৩.৪ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় শর্ত দিল জাকার্তা
ইন্দোনেশিয়া অদূর ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ রপ্তানি করবে না বলেই মনে হচ্ছে—২ নভেম্বর ২০২৬ জাকার্তায় এ কথা বলেন দেশটির জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বালিল লাহাদালিয়া। ২০৩৫ সালের মধ্যে কম কার্বন নিঃসরণকারী উৎস থেকে সিঙ্গাপুরে ৩.৪ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনায় তিনি দামের শর্ত জুড়ে দেন।
সূচিপত্র
ডাউনস্ট্রিমিং ও জ্বালানি রূপান্তরবিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রীর দায়িত্বেও থাকা বালিল বলেন, ইন্দোনেশিয়ার নিজেদেরই এখনো বিদ্যুৎ প্রয়োজন। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে বক্তব্যে তিনি রপ্তানির সম্ভাবনা নাকচ করেননি, তবে বলেছেন, ক্রেতাদের তাঁর সরকারের নির্ধারিত দাম মেনে নিতে হবে।
ইন্দোনেশিয়া প্রতিদিন ৩ কোটি ১০ লাখ স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির বদলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এই সতর্কবার্তা এল। সিঙ্গাপুরের বিদ্যুতের প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে উৎপাদিত হয়। ফলে দুই দেশের সরবরাহ-সম্পর্ক উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎ রপ্তানি ও বিদ্যমান গ্যাস সরবরাহ এই সম্পর্কের দুটি পৃথক দিক। প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নতুন উৎপাদনকেন্দ্র, সঞ্চালন কেবল এবং আরও চুক্তি প্রয়োজন। বাণিজ্যিক চুক্তির আওতায় গ্যাস আগে থেকেই পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়; তবে সরবরাহের শর্ত নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
কোন দামে রপ্তানির পথ খুলবে?
বালিল বলেন, প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ রপ্তানির দাম সরকার হিসাব করেছে। তবে তিনি দামটি প্রকাশ করেননি বা কবে রপ্তানি শুরু হতে পারে, সে তারিখও জানাননি।
প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে মন্ত্রী সম্ভাব্য ক্রেতাদের যে শর্ত পূরণ করতে হবে, তা তুলে ধরেন:
দাম ঠিক থাকলে এবং তারা আমাদের দাম মেনে নিলে, অবশ্যই তা সম্ভব। কিন্তু দাম ঠিক না হলে আমরা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেব।
সেদিন এর আগে জাকার্তায় ২০২৬ সালের খনিজ ও কয়লা সম্মেলন ও প্রদর্শনীতে বালিল বলেছিলেন, ইন্দোনেশিয়ার নিজেদেরই বিদ্যুৎ প্রয়োজন বলে শিগগির বিদ্যুৎ রপ্তানির সম্ভাবনা কম। প্রাসাদে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, গ্রহণযোগ্য দাম হলে চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার এই অবস্থান ১১ মে বালিলের দেওয়া বক্তব্যের ধারাবাহিকতা। তখন তিনি দুই দেশের জন্য ন্যায্য শর্ত ও সুবিধার আহ্বান জানান। জুলাইয়ে তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের দাম নিয়ে আলোচনা চলছে। নভেম্বরের বক্তব্যে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে এসেছে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও সরকারের নির্ধারিত দাম।
রপ্তানির সিদ্ধান্ত কার হাতে?
সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌম বিনিয়োগ সংস্থা দানান্তারার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো ইন্দোনেশিয়ার অংশগ্রহণ তদারকির দায়িত্ব সংস্থাটিকে দিয়েছেন। এর বিনিয়োগের আওতায় রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থা পিএলএনও রয়েছে।
তবে বালিল বলেন, বিদ্যুৎ রপ্তানির অনুমতিপত্র দেওয়ার ক্ষমতা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের। কম দামে ইন্দোনেশিয়ার বিদ্যুৎ কিনতে আগ্রহী দেশগুলোর তদবির প্রত্যাখ্যান করতে তিনি দানান্তারাকে আহ্বান জানান।
খনিজ সম্মেলনে বালিল দায়িত্ব ভাগের বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন:
আমি দানান্তারাকে সতর্ক করেছি, তাদের তদবির করতে দেবেন না। অনুমতিপত্র দেবে ইএসডিএম, দানান্তারা নয়।
ইএসডিএম হলো তাঁর মন্ত্রণালয়ের ইন্দোনেশীয় সংক্ষিপ্ত নাম। দানান্তারা বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক চুক্তির আয়োজন করতে পারে, আর রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়। তাই প্রকল্প নিয়ে আলোচনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ব্যবসায়িক ব্যবস্থা এবং সরকারি অনুমতি—দুটিই প্রয়োজন।
জাকার্তার হিসাব-নিকাশে দেশের শিল্পোন্নয়নও রয়েছে। গলনাগার, শিল্পাঞ্চল ও ডেটা সেন্টারের জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন। সিঙ্গাপুরের কাছের শিল্প ও ডেটা সেন্টারকেন্দ্র বাতাম ইন্দোনেশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি পরিকল্পনা এবং প্রস্তাবিত রপ্তানি নেটওয়ার্ক—দুই ক্ষেত্রেই রয়েছে।
কত বিদ্যুৎ নিয়ে আলোচনা?
২০৩৫ সালের মধ্যে কম কার্বন নিঃসরণকারী উৎস থেকে ৬ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির লক্ষ্য সিঙ্গাপুরের। ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রস্তাবিত ৩.৪ গিগাওয়াট হবে ওই আমদানি লক্ষ্যের প্রায় ৫৭ শতাংশ—এই দুই অঙ্কের ভিত্তিতে হিসাব করলে তা-ই দাঁড়ায়।
গিগাওয়াট দিয়ে বিদ্যুৎক্ষমতা বোঝানো হয়, অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। ইন্দোনেশিয়ার প্রকল্পগুলো সিঙ্গাপুরের পরিকল্পিত আমদানি সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অংশ জোগাবে। সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহের বড় অংশ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের জ্বালানি বাজার কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মোট ২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির জন্য ইন্দোনেশিয়ার পাঁচটি প্রকল্পকে শর্তসাপেক্ষ লাইসেন্স দেয়। আরও ১.৪ গিগাওয়াটের জন্য দুটি প্রকল্প শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন পায়। সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার ছয়টি প্রকল্প শর্তসাপেক্ষ লাইসেন্সের পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
বাণিজ্যিক সরবরাহ শুরু করার আগে প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের আরও অনুমোদন ও চুক্তি প্রয়োজন। পরিকল্পনায় সমুদ্রতলদেশ দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের কেবল রয়েছে। সরবরাহের একাংশ ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের বাতাম, বিনতান ও কারিমুন এলাকা থেকে আসার কথা।
জমি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস সীমিত হওয়ায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সিঙ্গাপুরের জন্য আমদানি আরেকটি উপায় হতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার জন্য প্রকল্পগুলো নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ আনতে পারে। দর-কষাকষির মাধ্যমে ঠিক হবে সুবিধা ও ব্যয় কীভাবে ভাগ হবে।
আলোচনা যেভাবে এ পর্যায়ে এল
