নিজ বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তার ও সাময়িক বরখাস্তের তথ্য প্রকাশ পুলিশের
মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে শ্রীলঙ্কার পুলিশ ২০৮ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে। এ ছাড়া প্রায় ১,৫০০ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ মিডিয়া মুখপাত্র সহকারী পুলিশ সুপার এফ. ইউ. উটলার।
সূচিপত্র
- নিজ বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তার ও সাময়িক বরখাস্তের তথ্য প্রকাশ পুলিশের
- দুই ধরনের ব্যবস্থার অর্থ
- বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তে মাদক অপরাধও রয়েছে
- ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ১১ হাজারের বেশি শিশু গ্রেপ্তার
- স্কুল ও কোচিং ক্লাসে নজরদারি
- খাবার ও অন্যান্য পণ্যের মাধ্যমে বিতরণ নিয়ে তদন্ত
- সন্তানদের পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে অভিভাবকদের প্রতি পুলিশের আহ্বান
- মূল বিষয়গুলো
উটলার স্বীকার করেন, পুলিশ বিভাগে দুর্নীতিগ্রস্ত ও দায়িত্ব পালনের অনুপযুক্ত সদস্য রয়েছেন। তিনি বলেন, এসব কর্মকর্তাকে শনাক্ত করে বাহিনী থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
এই তথ্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে পুলিশ সদস্যদের আচরণের বিষয়টি মাদকবিরোধী বিভাগের বৃহত্তর অভিযানের পাশাপাশি সামনে এসেছে। একই বক্তব্যে উটলার স্কুল ও বেসরকারি কোচিং ক্লাসের আশপাশে নজরদারি, মাদক বিতরণের সন্দেহভাজন পদ্ধতি নিয়ে তদন্ত এবং হাজারো শিশুকে গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করেন।
প্রকাশিত পরিসংখ্যানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর নেই: কর্মকর্তা গ্রেপ্তার ও সাময়িক বরখাস্তের সময়কাল, দুই তালিকায় একই ব্যক্তির সংখ্যা, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ এবং মামলার ফলাফল। শিশুদের বিষয়ে দেওয়া পরিসংখ্যানে কোন তারিখ পর্যন্ত হিসাব করা হয়েছে বা অভিযোগের ধরন অনুযায়ী বিভাজন কী, তাও জানানো হয়নি। আরও তথ্য প্রকাশের তারিখও উল্লেখ করা হয়নি।
পুলিশের ভেতরে অনিয়মের ব্যাপ্তি এবং বিভাগ কীভাবে তা মোকাবিলা করছে, তা বুঝতে এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘোষণায় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে নেওয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি চাকরির অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত অন্যদের শনাক্ত করার চলমান প্রচেষ্টার কথাও বলা হয়েছে।
দুই ধরনের ব্যবস্থার অর্থ
২০৮ জনকে গ্রেপ্তার এবং প্রায় ১,৫০০ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করার তথ্য দুটি ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থাকে বোঝায়। গ্রেপ্তারের মাধ্যমে একজনকে ফৌজদারি তদন্তের আওতায় আনা হয়। আর চাকরিসংক্রান্ত বা শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়ায় একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়; এই প্রক্রিয়া ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি চলতে পারে।
তাই কোনো অপরাধে অভিযুক্ত কর্মকর্তার ক্ষেত্রে দুটি প্রক্রিয়া একই সঙ্গে চলতে পারে। ফৌজদারি কার্যক্রমে আইনের কথিত লঙ্ঘন বিবেচনা করা হয়, আর শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রমে ওই ব্যক্তির পুলিশে চাকরি চালিয়ে যাওয়া উচিত কি না, তা নির্ধারণ করা হয়।
উটলার যে পদ্ধতির কথা বলেছেন, তাতে দুটি দায়িত্বই রয়েছে: দুর্নীতিগ্রস্ত বা অনুপযুক্ত সদস্যদের বাহিনী থেকে সরানো এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। জনসাধারণের কাছে জবাবদিহির অর্থ হলো, একজন কর্মকর্তার চাকরির পরিণতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ায় কী ঘটে, সেটিও।
বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তে মাদক অপরাধও রয়েছে
