এশিয়ার জলবায়ু সংকট: বৈশ্বিক হারের দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণায়ন ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব

পড়তে 9 মিনিট
Parts of Asia May Be Too Hot for People by 2100

এশিয়ার জলবায়ু জরুরি অবস্থা: বৈশ্বিক হারের দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণায়ন

বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের আবাস এশিয়া এখন বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) সর্বশেষ এশিয়ার জলবায়ুর অবস্থা ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহাদেশটি বিশ্বের বাকি অংশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এই দ্রুত উষ্ণায়নে চরম আবহাওয়ার ঘটনা তীব্রতর হচ্ছে, খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে, ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র অস্থিতিশীল হচ্ছে এবং অর্থনীতিতে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। হিমালয় থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত গোটা অঞ্চলে এর প্রভাব ইতিমধ্যেই অনুভূত হচ্ছে।

সূচিপত্র
  1. এশিয়ার জলবায়ু জরুরি অবস্থা: বৈশ্বিক হারের দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণায়ন
  2. এশিয়া এত দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে কেন?
  3. রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়া
  4. বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়: অবরুদ্ধ এক অঞ্চল
  5. হিমবাহ গলে যাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি: সংকটে হিমমণ্ডল
  6. উপকূলীয় জনপদ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্মুখসারিতে
  7. অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি, ঝুঁকিতে লাখো মানুষ
  8. স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: মানবকল্যাণের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি
  9. অভিযোজন ও আগাম সতর্কতা: পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে সহনশীলতা গড়ে তোলা
  10. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: গ্রিনহাউস গ্যাস ও প্যারিস চুক্তি
  11. করণীয় কী? নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ
  12. সংক্ষেপে

২০২৪ সালে এশিয়ায় রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ অথবা দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর দেখা গেছে। ১৯৯১–২০২০ সময়কালের গড়ের তুলনায় গড় তাপমাত্রা ১.০৪°C (১.৮৭°F) বেড়েছে। ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেখা এই উষ্ণায়নের প্রবণতা আগের তিন দশকের (১৯৬১–১৯৯০) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্বের মহাসাগরগুলোর তুলনায় দ্রুত উত্তপ্ত হওয়া এশিয়ার বিশাল ভূখণ্ড এই ত্বরান্বিত উষ্ণায়নের একটি প্রধান কারণ। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এশিয়া বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ; এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে এ অঞ্চলের মানুষ, অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর।

এশিয়া এত দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে কেন?

এশিয়ার অনন্য ভৌগোলিক অবস্থান এর দ্রুত উষ্ণায়নে বড় ভূমিকা রাখে। বিষুবরেখা থেকে আর্কটিক অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহাদেশের বিশাল ভূভাগ মহাসাগরের তুলনায় বেশি দক্ষতার সঙ্গে তাপ শোষণ ও ধরে রাখে। সাধারণত জলভাগের চেয়ে স্থলভাগ দ্রুত উষ্ণ হয়, কারণ এর তাপ ধারণক্ষমতা কম এবং এটি তাপ সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে না। তাই বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এশিয়ার মতো মহাদেশে তাপমাত্রার বৃদ্ধি আরও স্পষ্ট হয়।

এ ছাড়া, দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাসাগর—বিশেষ করে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের—কাছাকাছি অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। WMO-এর প্রতিবেদন বলছে, এশিয়ার সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রতি দশকে ০.২৪°C হারে বেড়েছে, যা বৈশ্বিক গড় ০.১৩°C হারের প্রায় দ্বিগুণ। সমুদ্রের এই উষ্ণায়নে শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাই বাড়ছে না, বরং আরও তীব্র ও ঘন ঘন সামুদ্রিক তাপপ্রবাহও তৈরি হচ্ছে। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও উপকূলীয় জনপদের ওপর এর প্রভাব বিধ্বংসী।