বিগত কয়েক বছর ধরে চুক্তি ও নেতাদের বৈঠকের মধ্য দিয়ে ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর বিদ্যুৎ উদ্যোগটি এগিয়ে নিয়েছে। দুই সরকারই উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করার পর বালিলের সর্বশেষ শর্তগুলো এল।
- সেপ্টেম্বর ২০২৪: সিঙ্গাপুর ইন্দোনেশিয়া থেকে ২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির জন্য শর্তসাপেক্ষ লাইসেন্স এবং আরও ১.৪ গিগাওয়াটের জন্য শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন দেয়।
- জুন ২০২৫: বিদ্যুৎ বাণিজ্য, কার্বন ধারণ ও সংরক্ষণ এবং রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জে টেকসই শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়ে দেশ দুটি তিনটি সমঝোতা স্মারক সই করে।
- ১১ মে ২০২৬: বালিল বলেন, বিদ্যুৎ রপ্তানির জন্য উভয় পক্ষের ন্যায্য শর্ত ও সুবিধা প্রয়োজন।
- জুলাই ২০২৬: নেতাদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং ও প্রেসিডেন্ট প্রবোও উদ্যোগটি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বিদ্যুৎ ক্রয়, সঞ্চালন অবকাঠামো ও একটি রোডম্যাপসংক্রান্ত চুক্তি প্রত্যক্ষ করেন।
- ২৪ অক্টোবর ২০২৬: দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইন্দোনেশিয়া সিঙ্গাপুরে পাইপলাইনে গ্যাস রপ্তানি কমাতে শুরু করে।
- ২ নভেম্বর ২০২৬: বালিল বলেন, শিগগির বিদ্যুৎ রপ্তানির সম্ভাবনা কম, তবে ক্রেতারা ইন্দোনেশিয়ার দাম মেনে নিলে তা সম্ভব।
জুলাইয়ের চুক্তিতে বিদ্যুৎ ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত ছিল, অর্থাৎ কোনো প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কেনার অঙ্গীকার। এ ধরনের অঙ্গীকার প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের আয় পরিকল্পনা ও অর্থায়ন পেতে সহায়তা করে। নভেম্বরের বক্তব্যে এসব ব্যবস্থাকে চালু প্রকল্পে রূপ দিতে আরেকটি শর্ত যোগ হয়েছে: রপ্তানির দাম নিয়ে জাকার্তার সঙ্গে সমঝোতা।
গ্যাস কোথায় সরিয়ে নিচ্ছে ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়ার তেল ও গ্যাস খাতের আপস্ট্রিম নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসকেকে মিগাস জানায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশের জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতেই গ্যাস অন্যদিকে সরানো হয়েছে। প্রতিদিন মোট ৩ কোটি ১০ লাখ স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুট গ্যাস এর আওতায় এসেছে; এর মধ্যে নাতুনা থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ এবং সুমাত্রা থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট।
নাতুনার গ্যাস ডব্লিউএনটিএস-পুলাউ পেম্পিং-বাতাম পাইপলাইনে পিএলএন বাতামে পাঠানো হয়। সুমাত্রা থেকে সরবরাহ বাতাম, বিনতান ও সুমাত্রার বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে টিজিআই পাইপলাইনের মাধ্যমে অন্যদিকে পাঠানো হয়।
সিঙ্গাপুরের জ্বালানি বাজার কর্তৃপক্ষ জানায়, আমদানিকারকেরা ১৮ দিন ধরে প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ কোটি ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট গ্যাস সরবরাহ কমানোর বিষয়টি তাদের জানিয়েছে। এটি সিঙ্গাপুরের দৈনিক গ্যাস চাহিদার ২ শতাংশেরও কম। ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট দিয়ে জ্বালানির পরিমাণ বোঝানো হয়, আর ঘনফুট দিয়ে গ্যাসের আয়তন।
বালিলের হিসাবে, কমানো পরিমাণ সংশ্লিষ্ট রপ্তানির প্রায় ৮ শতাংশ। তাঁর বলা শতাংশটি ওই রপ্তানি সরবরাহের হিসাব; সিঙ্গাপুরের হিসাবটি তাদের মোট দৈনিক গ্যাস চাহিদার তুলনায় কমে যাওয়া জ্বালানির পরিমাণ। এই দুই শতাংশ জ্বালানি ব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন অংশ নির্দেশ করে।
ইন্দোনেশিয়ার যেসব এলাকায় সরিয়ে নেওয়া জ্বালানি পৌঁছাচ্ছে, সেখানে তাৎক্ষণিক লক্ষ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি জোগানো। অন্যদিকে, সরবরাহ কমায় সিঙ্গাপুরের বিদ্যমান জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়ছে; প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ আমদানি এখনো ভবিষ্যতে চালু করার জন্য তৈরি হওয়া প্রকল্পের পর্যায়ে।
চুক্তি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য
বালিল বলেন, গ্যাস সরবরাহ কমানো হলেও তা চুক্তির ন্যূনতম শর্তের মধ্যে, যা প্রায় ৯১ থেকে ৯২ শতাংশ। এর পেছনে রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন ও দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা আংশিকভাবে দায়ী বলে তিনি জানান।
চুক্তির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে মন্ত্রী তাঁর ব্যাখ্যা তুলে ধরেন:
আমরা মাত্র প্রায় ৮ শতাংশ কমিয়েছি। ১০ শতাংশ কমালেই কেবল আমরা চুক্তি লঙ্ঘন করতাম।
সিঙ্গাপুরের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, সরবরাহ কমানো চুক্তি লঙ্ঘন কি না, তা যাচাই করতে গ্যাস সাপ্লাই প্রাইভেট লিমিটেড তাদের সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা করবে। ফলে চুক্তির বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
চুক্তি মেনে সরবরাহ করা হবে বলে বালিলের আশ্বাসকে স্বাগত জানিয়েছে মন্ত্রণালয়:
ইন্দোনেশীয় সরবরাহকারীরা তাদের চুক্তি মেনে চলবেন—এই স্পষ্টীকরণকে আমরা স্বাগত জানাই।
প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং ২৫ অক্টোবর বলেছিলেন, সিঙ্গাপুর আশা করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তাদের বাণিজ্যিক অঙ্গীকার মেনে চলবে। পরদিন বালিল জবাবে বলেন, ইন্দোনেশিয়া তার বাধ্যবাধকতা পূরণ করেছে। মতবিরোধটি বিদ্যমান গ্যাস চুক্তিতে কী শর্ত রয়েছে, তা নিয়ে; পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ রপ্তানির শর্ত নিয়ে আলাদা আলোচনা চলছে।
বিরোধে এল এলএনজি বাণিজ্য
সিঙ্গাপুরের কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন বালিল। এলএনজি হলো তরল অবস্থায় রূপান্তরিত গ্যাস, যা জাহাজে পরিবহন করা যায়। ইন্দোনেশিয়া পাইপলাইনের মাধ্যমেও সিঙ্গাপুরে গ্যাস সরবরাহ করে।
২৯ অক্টোবর বালিল বলেন, সিঙ্গাপুরে পাঠানো ১৪৮টি এলএনজি কার্গোর কিছু অন্যত্র বেচে রপ্তানি করা হয়েছে বলে তাঁর ধারণা। কোন চালানগুলো বা ১৪৮টি কার্গো কোন সময়ের, তা তিনি জানাননি। সিঙ্গাপুরে এলএনজি রপ্তানি কমানোর তাৎক্ষণিক কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও তিনি জানান।
৩০ অক্টোবর সিঙ্গাপুরের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জবাবে জানায়, সিঙ্গাপুরভিত্তিক ৫০টিরও বেশি কোম্পানি সারা বিশ্ব থেকে এলএনজি কেনে, বাজারজাত করে ও বাণিজ্য করে। তাদের সরবরাহের উৎসের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া।
এসব কোম্পানি কীভাবে সরবরাহের ব্যবস্থা করে, তা ব্যাখ্যা করে মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন:
সিঙ্গাপুরভিত্তিক ব্যবসায়ীরা কার্গোসংক্রান্ত বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নিলেও, এলএনজি কার্গো সাধারণত উৎসদেশ থেকে সরাসরি গন্তব্যদেশে যায় এবং সশরীরে সিঙ্গাপুরের ভেতর দিয়ে চলাচল করে না।
মন্ত্রণালয় জানায়, পাইপলাইনে আমদানি করা ইন্দোনেশীয় গ্যাস দেশের ভেতরেই ব্যবহার করা হয়, রপ্তানি করা হয় না। এলএনজি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে সিঙ্গাপুরের ভূমিকার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে কেনাবেচার ব্যবস্থা করা। জাহাজ সাধারণত উৎপাদনকারী দেশ থেকে সরাসরি চূড়ান্ত ক্রেতার কাছে যায়।
২ নভেম্বর বালিল আবার বাণিজ্যের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ইন্দোনেশিয়ার সম্পদ মধ্যবর্তী দেশের মাধ্যমে নয়, সরাসরি গন্তব্যদেশে রপ্তানি করা উচিত। তাঁর উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল, ইন্দোনেশিয়ার সম্পদ বেচাকেনার বাণিজ্যিক সুবিধা কারা পায়।
মতবিরোধ সত্ত্বেও সহযোগিতা চলছে
২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর জাকার্তা সফরের সময় ঘরোয়া চাহিদা ও জ্বালানি সহযোগিতার ভারসাম্য নিয়ে কথা বলেন সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণন। তিনি বলেন, জনগণের জন্য অত্যাবশ্যক সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি চুক্তি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে, অবকাঠামো সম্প্রসারণ করতে এবং বৃহত্তর পরিসরের সুবিধায় ব্যয় কমাতে পারে।
দুটি লক্ষ্যকে পরস্পরবিরোধী নয় বলে বর্ণনা করেন বালাকৃষ্ণন:
একসঙ্গে কাজ করা এবং নিজেদের চাহিদা পূরণ করা—এ দুটির যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে, এমন নয়। বিষয়টি দ্বিমুখীও নয়।
ইন্দোনেশিয়ার বিনিয়োগমন্ত্রী রোসান রোসলানি ২৯ অক্টোবর বলেন, গ্যাস ও ধোঁয়াশা নিয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের অঙ্গীকার অটুট রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে সিঙ্গাপুর ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের উৎস। ২০২৫ সালে দেশটির বিনিয়োগের পরিমাণ ১৭৪০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছায়।
ইন্দোনেশিয়ার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং ইন্দোনেশীয় নিয়োগকর্তা সমিতির চেয়ারম্যান শিনতা কামদানি বলেন, বাস্তব অর্থনীতিতে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ আগ্রহ কমতে দেখেননি তিনি। তবে উত্তেজনা আর্থিক বাজারের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে বলেও জানান।
বালাকৃষ্ণনের সফরের সময় দুই সরকার ধোঁয়াশা নিয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠনে সম্মত হয়। এর লক্ষ্য তথ্য ভাগাভাগি এবং আইন প্রয়োগে সমন্বয়। ওই চুক্তি ও চলমান বিনিয়োগ আলোচনা দেখায়, জ্বালানি নিয়ে মতবিরোধের পাশাপাশি সহযোগিতাও এগোচ্ছে।
এই বিদ্যুৎ উদ্যোগটি অঞ্চলটির বিদ্যুৎব্যবস্থাগুলোকে যুক্ত করার বৃহত্তর আসিয়ান পাওয়ার গ্রিড প্রচেষ্টার অংশ। এর পরবর্তী বাস্তব পদক্ষেপ নির্ভর করছে দাম, অনুমতিপত্র ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থার ওপর। অন্যদিকে, বিদ্যমান গ্যাস সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরবরাহকারী ও ক্রেতাদের চুক্তির সরবরাহ-শর্ত নিয়ে সমাধানে পৌঁছাতে হবে।
মূল বিষয়গুলো
- ইন্দোনেশিয়া বলছে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ চাহিদাই অগ্রাধিকার পাবে; ক্রেতারা তাদের দাম মেনে নিলে রপ্তানি সম্ভব।
- ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রস্তাবিত ৩.৪ গিগাওয়াট সরবরাহ ২০৩৫ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের ৬ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি লক্ষ্যের প্রায় ৫৭ শতাংশ।
- ইন্দোনেশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় রপ্তানির অনুমতিপত্র দেয়; বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সমন্বয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে দানান্তারা।
- ইন্দোনেশিয়া প্রতিদিন ৩ কোটি ১০ লাখ স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুট গ্যাস দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরিয়ে নিয়েছে।
- সিঙ্গাপুরের হিসাবে, অবহিত করা গ্যাস সরবরাহ হ্রাস তাদের দৈনিক গ্যাস চাহিদার ২ শতাংশেরও কম।
- গ্যাস সরবরাহ কমানো চুক্তি অনুযায়ী কি না, সে মূল্যায়ন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি; তবে দুই দেশের বিনিয়োগ ও জ্বালানিবিষয়ক আলোচনা চলছে।