গ্রেপ্তার হওয়া ২০৮ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে মাদক অপরাধও রয়েছে। উটলার বলেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে; অর্থাৎ পুলিশ সদস্যদের কথিত অসদাচরণের বৃহত্তর চিত্রে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধও অন্তর্ভুক্ত।
এই তথ্য পুলিশের দুটি দায়িত্বকে সরাসরি সামনে এনেছে। একদিকে কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ মাদকের সরবরাহ তদন্ত করছেন, অন্যদিকে নিজেদের সদস্যদের কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধেও বিভাগ ব্যবস্থা নিচ্ছে।
উটলার বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অনুপযুক্ত কর্মকর্তাদের শনাক্ত করার কাজ বিভাগ চালিয়ে যাচ্ছে। এতে বোঝা যায়, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান; এখন পর্যন্ত নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে প্রকাশিত গ্রেপ্তার ও সাময়িক বরখাস্তের ঘটনা।
অপরাধ তদন্তে পুলিশের ওপর নির্ভরশীল বাসিন্দাদের কাছে মূল প্রশ্ন হলো, কারা দায়িত্বে বহাল রয়েছেন, কোন অভিযোগে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু হচ্ছে এবং শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন মনে হলে অসদাচরণে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে সরানো হচ্ছে কি না।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ১১ হাজারের বেশি শিশু গ্রেপ্তার
উটলার আরও বলেন, ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ১১ হাজার ১৩১ শিশুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৩৩ জন মেয়ে। শিশুরা যেখানে পড়াশোনা করে, সেই স্থানগুলোর আশপাশে মাদক নিয়ে উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রকাশিত মোট সংখ্যার প্রায় ২.১ শতাংশ মেয়ে; ২৩৩-কে ১১ হাজার ১৩১ দিয়ে ভাগ করে এই হিসাব পাওয়া যায়। শিশুদের বিষয়ে এটি সীমিত একটি ধারণা দেয়: বর্ণিত গ্রেপ্তারের মধ্যে মেয়েদের অংশ তুলনামূলকভাবে কম।
মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা মুখপাত্রের তুলে ধরা পুলিশি কার্যক্রমে শিশুদের বিষয়ে বড় পরিসরের দায়িত্বকে সামনে এনেছে। মাদক বিতরণ ঠেকানোর প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শিশুকে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্পর্শে আসার পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে কর্তৃপক্ষ।
শিশু গ্রেপ্তার হওয়ার পর কী ঘটে, তা পরিবারের জানা জরুরি: কোন অভিযোগে তদন্ত চলছে, শিশুটির পরিস্থিতি কী এবং মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ কী। জাতীয় পর্যায়ের মোট সংখ্যার পেছনের মানবিক প্রভাব বুঝতে এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুল ও কোচিং ক্লাসে নজরদারি
স্কুল ও বেসরকারি কোচিং ক্লাসের ভেতরে এবং আশপাশে মাদক বিতরণের সন্দেহভাজন নেটওয়ার্কের ওপর পুলিশ নিবিড় নজর রাখছে বলে জানিয়েছেন উটলার। বিশেষ উদ্বেগের একটি মাদক হিসেবে তিনি ক্রিস্টাল মেথামফেটামিনের কথা উল্লেখ করেন, যা সাধারণত ‘আইস’ নামে পরিচিত।
ক্রিস্টাল মেথামফেটামিন একটি শক্তিশালী উত্তেজক মাদক; এটি মস্তিষ্ক ও শরীরের কার্যক্রমের গতি বাড়ায়। এতে নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। তাই শিশুদের আশপাশে এটি বিতরণের সন্দেহ পুলিশি ও স্বাস্থ্যগত, দুই দিক থেকেই উদ্বেগের বিষয়।
বেসরকারি কোচিং ক্লাসের কারণে পুলিশের নজরদারি স্কুল প্রাঙ্গণের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। অতিরিক্ত পড়াশোনার জন্য যাতায়াত করা বা কাছাকাছি জড়ো হওয়া শিশুরাও মুখপাত্রের বর্ণিত স্থানগুলোর আওতায় রয়েছে।
সন্দেহভাজন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও আরও বিতরণ ঠেকাতে গোয়েন্দা সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান উটলার। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁদের কাজ হলো সন্দেহভাজন সরবরাহ নেটওয়ার্কের তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করা।
