নতুন রান্নার হাঁড়িতে দৈনন্দিন খাবারে মিশছে সিসা
বাংলাদেশে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি থেকে পরীক্ষাগারে ভাত ও খিচুড়িতে সিসা মিশে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। হাঁড়িগুলো প্রথমবার ব্যবহারের সময় সিসার ঘনত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। icddr,b ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০টি নতুন এবং সাতটি ব্যবহৃত হাঁড়ি পরীক্ষা করে এমন একটি পথ শনাক্ত করেছেন, যার মাধ্যমে সাধারণ একটি গৃহস্থালি পণ্য পরিবারের সদস্যদের এমন এক ধাতুর সংস্পর্শে আনতে পারে, যা শিশুদের বিকাশমান মস্তিষ্কের ক্ষতি করে।
সূচিপত্র
- নতুন রান্নার হাঁড়িতে দৈনন্দিন খাবারে মিশছে সিসা
- গবেষকেরা যেভাবে হাঁড়ি পরীক্ষা করেছেন
- কেন ঘষে পরিষ্কার করা ও অম্লীয় খাবার গুরুত্বপূর্ণ
- শিশুদের জন্য পরিসংখ্যানের অর্থ
- জাতীয় স্বাস্থ্যসমস্যার মধ্যে রান্নাঘরের ঝুঁকি
- হাঁড়ি নিয়ে সতর্কতা বহু বছরের
- অন্য দেশের পরীক্ষায় যে চিত্র পাওয়া গেছে
- ভাঙারি ধাতু ও নিরাপদ হাঁড়ির দাম
- নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কী করছে
- মূল বিষয়গুলো
২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর Journal of Exposure Science & Environmental Epidemiology-তে প্রকাশিত গবেষণায় প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি ভাতে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং প্রতি কেজি খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া যায়। খিচুড়ি চাল ও ডাল দিয়ে তৈরি একটি খাবার। গবেষণাপত্রের সারাংশে এই পরিমাণগুলোকে গড় ঘনত্ব বলা হয়েছে; জনসমক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মাত্রা ওই পরিমাণ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
গবেষকদের উল্লেখ করা শিশু ও ছোটদের খাবারের জন্য প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রামের মানদণ্ডের তুলনায় এই ঘনত্ব প্রায় ৩০ ও ৪২ গুণ। বারবার রান্নার পরও খাবারে সিসা মিশেছে, তৃতীয়বার ব্যবহারের সময়ও। পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা সাতটি হাঁড়ির মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও শনাক্তযোগ্য সিসা ছিল।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Human and Planetary Health উদ্যোগের Project Unleaded-এর পরিচালক ডা. জেনা ফোরসিথ ব্যাখ্যা করেন, দলটি হাঁড়ি ও খাবার দুটোই পরীক্ষা করেছে কেন:
আমরা হাঁড়ি এবং তাতে রান্না করা খাবার—দুটিতেই সিসা পরিমাপ করেছি। এতে দেখা গেছে, দৈনন্দিন রান্নার একটি হাঁড়ি কীভাবে সংস্পর্শের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণার ফল উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা তদারকির পাশাপাশি রান্নাঘরের অভ্যাসের দিকেও নজর দিচ্ছে। চকচকে নতুন হাঁড়ি প্রথম দিকে পুরোনোটির চেয়ে বেশি সিসা ছাড়তে পারে, আর ঘষে পরিষ্কার করলে পৃষ্ঠ থেকে বেশি সিসা বেরিয়ে আসতে পারে।
গবেষকেরা যেভাবে হাঁড়ি পরীক্ষা করেছেন
গবেষক দলের রান্নার হাঁড়ি থেকে সংস্পর্শ নিয়ে গবেষণায় দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল: সাদা ভাত ও খিচুড়ি রান্না করা এবং ৪% অ্যাসিটিক অ্যাসিডযুক্ত দ্রবণ দিয়ে ধাতু নির্গমনের পরীক্ষা। অ্যাসিটিক অ্যাসিড হলো ভিনেগারে থাকা অ্যাসিড। দ্রবণটি দিয়ে অম্লতা ও দৈনন্দিন ব্যবহারের ফলে ধাতু থেকে তরলে সিসা কীভাবে মেশে, তা পরীক্ষা করা হয়।
২০টি নতুন হাঁড়ি বাংলাদেশে এক সরবরাহকারীর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল, আর সাতটি ব্যবহৃত হাঁড়ি দিয়েছিল স্থানীয় পরিবারগুলো। গবেষকেরা হাঁড়িতে সিসার পরিমাণ মাপেন এবং বারবার ব্যবহার, ঘষে পরিষ্কার ও নাড়াচাড়াসহ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে খাবার ও তরলে সিসা মেশার বিষয়টি পরীক্ষা করেন।
নতুন হাঁড়ি প্রথম দিকে ব্যবহারের সময় সবচেয়ে বেশি সিসা ছাড়ে, পরে তা কমে যায়। লেখকদের ধারণা, পৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা সিসা সহজে বেরিয়ে আসে এবং ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কমে যায়। তবে গবেষণাপত্রের সারাংশে বর্ণিত পরীক্ষায় রান্না করা খাবারে সিসার ঘনত্ব শিশুদের খাবারের জন্য উল্লেখ করা মানদণ্ডের চেয়ে বেশি ছিল।
গবেষণায় সহায়তা দিয়েছে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের King Center on Global Development। এটি ২৭টি হাঁড়ি নিয়ে পরীক্ষাগারে করা গবেষণা; শিশুদের খাদ্যগ্রহণের হিসাব করা হয়েছে তাদের খাবার খাওয়ার ধরন থেকে। বিভিন্ন উৎপাদক, হাঁড়ির ধরন ও রান্নার অভ্যাস নিয়ে আরও বিস্তৃত পরীক্ষা দরকার। সিসার সংস্পর্শের কতটা হাঁড়ির কারণে হচ্ছে এবং এই নির্দিষ্ট হাঁড়িগুলো তৈরিতে কী ধরনের পুরোনো ধাতব সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি।
কেন ঘষে পরিষ্কার করা ও অম্লীয় খাবার গুরুত্বপূর্ণ
পরীক্ষায় ঘষে পরিষ্কার করার ফলে কিছু স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেছে। পরীক্ষার আগে ঘষে পরিষ্কার করা নতুন হাঁড়ি প্রথমবার ব্যবহারের সময় না ঘষা হাঁড়ির তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা ছেড়েছে। দ্বিতীয়বার ব্যবহারের সময় পার্থক্য ছিল প্রায় তিন গুণ।
এই তুলনাগুলো অ্যাসিটিক অ্যাসিডের পরীক্ষার ফল। অম্লতা দূষিত হাঁড়ি থেকে ধাতু বের করে আনতে সাহায্য করে, আর জোরে ঘষলে পৃষ্ঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আরও বেশি উপাদান উন্মুক্ত হতে পারে। একই ধরনের পরীক্ষায় ধাতব খুন্তি দিয়ে নাড়লেও সিসা নির্গমন বেড়েছে।
তাই তারের মাজুনি দিয়ে হাঁড়ি পরিষ্কার করা পরিবারগুলো হাঁড়ি পরিষ্কার রাখতে গিয়ে সিসার সংস্পর্শ বাড়াতে পারে। ঘষে পরিষ্কারের মাজুনি ও অম্লীয় খাবার এড়ালে সিসা নির্গমনে সহায়ক কিছু পরিস্থিতি কমানো যায়, যদিও স্বাভাবিক রান্নার সময়ও দূষণ থাকতে পারে।
icddr,b-এর পরিবেশস্বাস্থ্য ও পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি বিভাগের সহকারী বিজ্ঞানী ডা. জেসমিন সুলতানা পরিবারগুলোর উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন:
পরিবারগুলো খুব যত্ন করে ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে। হাঁড়ি থেকে সিসা মিশছে কি না, তা নিয়ে তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা নয়।
ছোট শিশুদের খাবার রান্নায় খাদ্যনিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হাঁড়ি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন সুলতানা। পরিবারগুলো স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি ব্যবহার অব্যাহত রাখলে তিনি তারের মাজুনি এবং টক বা অম্লীয় খাবার এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। হাঁড়ির চেহারা দেখে নিরাপত্তা বোঝার উপায় নেই: সিসার কোনো দৃশ্যমান রং, গন্ধ বা স্বাদ নেই, যা দেখে পরিবার বুঝতে পারে হাঁড়িটি নিরাপদ কি না।
শিশুদের জন্য পরিসংখ্যানের অর্থ
গবেষকেরা রান্নার পরীক্ষার ফলের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামীণ শিশুদের ভাত খাওয়ার পরিমাণ নিয়ে আগের পরিমাপ মিলিয়ে দেখেন। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, পরীক্ষিত হাঁড়িতে তিনবার রান্নার পর তৈরি ভাত খাওয়া শিশুরা দিনে প্রায় ১৩ থেকে ১৯ মাইক্রোগ্রাম সিসা গ্রহণ করতে পারে, যা শিশুদের দৈনিক সিসা গ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের অন্তর্বর্তী নির্দেশক মাত্রার প্রায় ছয় থেকে নয় গুণ।
এক মাইক্রোগ্রাম হলো এক গ্রামের দশ লাখ ভাগের এক ভাগ। এত সামান্য পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সিসা একটি নিউরোটক্সিন, অর্থাৎ এমন পদার্থ যা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। শিশুদের মস্তিষ্ক এখনো বিকাশমান, তাই শেখা, মনোযোগ ও আচরণের ক্ষেত্রে সিসার সংস্পর্শ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
খাবারে সিসার ঘনত্বের মানদণ্ড এবং দৈনিক গ্রহণের নির্দেশক মাত্রা ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়। প্রতি কেজিতে মাইক্রোগ্রাম দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবারে সিসার পরিমাণ বোঝানো হয়। দিনে কত মাইক্রোগ্রাম দিয়ে এক দিনে মোট কতটা সিসা গিলে খাওয়া হয়, তা বোঝায়; এই পরিমাণ নির্ভর করে শিশু কতটা খাবার খায় তার ওপর। ভাত খাওয়ার পরিমাণ ধরে হিসাব করে গ্রহণের এই অনুমান করা হয়েছে, এই হাঁড়িতে রান্না করা ভাত খাওয়া শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা জানা নেই। রক্তে সিসার পরিমাণ প্রতি ডেসিলিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছালে সংস্পর্শের উৎস শনাক্ত করে তা কমানোর পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। এক ডেসিলিটার এক লিটারের দশ ভাগের এক ভাগ। এই হস্তক্ষেপের মাত্রা স্বাস্থ্যসেবাকে কখন ব্যবস্থা নিতে হবে তা ঠিক করতে সাহায্য করে; এর চেয়ে কম মাত্রাতেও প্রতিরোধ জরুরি।
জাতীয় স্বাস্থ্যসমস্যার মধ্যে রান্নাঘরের ঝুঁকি
বাংলাদেশের Multiple Indicator Cluster Survey 2025-এ দেখা গেছে, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৮.৪% শিশু এবং ৭.৫% গর্ভবতী নারীর রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো UNICEF-এর সহায়তায় জরিপটি পরিচালনা করে। নিয়মিত সংস্পর্শের উৎস শনাক্ত করা কেন জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে, জরিপটি তা দেখায়।
দূষিত খাবার, রং, ধুলো, গৃহস্থালি পণ্য এবং অনিরাপদ ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে সিসা পরিবারের সদস্যদের শরীরে পৌঁছাতে পারে। হাঁড়ির গবেষণার ফল এসব উৎসের পাশাপাশি নজর দেওয়ার মতো আরেকটি সংস্পর্শের পথ শনাক্ত করেছে। দীর্ঘদিন সিসার সংস্পর্শে থাকলে প্রাপ্তবয়স্করাও ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাঁদের হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
বাংলাদেশের জাতীয় সিসা হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে রক্তে সিসার মাত্রা বেশি এমন ছোট শিশুর অনুপাত অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৯৫% কমানোর কথা বলা হয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সালের জন্য ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশ’ জাতীয় কৌশল ও বহু-বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনার খসড়া ২০২৬ সালের ১৭ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়।
হাঁড়ি পরীক্ষা এসব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের একটি নির্দিষ্ট কাজ সামনে এনেছে: দূষিত পণ্য রান্নাঘরে পৌঁছানোর আগেই তা শনাক্ত করা। রক্ত পরীক্ষা যাদের বিশেষ নজর দরকার, তাদের শনাক্ত করতে পারে; আর কাঁচামাল ও তৈরি হাঁড়ি পরীক্ষা করলে দৈনন্দিন খাবারের মাধ্যমে বারবার সিসার সংস্পর্শ ঠেকানো যায়।
হাঁড়ি নিয়ে সতর্কতা বহু বছরের
পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ESDO) ২০১৮ সালে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়া অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি নিয়ে উদ্বেগ জানায়। তাদের হাঁড়ির দূষণবিষয়ক প্রতিবেদনে সান ফ্রান্সিসকোর একটি পরীক্ষাগারে বাংলাদেশের চারটি নমুনা পরীক্ষার কথা বলা হয়।
ESDO জানায়, প্রতি পরিবেশনে গড়ে ২১৬ মিলিগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম, ছয় মাইক্রোগ্রাম আর্সেনিক, ৭.৫ মাইক্রোগ্রাম ক্যাডমিয়াম এবং দুই মাইক্রোগ্রাম সিসার সংস্পর্শ হতে পারে। সংস্থাটি বলে, নিম্নমানের হাঁড়ি থেকে বেশি সিসা, আর উন্নত মানের হাঁড়ি থেকে বেশি তামা বেরিয়ে এসেছে। অল্প কয়েকটি নমুনার এই পরীক্ষা কয়েকটি ধাতু নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরে এবং উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণ সম্পর্কে আরও অনুসন্ধানের পক্ষে যুক্তি দেয়।
এখন কয়েকটি ঘটনা আগের সতর্কতার সঙ্গে বর্তমান গবেষণা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে যুক্ত করেছে:
- ফেব্রুয়ারি ২০১৭: উন্নয়নশীল ১০টি দেশের ৪২টি রান্নার সামগ্রী নিয়ে গবেষণায় অ্যাসিড পরীক্ষার সময় সিসা ও অন্যান্য ধাতু নির্গমনের প্রমাণ নথিবদ্ধ হয়।
- ২৮ এপ্রিল ২০১৮: বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া চারটি হাঁড়ির নমুনা পরীক্ষা করে ESDO তাদের ফল জানায়।
- জানুয়ারি ২০২৬: BSTI-এর তথ্য অনুযায়ী, BDS 1110:2025-এর আওতায় অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্রের জন্য সনদ বাধ্যতামূলক হয়।
- ১৭ আগস্ট ২০২৬: ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সিসার সংস্পর্শ কমাতে বাংলাদেশের জাতীয় কৌশল ও কর্মপরিকল্পনার খসড়া অনুমোদিত হয়।
- ২৫ অক্টোবর ২০২৬: icddr,b ও স্ট্যানফোর্ডের হাঁড়িবিষয়ক গবেষণা প্রকাশিত হয়।
- ৬ নভেম্বর ২০২৬: জনসমক্ষে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নতুন গবেষণার ফল এবং খাদ্যনিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।
প্রথম সতর্কতা থেকে সাম্প্রতিক পরীক্ষা পর্যন্ত পেরিয়ে যাওয়া বছরগুলো দেখায়, বাজারে বিক্রি হওয়া পণ্যের নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সঙ্গে গবেষণার যোগসূত্র তৈরি করা দরকার।
অন্য দেশের পরীক্ষায় যে চিত্র পাওয়া গেছে
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত গবেষণায় উন্নয়নশীল ১০টি দেশের অ্যালুমিনিয়ামের ৪২টি রান্নার সামগ্রীতে দুই ঘণ্টা ধরে পাতলা অ্যাসিটিক অ্যাসিড ফুটিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ১৫টি সামগ্রী থেকে প্রতি ২৫০ মিলিলিটারের পরিবেশনে অন্তত এক মাইক্রোগ্রাম সিসা বের হয়, যা নমুনার প্রায় ৩৬%।
১০টি সামগ্রী থেকে প্রতি পরিবেশনে এক মাইক্রোগ্রামের বেশি ক্যাডমিয়াম এবং ১৫টি থেকে এক মাইক্রোগ্রামের বেশি আর্সেনিক বের হয়। ভিয়েতনামের একটি হাঁড়ি থেকে ধারাবাহিক পরীক্ষায় প্রতি পরিবেশনে যথাক্রমে ৩৩, ১,১২৬ ও ১,৪২৬ মাইক্রোগ্রাম সিসা বের হয়। এর ক্রমবর্ধমান নির্গমন বাংলাদেশের নতুন গবেষণায় বারবার ব্যবহারের সঙ্গে সিসা কমে যাওয়ার পর্যবেক্ষণের বিপরীত। এতে বোঝা যায়, বিভিন্ন পণ্য এবং বারবার রান্নার প্রভাব পরীক্ষা করা কেন জরুরি।
আগের ওই গবেষণার প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা যায়, রান্নার সামগ্রীতে প্রলেপ দিলে প্রতি পরিবেশনে অ্যালুমিনিয়ামের সংস্পর্শ ৯৮%-এর বেশি কমে যায়; অন্যান্য ধাতুর ক্ষেত্রেও একই রকম হ্রাস হয়। সুরক্ষামূলক পৃষ্ঠ উৎপাদনে একটি সম্ভাব্য পদ্ধতি হতে পারে, তবে ব্যবহারের সময় এর নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করা দরকার।
বাংলাদেশের নতুন গবেষণা ভাত ও খিচুড়ি থেকে সরাসরি পরিমাপ যোগ করে এই বিস্তৃত প্রমাণভান্ডারে। এর ব্যবহারিক অবদান হলো, অম্লতা, পরিষ্কার ও নাড়াচাড়ার নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার পাশাপাশি মানুষের নিয়মিত খাওয়া খাবারও পরীক্ষা করা।
ভাঙারি ধাতু ও নিরাপদ হাঁড়ির দাম
সাশ্রয়ী, সহজলভ্য এবং তাপ ভালোভাবে পরিবহন করে বলে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি জনপ্রিয়। ছোট উৎপাদকেরা প্রায়ই ভাঙারি ধাতু গলিয়ে হাঁড়ি তৈরি করেন। ফেলে দেওয়া ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, রেডিয়েটর, কম্পিউটারের অংশ এবং ক্যান এর সম্ভাব্য উৎস; এসবের ধাতব উপাদানে অনেক পার্থক্য থাকতে পারে।
অনুপযুক্ত ভাঙারি ধাতুতে থাকা সিসা তৈরি পণ্যে থেকে যেতে পারে। তাই ঢালাই শুরুর আগেই কাঁচামাল পরীক্ষা জরুরি, আর রান্নার সময় খাবারে কতটা দূষণ মিশতে পারে, তা বুঝতে তৈরি হাঁড়িও পরীক্ষা করা দরকার।
icddr,b-এর গবেষক ও গবেষণাপত্রের একজন লেখক মাহবুবুর রহমান বলেন, অনেক পরিবারের জন্য সস্তা হাঁড়ি বদলে ফেলা কঠিন হবে। তিনি দূষিত ভাঙারি ধাতু উৎপাদনে ঢোকা ঠেকানো এবং ছোট উৎপাদকদের নিরাপদ উপকরণ ও মান যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
গবেষকেরা একটি কর্মশালাসহ হাঁড়ি প্রস্তুতকারক ও BSTI-এর সঙ্গে ফলাফল নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাঁদের কাঁচামালের উৎস শনাক্ত করতে তাঁরা সমস্যায় পড়েছেন। এরপর দলটি আরও পরীক্ষার জন্য ঢাকা ও বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকা থেকে অতিরিক্ত হাঁড়ির নমুনা সংগ্রহ করেছে।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে খাবারের মাধ্যমে সিসার সংস্পর্শের আরেকটি পথ কমিয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় পরীক্ষা করা বাজারের হলুদের নমুনায় শনাক্তযোগ্য সিসার উপস্থিতি ২০১৯ সালের ৪৭% থেকে ২০২১ সালে শূন্যে নেমে আসে। গবেষকেরা এই উন্নতির সঙ্গে জনসচেতনতা, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ এবং সিসাযুক্ত রং ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যোগসূত্র পান। হাঁড়ির ক্ষেত্রেও উৎপাদন পর্যায়ের পরীক্ষা, বাজার তদারকি ও সাশ্রয়ী নিরাপদ পণ্যের মধ্যে একই ধরনের যোগসূত্র দরকার।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কী করছে
BSTI বলছে, BDS 1110:2025-এর আওতায় বাধ্যতামূলক সনদ পেতে অ্যালুমিনিয়ামের বাসনপত্রে সিসা ও অন্যান্য বিষাক্ত ধাতুর নির্ধারিত সীমা মানতে হবে। সংস্থাটি জানিয়েছে, কারখানা ও বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে, প্রস্তুতকারকদের সনদব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে এবং শর্ত পূরণে ব্যর্থ পণ্যের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
BSTI সর্বোচ্চ ০.০৫% সীমার কথা জানালেও ওই পরিমাণ কোন কোন ধাতুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা উল্লেখ করেনি। সনদ পেতে রান্নার সময় হাঁড়ি থেকে খাবারে কতটা সিসা মেশে, তা মাপা হয় কি না, সে বিষয়টিও সংস্থার প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট করা হয়নি। গবেষকেরা হাঁড়ির উপাদান এবং রান্নাঘরে এর কার্যকারিতা—দুটিই বিবেচনায় নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
icddr,b-এর পরিবেশস্বাস্থ্য ও পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি বিভাগের ডা. মো. মাহবুবুর রহমান দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানান:
রান্নার হাঁড়ি থেকে খাবারে সিসা মেশার বিষয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট নিরাপত্তার শর্ত নির্ধারণ এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (BSTI) হাঁড়ির সিসা-নিরাপত্তার স্পষ্ট শর্ত নির্ধারণ ও তা কার্যকর করার আহ্বান জানাই।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. সাফিকুল ইসলাম বলেন, দূষণের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করতে কর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে। তিনি পরিবারগুলোকে যতটা সম্ভব অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন।
পরিবারগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো খাদ্যনিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হাঁড়ি ব্যবহার করা, বিশেষ করে শিশুদের খাবার রান্নায়; আর উদ্বেগের হাঁড়ি ব্যবহার করলে জোরে ঘষে পরিষ্কার করা ও অম্লীয় খাবার রান্না এড়ানো। নিয়ন্ত্রক ও উৎপাদকদের বড় দায়িত্ব হলো—সাশ্রয়ী হাঁড়িটি উপযুক্ত উপকরণে তৈরি এবং খাবারে কী ছাড়ে তা পরীক্ষা করা নিশ্চিত করা।
মূল বিষয়গুলো
- গবেষকেরা বাংলাদেশের ২০টি নতুন ও সাতটি ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পরীক্ষা করে রান্না ও পরীক্ষাগারের পরীক্ষায় সিসা মিশে যাওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন।
- প্রথমবার ব্যবহারের সময় খাবারে প্রতি কেজি ভাতে ৩০৫ এবং খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে।
- অ্যাসিড পরীক্ষায় নতুন হাঁড়ি প্রথমবার ব্যবহারের আগে জোরে ঘষে পরিষ্কার করলে সিসা নির্গমন প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে।
- তিনবার ব্যবহারের পর রান্না করা ভাত থেকে শিশুদের দৈনিক সিসা গ্রহণের পরিমাণ আনুমানিক ১৩ থেকে ১৯ মাইক্রোগ্রাম।
- বাংলাদেশের ২০২৫ সালের জাতীয় জরিপে ছোট শিশুদের প্রায় ৩৮.৪% এবং গর্ভবতী নারীদের ৭.৫%-এর রক্তে সিসার মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে।
- গবেষকেরা নিরাপদ ভাঙারি ধাতু, উৎপাদনে কঠোর তদারকি এবং হাঁড়ি থেকে খাবারে সিসা মেশার বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম চান।