বিজ্ঞাপন

রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়া

২০২৪ সালে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনসহ পূর্ব এশিয়ায় এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাসিক গড় তাপমাত্রা রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, জাপানে রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ বছর দেখা গেছে, যা মাত্র এক বছর আগে স্থাপিত আগের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যায়। মিয়ানমারে এপ্রিলে তাপমাত্রা ৪৮.২°C (১১৮.৭°F) ছুঁয়ে নতুন জাতীয় রেকর্ড গড়ে। ভারতের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৪°C (১১১°F) ছাড়িয়ে যাওয়ায় তাপজনিত কারণে কয়েক শ মানুষের মৃত্যু হয়।

এই তাপপ্রবাহগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমে ঘন ঘন ও তীব্র হয়ে ওঠা চরম আবহাওয়ার বৃহত্তর প্রবণতারই অংশ এগুলো। WMO-এর প্রতিবেদন বলছে, তাপপ্রবাহ এখন বিশ্বে চরম আবহাওয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী ধরন, যা প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। এশিয়ায় এই সংখ্যা বাড়ছে; চরম তাপের শারীরিক ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী।

বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়: অবরুদ্ধ এক অঞ্চল

এশিয়ার জলবায়ু সংকট শুধু তাপপ্রবাহে সীমাবদ্ধ নয়। মহাদেশটিতে বন্যা, খরা ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ও আরও ঘন ঘন ও তীব্র হচ্ছে। ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড় ইয়াগি ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, লাওস, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও চীনের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। শুধু এই দুর্যোগেই মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং কয়েক লাখ ভবন ধ্বংস হয়।

ভারী বৃষ্টিপাত ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় কেরালা রাজ্যে অতিবৃষ্টিতে ৩৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। নেপালে সেপ্টেম্বরে রেকর্ড বৃষ্টিপাতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়, এতে অন্তত ২৪৬ জন নিহত হন এবং ৯ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়। এদিকে, চীনে খরায় প্রায় ৪৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ৩ লাখ ৩৫ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির ফসল নষ্ট হয় এবং সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি ৪০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

এই ঘটনাগুলো অতিরিক্ত পানি ও পানির ঘাটতি—জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিক—দুটোরই হুমকি তুলে ধরে। কিছু অঞ্চল বন্যায় ডুবে যাচ্ছে, আবার অন্যগুলো দীর্ঘস্থায়ী খরায় ভুগছে। উভয় পরিস্থিতিই খাদ্যনিরাপত্তা দুর্বল করে, মানুষের জীবিকা ব্যাহত করে এবং জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

হিমবাহ গলে যাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি: সংকটে হিমমণ্ডল

এশিয়ার উঁচু পার্বত্য অঞ্চলগুলোকে প্রায়ই “তৃতীয় মেরু” বলা হয়। মেরু অঞ্চলগুলোর বাইরে সবচেয়ে বেশি বরফ রয়েছে এখানে। শীতকালে তুষারপাত কমে যাওয়া ও গ্রীষ্মে চরম তাপের কারণে হিমালয় ও তিয়ান শানের হিমবাহ উদ্বেগজনক হারে পিছু হটছে। এ অঞ্চলের পর্যবেক্ষণাধীন ২৪টি হিমবাহের মধ্যে ২০২৩–২০২৪ সালে ২৩টির বরফের ভর কমেছে। এতে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ উপচে আকস্মিক বন্যা এবং ভাটির দিকে বিধ্বংসী বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে পানিনিরাপত্তায় গভীর প্রভাব পড়ছে। এশিয়ার কয়েক কোটি মানুষ পানীয় জল, কৃষি ও জলবিদ্যুতের জন্য হিমবাহনির্ভর নদীর ওপর নির্ভরশীল। হিমবাহ ছোট হয়ে আসায় দীর্ঘমেয়াদে এসব পানিসম্পদের প্রাপ্যতা হুমকির মুখে পড়ছে, বাড়ছে সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি।

একই সময়ে, এশিয়ার প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালে এশিয়ার প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকায়—বিশ্বের মোট সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় এক-দশমাংশে—তীব্র, প্রবল বা চরম মাত্রার সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ দেখা যায়। এই নজিরবিহীন উষ্ণায়নে সমুদ্রপৃষ্ঠ আরও উঁচু হচ্ছে, সমুদ্রস্রোতের ধরন বদলাচ্ছে এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র বিঘ্নিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

