চীনের বিরল মৃত্তিকা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ: বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয়ের নতুন যুগ
২০২৫ সালের এপ্রিলে চীন সাতটি বিরল মৃত্তিকা মৌল এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চুম্বকসহ সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর ব্যাপক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য উত্তেজনা ও শাস্তিমূলক শুল্কের জবাবে নেওয়া এসব পদক্ষেপ বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে তীব্র আলোড়ন তুলেছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত ইলেকট্রনিকস এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য এসব গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে চীনের ওপর বিশ্বের ব্যাপক নির্ভরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আকস্মিক ঘাটতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে গাড়ি নির্মাণ থেকে মহাকাশশিল্প—বিভিন্ন খাত হিমশিম খাচ্ছে।
সূচিপত্র
- চীনের বিরল মৃত্তিকা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ: বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয়ের নতুন যুগ
- চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ যেভাবে কার্যকর হলো
- বিরল মৃত্তিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ: আধুনিক প্রযুক্তির মেরুদণ্ড
- প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা: আমলাতান্ত্রিক জট ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
- বৈশ্বিক প্রভাব: গাড়িশিল্প ও অন্যান্য খাত
- অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব
- ইউরোপ, ভারত এবং বিকল্পের সন্ধান
- যুক্তরাষ্ট্রের দোটানা: অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন
- অস্ট্রেলিয়া এবং নতুন সরবরাহকারীর সন্ধান
- এরপর কী? সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার দীর্ঘ পথ
- সারসংক্ষেপ
বিরল মৃত্তিকা মৌল (REE) হলো রাসায়নিকভাবে সদৃশ ১৭টি ধাতুর একটি গোষ্ঠী, যেগুলোর চৌম্বকীয়, আলোকীয় ও অনুঘটকীয় বৈশিষ্ট্য অনন্য। নামের সঙ্গে পুরোপুরি না মিললেও পৃথিবীর ভূত্বকে এগুলো তুলনামূলকভাবে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। তবে ব্যবহারযোগ্য রূপে আহরণ ও পরিশোধন করা জটিল, ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য চ্যালেঞ্জিং। খনি থেকে আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ—উভয় ক্ষেত্রেই চীনের আধিপত্য রয়েছে। দেশটি বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং পরিশোধনের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে; ফলে বিশ্বের বিরল মৃত্তিকা সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ যেভাবে কার্যকর হলো
চীনের নতুন রপ্তানি ব্যবস্থায় সাতটি বিরল মৃত্তিকা এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যকে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্যের রপ্তানি লাইসেন্স ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়। চলমান বাণিজ্য বিরোধে বেইজিংয়ের প্রভাব প্রদর্শন এবং মার্কিন শুল্কের কৌশলগত জবাব দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য। তবে বাস্তবায়নের সময় অপ্রত্যাশিত নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। রপ্তানি লাইসেন্সের আবেদনের বিপুল চাপ সামলাতে চীনা কর্মকর্তারা হিমশিম খেয়েছেন। এতে রপ্তানি কোড নিয়ে বিভ্রান্তি, চালানের উপাদান যাচাইয়ে সমস্যা এবং শুল্ক বিভাগে আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব দেখা দিয়েছে।
শিল্প খাতের সূত্রগুলোর ভাষ্য, এসব নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করার জটিলতা সামাল দিতে চীনা আমলাতন্ত্র প্রস্তুত ছিল না। গ্লোবাল রেয়ার আর্থ ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা নাবিল মানচেরি বলেন:
এটি বেইজিংয়ের আমলাতন্ত্রকে বিস্মিত করেছে। তারা ভাবেনি যে এতটা কাজ করতে হবে। চীনা পক্ষ থেকে যা শুনছি, তাতে তাদের নিজেদের কাছেও এটি ছিল এক ধাক্কা।
চীনা শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে বিরল মৃত্তিকার চুম্বকের চালান এপ্রিলে তুলনায় ৫০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। ২০১২ সালের পর মাসওয়ারি হিসাবে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় পতন। বড় ক্রেতাদের কাছে রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমেছে: জার্মানিতে ৫৫ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৭৭ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৮১ শতাংশ এবং জাপানে ৫৭ শতাংশ। এর তাৎক্ষণিক ও গুরুতর প্রভাব পড়েছে: যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও ইউরোপের গাড়ি নির্মাতারা উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছে। মজুত কমে আসায় সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপকেরা আরও বিঘ্নের আশঙ্কা করছেন।
বিরল মৃত্তিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ: আধুনিক প্রযুক্তির মেরুদণ্ড
উন্নত প্রযুক্তির বিস্তৃত পরিসরে বিরল মৃত্তিকার অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। নিওডিমিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়াম দিয়ে তৈরি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চুম্বক বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, বায়ু টারবাইন, যুদ্ধবিমান এবং এমনকি গাড়ির আসন ও উইন্ডশিল্ড ওয়াইপার চালানোর ক্ষুদ্র মোটরেও ব্যবহৃত হয়। একটি F-35 যুদ্ধবিমানে প্রায় ৯০০ পাউন্ড বিরল মৃত্তিকা থাকে; ভার্জিনিয়া-শ্রেণির একটি ডুবোজাহাজে লাগে ৯,০০০ পাউন্ডেরও বেশি। পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার এসব উপাদানের বৈশ্বিক চাহিদা আরও বাড়িয়েছে।
চীনের আধিপত্য শুধু খনি থেকে আহরণেই নয়, গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিশোধনেও। দেশটির রাষ্ট্র-সমর্থিত শিল্প পরিশোধন সক্ষমতা, গবেষণা ও শিক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে, যা তাদের খরচ ও প্রযুক্তিতে বড় সুবিধা দিয়েছে। সিনোলিটিকসের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ইয়োস্ট ভ্যুবেকে বলেন:
বিশ্ব অর্থনীতির পুরোটাই চীনের এই চুম্বকগুলোর ওপর নির্ভরশীল। এগুলোর রপ্তানি বন্ধ করলে তার প্রভাব সারা বিশ্বে পড়বে।
কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা দেশগুলো কম খরচ ও কম পরিবেশগত বিধিনিষেধের কারণে তাদের বিরল মৃত্তিকা শিল্প চীনে চলে যেতে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেদের বিরল মৃত্তিকার চুম্বক প্রায় উৎপাদনই করে না; বরং চীন এবং তুলনামূলক কম পরিমাণে জাপান ও ভিয়েতনাম থেকে আমদানির ওপর নির্ভর করে।
প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা: আমলাতান্ত্রিক জট ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়ন প্রশাসনিক বিভ্রান্তি ও সরকারের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্যের রপ্তানি ব্যবস্থায় রপ্তানিকারকদের পণ্যের পরবর্তী ক্রেতা এবং চূড়ান্ত ব্যবহারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে হয়। এতে বাণিজ্য আলোচনা জটিল হচ্ছে এবং মেধাস্বত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সব স্থায়ী বিরল মৃত্তিকার চুম্বকের জন্য একই আন্তর্জাতিক পণ্য কোড (HS code) ব্যবহৃত হয়—সেগুলোতে নিয়ন্ত্রিত মৌল থাকুক বা না থাকুক। ফলে চীনা বন্দরে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে এবং সময়সাপেক্ষ পরীক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে।
প্রজেক্ট ব্লুর ডেভিড মেরিম্যান জানান, রপ্তানিকারকদের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সংখ্যা চীনের সরকারি ব্যবস্থার সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে, ফলে প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়েছে। তালিকাভুক্ত বিরল মৃত্তিকার সামান্য অপরিষ্কার উপাদান থাকায় কিছু চালান আটকে রাখা হয়েছে, যদিও সেগুলোতে ইচ্ছাকৃতভাবে ওই উপাদান মেশানো হয়নি। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও ভূমিকা রেখেছে: পদক্ষেপগুলো কতটা কঠোরভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বিদেশি কোম্পানিকে রপ্তানি লাইসেন্স দিতে অনিচ্ছুক; যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় দর-কষাকষির ক্ষমতা ধরে রাখাই তাদের লক্ষ্য।
অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবু রপ্তানি লাইসেন্সের আবেদনের মাত্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ অনুমোদন পেয়েছে। প্রদেশভেদে প্রক্রিয়া এখনো অস্বচ্ছ ও অসংগত। কিছু লাইসেন্স প্রক্রিয়াগত কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের শর্ত দেওয়া হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রভাব: গাড়িশিল্প ও অন্যান্য খাত
চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক গাড়িশিল্পে। ইউরোপের গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী কারখানা ও উৎপাদন লাইন ইতিমধ্যে বন্ধ হয়েছে; মজুত ফুরিয়ে এলে আরও উৎপাদন বন্ধের আশঙ্কা রয়েছে। মে মাসে শিকাগোর কারখানায় ফোর্ডকে এক সপ্তাহের জন্য এক্সপ্লোরার এসইউভির উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। জাপানি গাড়ি নির্মাতা সুজুকিও তাদের সুইফট গাড়ির উৎপাদন স্থগিত করেছে। কিছু লাইসেন্স দেওয়া হলেও শুল্ক ছাড়ের ধীরগতি এবং চলমান অনিশ্চয়তা নির্মাতাদের নাজুক অবস্থায় ফেলেছে।
ইউরোপীয় গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের সংগঠন CLEPA-এর মহাসচিব বেঞ্জামিন ক্রিগার সতর্ক করে বলেন:
বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খল গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল। চীনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ইতিমধ্যে ইউরোপের সরবরাহকারী খাতে উৎপাদন বন্ধ করে দিচ্ছে।
