সিঙ্গাপুরে ভ্যাপিংয়ের বিরুদ্ধে নতুন দমন অভিযান: বিদেশিদের পাস বাতিল, বহিষ্কার ও প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে
কঠোর আইন ও পরিচ্ছন্ন সড়কের জন্য পরিচিত সিঙ্গাপুর ভ্যাপিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করছে। ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে নগররাষ্ট্রটিতে ই-সিগারেট বা ভ্যাপসহ ধরা পড়া বিদেশিদের শুধু বড় অঙ্কের জরিমানাই নয়, পাস বাতিল, বহিষ্কার এবং দেশটিতে পুনঃপ্রবেশে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত নতুন পদক্ষেপগুলো বিশ্বের অন্যতম কঠোর ভ্যাপবিরোধী ব্যবস্থা, যার লক্ষ্য নিকোটিন ও মাদকমিশ্রিত—দুই ধরনের ভ্যাপই। অবৈধ ভ্যাপিং বেড়ে যাওয়া এবং মাদকমিশ্রিত ডিভাইস, বিশেষ করে স্থানীয়ভাবে “কে-পডস” নামে পরিচিত ইটোমিডেটযুক্ত ভ্যাপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই অভিযান শুরু হয়েছে।
সূচিপত্র
- সিঙ্গাপুরে ভ্যাপিংয়ের বিরুদ্ধে নতুন দমন অভিযান: বিদেশিদের পাস বাতিল, বহিষ্কার ও প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে
- ভ্যাপিংয়ের বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুর এত কঠোর কেন?
- ভ্যাপিংয়ে ধরা পড়লে বিদেশিদের কী শাস্তি হবে?
- ট্রানজিট যাত্রী ও পর্যটক: কোনো ছাড় নেই
- আইন কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
- মাদকমিশ্রিত ভ্যাপিং নিয়ে এত উদ্বেগ কেন?
- বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের অবস্থানের তুলনা
- সিঙ্গাপুরে ভ্যাপিং সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র কী?
- অভিবাসী শ্রমিক ও প্রবাসীদের জন্য এর তাৎপর্য
- অঞ্চলজুড়ে প্রভাব: পর্যটন ও সীমান্তপারের চ্যালেঞ্জ
- সমালোচনা ও বিতর্ক: শূন্য-সহনশীলতাই কি সবচেয়ে ভালো পথ?
- বিদেশিদের কী করা উচিত?
- সারসংক্ষেপ
সিঙ্গাপুরের বার্তা স্পষ্ট: দেশটি ভ্যাপিং সহ্য করবে না, আর বিদেশিদের ক্ষেত্রেও স্থানীয়দের মতো, এমনকি তার চেয়েও কঠোর শাস্তি প্রযোজ্য হতে পারে। নতুন নিয়ম পর্যটক, প্রবাসী, অভিবাসী শ্রমিক ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।
ভ্যাপিংয়ের বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুর এত কঠোর কেন?
২০১৮ সালে সিঙ্গাপুর ই-সিগারেট ও ভ্যাপ আমদানি, বিক্রি, কেনা, ব্যবহার ও সঙ্গে রাখা নিষিদ্ধ করে। এ পদক্ষেপ নেওয়া বিশ্বের প্রথম দেশগুলোর একটি ছিল সিঙ্গাপুর। নিষেধাজ্ঞার প্রধান কারণ হিসেবে কর্তৃপক্ষ জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ, মাদকাসক্তির প্রবেশপথ হিসেবে ভ্যাপিংয়ের ঝুঁকি এবং তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। কেটামিনের মতো প্রভাবসম্পন্ন শক্তিশালী অবশকারী ওষুধ ইটোমিডেট মেশানো ভ্যাপের সাম্প্রতিক বৃদ্ধি সরকারের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওং ইয়ে কুং এ পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন:
ভ্যাপ খুব গুরুতর মাদকাসক্তির প্রবেশপথ হয়ে উঠেছে। এখন এই ডিভাইসগুলো মাদক সেবনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।সরকারের শূন্য-সহনশীলতার নীতি বাসিন্দাদের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরে বসবাস, কাজ বা ভ্রমণে আসা লাখ লাখ বিদেশিকেও কঠোরভাবে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সমস্যাটির ব্যাপকতা তুলে ধরে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে কর্তৃপক্ষ ইটোমিডেটযুক্ত ই-ভ্যাপ পডের ২৮টি ঘটনা শনাক্ত করেছে—যা ২০২৪ সালের পুরো বছরের সংখ্যার প্রায় তিন গুণ। মাদকমিশ্রিত ভ্যাপ ব্যবহারের পর তরুণদের অস্বাভাবিক আচরণের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা জনমনে উদ্বেগ এবং কঠোর প্রয়োগের পক্ষে সমর্থন বাড়িয়েছে।
ভ্যাপিংয়ে ধরা পড়লে বিদেশিদের কী শাস্তি হবে?
