চীনা পর্যটক দলের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন ভিসামুক্ত নীতি: পর্যটন খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন
পর্যটন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া চীনা পর্যটক দলগুলোর জন্য সাময়িক ভিসামুক্ত প্রবেশনীতি ঘোষণা করেছে। ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সংগঠিত চীনা পর্যটক দলগুলো ভিসা ছাড়াই দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণ করতে পারবে। চীনের বড় জাতীয় দিবসের ছুটি এবং গিয়ংজুতে এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক আগে নেওয়া এই নীতির অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ব্যাপক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূচিপত্র
- চীনা পর্যটক দলের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন ভিসামুক্ত নীতি: পর্যটন খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন
- চীনা পর্যটকদের ভিসামুক্ত প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে কেন দক্ষিণ কোরিয়া?
- নীতিটি কীভাবে কার্যকর হবে?
- দ্রুত অভিবাসন প্রক্রিয়া ও চিকিৎসা পর্যটন উদ্যোগ
- অর্থনৈতিক প্রভাব: পর্যটন, খুচরা ব্যবসাসহ নানা খাতের জন্য সুফল
- প্রস্তুত খুচরা বিক্রি, শুল্কমুক্ত পণ্য ও খাবার পরিবেশনশিল্প
- কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট: চীন-দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্কে কি বরফ গলছে?
- এপেক শীর্ষ সম্মেলন: পর্যটন ও কূটনীতির অনুঘটক
- চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা: নীতিটি কি প্রত্যাশা পূরণ করবে?
- শিল্পখাত ও জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া
- সংক্ষেপে
কোভিড-১৯ মহামারির পর চীনা পর্যটকদের প্রবেশে বিধিনিষেধ শিথিল করার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এর আগে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের ভিসামুক্ত প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল চীন। পাল্টাপাল্টি এই নীতি পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মহামারিসংশ্লিষ্ট ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা গেছে।
চীনা পর্যটকদের ভিসামুক্ত প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে কেন দক্ষিণ কোরিয়া?
দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটনশিল্প দীর্ঘদিন ধরে আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে চীনা পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। মহামারির আগে এবং ২০১৭ সালে টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিরোধের আগে, বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে চীনাদের অংশ ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮০ লাখে পৌঁছেছিল। তবে থাড মোতায়েনের প্রতিক্রিয়ায় চীন দক্ষিণ কোরিয়ায় দলীয় ভ্রমণে অনানুষ্ঠানিক বিধিনিষেধ আরোপ করলে পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। কোভিড-১৯ মহামারিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ আরও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৪ সাল নাগাদ চীনা পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে ৪৬ লাখে দাঁড়ায়, যা দক্ষিণ কোরিয়ায় আসা মোট পর্যটকের ২৮.১ শতাংশ। শুধু ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই ২৫ লাখ ৩০ হাজার চীনা পর্যটক দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণ করেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.৯ শতাংশ বেশি। তা সত্ত্বেও এই সংখ্যা ২০১৬ সালের আগের পর্যায়ের তুলনায় কম। নতুন ভিসামুক্ত নীতির লক্ষ্য এই পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করা। সরকার ২০২৫ সালে ৫৩ লাখ ৬০ হাজার চীনা পর্যটক আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা ২০১৯ সালের ৬০ লাখ ২০ হাজারের কাছাকাছি।
প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সকসহ সরকারি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই নীতি “দক্ষিণ কোরিয়ায় ভ্রমণের চাহিদা আরও বাড়াবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিকে চাঙা করাসহ অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে” বলে আশা করা হচ্ছে। সময়টি কৌশলগতভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। চীনের জাতীয় দিবসের ছুটি (১-৭ অক্টোবর) এবং এপেক শীর্ষ সম্মেলনের সময়ে এই নীতি কার্যকর হচ্ছে। উভয় উপলক্ষেই বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যটক আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নীতিটি কীভাবে কার্যকর হবে?
স্বীকৃত ভ্রমণ সংস্থার আয়োজিত সংগঠিত দলে ভ্রমণকারী চীনা পর্যটকদের জন্যই এই ভিসা অব্যাহতি প্রযোজ্য। আগের নীতির তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ। আগের নীতিতে দলীয় পর্যটকেরা কেবল জেজু দ্বীপে সর্বোচ্চ ৩০ দিন ভিসা ছাড়া থাকতে পারতেন। এখন চীনা পর্যটক দলগুলো যেকোনো প্রবেশবন্দর দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় ঢুকে ভিসা ছাড়াই দেশজুড়ে ভ্রমণ করতে পারবে।
দলীয় পর্যটকেরা সর্বোচ্চ কত দিন থাকতে পারবেন, সরকার তা এখনো জানায়নি। তবে ভ্রমণের আনুষ্ঠানিকতা সহজ করা এবং আরও স্বতঃস্ফূর্ত ও নমনীয় ভ্রমণে উৎসাহ দেওয়াই যে এই নীতির উদ্দেশ্য, তা স্পষ্ট। সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, এই কর্মসূচির আওতায় বেইজিং ও সাংহাইয়ের মতো বড় চীনা শহরের ২০-৩০ বছর বয়সী একক পর্যটকদের পাশাপাশি ছোট শহর থেকে ক্রীড়া, খাদ্যসংস্কৃতি, সৌন্দর্যচর্চা, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাভিত্তিক বিশেষ দলীয় ভ্রমণকে লক্ষ্য করা হবে।
দ্রুত অভিবাসন প্রক্রিয়া ও চিকিৎসা পর্যটন উদ্যোগ
ভিসা অব্যাহতির পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে আসা বিদেশি পর্যটকদের জন্য পরীক্ষামূলক দ্রুত প্রবেশব্যবস্থা চালু করছে দক্ষিণ কোরিয়া। দ্রুত অভিবাসন ছাড়পত্র পাওয়ার যোগ্য অনুষ্ঠানের জন্য আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণকারীর ন্যূনতম সংখ্যা ৫০০ থেকে কমিয়ে ৩০০ করা হয়েছে। ফলে ব্যবসা ও শিক্ষাক্ষেত্রের ভ্রমণকারীদের দ্রুত দেশে প্রবেশ সহজ হবে। সভা, প্রণোদনামূলক ভ্রমণ, সম্মেলন ও প্রদর্শনী (মাইস) আয়োজনের শীর্ষ গন্তব্য হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়াকে প্রতিষ্ঠিত করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ এই পদক্ষেপ।
বিদেশি চিকিৎসা পর্যটক আকৃষ্ট করার জন্য সনদ পেতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর শর্তও শিথিল করছে সরকার। এর লক্ষ্য দ্রুত বর্ধনশীল চিকিৎসা পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়া। ৫০০ বা তার বেশি বিদেশি রোগী পাঠায়, এমন সংস্থাগুলো এখন ইলেকট্রনিক ভিসার ব্যবস্থা করতে পারবে। এতে দক্ষিণ কোরিয়ায় চিকিৎসা নিতে আসা আন্তর্জাতিক রোগীদের প্রক্রিয়া সহজ হবে।
অর্থনৈতিক প্রভাব: পর্যটন, খুচরা ব্যবসাসহ নানা খাতের জন্য সুফল
অর্থনৈতিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অনেক। ব্যাংক অব কোরিয়ার হিসাবে, অতিরিক্ত প্রতি ১০ লাখ চীনা পর্যটকের আগমনে দেশটির জিডিপি সর্বোচ্চ ০.০৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়তে পারে। ২০২৪ সালে বিদেশি পর্যটকেরা দক্ষিণ কোরিয়ায় রেকর্ড ৯.২৬ ট্রিলিয়ন ওন (প্রায় ৬৯০ কোটি ডলার) খরচ করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের হিসাবে, দেশটির অর্থনীতির ৪.৩ শতাংশ এসেছে পর্যটন খাত থেকে।
ভিসামুক্ত নীতি ঘোষণার পরই দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে এর প্রভাব পড়েছে। চীনা পর্যটকদের চাহিদা বাড়বে—এমন প্রত্যাশায় ডিপার্টমেন্ট স্টোর, ক্যাসিনো, হোটেল ও প্রসাধনসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। ঘোষণার পর হুন্দাই ডিপার্টমেন্ট স্টোরের শেয়ারের দাম ৭.১ শতাংশ, হোটেল শিলার ৪.৮ শতাংশ, ক্যাসিনো পরিচালনাকারী প্যারাডাইসের ২.৯ শতাংশ এবং হানকুক কসমেটিকসের ৯.৯ শতাংশ বেড়েছে।
চীনের ধনী জুয়াড়িদের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল বিদেশিদের জন্য নির্ধারিত ক্যাসিনোগুলোতেও আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কোরিয়ার বৃহত্তম এ ধরনের ক্যাসিনো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান প্যারাডাইস কো জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চে তাদের ক্যাসিনো আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে ৮১ বিলিয়ন ওনে (৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার) পৌঁছেছে।
