সূচিপত্র
লি জে-মিয়ংয়ের ক্ষমতায় অভূতপূর্ব উত্থান
লি জে-মিয়ং দক্ষিণ কোরিয়ার ২১তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশটি এক নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করেছে। লির বিজয় কেবল নেতৃত্বের নিয়মিত পরিবর্তন নয়; এটি ব্যক্তিগত অধ্যবসায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বাস্তববাদী সংস্কারের প্রত্যাশার এক নাটকীয় কাহিনি। দারিদ্র্য ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় চিহ্নিত শৈশব থেকে এশিয়ার অন্যতম উন্নত গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদে তাঁর যাত্রা দেশ ও বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ১৯৬৩ সালে গ্রামীণ শহর আন্দংয়ে জন্ম নেওয়া লি ছিলেন সাত সন্তানের মধ্যে পঞ্চম। তাঁর পরিবার জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম করত। অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে অল্প বয়সেই তাঁকে কারখানায় কাজ করতে হয়। সেখানে এক কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় তাঁর বাঁ হাত স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে যায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কয়েক বছর পিছিয়ে পড়লেও লি উচ্চমাধ্যমিক সমমানের সনদ অর্জন করেন, চুং-আং বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পান এবং ১৯৮৬ সালে বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি মানবাধিকার আইনজীবী হন, প্রান্তিক মানুষের পক্ষে কথা বলেন এবং স্থানীয় সরকারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ২০১০ সালে সিওংনামের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে লির রাজনৈতিক জীবন জোরালোভাবে শুরু হয়। শহরটি নাগরিক সক্রিয়তার জন্য পরিচিত। পরে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চল গিয়ংগি প্রদেশের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তাঁর কল্যাণনীতি এবং কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলার কারণে তিনি জাতীয় পরিচিতি পান। তাঁর উত্থানের পথে বাধাও এসেছে: ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এক শতাংশেরও কম ভোটের ব্যবধানে তিনি হেরে যান এবং ২০২৪ সালে একটি হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যান। তবু তিনি এগিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের আগাম নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টিকে নির্ণায়ক বিজয়ের নেতৃত্ব দেন। সাংবিধানিক সংকটের কারণে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।বিজ্ঞাপন
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের ম্যান্ডেট
তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতার পর লি নির্বাচিত হয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সামরিক আইন জারির চেষ্টা তাঁর অভিশংসন ও ক্ষমতাচ্যুতির দিকে নিয়ে যায়, ফলে দক্ষিণ কোরিয়া সাংবিধানিক সংকটে পড়ে। প্রতিরোধে লি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সামরিক আইন প্রত্যাহারে সহায়তা করতে তিনি জাতীয় পরিষদের বেড়া টপকে ওঠার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করে আলোচনায় আসেন। জনগণের প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্ট: প্রায় ৮০ শতাংশের রেকর্ড ভোটার উপস্থিতিতে লির বিজয়কে কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে প্রত্যাখ্যান এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান হিসেবে দেখা হয়। রাজনীতির বাইরের মানুষ হিসেবে পরিচিতি এবং দুর্নীতি ও নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে চলমান বিচারসহ একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, আশা ও সংস্কারের বার্তা দিয়ে লি ভোটারদের মন জয় করেন। তাঁর প্রচারের মূল বিষয় ছিল অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন, সামাজিক সংহতি এবং বাস্তববাদী শাসন। অভিষেক ভাষণে লি “ঘৃণা ও সংঘাতের বদলে সহাবস্থান, পুনর্মিলন ও সংহতি” প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন এবং এমন একটি সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন, যেখানে সব নাগরিক উন্নতি করতে পারবেন।বিজ্ঞাপন
নীতির দৃষ্টিভঙ্গি: কল্যাণ, অর্থনীতি ও বাস্তববাদ
লির রাজনৈতিক দর্শন তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় গভীরভাবে প্রভাবিত। তিনি ধারাবাহিকভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সহায়তায় সর্বজনীন মৌলিক আয়, বিনা মূল্যে স্কুলের ইউনিফর্ম এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণের মতো নীতির পক্ষে কথা বলেছেন। মেয়র ও গভর্নর হিসেবে তিনি উদ্ভাবনী কল্যাণ কর্মসূচি চালু করেন, যা প্রায়ই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বাধার মুখে পড়ে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি শ্রেণিসংঘাতের পক্ষে নয়; বরং সবার জন্য সুযোগ তৈরি করাই এর লক্ষ্য। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, “দারিদ্র্য কোনো পাপ নয়” এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তার জন্য সমাজকে “মোটা নিরাপত্তার জাল” দিতে হবে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে লি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বড় বিনিয়োগ, কর্মসপ্তাহ সংক্ষিপ্ত করা এবং পরিবারগুলোর জন্য কর প্রণোদনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁকে “প্রগতিশীল বাস্তববাদী” হিসেবে দেখা হয়, যিনি পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও জনমতের সঙ্গে নীতি মানিয়ে নিতে প্রস্তুত। তাঁর সরাসরি যোগাযোগের ধরন এবং প্রচলিত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মানসিকতা তাঁকে যেমন একনিষ্ঠ সমর্থক এনে দিয়েছে, তেমনি কঠোর সমালোচকেরও মুখোমুখি করেছে।বিজ্ঞাপন
পররাষ্ট্রনীতি: ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন সামলানো
বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তার সময়ে লির প্রেসিডেন্সির শুরু। দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা জোট এবং চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাঝখানে রয়েছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছেন লি। তিনি যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোটকে জাতীয় নিরাপত্তার “মেরুদণ্ড” বলে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক মেরামত করতে এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তববাদী পথ অনুসরণ করতে চান তিনি। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি লেনদেনভিত্তিক বাস্তববাদে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, যেখানে আদর্শগত সামঞ্জস্যের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন লি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হবে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়া এবং রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক গভীর হওয়ার প্রেক্ষাপটে।চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক
লির উত্থান বিতর্কমুক্ত নয়। জমি উন্নয়ন কেলেঙ্কারি এবং তাঁর আগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে কথিত মিথ্যা বিবৃতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে তিনি চলমান আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টরা সাধারণত ক্ষমতায় থাকাকালে বিচার থেকে অব্যাহতি পান, তবে আইনি অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। লির সংঘাতপ্রবণ ধরন এবং রাজনীতির বাইরের মানুষ হিসেবে পরিচিতি তাঁকে মেরুকরণকারী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। সমালোচকেরা তাঁকে রূঢ় এবং প্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি চ্যালেঞ্জ করতে অতিমাত্রায় আগ্রহী বলে অভিযোগ করেন।বিজ্ঞাপন
বৃহত্তর তাৎপর্য: দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্রের পরীক্ষা
লি জে-মিয়ংয়ের প্রেসিডেন্সি দক্ষিণ কোরিয়া গভীর রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে উঠতে এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে পথ নির্ধারণ করতে পারবে কি না, তার পরীক্ষা। তাঁর দল নির্বাহী ও আইনসভা—দুই শাখাই নিয়ন্ত্রণ করায় নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়নে লির বিরল সুযোগ রয়েছে। তবে ক্ষমতার নিজস্ব ঝুঁকিও আছে। পর্যবেক্ষকেরা সতর্ক করছেন, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হবে লি সংযমের সঙ্গে দেশ চালাতে এবং মেরুকরণে বিভক্ত সমাজে ঐকমত্য গড়তে পারেন কি না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে মধ্যম শক্তিগুলো কীভাবে পথ চলতে পারে, তার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে লির বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। তাঁর সাফল্য বা ব্যর্থতা শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার ভবিষ্যৎ নয়, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা বৃহত্তর অঞ্চলের ওপরও প্রভাব ফেলবে।বিজ্ঞাপন
সারসংক্ষেপ
- একসময়ের শিশুশ্রমিক লি জে-মিয়ং নাটকীয় রাজনৈতিক যাত্রার পর এখন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট।
- সাংবিধানিক সংকটের পর তাঁর নির্বাচন হয়েছে, যা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সংস্কারের ম্যান্ডেট হিসেবে বিবেচিত।
- ব্যক্তিগত দুর্দশার অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা লির নীতির কেন্দ্রে রয়েছে কল্যাণ, অর্থনৈতিক উদ্ভাবন এবং বাস্তববাদী শাসন।
- যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা, উত্তর কোরিয়াকে সামলানো এবং দেশের অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ মোকাবিলায় তাঁকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
- চলমান আইনি জটিলতা ও রাজনীতির বাইরের মানুষ হিসেবে তাঁর পরিচিতি প্রেসিডেন্সিকে সম্ভাবনাময় এবং অনিশ্চিত—দুই-ই করে তুলেছে; এর প্রভাব পড়বে দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্র ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর।






