দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রাক্‌-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা: শিশুদের ওপর বাড়তি চাপের মধ্যে সংস্কারের আহ্বান মানবাধিকার কমিশনের

পড়তে 8 মিনিট
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রাক্‌-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা: শিশুদের ওপর বাড়তি চাপের মধ্যে সংস্কারের আহ্বান মানবাধিকার কমিশনের

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রারম্ভিক শিক্ষার সংকট: প্রাক্‌-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা কেন সমালোচনার মুখে

দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষায় সাফল্যের দৌড় শুরু হয় বিশ্বের প্রায় যেকোনো দেশের চেয়ে আগে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে ক্রমবর্ধমানসংখ্যক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—স্থানীয়ভাবে হাগওন নামে পরিচিত—চার-পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কঠিন ভর্তি পরীক্ষা চালু করেছে। ‘সাত বছর বয়সীদের পরীক্ষা’ নামে পরিচিত এসব পরীক্ষা শিক্ষার চাপ, শিশুর বিকাশ ও মানবাধিকার নিয়ে দেশটির চলমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সূচিপত্র
  1. দক্ষিণ কোরিয়ার প্রারম্ভিক শিক্ষার সংকট: প্রাক্‌-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা কেন সমালোচনার মুখে
  2. ‘সাত বছর বয়সীদের পরীক্ষা’ কী এবং কেন তা বিতর্কিত?
  3. এসব পরীক্ষা শিশুদের কীভাবে প্রভাবিত করে?
  4. দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষামুখী আসক্তির শিকড়
  5. বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে এর তুলনা কেমন?
  6. হস্তক্ষেপ করল মানবাধিকার কমিশন: কী বলেছে কমিশন?
  7. এর বৃহত্তর প্রভাব কী?
  8. প্রাক্‌-প্রাথমিক পর্যায়ের কোচিং স্কুলের ভেতরের জগৎ
  9. মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ
  10. সংস্কারের দাবি: এরপর কী?
  11. সারসংক্ষেপ

২৫ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এক বিরল নীতিগত মতামত প্রকাশ করে, যেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ‘প্রারম্ভিক পর্যায়ের চরম বেসরকারি শিক্ষা’ মোকাবিলার আহ্বান জানানো হয়। প্রাক্‌-প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষার বিস্তার ঠেকাতে সরকারি পদক্ষেপের দাবিতে ৮০০ জনের বেশি নাগরিকের স্বাক্ষরিত একটি আবেদনের পর কমিশন এ বিবৃতি দেয়। প্রক্রিয়াগত কারণে কমিশন আবেদনটি খারিজ করলেও, মানবাধিকার নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের কথা স্বীকার করে এবং ব্যবস্থাগত সংস্কারের আহ্বান জানায়।

‘সাত বছর বয়সীদের পরীক্ষা’ কী এবং কেন তা বিতর্কিত?

‘সাত বছর বয়সীদের পরীক্ষা’ বলতে অভিজাত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাক্‌-প্রাথমিক বয়সী শিশুদের ভর্তি করাতে নেওয়া পরীক্ষাকে বোঝায়। এসব পরীক্ষায় প্রায়ই ইংরেজি, গণিত, এমনকি কোডিংয়ের মতো বিষয় থাকে—যেসব দক্ষতা সাধারণত অনেক বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত। সিউলের গাংনাম, সেওচো ও সংপা এলাকার মতো সচ্ছল জেলাগুলোতে নামী ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদানকারী কিন্ডারগার্টেনে ভর্তির প্রতিযোগিতা তীব্র। সন্তানদের এগিয়ে রাখার আশায় অভিভাবকেরা প্রস্তুতিমূলক ক্লাস, ব্যক্তিগত শিক্ষক ও পরীক্ষার সহায়িকা বইয়ের পেছনে হাজার হাজার ডলার ব্যয় করেন।

প্রতিনিধি কাং কিয়ং-সুক ও নাগরিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড উইদাউট ওয়ারিয়িং অ্যাবাউট প্রাইভেট এডুকেশনের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব জেলার ৭৪ শতাংশের বেশি কিন্ডারগার্টেনে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার কার্যক্রম রয়েছে। দেখা গেছে, ১০টি কিন্ডারগার্টেনে প্রাক্‌-প্রাথমিক শিশুদের পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যক্রম পড়ানো হয়। অন্যদিকে, মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান খেলাভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রারম্ভিক পর্যায়ের পড়াশোনা সক্রিয়ভাবে নিরুৎসাহিত করে।

প্রারম্ভিক শিক্ষার এই চাপ শুধু সিউলের সবচেয়ে ধনী এলাকাগুলোতে সীমাবদ্ধ নয়। দেশজুড়ে বেসরকারি ইংরেজি ভাষার প্রাক্‌-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা পাঁচ বছরে ৩৭ শতাংশ বেড়েছে, আর সাধারণ কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি কমেছে। এ প্রবণতা অন্য শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে ক্রমেই কম বয়স থেকে শিক্ষায় এগিয়ে থাকার প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।

এসব পরীক্ষা শিশুদের কীভাবে প্রভাবিত করে?

শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, প্রারম্ভিক পর্যায়ে অতিরিক্ত শিক্ষার চাপ গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। নিবিড় পড়াশোনার সময়সূচি ও উচ্চ ঝুঁকির পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া ছোট শিশুরা মানসিক চাপ, উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ, এমনকি চুল পড়ার মতো শারীরিক সমস্যায় ভুগতে পারে। সহযোগিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সহমর্মিতার মতো সামাজিক-আবেগীয় দক্ষতা বিকাশের এই পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অথচ মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে প্রায়ই সেগুলো উপেক্ষিত হয়।

“একাডেমিতে ভর্তির জন্য শিশুদের ইংরেজি বাক্য মুখস্থ করতে এবং সাক্ষাৎকারের মহড়া দিতে বাধ্য করা হয়,” বলেন ন্যাশনাল অ্যাকিউজার্স এগেইনস্ট সেভেন-ইয়ার-ওল্ড ক্র্যাম এক্সামসের এক মুখপাত্র। এ জোটটি চলতি বছরের শুরুতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দায়ের করে। দলটি এ প্রবণতাকে শিশুর অধিকার লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছে এবং প্রাক্‌-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার শুরুর স্তরে ছায়াশিক্ষা নিয়ে দেশজুড়ে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।

সিউলের শিক্ষা জেলাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিষণ্নতা বা উদ্বেগে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত শিশুদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ছোট শিশুদের মধ্যে টিক ডিজঅর্ডার ও মানসিক চাপজনিত অন্যান্য সমস্যার বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছেন। তাদের মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই শুরু হওয়া অবিরাম শিক্ষার চাপ এর অন্যতম কারণ।

বিজ্ঞাপন

দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষামুখী আসক্তির শিকড়

প্রাক্‌-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা এত ব্যাপক হয়ে উঠেছে কেন, তা বুঝতে দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি। সামাজিক উন্নতি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রধান পথ হিসেবে শিক্ষাকে দেখা হয়। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটিতে ভর্তি—যেগুলো সম্মিলিতভাবে ‘স্কাই’ বিশ্ববিদ্যালয় (সিউল ন্যাশনাল, কোরিয়া ও ইয়নসেই) নামে পরিচিত—সাফল্যের প্রবেশপত্র হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত। এই বিশ্বাস তীব্র প্রতিযোগিতার সংস্কৃতিকে উসকে দিয়েছে; পরিবারগুলো ছোটবেলা থেকেই বেসরকারি শিক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ করছে।

এই চাপের সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় জোসন রাজবংশের সময়ে। তখন অভিজাত পরিবারের শিশুরা সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অল্প বয়স থেকেই কঠোর পড়াশোনা শুরু করত। আজ চাপের মাত্রা সম্ভবত আরও বেশি। বেসরকারি শিক্ষার ‘কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে পরিচিত দেচি-দংয়ের মতো এলাকায় অভিভাবকেরা তিন বছর বয়স থেকেই সন্তানদের প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচিতে ভর্তি করান। সবচেয়ে অভিজাত কিন্ডারগার্টেনগুলোতে মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা ও ইংরেজি সাক্ষাৎকারে পাস করতে হয়। মাসিক ফি ১,০০০ ডলারের বেশি, এর সঙ্গে ইউনিফর্ম ও শিক্ষা উপকরণের খরচও রয়েছে।

বিনামূল্যে সরকারি কিন্ডারগার্টেন থাকা সত্ত্বেও অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তানকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখার জন্য বেসরকারি শিক্ষার পথ বেছে নেওয়া জরুরি। এগিয়ে থাকার এই তাগিদ শুধু ইংরেজিতেই সীমাবদ্ধ নয়: তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ষষ্ঠ শ্রেণির গণিত পড়া সাধারণ ঘটনা, আর কেউ কেউ পঞ্চম শ্রেণিতেই ক্যালকুলাস শেখে। ‘কয়েক বছর এগিয়ে পড়াশোনা করার’ মানসিকতা গভীরভাবে প্রোথিত। এর লক্ষ্য অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এবং পরে স্যামসাংয়ের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীতে মর্যাদাপূর্ণ চাকরি পাওয়া।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে এর তুলনা কেমন?

দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা উচ্চ শিক্ষাগত সাফল্যের জন্য সুপরিচিত, তবে শিক্ষার্থীদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টির জন্য সমালোচিতও। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয় বছরের কম বয়সী কোরীয় শিশুদের প্রায় অর্ধেক বেসরকারি শিক্ষায় অংশ নেয়। ব্যবস্থাটি এতটাই প্রতিযোগিতামূলক যে প্রাক্‌-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষাও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পরীক্ষার মতো কঠিন হতে পারে।

শিক্ষাকে ঘিরে এই আসক্তির মানসিক ও আর্থিক ক্ষতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটা অধ্যাপক জোয়ান উইলিয়ামস দক্ষিণ কোরিয়ার রেকর্ড-নিম্ন জন্মহার নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলে ওঠেন, “কোরিয়া পুরোপুরি ধ্বংসের পথে।” এ মন্তব্যে শিক্ষার চাপ ও দেশটির জনমিতিক সংকটের যোগসূত্রের দিকটি তুলে ধরা হয়।

বিজ্ঞাপন

হস্তক্ষেপ করল মানবাধিকার কমিশন: কী বলেছে কমিশন?

দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রারম্ভিক শিক্ষা নিয়ে বিতর্কে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নীতিগত মতামতে কমিশন বলেছে, প্রারম্ভিক পর্যায়ের চরম শিক্ষাচর্চা “সংবিধান ও জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বীকৃত শিশুদের স্বাস্থ্য, বিকাশ, বিশ্রাম ও খেলার অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে।”

কমিশন জোর দিয়ে বলেছে, অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার কারণে পরিচালিত এসব প্রারম্ভিক শিক্ষাচর্চা ছোট শিশুদের বয়সোপযোগী অভিজ্ঞতা—যেমন খেলা, নিজেকে প্রকাশ এবং বিশ্রামের—অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।

প্রক্রিয়াগত কারণে—বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কমিশনের সরাসরি তদন্তের আওতার বাইরে উল্লেখ করে—আবেদনটি খারিজ করলেও কমিশন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে:

  • প্রারম্ভিক শৈশবের বেসরকারি শিক্ষা নিয়ে দেশজুড়ে জরিপ
  • জরিপের ফলাফল প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা
  • ছোট শিশুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত পরীক্ষা-নির্ভর কর্মসূচি ও নিবিড় বিদেশি ভাষা শিক্ষার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ

“এসব চর্চা স্পষ্টতই শিশুদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে,” বলেছে কমিশন। একই সঙ্গে “সব শিশু যাতে বিকাশের উপযোগী পরিবেশে বেড়ে উঠতে ও শিখতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থাগত সুরক্ষাব্যবস্থা” গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে।

এর বৃহত্তর প্রভাব কী?

কমিশনের সুপারিশগুলো শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বাড়তে থাকা ঐকমত্যের প্রতিফলন: প্রারম্ভিক শৈশবের শিক্ষা খাতে লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক নজরদারি না থাকলে, যেকোনো মূল্যে সাফল্য অর্জনের সংস্কৃতির মূল্য চুকাতে হতে পারে কোরিয়ার সবচেয়ে ছোট শিক্ষার্থীদের। পরিবারগুলোর ওপর চাপানো মানসিক ও আর্থিক বোঝা দেশটির দ্রুত কমতে থাকা জন্মহারে—যা বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন—অবদান রাখছে এবং বর্তমান ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

অন্যদিকে, অভিভাবকেরা পড়েছেন উভয়সংকটে। এই দৌড়ে অংশ না নিলে সন্তান পিছিয়ে পড়তে পারে, কিন্তু অংশ নেওয়ার অর্থ প্রায়ই তার সুস্থতা বিসর্জন দেওয়া। দেচি-দংয়ের এক অভিভাবক যেমন ব্যাখ্যা করলেন, “আপনি অংশ না নিলে আপনার সন্তান পিছিয়ে পড়বে। আর অংশ নিলে তার সুখ ও স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়।”

বিজ্ঞাপন

প্রাক্‌-প্রাথমিক পর্যায়ের কোচিং স্কুলের ভেতরের জগৎ

সিউলের দেচি-দংয়ে সফল হওয়ার চাপ শুরু হয় চার বছর বয়স থেকেই। শিশুরা ইংরেজি ভাষার কিন্ডারগার্টেনে ভর্তির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে বিভিন্ন একাডেমিতে যায়। সেখানে তারা অক্ষর চিনতে, ইংরেজিতে উত্তর দিতে এবং শ্রেণিকক্ষে কেমন আচরণ করতে হয়, তা শেখে। শিশুরা অভ্যস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসের সময় প্রথমে ৩০ মিনিট থেকে ধীরে ধীরে এক ঘণ্টায় বাড়ানো হয়। অভিভাবকেরা গৃহশিক্ষক ও পরীক্ষার সহায়িকা বইয়ের পেছনে শত শত ডলার খরচ করেন। কিন্ডারগার্টেনে ভর্তির জন্য লাইনে জায়গা ধরে রাখতে কেউ কেউ লোকও ভাড়া করেন।

এসব কর্মসূচির মাসিক ফি ২০ লাখ ওন (প্রায় ১,৫০০ ডলার) ছাড়িয়ে যেতে পারে। চাহিদাপূর্ণ পাঠ্যক্রমের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যক্তিগত পড়াশোনা ও অতিরিক্ত একাডেমির পেছনেও খরচ করতে হয়। ভাষায় নিমজ্জিত রাখার উদ্দেশ্যে কেউ কেউ বাড়িতেও ইংরেজি নাম ব্যবহার করেন, যদিও এতে শিশুরা কোরীয় ভাষার সাধারণ শব্দ বলতেও সমস্যায় পড়তে পারে।

অনেকের কাছে প্রারম্ভিক ইংরেজি শিক্ষার উদ্দেশ্য ভবিষ্যতের বাধা দূর করা, যাতে শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গণিতের মতো উন্নত বিষয় পড়ায় মনোযোগ দিতে পারে। এগিয়ে থাকার তাগিদ এতটাই প্রবল যে কিছু শিশুকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির পাঠ্যক্রমে পড়ানো হয়। এই প্রারম্ভিক চাপের চূড়ান্ত ধাপ হলো ‘সাত বছর বয়সীদের গোসি’—স্কুল-পরবর্তী অভিজাত ইংরেজি একাডেমিতে ভর্তির জন্য অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ

দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়াশোনার চাপ সবারই জানা, আর শৈশবের মানসিক চাপ এখন নথিভুক্ত একটি সংকট। তথ্য অনুযায়ী, সিউলের শিক্ষা জেলাগুলোতে বিষণ্নতা বা উদ্বেগে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত শিশুদের সংখ্যা পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, শিক্ষায় সাফল্য অর্জনের নিরলস চেষ্টা শিশুদের সুখ ও সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলছে।

শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বাড়তে থাকা ঐকমত্য স্পষ্ট: প্রারম্ভিক শৈশবের শিক্ষা খাতে লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক নজরদারি না থাকলে, যেকোনো মূল্যে সাফল্য অর্জনের সংস্কৃতির মূল্য চুকাতে হতে পারে কোরিয়ার সবচেয়ে ছোট শিক্ষার্থীদের।
বিজ্ঞাপন

সংস্কারের দাবি: এরপর কী?

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশ দক্ষিণ কোরিয়ার প্রারম্ভিক শিক্ষা নিয়ে বিতর্ক নতুন করে উসকে দিয়েছে। অধিকারকর্মীরা বেসরকারি একাডেমিগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, প্রারম্ভিক শৈশবের শিক্ষা নিয়ে আরও স্বচ্ছতা এবং খেলাভিত্তিক শিক্ষায় নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং সব শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকারের বিনামূল্যে সরকারি প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা উচিত।

আন্তর্জাতিক তুলনা থেকে দেখা যায়, শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক বিকাশ, ভবিষ্যতের শিক্ষাগত অর্জন এবং অর্থনৈতিক সুযোগের জন্য প্রারম্ভিক শৈশবের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার মডেল—যার বৈশিষ্ট্য বেসরকারি শিক্ষায় উচ্চ ব্যয়, তীব্র প্রতিযোগিতা ও অল্প বয়সে পড়াশোনার চাপ—খেলা, সৃজনশীলতা ও আবেগীয় সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক।

শিক্ষামুখী আসক্তির সংস্কৃতির পরিণতি নিয়ে দেশটি যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন প্রশ্ন থেকে যায়: দক্ষিণ কোরিয়া কি শিক্ষাগত উৎকর্ষের পাশাপাশি তার কনিষ্ঠ নাগরিকদের অধিকার ও সুস্থতার মধ্যে ভারসাম্য আনতে পারবে?

বিজ্ঞাপন

সারসংক্ষেপ

  • দক্ষিণ কোরিয়ার মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা প্রাক্‌-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষাসহ প্রারম্ভিক শিক্ষার চরম চর্চা বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
  • ‘সাত বছর বয়সীদের পরীক্ষা’ হলো অভিজাত বেসরকারি একাডেমিতে ভর্তির জন্য ছোট শিশুদের নেওয়া উচ্চ ঝুঁকির পরীক্ষা, বিশেষ করে সিউলের সচ্ছল জেলাগুলোতে।
  • বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত শিক্ষার চাপ শিশুদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা বাড়ায়।
  • প্রারম্ভিক পর্যায়ের শিক্ষাগত প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধের গভীরে প্রোথিত।
  • জাতীয় মানবাধিকার কমিশন দেশজুড়ে জরিপ, আরও স্বচ্ছতা এবং প্রারম্ভিক শৈশবের শিক্ষায় কঠোর নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করেছে।
  • শিক্ষায় সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা ও সন্তানের সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অভিভাবকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
  • শিশুদের অধিকার ও বিকাশ আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত করতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রারম্ভিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে বিতর্ক চলছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে