কতজন উত্তর কোরীয় সেনা নিহত হয়েছেন?
উত্তর কোরীয় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা গোপনই রয়েছে। তবে দক্ষিণ কোরীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের হিসাব বলছে, অন্তত ৬০০ উত্তর কোরীয় সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও হাজারো সেনা আহত হয়েছেন। কিছু সূত্রের হিসাবে, ১৫ হাজার সেনার মধ্যে নিহত ও আহত মিলিয়ে মোট হতাহতের সংখ্যা ৪ হাজার ৭০০ পর্যন্ত হতে পারে। ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাও কাছাকাছি হিসাব দিয়েছে। ইউক্রেনের বিশেষ বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তর কোরীয় ইউনিটগুলোর তীব্র এবং প্রায়ই মরিয়া কৌশলের কথা জানিয়েছে।
সম্প্রতি পিয়ংইয়ংয়ে এক অনুষ্ঠানে কিম জং উন নিহত ১০০ সেনার পরিবারকে সম্মান জানান। তিনি শিশুদের জড়িয়ে ধরেন এবং জাতীয় পতাকায় মোড়ানো নিহত সেনাদের প্রতিকৃতি তুলে দেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেখা যায়, কিম এক নিহত সেনার প্রতিকৃতির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মৃতদের ছবির পাশে পদক ও ফুল রাখছেন। উত্তর কোরিয়ায় এ ধরনের ব্যাপক প্রচারিত অনুষ্ঠান অস্বাভাবিক, কারণ দেশটি খুব কমই সামরিক ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে—বিশেষ করে চলমান সংঘাতের সময়।
অনুষ্ঠানের অন্তরালে: কিমের আবেগঘন আবেদন ও রাজনৈতিক হিসাব
শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোতে প্রতীকী তাৎপর্য ও রাজনৈতিক বার্তা ছিল স্পষ্ট। কিম জং উন বলেন, নিহতদের ‘মূল্যবান জীবন’ রক্ষা করতে না পারায় তিনি গভীরভাবে অনুতপ্ত। তিনি পরিবারগুলোকে জানান, তাঁদের স্বজনদের আত্মত্যাগ রাষ্ট্র সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করবে। মৃতদের সন্তানদের পূর্ণ সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। এ জন্য পিয়ংইয়ংয়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং শোকাহত পরিবারগুলোর নামে নতুন সড়কের নামকরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে কিম এক ভাষণে বলেন, “স্মৃতিপ্রাচীরে থাকা ছবির মাধ্যমে মহান বিজয় ও গৌরবের জন্য নিজেদের মূল্যবান জীবন উৎসর্গ করা মহৎ মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা করতে পারি—এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে আমার হৃদয় ব্যথিত ও ভারাক্রান্ত।”
কিমের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পাঠানো এক চিঠিতেও। চিঠিতে তিনি উত্তর কোরীয় সেনাদের ‘বীরোচিত’ বলে উল্লেখ করেন এবং দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধনের কথা স্মরণ করেন। উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে এসব অনুষ্ঠান সেনা মোতায়েনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার এবং দেশে মনোবল বাড়ানোর কাজও করেছে।
প্রচার, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্য
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নিহত সেনাদের শহীদ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে; বলা হয়েছে, তাঁরা দেশের সম্মান রক্ষা করেছেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ‘মহান কৃতিত্ব’ অর্জনে অবদান রেখেছেন। সরকার পরিবারগুলোকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে দৃঢ়চেতা, দেশপ্রেমিক ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ’ বলে প্রশংসা করেছে এবং তাদের দেখভাল করাকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কান্নারত শিশুদের জড়িয়ে ধরা ও শোকাহত মা-বাবার সামনে কিমের মাথা নত করার মতো আবেগঘন দৃশ্য উত্তর কোরীয় রাষ্ট্রের মূল মূল্যবোধ হিসেবে আনুগত্য ও আত্মত্যাগকে প্রতিষ্ঠা করার সুপরিকল্পিত প্রচারণার অংশ।
তবে প্রচারের আড়ালে রয়েছে কঠোর বাস্তবতা: রাশিয়ায় পাঠানো অনেক সেনাই ছিল তরুণ, যাদের বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সামান্য। বাড়ি থেকে বহু দূরে তাদের লড়তে হয়েছে নিষ্ঠুর ও অপরিচিত এক সংঘাতে। ইউক্রেনীয় কমান্ডারদের ভাষ্য, উত্তর কোরীয় সেনারা অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ ও শারীরিকভাবে সহনশীল হলেও আধুনিক যুদ্ধ এবং রুশ সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের পরিচিতি কম। মোতায়েনের শুরুর দিকে উত্তর কোরীয় ইউনিটগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। তারা প্রায়ই বড় ও অরক্ষিত দলে চলাচল করত এবং নিহত সহযোদ্ধাদের মরদেহ উদ্ধারে জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে প্রস্তুত থাকত।
যুদ্ধে উত্তর কোরীয় সেনাদের ভূমিকা কী ছিল?
