ছয় পয়েন্টে পিছিয়ে, তারপর ইতিহাসের পাতায়
২০২৬ সালের ৩০ অক্টোবর কাজাখস্তানের আস্তানায় বিশ্ব কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপে নারীদের ৫৯ কেজি ফাইনালে অ্যাবিগেইল নেটের কাছে ৬-০ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিলেন মনীষা বানওয়ালা। আর মাত্র ২৭ সেকেন্ড বাকি থাকতে ভারতীয় কুস্তিগির সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে ৮-৬-এ এগিয়ে যান। ব্যবধান ধরে রেখে তিনি সিনিয়র পর্যায়ে বিশ্ব কুস্তি শিরোপা জেতা ভারতের প্রথম নারী হন।
সূচিপত্র
হরিয়ানার ২৯ বছর বয়সী বানওয়ালা সিনিয়র বিশ্ব শিরোপা জেতা দ্বিতীয় ভারতীয় কুস্তিগির হিসেবে সুশীল কুমারের সঙ্গে নাম লেখান। ২০১০ সালে পুরুষদের ৬৬ কেজি ফ্রিস্টাইল শিরোপা জিতেছিলেন কুমার। ফলে বানওয়ালার জয়টি ছিল ১৬ বছরে দেশের প্রথম বিশ্ব শিরোপা।
তাঁর সোনা ভারতীয় নারী দলের জন্যও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। ২৯ অক্টোবর ৫০ কেজিতে নীলম সিরোহি এবং ৭৬ কেজিতে কাজল ধোচক রুপা জিতেছিলেন। একই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো তিন ভারতীয় নারী ফাইনালে লড়লেন। ৭২ কেজিতে তনু শর্মা ব্রোঞ্জ জেতায় নারীদের পদকসংখ্যা দাঁড়ায় চারে।
২০২২ সালে মারা যাওয়া বাবা সুরেশ বানওয়ালার ছবি ছাপা একটি সাদা টি-শার্ট পরে জয় উদ্যাপন করেন বানওয়ালা। তিনিই তাঁকে কুস্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং বিশ্ব শিরোপা জেতার স্বপ্ন বাস্তব বলে মনে হওয়ার বহু আগে থেকেই তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষায় সমর্থন জুগিয়েছিলেন।
বানওয়ালার ভাষ্য অনুযায়ী, এশিয়ান গেমসের অভিযান পদক ছাড়াই শেষ হওয়ার পর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতির জন্য তাঁর হাতে ছিল মাত্র ১০ দিন। বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ফিটনেস, ওজন শ্রেণি পরিবর্তনের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত এবং ফাইনালকে পুরো ছয় মিনিটে গড়ানোর পরিকল্পনা মিলেই এই জয়ের পথ তৈরি করে।
যেভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন ফাইনালে
আমেরিকার প্যান আমেরিকান চ্যাম্পিয়ন নেটে শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেন। তিনি বানওয়ালার ডান পায়ে আক্রমণ করেন, ভারতীয় কুস্তিগিরের বাধা সত্ত্বেও ধরন ধরে রাখেন এবং ম্যাটের কিনারার কাছে তাঁকে ছুড়ে ফেলে চার পয়েন্ট পান।
বানওয়ালার বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক সিদ্ধান্তের পর ব্যবধান বেড়ে ৬-০ হওয়ার আগে নেটে ৫-০-তে এগিয়ে যান। প্রতিপক্ষকে প্রতিযোগিতার এলাকার বাইরে ঠেলে দিয়ে এক পয়েন্ট আদায় করেন বানওয়ালা। বিরতিতে তিনি ৬-১ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিলেন।