উপকূলীয় জনপদ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্মুখসারিতে

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এশিয়ার নিচু উপকূলীয় জনপদ ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বের জন্য হুমকি। বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের মতো দেশগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ; প্রায় ৯০ কোটি মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির তীব্র ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় বাস করে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘গ্লোবাল রিস্কস রিপোর্ট ২০২৫’-এ আগামী দশকে বিশ্বের প্রধান হুমকিগুলোর একটি হিসেবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

টুভালু, কিরিবাতি ও ফিজির মতো প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে ইতিমধ্যেই উপকূলীয় বন্যা, তীরভাঙন ও মিঠাপানির উৎসে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ার ঘটনা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পুরো গ্রাম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব দ্বীপের গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র এক থেকে দুই মিটার, ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ সামান্য বাড়লেও এগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়ে।

WMO-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সাল থেকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের কিছু অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠ ১০–১৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও আগামী তিন দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠ আরও ১৫ সেন্টিমিটার বাড়তে পারে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি, ঝুঁকিতে লাখো মানুষ

এশিয়ার জলবায়ু সংকটের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য ভয়াবহ। চরম আবহাওয়ার ঘটনায় শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে, অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং গোটা অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়েছে। এশিয়ার বহু অর্থনীতির ভিত্তি কৃষি তাপপ্রবাহ, খরা ও বন্যার কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে; এতে কয়েক কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।

WMO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে আবহাওয়া, জলবায়ু ও পানিসংশ্লিষ্ট বিপর্যয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল ছিল এশিয়া। বন্যা ও ঝড়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে, আর তাপপ্রবাহের প্রভাব আরও গুরুতর হয়েছে। শুধু ২০২৩ সালেই এশিয়ায় নথিভুক্ত ৭৯টি দুর্যোগে দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং ৯০ লাখ মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

বিজ্ঞাপন

খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। জলবায়ুজনিত আকস্মিক আঘাতে কৃষি উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্ষুধার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, ২০২০ সালে ৭৭ কোটি মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিলেন, যাদের বেশিরভাগই আফ্রিকা ও এশিয়ায়। খাদ্যব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়ে, ফসলের উৎপাদন কমিয়ে এবং খাদ্যবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তন এসব চ্যালেঞ্জকে আরও তীব্র করছে।

স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: মানবকল্যাণের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশ বা অর্থনীতির সমস্যা নয়—এটি মানবস্বাস্থ্যের জন্যও একটি মৌলিক হুমকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সতর্ক করে বলেছে, শুধু অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া ও তাপজনিত চাপের কারণে ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে। স্বাস্থ্য অবকাঠামো দুর্বল এমন এলাকাগুলো—যার বেশিরভাগই উন্নয়নশীল দেশে—সহায়তা ছাড়া এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সবচেয়ে কম সক্ষম।

অতিরিক্ত তাপে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ব্যাহত হয়, ফলে হিটস্ট্রোক ও অন্যান্য তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে। বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং আগে থেকে স্বাস্থ্যসমস্যা রয়েছে এমন মানুষসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছে। গত দুই দশকে তাপপ্রবাহের কারণে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে তাপজনিত মৃত্যুর হার ইতিমধ্যে ৭০% বেড়েছে।

বন্যা ও ঝড়ের পর পানিবাহিত ও বাহকবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে, আর খরা খাদ্য ও পানির অনিরাপত্তা বাড়ায়। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়ে; জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও দুর্যোগ উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপের কারণ হতে পারে।

অভিযোজন ও আগাম সতর্কতা: পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে সহনশীলতা গড়ে তোলা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযোজন ও সহনশীলতা গড়ে তোলার কাজ ক্রমেই জরুরি হয়ে উঠছে। জীবন ও জীবিকা রক্ষায় আগাম সতর্কতাব্যবস্থা এবং আগাম প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপের গুরুত্ব তুলে ধরেছে WMO-এর প্রতিবেদন। উদাহরণস্বরূপ, বন্যার আগাম সতর্কতাব্যবস্থায় নেপালের বিনিয়োগের ফলে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রেকর্ডভাঙা বন্যার সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠী সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে পেরেছিল এবং প্রাণহানি কমেছিল।

তবে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। এশিয়ায় WMO-এর ৮০% সদস্য দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে জলবায়ু পরিষেবা দিলেও কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় উপযোগী তথ্যপণ্য সরবরাহ করে অর্ধেকেরও কম সদস্য। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখার জন্য আগাম সতর্কতাব্যবস্থার আওতা বাড়ানো, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ জরুরি পদক্ষেপ।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: গ্রিনহাউস গ্যাস ও প্যারিস চুক্তি

এশিয়ার জলবায়ু সংকট বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রবণতারই অংশ। ২০২৩ সালে বিশ্বের তিনটি প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাস—কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড—নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছায়। শিল্প-পূর্ব সময়ের গড়ের তুলনায় ভূপৃষ্ঠসংলগ্ন বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১.৪৫°C বেশি ছিল, ফলে ২০২৩ রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হয়। প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত ১.৫°C উষ্ণায়নের সীমা অতিক্রম করার বিপজ্জনক কাছাকাছি পৌঁছেছে বিশ্ব। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এই সীমার পর তাপমাত্রার প্রতিটি ভগ্নাংশ বৃদ্ধির সঙ্গে বিপর্যয়কর প্রভাবের ঝুঁকি বাড়ে।

গ্রান্থাম ইনস্টিটিউটের জলবায়ুবিজ্ঞানী জোয়েরি রোজেল দ্রুত নিঃসরণ কমানোর জরুরি প্রয়োজনের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন:

উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রিতে পৌঁছানো আর বেশি দূরে নয়, আর তা ঠেকাতে অসাধারণ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। তবে এই সীমা অতিক্রম করলেও লক্ষ্যটির গুরুত্ব কমে না; কারণ উষ্ণায়নের প্রতিটি ভগ্নাংশ—তা ১.৬, ২ বা ৩ ডিগ্রি যা-ই হোক—বিশ্বকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। আর আমরা যত বেশি সময় ১.৫ ডিগ্রির ওপরে থাকব, মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তত বাড়বে।

উষ্ণায়ন ১.৫°C ছাড়িয়ে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের বিপজ্জনক উচ্চতা বৃদ্ধি, প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস এবং বরফের চাদর গলে যাওয়াসহ জলবায়ু ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। নিষ্ক্রিয়তার মূল্য বিপুল; বিভিন্ন হিসাব বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণহীন থাকলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ এর মোট ব্যয় ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

করণীয় কী? নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ

এশিয়ার জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বহুমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন:

  • প্রশমন: নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর, জ্বালানি দক্ষতার উন্নয়ন এবং ভূমির টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো।
  • অভিযোজন: চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি কমাতে জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, আগাম সতর্কতাব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করা।
  • স্বাস্থ্যব্যবস্থা: তাপপ্রবাহ, বাহকবাহিত রোগ ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতাসহ জলবায়ুসংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি সামাল দিতে স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করা।
  • আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ও জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা।
  • জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ: অভিযোজন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, যাতে সমাধানগুলো স্থানীয় প্রেক্ষাপট অনুযায়ী হয় এবং সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে।

এশিয়াজুড়ে ইতিমধ্যেই অভিনব অভিযোজন কৌশল বাস্তবায়িত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালদ্বীপ ভাসমান বাড়ি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে; অন্যদিকে, চীন ও ভারত বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সংরক্ষণ এবং পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাবে ফিজিতে পুরো গ্রাম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সংক্ষেপে

  • এশিয়া বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে; ২০২৪ সাল মহাদেশটির রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলোর একটি।
  • তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়সহ চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ও তীব্র হচ্ছে, যার ফলে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি ঘটছে।
  • হিমালয় ও তিয়ান শানের হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে, যা লাখো মানুষের পানিনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
  • এশিয়ার উপকূলগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে, ফলে উপকূলীয় জনপদ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে।
  • জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব গভীর; খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, রোগব্যাধি ও বাস্তুচ্যুতি বাড়ছে।
  • জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় আগাম সতর্কতাব্যবস্থা ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোসহ অভিযোজন এবং সহনশীলতা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
  • জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বিপর্যয়কর প্রভাব এড়াতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে