যুদ্ধের ১৭ বছর পরও জমি ও জীবিকার ওপর বিধিনিষেধ
তামিল-অধ্যুষিত উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সামরিক বাহিনীর দখলে থাকা জমি দ্রুত ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশন। কমিশন বলেছে, ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার ১৭ বছর পরও সামরিকীকরণ অব্যাহত রয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক উপস্থিতি এখনো মানুষের বসবাসের জায়গা, আয়ের উপায় এবং বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে।
সূচিপত্র
- যুদ্ধের ১৭ বছর পরও জমি ও জীবিকার ওপর বিধিনিষেধ
- মালিকানার নথি নিয়ে বিরোধ কেন
- জাতীয় নিরাপত্তা ও সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা
- খামার ও প্রাক্-প্রাথমিক বিদ্যালয়েও সামরিক বাহিনীর ভূমিকা
- নজরদারি কীভাবে ন্যায়বিচারের সন্ধানকে প্রভাবিত করে
- গণকবর ও বাস্তুচ্যুতির অমীমাংসিত অধ্যায়
- কমিশনের অনুসন্ধান যেভাবে তৈরি হয়েছে
- দশকের পর দশক ধরে চলা বিরোধ
- মূল বিষয়গুলো
কমিশনের প্রতিবেদন ‘শ্রীলঙ্কার উত্তর ও পূর্ব প্রদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি’-তে জমি দখল, ঐতিহ্যবাহী জীবিকার ওপর বিধিনিষেধ এবং ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনা অব্যাহত থাকার কথা উঠে এসেছে। দখল করা জমি ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সম্পত্তির অধিকার এবং নিজেদের ভরণপোষণের সক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে কমিশন।
জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশন সাবেক সংঘাতপূর্ণ এলাকার জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব ফেলা পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছে এভাবে:
জমি দখল, ঐতিহ্যবাহী জীবিকায় প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ভয়ভীতি দেখানোর ধারাবাহিক চিত্র
এই অনুসন্ধান সরকারের অগ্রগতির দাবির পাশাপাশি এসেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ব্রিগেডিয়ার ফ্রাঙ্কলিন জোসেফ বলেছেন, সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা আগের জমির ৯০ শতাংশের বেশি ফেরত দেওয়া হয়েছে। ইলঙ্কাই তামিল আরাসু কাচ্চির হয়ে মুল্লাইত্তিভু জেলার প্রতিনিধিত্বকারী তামিল আইনপ্রণেতা থুরাইরাসা রবিকরন বলেছেন, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি এখনো সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে বাস্তব সমস্যায় পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা: ব্যাপক হারে জমি ফেরত দেওয়া হলেও যেসব পরিবারের সম্পত্তি এখনো দখলে রয়েছে, তাদের তা পুনরুদ্ধারের উপায় দরকার। কমিশনের সুপারিশে জমি ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি বেসামরিক জীবনে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর বৃহত্তর ভূমিকার বিষয়টিও এসেছে।
মালিকানার নথি নিয়ে বিরোধ কেন
প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে, যিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছেন, ২০২৬ সালের আগস্টে নিরাপত্তার স্বার্থে আর প্রয়োজন নেই—এমন যুদ্ধকালীন দখল করা জমি দ্রুত ফেরত দিতে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দেন। তামিলভাষী বাসিন্দারা এ নির্দেশ বাস্তবায়নের গতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
জোসেফ বলেছেন, মালিকদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি বা মালিকানার প্রমাণপত্র নেই—এমন কিছু মামলা এখনো পর্যালোচনাধীন। রবিকরন আপত্তি জানিয়ে বলেছেন, যুদ্ধের সময় পালিয়ে যাওয়া পরিবারগুলোর কাছে জমির নথি চাওয়া অন্যায্য। বাস্তুচ্যুতির কারণে একটি পরিবার ঘরবাড়ির পাশাপাশি তা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
এখানে দেওয়া পরিসংখ্যানে সামরিক বাহিনীর আগের নিয়ন্ত্রণাধীন জমির মোট আয়তন, এখনো দখলে থাকা জমির পরিমাণ বা জমি ফেরত দেওয়া শেষ করার সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। জোসেফের শতাংশের হিসাব সামরিক বাহিনীর আগের নিয়ন্ত্রণাধীন জমি নিয়ে, আর রবিকরনের আপত্তির আওতায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগসহ অন্যান্য সরকারি সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন সম্পত্তিও রয়েছে।
সম্পত্তির অধিকার ও জীবিকা পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে কমিশন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষেত্রে এর অর্থ, নিরাপত্তা পর্যালোচনা ও কাগজপত্রের দাবির মধ্যে আটকে না থেকে আবার জমি ব্যবহার করতে পারা।
জাতীয় নিরাপত্তা ও সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা
জাতীয় নিরাপত্তাকে জমি অধিগ্রহণের ঢালাও যুক্তি হিসেবে ব্যবহার না করার সুপারিশ করেছে কমিশন। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে অসমভাবে বেশি ক্ষতির ভার বহন করতে হয় বা অধিগ্রহণের ফলে ধর্মীয় অনুপ্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়, সেগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কমিশন।
জমি অধিগ্রহণ বলতে রাষ্ট্রের কোনো সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে বোঝায়। উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে বিরোধে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ জড়িত থাকতে পারে, যাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব আলাদা। ফলে বাসিন্দারা বেসামরিক বিভাগগুলোর আরোপিত বিধিনিষেধের মুখেও পড়লে সামরিক বাহিনীর জমি ফেরত দেওয়ার কর্মসূচি বৃহত্তর সমস্যার কেবল একটি অংশের সমাধান করে।
এই বিস্তৃত ধারার উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের শ্রীলঙ্কায় মানবাধিকার শীর্ষক ব্রিফিংয়ে। এতে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগসহ সরকারি বিভাগের জমি অধিগ্রহণ এবং প্রবেশাধিকারের ওপর সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কাকে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য যুক্তরাজ্যের সুপারিশের কথা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে ২০২৪ সালের ৪ মার্চ শ্রীলঙ্কা কোর গ্রুপের দেওয়া একটি বিবৃতিও তুলে ধরা হয়েছে। এই গ্রুপে যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালাউই, মন্টেনেগ্রো, উত্তর মেসিডোনিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে। জমি ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়ে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গ্রুপটি বলেছিল:
জমি ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সরকারের ঘোষিত অঙ্গীকারকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে দেশের উত্তরাঞ্চলে এবং বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে জমি দখলকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার খবর নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।
২০২৫ সালের ঘটনাবলির বিবরণেও হিন্দু মন্দির ও সংলগ্ন জমি দখলে সরকারি সংস্থা, সামরিক সদস্য এবং পুলিশের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। উপাসক ও আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য এসব স্থানের নিয়ন্ত্রণ সম্পত্তির অধিকারের সঙ্গে ধর্ম পালনের স্বাধীনতাকেও যুক্ত করে।
খামার ও প্রাক্-প্রাথমিক বিদ্যালয়েও সামরিক বাহিনীর ভূমিকা
কৃষি ও শিক্ষাসহ বেসামরিক অর্থনৈতিক খাতে সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততা বন্ধে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কমিশন। বেসামরিক নিরাপত্তা বিভাগের মাধ্যমে কার্যক্রম এবং প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সামরিক বাহিনীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছে কমিশন।
এসব দায়িত্বের ফলে সামরিক স্থাপনা পাহারা দেওয়ার বাইরেও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো জড়িয়ে পড়ে। কৃষির সঙ্গে জমি ও আয়ের সুযোগের প্রশ্ন জড়িত। প্রাক্-প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনার সঙ্গে ছোট শিশুদের শিক্ষক এবং তাঁদের কাজের তদারককারী কর্তৃপক্ষ জড়িত।
কমিশনের মতে, শ্রীলঙ্কায় নিরাপত্তা খাত সংস্কারের কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নেই, যা উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে বেসামরিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে। নিরাপত্তা খাত সংস্কার বলতে সশস্ত্র বাহিনীর মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, নিয়ম ও তদারকি বদলে তাদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা এবং জনসাধারণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনা বোঝায়।
তাই প্রতিবেদনের সুপারিশ শুধু ব্যক্তিগত জমি ফেরত দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ জনগোষ্ঠীর জীবন পরিচালনায় সামরিক দায়িত্ব ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে আরও স্পষ্ট বিভাজন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে এতে। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্মিলনের পথে বেসামরিক বিষয়ে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততাকে বাধা হিসেবে দেখেছে কমিশন।
নজরদারি কীভাবে ন্যায়বিচারের সন্ধানকে প্রভাবিত করে
জমি নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি নজরদারি ও ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়ও পর্যালোচনা করেছে কমিশন। তাদের গবেষণায় জোরপূর্বক গুম, গণকবর এবং স্মৃতিচারণের বিষয়ও রয়েছে; স্মৃতিচারণ বলতে নিহত বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও জনগোষ্ঠীর স্মরণ করার নানা উপায় বোঝায়।
শ্রীলঙ্কা নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের বার্ষিক মূল্যায়নে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে প্রভাব বিস্তারকারী নজরদারি কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। দপ্তরটি জানিয়েছে:
বিশেষ করে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে নজরদারি ব্যবস্থা মোটামুটি অক্ষত রয়েছে; কেন্দ্রীয় সরকারের তদারকি বা নির্দেশনা খুবই সীমিত
২০২৫ সালেও ন্যায়বিচারের দাবিতে প্রচার চালানো পরিবার, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা নজরদারি ও ভয়ভীতির মুখে পড়েছেন। ওই বছরের আগস্টে সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ তামিল সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী কানাপাথিপিল্লাই কুমাননকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে।
২০২৫ সালের জুনে জাতিসংঘের শ্রীলঙ্কা জবাবদিহি প্রকল্পকে তথ্য দেওয়া ত্রিনকোমালির এক নারী জানান, পুলিশ তাঁর বাড়িতে এসে তাঁকে তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাঁর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। পরিবারের ওপর চাপের কথা তিনি এভাবে বর্ণনা করেন:
এখন নজরদারি আরও কড়া," তিনি বলেন। "কখনো কখনো [পুলিশ] আমাদের সম্পর্কে তথ্য জানতে আমাদের সন্তানদের কাছেও যায়। এটা এক ধরনের হুমকি।
সংঘাত-সংশ্লিষ্ট নির্যাতনের প্রমাণ সংগ্রহ করে এই প্রকল্প। এতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা তথ্য জানানোর সুযোগ পান, আর ওই নারীর বর্ণিত জিজ্ঞাসাবাদ দেখায়, এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কী ধরনের চাপ যুক্ত হতে পারে।
গণকবর ও বাস্তুচ্যুতির অমীমাংসিত অধ্যায়
২০২৫ সালের তদন্তে সংঘাতের সময় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে নতুন করে দৃষ্টি পড়ে। জাফনার কাছে চেম্মানিতে গণকবরের নতুন তদন্তে দুই শতাধিক মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। ধারণা করা হয়, ১৯৯০-এর দশকে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছিলেন তাঁরা।
২০২৫ সালের আগস্টে বাট্টিকালোয়া জেলার কুরুক্কালমাদামের আরেকটি গণকবর খননের নির্দেশ দেয় আদালত। কয়েক বছর ধরে শ্রীলঙ্কাজুড়ে অন্তত ২০টি গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে, প্রায়ই নির্মাণকাজের সময় সেগুলোর সন্ধান মিলেছে।
কারিগরি সক্ষমতার ঘাটতির কারণে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আগে প্রমাণ সংরক্ষণ ও দেহাবশেষ শনাক্তের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ফলে অনেক পরিবার এখনো কোনো উত্তর পায়নি। গণকবর ও জোরপূর্বক গুমের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে কমিশন নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানকে জমি, বাসস্থান এবং ভয়ভীতি থেকে মুক্তির দাবির পাশাপাশি স্থান দিয়েছে।
১৯৯০ সালে তামিল ইলমের লিবারেশন টাইগার্সের হাতে বিতাড়িত উত্তরাঞ্চলের মুসলমানদের পুনর্বাসনের বিষয়ও গবেষণায় রয়েছে। তাঁদের বাস্তুচ্যুতি ঘরবাড়ি, জমি ও সামাজিক জীবন নিয়ে অঞ্চলের অমীমাংসিত দাবির আরেকটি অংশ। তামিল জনগোষ্ঠীর উদ্বেগের পাশাপাশি তাঁদের পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করে সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অধিকার তুলে ধরেছে কমিশন।
কমিশনের অনুসন্ধান যেভাবে তৈরি হয়েছে
মানবাধিকার কমিশন জানিয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজের সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মাঠপর্যায়ের সফর ও আলোচনার ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়েছে। প্রাসঙ্গিক প্রতিবেদন ও গবেষণাও পর্যালোচনা করেছে কমিশন।
গবেষণায় সমতা, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার, নিরাপদ জীবিকা, জমি, বাসস্থান এবং সরকারি সেবার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আওতায় ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণও এসেছে।
অঞ্চলকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তে জবাবদিহি ও জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে কমিশন। বাস্তবে এর অর্থ, জমি, পুনর্বাসন ও উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় বাসিন্দারাও ভূমিকা রাখবেন; সরকারি সংস্থার নেওয়া সিদ্ধান্ত তাঁদের শুধু জানিয়ে দেওয়া হবে না।
সুপারিশগুলো যুদ্ধ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারকে দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করেছে: নিরাপদ বাসস্থান, কাজের সুযোগ, সরকারি সেবা এবং অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার ব্যবস্থা। ঐতিহাসিক অবিচার ও স্থায়ী বৈষম্য মোকাবিলার দায়ও সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর দিয়েছে কমিশন।
দশকের পর দশক ধরে চলা বিরোধ
বহু বছরের বাস্তুচ্যুতি, সরকারি প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির পর এসেছে সর্বশেষ এই অনুসন্ধান। কয়েকটি তারিখ থেকে বোঝা যায়, বর্তমান বিরোধগুলোর সঙ্গে আগের ঘটনাগুলোর যোগসূত্র কীভাবে তৈরি হয়েছে:
- ১৯৯০: তামিল ইলমের লিবারেশন টাইগার্স উত্তরাঞ্চলের মুসলমানদের বিতাড়িত করে। কমিশনের পর্যালোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে তাঁদের পুনর্বাসনও রয়েছে।
- ২০০৯: শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ শেষ হয়। দখল করা জমি, নিখোঁজ ব্যক্তি এবং বেসামরিক শাসন নিয়ে অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়ে যায়।
- ২০২৩: উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে জমি অধিগ্রহণ ও বিধিনিষেধ মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায় যুক্তরাজ্য সরকার।
- ৪ মার্চ ২০২৪: বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে জমি দখলকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে শ্রীলঙ্কা কোর গ্রুপ।
- ২০২৫: গণকবরের তদন্ত অব্যাহত থাকে। ভুক্তভোগীদের পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীরা নজরদারি এবং ভয়ভীতির মুখে পড়েন।
- আগস্ট ২০২৬: নিরাপত্তার স্বার্থে আর প্রয়োজন নেই—এমন জমি দ্রুত ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন দিসানায়েকে।
দেশের অভ্যন্তরের এই বিরোধগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জবাবদিহির উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৫১/১ নম্বর প্রস্তাব জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরকে শ্রীলঙ্কা নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া এবং ভবিষ্যতের জবাবদিহি প্রক্রিয়ার জন্য অতীত নির্যাতনের প্রমাণ সংরক্ষণের দায়িত্ব নতুন করে দিয়েছে বলে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ব্রিফিংয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে পরিষদ শ্রীলঙ্কা জবাবদিহি প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছরের জন্য বাড়ায়।
কমিশনের মূল দাবি শ্রীলঙ্কার ভেতরেই পদক্ষেপ নেওয়া: দখল করা সম্পত্তি ফেরত দেওয়া, জীবিকা পুনরুদ্ধার, বেসামরিক বিষয়ে সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততা কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে অর্থবহ মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া। জমি ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য অগ্রগতির পরবর্তী মাপকাঠি হলো নিজেদের বাড়ি ও জীবিকায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ।
মূল বিষয়গুলো
- শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশনের মতে, গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার ১৭ বছর পরও উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সামরিকীকরণ অব্যাহত রয়েছে।
- কৃষি ও শিক্ষাসহ বেসামরিক খাতে সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততা বন্ধ এবং দ্রুত জমি ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কমিশন।
- প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, সামরিক বাহিনীর আগের নিয়ন্ত্রণাধীন জমির ৯০ শতাংশের বেশি ফেরত দেওয়া হয়েছে।
- বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর কাছে নথি চাওয়ার বিরোধিতা করেছেন আইনপ্রণেতা থুরাইরাসা রবিকরন। তাঁর দাবি, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি এখনো সরকারি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
- গবেষণায় নজরদারি, গুম, গণকবর, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং উত্তরাঞ্চলের মুসলমানদের পুনর্বাসনের বিষয়ও এসেছে।
- জবাবদিহি, বেসামরিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে কমিশন।