নতুন পদক্ষেপে ধাপে ধাপে শাস্তির ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পুনরায় অপরাধ করলে এবং মাদকমিশ্রিত ভ্যাপসহ ধরা পড়লে শাস্তি আরও কঠোর হবে। নিয়মগুলো হলো:
- প্রথম অপরাধ (নিকোটিনযুক্ত ভ্যাপ): ই-ভ্যাপোরাইজারসহ ধরা পড়া বিদেশিদের ডিভাইস জব্দ করা হবে এবং জরিমানা করা হবে। ১৮ বছরের কম বয়সীদের জরিমানা হবে ৫০০ সিঙ্গাপুর ডলার (আগে ৩০০ ডলার), আর প্রাপ্তবয়স্কদের ৭০০ ডলার (আগে ৫০০ ডলার)।
- পুনরায় অপরাধ: স্বল্পমেয়াদি ভিজিট পাসধারীরা আবার অপরাধ করলে সিঙ্গাপুরে পুনঃপ্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। দীর্ঘমেয়াদি পাসধারী বিদেশিদের (এমপ্লয়মেন্ট পাস, এস পাস, ওয়ার্ক পারমিট, স্টুডেন্টস পাস, লং-টার্ম ভিজিট পাস, ডিপেন্ড্যান্টস পাস) তৃতীয় অপরাধে পাস বাতিল হতে পারে; পাশাপাশি তাঁদের বহিষ্কার এবং পুনঃপ্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে।
- মাদকমিশ্রিত ভ্যাপ (কে-পডস/ইটোমিডেট): ইটোমিডেটমিশ্রিত ভ্যাপসহ ধরা পড়া বা পরীক্ষায় এ মাদকের উপস্থিতি পাওয়া গেলে বিদেশিদের পাস বাতিল, বহিষ্কার এবং সিঙ্গাপুরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। প্রথম অপরাধ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
- সরবরাহকারী ও পাচারকারী: মাদকমিশ্রিত ভ্যাপ সরবরাহ করতে গিয়ে ধরা পড়লে, জাতীয়তা যা-ই হোক, সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং বেত্রাঘাতের ১৫টি দণ্ড হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে. শানমুগাম বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পাসধারী তরুণ বা প্রথমবার অপরাধকারীদের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা দেখানো হতে পারে, তবে পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের সরিয়ে দেওয়া হবে। প্রতিটি ঘটনা বিবেচনা করে আপিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, কিন্তু সার্বিকভাবে অবস্থান অনড়।
ট্রানজিট যাত্রী ও পর্যটক: কোনো ছাড় নেই
চাঙ্গি বিমানবন্দর দিয়ে শুধু ট্রানজিট করলেও সিঙ্গাপুরের কঠোর নিয়ম প্রযোজ্য। অবতরণকারী উড়োজাহাজে ঘোষণা এবং চোখে পড়ার মতো সাইনবোর্ডে যাত্রীদের ইমিগ্রেশন পার হওয়ার আগে বিশেষ লাল বিনে ভ্যাপ ফেলে দিতে বলা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওং ইয়ে কুং জোর দিয়ে বলেন:
ভ্যাপ ফেলে দিতে হবে। ট্রানজিট যাত্রীরা বিমানবন্দরের লাল বিনে ভ্যাপ জমা দিতে ও ফেলে দিতে পারেন।ধরা পড়লে ভ্যাপগুলো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য, নাকি পাচারের উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল, তা কর্মকর্তারা যাচাই করবেন। পাচারের ক্ষেত্রে শাস্তি অনেক বেশি কঠোর।
আইন কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
সিঙ্গাপুরে আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা বহুস্তরীয় এবং এতে সরকারের একাধিক সংস্থা যুক্ত:
- ইমিগ্রেশন অ্যান্ড চেকপয়েন্টস অথরিটি (আইসিএ): সীমান্তে তল্লাশি বাড়ানোর ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শত শত ভ্যাপ ও যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়েছে। আলোচিত এক ঘটনায়, ৮৯০টির বেশি ভ্যাপ ও ৬,৭০০টি যন্ত্রাংশসহ উডল্যান্ডস চেকপয়েন্টে এক মালয়েশীয় ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
- জনশক্তি মন্ত্রণালয় (এমওএম): প্রায় ৭০০ কর্মকর্তাকে ভ্যাপিংয়ের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অভিবাসী শ্রমিকদের আবাসনে আকস্মিক তল্লাশিও রয়েছে। বিশেষায়িত প্রয়োগ কার্যক্রমের জন্য কয়েকজন কর্মকর্তাকে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান কর্তৃপক্ষে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
- জনসচেতনতা: সরকার একাধিক ভাষায় তথ্যসামগ্রী বিতরণ করে প্রচার কার্যক্রম জোরদার করছে এবং অভিবাসী শ্রমিক ও গৃহকর্মীদের কাছে পৌঁছাতে নিয়োগকর্তা, আবাসন পরিচালনাকারী ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে।
- জনসমাগম ও পরিবহন কেন্দ্র: চাঙ্গি বিমানবন্দর, কমিউনিটি ক্লাব, বিশ্ববিদ্যালয় ও গণপরিবহন কেন্দ্রে ভ্যাপ ফেলার বিন এবং ভ্যাপবিরোধী সাইনবোর্ড বসানো হচ্ছে। পার্ক, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনে টহলদল আকস্মিক তল্লাশি চালাচ্ছে।
ভ্যাপের অনলাইন বিক্রি ও বিপণন বন্ধ করতে কর্তৃপক্ষ নতুন আইনও কাজে লাগাচ্ছে। বিক্রেতাদের অপরাধী চক্রের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং দোষী সাব্যস্ত না হলেও তাঁদের মুনাফা বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। ভ্যাপের প্রচারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবকদের সিঙ্গাপুরের দর্শকদের কাছে পৌঁছানো বন্ধ করা হতে পারে।
মাদকমিশ্রিত ভ্যাপিং নিয়ে এত উদ্বেগ কেন?
কে-পডস নামে পরিচিত ইটোমিডেটমিশ্রিত ভ্যাপের ওপর সাম্প্রতিক নজর মাদকাসক্তি নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের প্রতিফলন। ইটোমিডেট একটি শক্তিশালী অবশকারী ওষুধ। শ্বাসের সঙ্গে শরীরে গেলে এটি পেশিতে খিঁচুনি, মৃগীরোগের মতো খিঁচুনি, বিভ্রান্তি ও শারীরিক নির্ভরতা সৃষ্টি করতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছয় মাসের জন্য ইটোমিডেটকে ‘ক্লাস সি’ নিয়ন্ত্রিত মাদক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এ শ্রেণিবিভাগের মেয়াদ বাড়ানো বা পরিবর্তনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইটোমিডেটমিশ্রিত ভ্যাপ সঙ্গে রাখা বা সেবনের শাস্তি এখন অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত মাদকের শাস্তির কাছাকাছি: অবৈধভাবে সঙ্গে রাখা ও ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার জরিমানা; আর সরবরাহকারীদের সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড ও বেত্রাঘাতের ১৫টি দণ্ড হতে পারে। বিদেশিরাও এসব শাস্তি থেকে রেহাই পাবেন না; তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কার এবং স্থায়ী প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় সতর্ক করেছে, অপরাধী চক্রগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভ্যাপ শিল্পকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিস্তার ঠেকাতে বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই সিঙ্গাপুরের এই দমন অভিযান চলছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের অবস্থানের তুলনা
শূন্য-সহনশীলতার নীতির ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর বিশ্বের কঠোরতম দেশগুলোর একটি। থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোর মতো দেশও ভ্যাপিংয়ের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, বিশেষ করে ভ্রমণকারীদের জন্য। ইউরোপে স্পেন, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের মতো দেশ ডিসপোজেবল ভ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে বা জনসমক্ষে ভ্যাপিং সীমিত করেছে। তবে সেখানকার শাস্তি সাধারণত সিঙ্গাপুরের তুলনায় কম কঠোর।