জার্মানির গাড়িশিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী VDA-ও সতর্কবার্তা দিয়েছে: পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিগগিরই উৎপাদন পুরোপুরি থেমে যেতে পারে। গাড়ি নির্মাতারা এখন বিরল মৃত্তিকার ওপর নির্ভরতা কমানোর উপায় খুঁজছে। তারা এসব উপাদানের ব্যবহার খুব কম বা একেবারেই নেই—এমন মোটর তৈরি করছে। তবে এসব সমাধান এখনো বড় পরিসরে উৎপাদনযোগ্য বা সাশ্রয়ী নয়।
এই বিঘ্ন গাড়িশিল্পের বাইরেও ছড়িয়েছে। মহাকাশযান নির্মাতা, সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি এবং সামরিক ঠিকাদার—সবাই প্রভাবিত হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্প ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ উন্নত অস্ত্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য বিরল মৃত্তিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৭৫ শতাংশ কোম্পানি আশঙ্কা করছে, তাদের বিরল মৃত্তিকার মজুত তিন মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব
রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে বিরল মৃত্তিকার দাম বেড়েছে, বৈশ্বিক রপ্তানির পরিমাণে বড় পরিবর্তন এসেছে এবং সংগ্রহের খরচ বেড়েছে। ঘাটতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত উৎপাদনসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে; এর ফলে বিরল মৃত্তিকা মৌলের ওপর নির্ভরশীল শিল্পগুলো অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে। পরিস্থিতির কারণে জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। বাণিজ্য বিরোধ মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আলোচনা করছে, আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স অনুমোদন দ্রুত করার চেষ্টা করছে।
চীনের পদক্ষেপকে বাণিজ্য আলোচনায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার কৌশলগত চেষ্টা হিসেবে ব্যাপকভাবে দেখা হচ্ছে। গেভকাল ড্রাগোনমিকসের প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার আর্থার ক্রোয়েবার বলেন:
তারা বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের কাছে রপ্তানি আবার শুরু করবে—এমন সম্ভাবনাই বেশি। তবে মজুত গড়ে তোলার মতো পরিমাণে নয়।
আপাতত, চীনের রপ্তানি লাইসেন্স ব্যবস্থা শুধু শুল্কের সাময়িক জবাব নয়, বরং স্থায়ী ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। টেনিওর ব্যবস্থাপনা পরিচালক গ্যাব্রিয়েল ওয়াইল্ডাউ সতর্ক করেছেন, সরবরাহ বন্ধের হুমকি সব সময়ই থাকবে। এর মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন ও অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির ওপর নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার চীনা অভিপ্রায় স্পষ্ট হয়েছে।
ইউরোপ, ভারত এবং বিকল্পের সন্ধান
ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেদের ঝুঁকি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন; বিরল মৃত্তিকার চুম্বকের ৯৮ শতাংশের জন্য তারা চীনের ওপর নির্ভরশীল। ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে ৭,০০০ টন চুম্বক উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। এস্তোনিয়া ও ফ্রান্সে নতুন খনি, পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহার প্রকল্পের কাজ চলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, স্বল্পমেয়াদে চীনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ অকল্পনীয়; বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে কয়েক বছর লাগবে।
বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম বিরল মৃত্তিকার মজুত থাকা সত্ত্বেও উচ্চপ্রযুক্তির কাজে ব্যবহারের জন্য এসব প্রক্রিয়াজাত করার মতো পরিশোধন সক্ষমতা ভারতের নেই। দেশটি চীনা রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা চলছে, তবে তা এখনো উল্লেখযোগ্য ফল দেয়নি।
বিরল মৃত্তিকার ঘাটতি অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যে হুমকি তৈরি করেছে, তা স্বীকার করেছেন G7 নেতারা। ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারে বিঘ্ন সৃষ্টি করার বিরুদ্ধে যৌথ পদক্ষেপ এবং উৎপাদন ও সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার অঙ্গীকারও করেছেন তারা। তবে খনি থেকে চুম্বক তৈরি পর্যন্ত বিস্তৃত ও সমন্বিত চীনা সরবরাহ শৃঙ্খল দেশটিকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দোটানা: অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন
বিরল মৃত্তিকা শিল্প চীনে চলে যেতে দেওয়ার পরিণতি এখন যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দুই দশক আগে বিরল মৃত্তিকার চুম্বক উৎপাদনকারী মার্কিন কারখানাগুলো বিদেশে চলে যায়। দেশে উৎপাদন আবার শুরু করার প্রচেষ্টা উচ্চ ব্যয়, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং কারিগরি দক্ষতার অভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন পাসই যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র বিরল মৃত্তিকার খনি। চীনের কম খরচের প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে খনিটি হিমশিম খেয়েছে এবং সম্প্রতি সেখানে বিরল মৃত্তিকা পৃথক করার কাজ শুরু হয়েছে।
ম্যাসাচুসেটসের ফিনিক্স টেইলিংসের মতো নতুন স্টার্টআপ দেশে বিরল মৃত্তিকা ধাতু উৎপাদনের চেষ্টা করছে। তবে চীনা কারখানার তুলনায় তাদের উৎপাদন খুবই সামান্য। উৎপাদন বাড়াতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ, সরকারি সহায়তা এবং সময় লাগবে—যে সম্পদগুলোর ঘাটতি এখন সংকট আরও তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকট হচ্ছে।
গাড়িশিল্প বিষয়ক পরামর্শক মাইকেল ডান বলেন:
চীন যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি সংযোজন কারখানাগুলোর কাজ থামিয়ে দিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া এবং নতুন সরবরাহকারীর সন্ধান
এই অস্থিরতার মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সম্ভাব্য বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। সমৃদ্ধ খনিজ মজুত ও সরকারের বাড়তি সহায়তায় দেশটি নতুন খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় বিনিয়োগ করছে। চীনের বাইরে সবচেয়ে বড় উৎপাদক লিনাস রেয়ার আর্থস পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় মাউন্ট ওয়েল্ড খনি পরিচালনা করে এবং মালয়েশিয়ায় বিরল মৃত্তিকা পরিশোধন করে। ইলুকা রিসোর্সেস ও আরাফুরা রেয়ার আর্থসের মতো অন্য কোম্পানিগুলো নতুন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তুলছে; এ সম্প্রসারণে সরকারি ঋণ সহায়তা দিচ্ছে।
তবে অস্ট্রেলিয়ারও নিজস্ব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রক্রিয়াজাতকরণের বেশির ভাগ এখনো বিদেশে হয়, আর পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে দেশে পরিশোধন সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজ বিলম্বিত হয়েছে। সম্পূর্ণ সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খল গড়তে কয়েক বছর লাগবে। আপাতত চীনের খরচের সুবিধার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন।
বিরল মৃত্তিকা পুনর্ব্যবহারও আরেকটি বিবেচনাধীন পথ, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে। ২০৫০ সালের মধ্যে পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ দিয়ে চাহিদার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পূরণের লক্ষ্য রয়েছে তাদের। তবে বর্তমান অবকাঠামো অপর্যাপ্ত, আর আইনি ও আর্থিক বাধাও রয়ে গেছে।
এরপর কী? সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার দীর্ঘ পথ
অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় নতুন প্রকল্পের কারণে গত এক দশকে বৈশ্বিক বিরল মৃত্তিকা আহরণে চীনের অংশ ৮০ শতাংশ থেকে কমে ৬০ শতাংশে নেমেছে। তবু বাজারে দেশটিই এখনো প্রধান শক্তি। বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গড়তে বিস্তৃত অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং সরকারি সহায়তা প্রয়োজন হবে। এ প্রক্রিয়ায় অন্তত এক দশক লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উপকরণ মজুত করছে, বিরল মৃত্তিকার ব্যবহার কমাতে গবেষণায় বিনিয়োগ করছে এবং সরকারি সহায়তার জন্য চাপ দিচ্ছে। বর্তমান সংকট বিরল মৃত্তিকার কৌশলগত গুরুত্ব এবং একক সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট করেছে।
সারসংক্ষেপ
- বিরল মৃত্তিকার ওপর চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস ও প্রতিরক্ষা খাতে।
- আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব, প্রশাসনিক বিভ্রান্তি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি পরিস্থিতির প্রভাব আরও বাড়িয়েছে; রপ্তানি লাইসেন্সের আবেদনের মাত্র অল্প অংশ অনুমোদন পেয়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের গাড়ি নির্মাতারা উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছে। মজুত ফুরিয়ে আসায় বিভিন্ন শিল্পে আরও ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
- এই সংকট গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জন্য চীনের ওপর বিশ্বের নির্ভরতা এবং বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জগুলো সামনে এনেছে।
- সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করা, নতুন খনি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় বিনিয়োগ এবং পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে উদ্যোগ চলছে; তবে এসব সমাধান বাস্তবায়নে কয়েক বছর লাগবে।
- বাণিজ্য আলোচনায় চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সম্ভবত শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে থাকবে; সরবরাহ বন্ধের আশঙ্কা বৈশ্বিক শিল্পের জন্য হুমকি হয়ে থাকবে।
- বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা ও ঝুঁকি কমানোর প্রতিযোগিতা চলছে, তবে আপাতত বিরল মৃত্তিকার বৈশ্বিক পরাশক্তি চীনই।