দ্বিতীয় পর্বে ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। নেটে আবার পায়ে আক্রমণ করলে বানওয়ালা তাঁর পেছনে গিয়ে টেকডাউন করেন। রেফারি আগেই খেলা থামিয়েছিলেন দাবি করে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানায় আমেরিকান কোণ। চ্যালেঞ্জটি ব্যর্থ হওয়ায় বানওয়ালা আরও এক পয়েন্ট পান।
এরপর গাট রেঞ্চ কৌশলে স্কোর ৬-৬ করেন বানওয়ালা। এই কৌশলে প্রতিপক্ষ ম্যাটে থাকলে কুস্তিগির তার কোমরের চারপাশে ধরে তাকে গড়িয়ে দেন, যাতে প্রতিপক্ষের পিঠ উন্মুক্ত হয় এবং পয়েন্ট পাওয়া যায়। সমান স্কোরে কুস্তিগিরদের আলাদা করতে ব্যবহৃত নিয়মে তখনও নেটে এগিয়ে ছিলেন।
বানওয়ালার দরকার ছিল আরও একটি পয়েন্ট পাওয়ার মতো আক্রমণ। দুই পয়েন্টের একটি চাল তাঁকে ২৭ সেকেন্ড বাকি থাকতে ৮-৬-এ এগিয়ে দেয়। ম্যাচের বড় একটা সময় ঘাটতি পুষিয়ে তুলতে ব্যয় করার পর এবার নেটেকে পয়েন্ট পাওয়া থেকে আটকাতে হতো তাঁকে। শেষ পর্যন্ত ব্যবধান ধরে রাখেন তিনি।
বিরতির আগে স্কোর ৬-০ থেকে ৬-১ হয়, এরপর শেষ তিন মিনিটে ৬-১ থেকে ৬-৮। ঘুরে দাঁড়ানোর পথে টানা আট পয়েন্ট পান বানওয়ালা।
পরিকল্পনা ছিল পুরো সময় কাজে লাগানোর
প্রধান কোচ বীরেন্দর দাহিয়া বলেন, ভারতীয় দল নেটের কৌশল বিশ্লেষণ করেছিল এবং ম্যাচের শেষ দিকে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়বেন বলে ধারণা করেছিল। বানওয়ালাকে ম্যাচে টিকে থেকে নিজের সহনশীলতা কাজে লাগাতে হতো, পরিকল্পনাটি ছিল তার ওপর নির্ভরশীল।
পরিকল্পনার পেছনের ভাবনা ব্যাখ্যা করে দাহিয়া বলেন:
আমরা তার কুস্তির ধরন বিশ্লেষণ করেছিলাম। জানতাম পঞ্চম মিনিটে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই ঠিক করেছিলাম, ম্যাচ পুরো ছয় মিনিট চলতে হবে। তা হলে মনীষারই সব সময় সুবিধা থাকত।
দলের আরেকটি লক্ষ্য ছিল বানওয়ালাকে নেটের কাছাকাছি রাখা। দূর থেকে আক্রমণ করতে পছন্দ করেন নেটে। তাই সংস্পর্শ বজায় রাখলে ওই ধরনের আক্রমণের জন্য জায়গা কমে আসবে বলে পরিকল্পনা ছিল।
৩০ সেকেন্ডের বিরতিতে দাহিয়া বানওয়ালাকে মনে করিয়ে দেন, ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তাঁর হাতে তখনও ১৮০ সেকেন্ড রয়েছে। তাঁকে কী বলেছিলেন, তা স্মরণ করে তিনি বলেন:
আমি তাকে বলেছিলাম, কুস্তিতে এক সেকেন্ডেই সব বদলে যেতে পারে, আর ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তোমার হাতে ১৮০ সেকেন্ড আছে।
বানওয়ালা বলেন, তাঁর নিজের কৌশল ছিল ম্যাচ দীর্ঘায়িত করা এবং নেটেকে এমন কুস্তিতে টেনে আনা, যা তাঁর শক্তির সঙ্গে মানানসই। তাঁর ভাষ্য, অনুশীলনে প্রায়ই এমন পরিস্থিতি রাখা হতো যেখানে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে পয়েন্ট পেতে হতো, অথবা অল্প সময়ের জন্য এগিয়ে থাকা ব্যবধান ধরে রাখতে হতো। ফাইনালে দুই দক্ষতারই প্রয়োজন হয়েছিল।
এশিয়ান গেমসের হতাশার পর ঘুরে দাঁড়াতে ১০ দিন
আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে ৫৭ কেজি কোয়ার্টার ফাইনালে জাপানের আকারি ফুজিনামির কাছে ৩-০ ব্যবধানে হেরে আস্তানায় পৌঁছান বানওয়ালা। প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ফুজিনামি পরে সেমিফাইনালেও হেরে যান। ফলে ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায় বানওয়ালার।
রিপেচাজ পদ্ধতিতে, যে কুস্তিগিরের কাছে কেউ হেরেছেন তিনি ফাইনালে উঠলে পরাজিত কুস্তিগিরদের কেউ কেউ ব্রোঞ্জ পদকের লড়াইয়ে ফেরার সুযোগ পান। ফুজিনামি ফাইনালে উঠতে না পারায় এশিয়ান গেমসে বানওয়ালার অভিযান শেষ হয়ে যায়।
বানওয়ালা বলেন, ফলটি হতাশাজনক ছিল, কারণ নিজের কাছ থেকে তিনি আরও ভালো কিছু আশা করেছিলেন। অল্প প্রস্তুতির সময়ে হতাশাকে প্রাধান্য দিতে না দিয়ে তাঁর কোচ অনুশীলন, পুনরুদ্ধার এবং পরবর্তী প্রতিযোগিতায় মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করেন।
বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ৫৭ কেজি থেকে ৫৯ কেজিতে যান তিনি, জাতীয় বাছাইপর্বে জেতেন এবং রোহতকে আবার প্রস্তুতি শুরু করেন। দুই প্রতিযোগিতার মধ্যে সময় কম থাকায় ওজন শ্রেণি বাড়ানোর ফলে সঙ্গে সঙ্গে ওজন কমানোর চাপ কমে যায়।
বিশ্ব প্রতিযোগিতায় তাঁর পথে ছিল কানাডার লরেন্স বিউরগার্ড এবং মঙ্গোলিয়ার বলোরতুয়া খুরেলখুর বিরুদ্ধে জয়। কোয়ার্টার ফাইনালে খুরেলখুরকে ৬-০ ব্যবধানে হারান তিনি। সেমিফাইনালে কাজাখস্তানের আলতিন শাগায়েভার বিরুদ্ধে ১০-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর ফল করে জয় পান।
প্রতিপক্ষের দুই কাঁধ ম্যাটে চেপে ধরে রাখতে পারলে কুস্তির ম্যাচ ফলের মাধ্যমে শেষ হয়। সেমিফাইনালের জয়ে প্রথমবারের মতো সিনিয়র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠেন বানওয়ালা।
বাবার উৎসাহ, ম্যাটেও সঙ্গে
২০২২ সালের এপ্রিলে সুরেশ বানওয়ালা মারা যান। প্রায় একই সময়ে তাঁর মেয়ের প্রথম সিনিয়র এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে মঙ্গোলিয়া যাওয়ার কথা ছিল। বাবার মৃত্যুর পর যাত্রা চালিয়ে যেতে তাঁকে পরিবারের সদস্যদের রাজি করাতে হয়েছিল বলে স্মরণ করেন ভাই রিঙ্কু।
বানওয়ালা মঙ্গোলিয়া যান এবং ব্রোঞ্জ জেতেন। তাঁর মা ও ভাই বলেছেন, তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কতটা কাছাকাছি ছিলেন এবং বাবার হাত ধরে যে খেলায় এসেছিলেন, তা চালিয়ে যেতে পরিবার কীভাবে তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিল।
বাবাকে "ফাদার সাহাব" বলে ডাকেন বানওয়ালা। বাবার মৃত্যু তাঁর ক্রীড়াজীবনের অর্থ কীভাবে বদলে দিয়েছিল, তা তিনি বলেন:
২০২২ সালের আগে আমি নিজের জন্য কুস্তি করতাম। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর সব বদলে যায়। আমি তাঁকে দেখাতে চেয়েছিলাম যে আমি ভালো করছি এবং তাঁকে গর্বিত করব।
চার বছর ধরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপের প্রোফাইল ছবিতে রয়েছে বাবার ছবি। আস্তানায় উদ্যাপনের সময় বাবার ছবি ছাপা টি-শার্ট পরে সেই ব্যক্তিগত স্মৃতিকে সবার সামনে তুলে ধরেন তিনি।
বানওয়ালা বলেন, শুরু করা কাজ শেষ করার যে শিক্ষা বাবা দিয়েছিলেন, তা এখনও তাঁর সংকল্পকে প্রভাবিত করে:
আমার বাবা শিখিয়েছেন, কোনো কাজে জড়াবে না, নয়তো কাজটা পুরোপুরি শেষ করবে। এটা আমার রক্তে আছে।
রিঙ্কুর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যরা ফোনে ফাইনাল দেখেছেন। শোক এবং বারবার খেলাধুলার হতাশার সময়ও যাঁরা তাঁকে সমর্থন করেছেন, সেই পরিবারের সবার জন্য জয়টি ছিল গর্বের এক ভাগ করা মুহূর্ত।
হরিয়ানার হোস্টেল থেকে সিনিয়র দল
বানওয়ালার বাড়ি হরিয়ানার জিন্দ জেলার শিওয়াহা গ্রামের এক কৃষক পরিবারে। ভাই রিঙ্কু কাবাডি খেলতেন, তাঁর খেলা দেখেই বানওয়ালার খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তাঁর ভাবি মমতা সিহাগও একজন কুস্তিগির।
শুরুতে ফিটনেস বাড়ানোর জন্য বাবা তাঁকে হোস্টেলে পাঠান। সিনিয়র কুস্তিগিরদের অনুশীলন দেখা এবং ভারতীয় অ্যাথলেটদের পদক জিততে দেখে ধীরে ধীরে তাঁর লক্ষ্য বদলে যায়: নিজেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করা।
২০১৩ সাল থেকে কুস্তির সঙ্গে তাঁর প্রাথমিক যোগাযোগ, আর খেল স্কুল নিদানিতে প্রশিক্ষণ শুরু ২০১৫ সালে। পরে রোহতকের ছোটু রাম স্টেডিয়ামে তাঁর ক্যারিয়ারের বিকাশ ঘটে। সেখানে তিনি জুনিয়র কোচ হিসেবেও কাজ করেন।
বানওয়ালার ভাষ্য, ২০২০ সালের লকডাউনের পর তাঁর লক্ষ্য আরও সুনির্দিষ্ট হয়। তরুণ কুস্তিগিরদের দ্রুত পরিচিতি এনে দেয় এমন জুনিয়র পর্যায়ের সাফল্য তাঁর ঝুলিতে ছিল না। ২৫ বছর বয়সে ২০২২ সালে তিনি সিনিয়র দলে যোগ দেন।
রোহতকে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন কোচ মানদীপ সাইনি। বানওয়ালার উন্নতির কেন্দ্রে ধারাবাহিক প্রচেষ্টাকে রেখেছেন তিনি:
সে খুব ভালো প্রশিক্ষণ নেয় এবং দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে অনুশীলন করে। এত বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছে, আর এখন জানে যে তাকে নিজের সর্বোচ্চটা দিতে হবে। সেই অঙ্গীকার নিয়েই অনুশীলন করে সে।
ইনস্পায়ার ইনস্টিটিউট অব স্পোর্টের সহায়তা এবং জাপানি কোচ কোসেই আকাশির সঙ্গে কারিগরি অনুশীলনও তাঁর উন্নয়নের অংশ ছিল। নিজের ক্যারিয়ারে সহায়তার জন্য ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনকে কৃতিত্ব দিয়েছেন বানওয়ালা।
পদক ছাড়াই তিনটি বিশ্ব আসর
আস্তানা ছিল সিনিয়র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে বানওয়ালার চতুর্থ অংশগ্রহণ। সাইনির ভাষ্য, ২০২৩ সাল থেকে প্রতি বছরই তিনি অংশ নিয়েছেন, তবে পদকজয়ীদের মঞ্চে উঠতে পারেননি।
এর আগে সবচেয়ে কাছাকাছি সুযোগটি আসে ২০২৪ সালে আলবেনিয়ার তিরানায়। ৬৫ কেজিতে অংশ নিয়ে ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে ওঠেন তিনি, কিন্তু জাপানের মিওয়া মরিকাওয়ার কাছে ৮-২ ব্যবধানে হেরে পঞ্চম হন।
মহাদেশীয় প্রতিযোগিতায় অবশ্য তাঁর রেকর্ড ছিল আরও আশাব্যঞ্জক। ২০২২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত প্রতি বছর সিনিয়র এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিতেছেন তিনি। এর মধ্যে ছিল ২০২৫ সালে আম্মানে ৬২ কেজি শিরোপা।
বিশ্ব সোনা জেতার আগে কয়েকটি মৌসুমে তাঁর অগ্রগতির চিত্র:
- এপ্রিল ২০২২: মঙ্গোলিয়ায় এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে যাওয়ার সময় তাঁর বাবা মারা যান; সেখানে তিনি ব্রোঞ্জ জেতেন।
- ২০২৩: টানা চারটি সিনিয়র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার ধারার সূচনা।
- ২০২৪: তিরানায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ৬৫ কেজির ব্রোঞ্জ লড়াইয়ে হেরে পঞ্চম হন।
- ২০২৫: আম্মানে ৬২ কেজিতে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতেন।
- ২০২৬ এশিয়ান গেমস: ৫৭ কেজি কোয়ার্টার ফাইনালে আকারি ফুজিনামির কাছে হারেন।
- ৩০ অক্টোবর ২০২৬: আস্তানায় অ্যাবিগেইল নেটেকে ৮-৬ ব্যবধানে হারিয়ে ৫৯ কেজি বিশ্ব শিরোপা জেতেন।
তাই এশিয়ায় ধারাবাহিক সাফল্য এবং বিশ্ব পদক জেতার তিনটি ব্যর্থ চেষ্টার পর আসে বিশ্ব শিরোপা। চতুর্থবার অংশ নিয়েই সরাসরি পোডিয়ামের সর্বোচ্চ ধাপে ওঠেন তিনি।
অলিম্পিকের লক্ষ্য ৫৭ কেজিতে কেন
বিশ্ব শিরোপাটি ৫৯ কেজিতে জিতেছেন বানওয়ালা, যে ওজন শ্রেণি অলিম্পিক কুস্তির সূচিতে নেই। ২০২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে তাঁর লক্ষ্য ৫৭ কেজি। এর জন্য আবারও সতর্কভাবে ওজন পরিবর্তন করতে হবে।
৬৫, ৬২, ৫৯ ও ৫৭ কেজি, চারটি শ্রেণিতেই ভারতের হয়ে লড়েছেন তিনি। ওজন শ্রেণি বদলাতে খাবার, ফিটনেস এবং পুনরুদ্ধারের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হয়; একই সঙ্গে কুস্তির জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও সহনশীলতা ধরে রাখতে হয়।
সাইনি বলেন, তাঁর ওজন কমানো কঠিন ছিল। তবে উচ্চতা বেশি ওজনের কিছু শ্রেণিতে কয়েকজন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তাঁকে অসুবিধায় ফেলেছিল। বানওয়ালার ভাষ্য, ওজন নিয়ন্ত্রণ শুধু টুর্নামেন্টের আগে একবারের জন্য করা পরিবর্তন নয়, বরং চলমান পরিকল্পনার অংশ।
ধীরে ধীরে ৫৭ কেজিতে যাওয়ার ইচ্ছা তাঁর। ৫৯ কেজির প্রতিপক্ষদের সঙ্গে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে বলেও মনে করেন তিনি, কারণ তাঁদের কেউ কেউ অলিম্পিকের জায়গার জন্য হালকা ওজন শ্রেণিতে লড়বেন।
পরবর্তী পদক্ষেপের মধ্যে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, প্রো রেসলিং লিগ এবং জাতীয় শিবিরে আরও প্রস্তুতির কথা বলেছেন তিনি। কোন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেবেন, তা ঠিক করবেন কোচ ও সহায়তাকারীরা। স্থায়ীভাবে ৫৭ কেজিতে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো হয়নি।
লস অ্যাঞ্জেলেসে সোনা জেতাই বানওয়ালার লক্ষ্য, তবে তার আগে তাঁকে অলিম্পিকে জায়গা করে নিতে হবে। ২৯ বছর বয়সে তাঁর যুক্তি, বয়সের চেয়ে প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ:
সবকিছুই মনের ওপর নির্ভর করে। খাবার, ঘুম, অভ্যাস এবং সহায়তার ব্যবস্থা ভালো থাকলে তরুণ বা বয়স্ক হওয়ার মধ্যে আসলে কোনো পার্থক্য নেই। বয়স গুরুত্বপূর্ণ নয়, অনুশীলনই গুরুত্বপূর্ণ।
চার পদকজয়ীর ভাগ করা সাফল্য
ভারতের নারীরা জিতেছেন একটি সোনা, দুটি রুপা ও একটি ব্রোঞ্জ। শিরোপা এনে দেন বানওয়ালা; আর সিরোহি, ধোচক ও শর্মা নিশ্চিত করেন, এই অভিযান যেন একজন কুস্তিগিরের সাফল্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে।
২০২১ সালে আনশু মালিক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠেছিলেন, তবে সোনা জিততে পারেননি। আস্তানায় তিন ভারতীয় নারী একসঙ্গে সেই পর্যায়ে পৌঁছান এবং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ করা প্রথম ভারতীয় নারী হন বানওয়ালা।
সিরোহি বলেন, ২০২২ সাল থেকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়েও পদক পাননি। এবার ৫০ কেজিতে রুপা জিতেছেন। শর্মার ৭২ কেজির ব্রোঞ্জ এমন এক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছে, যার শুরু হয়েছিল শুধু ভারতের জার্সি গায়ে জড়ানোর ইচ্ছা থেকে।
আরও ভারতীয় কুস্তিগির তাঁর মতো শীর্ষে পৌঁছাক, তা চান বানওয়ালা। কুস্তির বাইরের অ্যাথলেটদের কাছ থেকেও অনুপ্রেরণা নেন তিনি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, যিনি সীমিত সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করেন বলে তাঁর প্রশংসা করেন বানওয়ালা।
তাঁর ফাইনালেই এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ রয়েছে: বিরতিতে পাঁচ পয়েন্টে পিছিয়ে থাকা অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তিন মিনিট, তারপর বিশ্ব শিরোপা ধরে রাখার জন্য ২৭ সেকেন্ড।
মূল বিষয়
- ২০২৬ সালের ৩০ অক্টোবর আস্তানায় ৫৯ কেজি ফাইনালে অ্যাবিগেইল নেটেকে ৮-৬ ব্যবধানে হারান মনীষা বানওয়ালা।
- ৬-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও ঘুরে দাঁড়ান এবং শেষ ২৭ সেকেন্ড জয়ের ব্যবধান ধরে রাখেন।
- সিনিয়র পর্যায়ে বিশ্ব কুস্তি চ্যাম্পিয়ন হওয়া ভারতের প্রথম নারী এবং সুশীল কুমারের পর দ্বিতীয় সিনিয়র বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হন তিনি।
- ভারতীয় নারীরা চারটি পদক জেতেন: বানওয়ালার সোনা, নীলম সিরোহি ও কাজল ধোচকের রুপা এবং তনু শর্মার ব্রোঞ্জ।
- ২০২২ সালে মারা যাওয়া বাবা সুরেশের ছবি-ছাপা টি-শার্ট পরে জয় উদ্যাপন করেন বানওয়ালা।
- তাঁর পরবর্তী বড় লক্ষ্য ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ৫৭ কেজি শ্রেণি; এর জন্য তাঁকে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।