প্রস্তুত খুচরা বিক্রি, শুল্কমুক্ত পণ্য ও খাবার পরিবেশনশিল্প
চীনা পর্যটকেরা কেনাকাটা, খাবার ও বিনোদনে বেশি অর্থ ব্যয়ের জন্য পরিচিত। ভ্রমণ সহজ করে এবং দীর্ঘ সময় অবস্থানে উৎসাহ দিয়ে ভিসামুক্ত নীতি দক্ষিণ কোরিয়ার খুচরা বিক্রি, শুল্কমুক্ত পণ্য ও খাবার পরিবেশনশিল্পকে সরাসরি উপকৃত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ট্রিপ ডটকম গ্রুপের মতো ভ্রমণ প্ল্যাটফর্ম জানিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় দলীয় ভ্রমণ নিয়ে খোঁজ ও বুকিং বেড়েছে। নীতিটি ঘোষণার আধা ঘণ্টার মধ্যেই সিউল নিয়ে খোঁজের পরিমাণ ৭০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে কুনার ডটকম।
কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট: চীন-দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্কে কি বরফ গলছে?
ভিসামুক্ত নীতিটি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, এটি একটি কূটনৈতিক বার্তাও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা গেছে। বিশেষ করে, ২০১৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের পর কোরীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চীন অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং চীনা পর্যটকের সংখ্যা তীব্রভাবে কমে যায়।
তবে উদারপন্থী প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং নির্বাচিত হওয়ায় সম্পর্ক উন্নয়নের আশা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ কোরীয়দের জন্য চীনের ভিসামুক্ত প্রবেশের সিদ্ধান্ত এবং এখন চীনা পর্যটক দলের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার একই ধরনের সুবিধা—পাল্টাপাল্টি এই ভিসা অব্যাহতি—জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা পুনর্গড়ে তোলার পারস্পরিক আগ্রহের প্রতিফলন।
দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত দাই বিং এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এটি “চীনা ভ্রমণকারীদের জন্য সুখবর”। দক্ষিণ কোরীয়দের জন্য চীনের নিজস্ব ভিসামুক্ত নীতির পর দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ দ্রুত বেড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সিউলে চীনা দূতাবাস জোর দিয়ে বলেছে, “বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা জোরদার করা দুই দেশ ও তাদের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থে।”
প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সক ২০২৫ সালের এপেক শীর্ষ সম্মেলনকে “পর্যটন বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ” এবং বিশ্বের কাছে দক্ষিণ কোরিয়ার উন্মুক্ত মনোভাব তুলে ধরার মঞ্চ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এপেক শীর্ষ সম্মেলন: পর্যটন ও কূটনীতির অনুঘটক
ভিসামুক্ত নীতির সময়সূচি আসন্ন এপেক শীর্ষ সম্মেলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত গিয়ংজুতে অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলনে চীনের শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টসহ ২১টি অর্থনীতির নেতারা অংশ নেবেন। সম্মেলনে হাজারো প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও ব্যবসায়ী নেতা আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার আতিথেয়তা ও বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা তুলে ধরার জন্য এটি একটি উচ্চপর্যায়ের মঞ্চ হবে।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা: নীতিটি কি প্রত্যাশা পূরণ করবে?
ভিসামুক্ত নীতিতে পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে বলে ব্যাপকভাবে আশা করা হলেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব—সবই ভ্রমণের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। তা ছাড়া, দলীয় ভ্রমণের ওপর নীতিটির জোর থাকায় এককভাবে ভ্রমণকারীদের কাছে এর আকর্ষণ সীমিত হতে পারে। চীনের বিদেশগামী পর্যটন বাজারে এই গোষ্ঠীর গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
তা সত্ত্বেও সরকার আশাবাদী। চীনের বড় শহরগুলো থেকে আসা তরুণ একক পর্যটক এবং ছোট শহর থেকে আসা বিশেষ দলীয় ভ্রমণকারীদের লক্ষ্য করে সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বিপণন প্রচারাভিযান তৈরি করছে। চাহিদা বাড়বে বলে ধারণা করে কোরিয়ান এয়ার, এশিয়ানা এবং স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা জেজু এয়ার চীনে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়াচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তর পর্যটন কৌশলের মধ্যে রয়েছে আগামী বছর থেকে সব বিদেশি পর্যটকের প্রবেশ-সংক্রান্ত পরিদর্শন সহজ করা এবং ভিসা অব্যাহতির যোগ্য দেশের তালিকা সম্প্রসারণ। বর্তমানে ১০০টিরও বেশি দেশের নাগরিকেরা দক্ষিণ কোরিয়ায় কোনো না কোনো ধরনের ভিসামুক্ত প্রবেশের সুবিধা পান। দেশের ভিত্তিতে থাকার মেয়াদ ৩০ দিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত।
শিল্পখাত ও জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া
পর্যটন ও খুচরা বিক্রিখাত নীতিটিকে উৎসাহের সঙ্গে স্বাগত জানিয়েছে। শিল্পখাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ একটি “পারস্পরিক ও উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক ব্যবস্থা”, যা চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে পর্যটন সহযোগিতা আরও গভীর করবে। ভ্রমণ সংস্থা, হোটেল ও খুচরা বিক্রেতারা চীনা পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চীনা রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী নতুন পণ্য ও সেবা তৈরি করছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
কিছু পর্যবেক্ষক সতর্ক করে বলেছেন, নীতিটির সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, ভ্রমণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে স্পষ্ট যোগাযোগ এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ওপর। পর্যটক ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে কর্মসূচিটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।
সংক্ষেপে
- পর্যটন বাড়ানো ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চীনা পর্যটক দলগুলোকে ভিসামুক্ত প্রবেশের অনুমতি দেবে দক্ষিণ কোরিয়া।
- স্বীকৃত ভ্রমণ সংস্থার আয়োজিত সংগঠিত দলীয় ভ্রমণের ক্ষেত্রে এই নীতি প্রযোজ্য। মহামারির পর চীনা পর্যটকদের প্রবেশে বিধিনিষেধ শিথিলের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে ব্যাপক পদক্ষেপ।
- এই পদক্ষেপে দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটন, খুচরা বিক্রি, আতিথেয়তা ও বিনোদন খাত উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক লাভেরও পূর্বাভাস রয়েছে।
- ভিসা অব্যাহতি পারস্পরিক। ২০২৪ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ কোরীয়দের ভিসামুক্ত প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার পর চীনের সিদ্ধান্তের জবাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বরফ গলার ইঙ্গিত দেয়।
- অতিরিক্ত পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য দ্রুত অভিবাসন প্রক্রিয়া এবং চিকিৎসা পর্যটনে সহায়তা। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য শীর্ষ গন্তব্য হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে দক্ষিণ কোরিয়া।
- নীতিটি গিয়ংজুতে এপেক শীর্ষ সম্মেলনের সময় কার্যকর হচ্ছে। বিশ্বের কাছে দক্ষিণ কোরিয়ার আতিথেয়তা ও বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা তুলে ধরার এটি একটি উচ্চপর্যায়ের সুযোগ।
- চ্যালেঞ্জ থাকলেও সরকার ও শিল্পখাত আশাবাদী যে ভিসামুক্ত নীতি দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করবে এবং চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলবে।