বিদেশে ই-সিগারেট নিয়ে যাওয়ার আগে ভ্রমণকারীদের স্থানীয় আইন যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সিঙ্গাপুরে ট্রানজিটের সময় ভ্যাপ সঙ্গে থাকলেও জরিমানা, জব্দ এবং সম্ভাব্য বহিষ্কারের ঘটনা ঘটতে পারে। অস্ট্রেলিয়া সরকারের ভ্রমণ পরামর্শে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বা ট্রানজিটের সময় হলেও ভ্যাপ সঙ্গে রাখা বা আমদানি করা বেআইনি এবং এর জন্য কঠোর শাস্তি হতে পারে।
সিঙ্গাপুরে ভ্যাপিং সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র কী?
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে, প্রকাশ্য অবৈধ ভ্যাপিং সংস্কৃতি টিকে আছে। একাডেমিক গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন ধরনের স্বাদ, সহজে ব্যবহার এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে ভ্যাপিংকে আকর্ষণীয় মনে করা হয়। কারও কারও ধারণা, আইন প্রয়োগ শিথিল এবং ভ্যাপিং সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। এ কারণে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে নিয়ন্ত্রিত বাজার চালুর দাবি উঠছে।
তবে কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে ভ্যাপিংকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তোলাই সরকারের নীতি। ঝুঁকি ও শাস্তি স্পষ্ট করে এবং ভ্যাপিংকে গুরুতর মাদকসংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে অবৈধ ব্যবহার কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অভিবাসী শ্রমিক ও প্রবাসীদের জন্য এর তাৎপর্য
সিঙ্গাপুরের বিদেশি কর্মশক্তির উল্লেখযোগ্য অংশ অভিবাসী শ্রমিক। নতুন আইন প্রয়োগ কার্যক্রমে তাঁদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের আবাসনে ভ্যাপিংয়ের ঘটনা বর্তমানে কম হলেও জনশক্তি মন্ত্রণালয় আকস্মিক তল্লাশি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়াচ্ছে। ভ্যাপসহ ধরা পড়া ওয়ার্ক-পাসধারীদের পাস বাতিল হতে পারে এবং সিঙ্গাপুরে কাজ করতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে।
বিদেশি শ্রমিকেরা যেন ভ্যাপিংয়ের আইনি ও স্বাস্থ্যগত পরিণতি বোঝেন, তা নিশ্চিত করতে নিয়োগকর্তা, আবাসন পরিচালনাকারী ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে নিজ নিজ ভাষায় বার্তা ছড়িয়ে দিতে যুক্ত করা হচ্ছে।
অঞ্চলজুড়ে প্রভাব: পর্যটন ও সীমান্তপারের চ্যালেঞ্জ
সিঙ্গাপুরের কঠোর অবস্থানের ফলে অঞ্চলে অনিচ্ছাকৃত কিছু প্রভাব পড়ছে। সিঙ্গাপুর থেকে ফেরিতে মাত্র এক ঘণ্টার পথ ইন্দোনেশিয়ার বাতাম দ্বীপ। সেখানে বৈধভাবে ভ্যাপ করতে আগ্রহী সিঙ্গাপুরবাসীদের জন্য দ্বীপটিকে পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বাতামের পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুর থেকে আসা পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। অতীতে গলফের মতো অন্যান্য কর্মকাণ্ডে সিঙ্গাপুরের বিধিনিষেধের কারণে প্রতিবেশী দেশে পর্যটন বেড়ে যাওয়ার প্রবণতার সঙ্গে এর মিল রয়েছে।
সিঙ্গাপুরে অধিকাংশ অবৈধ ভ্যাপ প্রতিবেশী মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসে বলে ধারণা করা হয়। এতে সীমান্তপারের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়। মালয়েশিয়া জাতীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি, আর ইন্দোনেশিয়া ভ্যাপের তরলে অবৈধ পদার্থ নিষিদ্ধ করার ওপর জোর দিচ্ছে। সিঙ্গাপুরের অবস্থান এর তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন; তাঁদের কেউ কেউ দেশটির সরকারকে একই ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
সমালোচনা ও বিতর্ক: শূন্য-সহনশীলতাই কি সবচেয়ে ভালো পথ?
সিঙ্গাপুরের অনড় অবস্থানের সমালোচনা করেছেন ক্ষতি কমানোর পক্ষে কাজ করা ব্যক্তিরা। তাঁদের যুক্তি, ভ্যাপিংকে মাদকসংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলে নিয়ন্ত্রিত ই-সিগারেট ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করতে পারে—এমন প্রমাণকে খাটো করা হয়। তাঁরা নিষেধাজ্ঞার বদলে নিয়ন্ত্রণের পক্ষে এবং সতর্ক করে বলেন, কঠোর শাস্তি ভ্যাপিংকে আরও গোপনে ঠেলে দিতে পারে।
কর্তৃপক্ষের পাল্টা যুক্তি, মাদকমিশ্রিত ভ্যাপের ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা কঠোর পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দেয়। সরকারের অবস্থান, ক্ষতি কমানোর পক্ষে যুক্তির চেয়ে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তরুণদের আসক্তি ঠেকানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশিদের কী করা উচিত?
বিদেশিদের জন্য মূল কথা সহজ: সিঙ্গাপুরে ভ্যাপ আনবেন না, কিনবেন না, ব্যবহার করবেন না বা সঙ্গে রাখবেন না। নিকোটিন বা অন্য কোনো পদার্থযুক্ত—সব ধরনের ই-সিগারেটের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য। চাঙ্গি বিমানবন্দর দিয়ে শুধু ট্রানজিট করলেও পৌঁছানোর আগেই সঙ্গে থাকা ভ্যাপ ফেলে দিন। আইন না জানাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করা হবে না এবং শাস্তি কঠোর।
সর্বশেষ তথ্যের জন্য ভ্রমণকারীদের সরকারি সূত্র যাচাই করা এবং স্থানীয় আইন পুরোপুরি মেনে চলা উচিত। বিদেশি কর্মী ও শিক্ষার্থীরা যেন নিয়ম এবং তা ভাঙার পরিণতি সম্পর্কে জানেন, তা নিয়োগকর্তা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিশ্চিত করা উচিত।
সারসংক্ষেপ
- ই-সিগারেট বা ভ্যাপসহ ধরা পড়া বিদেশিদের জন্য কঠোর শাস্তিসহ বিশ্বের অন্যতম কঠিন ভ্যাপবিরোধী আইন কার্যকর করছে সিঙ্গাপুর।
- শাস্তির মধ্যে রয়েছে জরিমানা, পাস বাতিল, বহিষ্কার এবং সিঙ্গাপুরে পুনঃপ্রবেশে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা; বিশেষ করে পুনরাবৃত্ত অপরাধী ও মাদকমিশ্রিত ভ্যাপসহ ধরা পড়াদের ক্ষেত্রে।
- সীমান্তে, অভিবাসী শ্রমিকদের আবাসনে ও জনসমাগমস্থলে কঠোর আইন প্রয়োগ চলছে। পাশাপাশি সচেতনতা ও প্রচার কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে।
- ভ্যাপিংয়ের নিয়মকানুন কঠোর করার বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ সিঙ্গাপুরের এই পদক্ষেপ, তবে দেশটির শাস্তি সবচেয়ে কঠোরগুলোর মধ্যে পড়ে।
- পর্যটক, প্রবাসী ও অভিবাসী শ্রমিকসহ বিদেশিদের যেকোনো পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুরে ভ্যাপ আনা বা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার জোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।