শিশুরা যেখানে পড়াশোনা করে, সেই স্থানগুলোর ওপর নজর দেওয়ার মধ্য দিয়ে সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগের তদন্ত এবং পরিবারের প্রতি সতর্কবার্তা একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। পুলিশ সন্দেহভাজন বিতরণকেন্দ্রগুলোর ওপর নজর রাখছে; অন্যদিকে অভিভাবকদের সন্তানদের দৈনন্দিন জীবনের পরিবর্তন খেয়াল করতে বলা হচ্ছে।
খাবার ও অন্যান্য পণ্যের মাধ্যমে বিতরণ নিয়ে তদন্ত
আইসক্রিম, তুলার মিছরি ও সারাভিটা দিয়ে মাদক বিতরণের খবর তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ বলে জানিয়েছেন উটলার। সারাভিটা শ্রীলঙ্কায় পান চিবানোর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রস্তুত খাবার।
পুলিশ এগুলোকে তদন্তাধীন মাদক বিতরণের সন্দেহভাজন পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করেছে। সম্ভাব্য মাদক সরবরাহ নিয়ে গোয়েন্দা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে, বিশেষ করে শিশুদের যাতায়াত আছে এমন স্থানে, এসব পণ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিচিত কিছু পণ্যের উল্লেখে পুলিশ কী খতিয়ে দেখছে, সে বিষয়ে অভিভাবক ও স্কুল-সম্প্রদায়ের কাছে আরও নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হয়। একই সঙ্গে তদন্তের পরিধি চেনা মাদকের সরাসরি বিক্রির বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে; সম্ভাব্য ব্যবহারকারীদের কাছে কীভাবে মাদক উপস্থাপন বা পৌঁছে দেওয়া হতে পারে, সেদিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
আরও মাদক ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এ ধরনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানান উটলার। কী বিতরণ করা হচ্ছে, কারা করছে এবং কোন কোন স্থানের মাধ্যমে করছে, তা নিশ্চিত করাও তদন্তের অংশ।
সন্তানদের পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে অভিভাবকদের প্রতি পুলিশের আহ্বান
সন্তানদের খাওয়ার অভ্যাস, আচরণ, কথাবার্তা ও বন্ধুত্বে পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা খেয়াল রাখতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান উটলার। তাঁর ভাষ্য, অস্বাভাবিক পরিবর্তন মাদক-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিতে পারে।
তাঁর আহ্বানে বর্ণিত উদ্যোগে পরিবারের ভূমিকাও পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। কর্মকর্তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে সন্দেহভাজন নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ করছেন, আর অভিভাবকদের ঘরের কাছের পরিবর্তনগুলো লক্ষ করতে বলা হচ্ছে।
ঘোষণায় শ্রীলঙ্কার পুলিশের দায়িত্বের দুটি ক্ষেত্র একসঙ্গে উঠে এসেছে: শিশুদের প্রভাবিত করা সন্দেহভাজন মাদক বিতরণের তদন্ত এবং বাহিনীর ভেতরে কথিত অপরাধ মোকাবিলা। জনসমক্ষে দেওয়া তথ্যে এখন রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রেপ্তার, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা এবং স্কুল ও কোচিং ক্লাসের আশপাশে চলমান গোয়েন্দা অভিযান।
মূল বিষয়গুলো
- পুলিশের মুখপাত্র এফ. ইউ. উটলার বলেন, মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২০৮ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
- প্রায় ১,৫০০ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
- দুর্নীতিগ্রস্ত ও অনুপযুক্ত সদস্যদের শনাক্ত করে বাহিনী থেকে সরানো এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান উটলার।
- পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ১১ হাজার ১৩১ শিশুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; তাদের মধ্যে ২৩৩ জন মেয়ে।
- স্কুল ও বেসরকারি কোচিং ক্লাসের কাছে মাদক বিতরণের সন্দেহভাজন কার্যক্রমে নজরদারি চলছে।
- আইসক্রিম, তুলার মিছরি ও সারাভিটা-সংশ্লিষ্ট খবর নিয়ে তদন্ত চলছে এবং গোয়েন্দা সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।