যুদ্ধক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার অভাব থাকায় শুরুতে বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, উত্তর কোরীয় সেনাদের প্রকৌশল বা নির্মাণকাজের মতো অযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু সম্মুখসারির খবর বলছে, উত্তর কোরীয় ইউনিটগুলো সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে, বিশেষ করে কুরস্ক অঞ্চলে। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ইউক্রেনীয় বাহিনী সেখানে আকস্মিক অভিযান চালায়।
উত্তর কোরীয় ইউনিটের বিরুদ্ধে লড়াই করা ইউক্রেনীয় সেনারা জানান, প্রতিপক্ষ বড়, শৃঙ্খলাবদ্ধ দলে একসঙ্গে চলাচল করত এবং ড্রোন ও গোলাবর্ষণেও প্রায় দমে যেত না। খবর অনুযায়ী, কিছু উত্তর কোরীয় সেনা তাপীয় চিত্রগ্রহণে শনাক্ত হওয়া এড়াতে মাইলার দিয়ে তৈরি পঞ্চো গায়ে জড়িয়েছিল, কিন্তু তাতে ড্রোনের কাছে তাদের আরও সহজে দেখা যাচ্ছিল। ইউক্রেনীয় ড্রোনচালকেরা জানান, উত্তর কোরীয় সেনারা ড্রোন ভূপাতিত করতে এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের কৌশলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ক্রমেই দক্ষ হয়ে ওঠে।
কুরস্কে লড়াই করা ইউক্রেনের এক বিশেষ অভিযান বাহিনীর সেনা বলেন, “উত্তর কোরীয়রা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়া থেকে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ শিখে নেওয়ার পর্যায়ে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কৌশল ব্যবহার করা থেকে তারা ড্রোন নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র সামলাতে শিখেছে, আর খুব দ্রুত শিখেছে।”
২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে রুশ ও উত্তর কোরীয় বাহিনী ইউক্রেনীয় সেনাদের কুরস্কের অধিকাংশ এলাকা থেকে হটিয়ে দেয়। মে মাসে রাশিয়ার বিজয় দিবসের উদ্যাপনেও উত্তর কোরীয় সেনাদের সম্মান জানানো হয়। ড্রোনযুদ্ধ ও আধুনিক লড়াইয়ে উত্তর কোরীয় সেনাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা দক্ষিণ কোরিয়া ও পশ্চিমা বিশ্লেষকদের উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁদের আশঙ্কা, কোরীয় উপদ্বীপে ভবিষ্যৎ কোনো সংঘাতে পিয়ংইয়ং এই নতুন দক্ষতা কাজে লাগাতে পারে।
নিষ্ঠুর কৌশল ও আত্মসমর্পণে অনীহা
ইউক্রেনীয় সেনা ও দলত্যাগীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, উত্তর কোরীয় সেনারা কিম জং উনের প্রতি অত্যন্ত মতাদর্শে দীক্ষিত ও অনুগত; আত্মসমর্পণে তাদের প্রবল অনীহা রয়েছে। উত্তর কোরীয় সেনাদের বন্দি হওয়া এড়াতে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানোর খবর রয়েছে। তাঁদের স্বজনেরা বন্দি হলে পরিবারগুলোকে কঠোর পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে বলেও খবর পাওয়া গেছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী অল্পসংখ্যক আহত উত্তর কোরীয় সেনাকে বন্দি করতে পেরেছে, তবে বেশির ভাগই চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা না থাকলেও উত্তর কোরীয় সেনারা, বিশেষ করে ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থার ব্যবহারে, অভিযোজন ও শেখার আগ্রহ দেখিয়েছে। রুশ কমান্ডাররা উত্তর কোরীয় ইউনিটগুলোকে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বলে খবর রয়েছে। বিনিময়ে রাশিয়ার উন্নত সামরিক প্রযুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে পিয়ংইয়ং, এমন ইঙ্গিতও মিলেছে।
এর বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া কী পাচ্ছে?
রাশিয়ায় সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত উত্তর কোরিয়া হালকাভাবে নেয়নি। অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি পিয়ংইয়ং রাশিয়ার সামরিক প্রযুক্তি পেতে চাইছে বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে দূরপাল্লার ড্রোন তৈরির দিকনির্দেশনা, ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা বাড়ানো এবং গোয়েন্দা উপগ্রহ উন্নয়ন। রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তা উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে, বিশেষ করে পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে।
জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের নির্মাণ ও মাইন অপসারণের কাজে রাশিয়ায় পাঠানোর খবরও রয়েছে। এসব মোতায়েনের অর্থনৈতিক সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সম্ভাবনা মিলিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে জোটকে কিম জং উনের জন্য উচ্চঝুঁকির এক বাজিতে পরিণত করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক প্রভাব
ইউক্রেনে লড়াইয়ের জন্য উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েনের নিন্দা জানিয়েছে ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো। তাদের সতর্কবার্তা, এতে সংঘাত আন্তর্জাতিক রূপ নিতে পারে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, উত্তর কোরীয় সেনাদের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা ও নতুন সামরিক সক্ষমতা ভবিষ্যতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। দীর্ঘদিনের নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে সিউল ইউক্রেনকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করতে পারে বলে জানিয়েছে।
জার্মানি ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশ রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘও যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছে। পিয়ংইয়ং ও মস্কোর সামরিক জোট গভীরতর হওয়ায় বৈশ্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনগুলো পশ্চিমা প্রভাব ও রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করছে।
উত্তর কোরীয় সেনা ও তাদের পরিবারের সামনে কী অপেক্ষা করছে?
রাশিয়ার যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার অংশগ্রহণ শেষ হতে পারে বলে কিম জং উন ইঙ্গিত দিলেও সম্মুখসারিতে কতজন উত্তর কোরীয় সেনা রয়েছেন বা আরও সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ইউক্রেনীয় ও পশ্চিমা গোয়েন্দারা সতর্ক করেছে, যুদ্ধ চলতে থাকলে পিয়ংইয়ং আরও কয়েক হাজার সেনা পাঠাতে পারে। রাশিয়ায় থাকা উত্তর কোরীয় শ্রমিকদেরও সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে প্রলুব্ধ করা হতে পারে।
নিহতদের পরিবারের কাছে ‘সুন্দর জীবনের’ প্রতিশ্রুতি ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা একদিকে সান্ত্বনার উৎস, অন্যদিকে শাসনব্যবস্থা তাদের কাছে যে আত্মত্যাগ দাবি করে তারও স্মারক। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, সড়কের নামকরণ ও বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া—সবই ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও আনুগত্য ও মনোবল ধরে রাখার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
বৃহত্তর তাৎপর্য: সামরিক জোটের নতুন যুগ
ইউক্রেনে উত্তর কোরীয় সেনাদের হতাহতের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করা পিয়ংইয়ংয়ের পররাষ্ট্রনীতি ও মস্কোর সঙ্গে সম্পর্কের মোড় ঘোরানো ঘটনা। দুই দেশের সামরিক জোট গভীরতর হওয়ার প্রভাব ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং উত্তর-পূর্ব এশিয়াসহ আরও বিস্তৃত অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে গড়ে তুলতে পারে।
বেইজিংয়ে সামরিক কুচকাওয়াজে ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কিম জং উনের সাক্ষাতের প্রস্তুতির সময় বিশ্ব নিবিড়ভাবে নজর রাখবে কর্তৃত্ববাদী শক্তিগুলোর এই নতুন জোট কীভাবে বিকশিত হয়—এবং বৈশ্বিক সংঘাতের ভবিষ্যতের জন্য এর অর্থ কী।
সংক্ষেপে
- রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনে লড়াই করতে গিয়ে শত শত উত্তর কোরীয় সেনা নিহত হয়েছেন বলে কিম জং উন প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন এবং তাঁদের পরিবারকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
- গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার সেনা পাঠিয়েছে। অন্তত ৬০০ জন নিহত এবং আরও হাজারো সেনা আহত হয়েছেন।
- কিম ও পুতিনের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির পর এই সেনা মোতায়েন করা হয়, যা পিয়ংইয়ং ও মস্কোর সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।
- উত্তর কোরীয় সেনারা, বিশেষ করে ড্রোনযুদ্ধে, মূল্যবান যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এতে দক্ষিণ কোরিয়া ও পশ্চিমা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ বেড়েছে।
- উত্তর কোরিয়া সহায়তার বিনিময়ে উন্নত রুশ সামরিক প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ পেতে চাইছে বলে ধারণা করা হয়।
- নিহতদের পরিবারকে নিয়ে প্রকাশ্য অনুষ্ঠান ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি আনুগত্য জোরদার এবং ব্যয়বহুল সেনা মোতায়েনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার বৃহত্তর প্রচারণার অংশ।
- আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তীব্র সমালোচনামূলক। আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার আহ্বান এবং সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তা এসেছে।
- যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার অংশগ্রহণের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কিম একদিকে অভিযান শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্যদিকে আরও সেনা পাঠানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।






