কয়েক সপ্তাহে ১১ ট্রিলিয়ন রুপি থেকে ৪৬২ বিলিয়ন রুপিতে
রুপিকে রক্ষায় রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) তারল্য সহায়তা সীমিত করায় ভারতীয় ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত নগদ অর্থ সেপ্টেম্বরের শুরুতে ১১ ট্রিলিয়ন রুপি থেকে কমে ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর ৪৬২ বিলিয়ন রুপিতে নেমেছে। ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের একটি সূচকে মাপা এই পতন প্রায় ৯৬ শতাংশ। ফলে লেনদেন মেটানো ও কার্যক্রম পরিচালনার অর্থ জোগাতে ঋণদাতাদের হাতে অনেক ছোট একটি সুরক্ষা-তহবিল রয়েছে।
সূচিপত্র
- কয়েক সপ্তাহে ১১ ট্রিলিয়ন রুপি থেকে ৪৬২ বিলিয়ন রুপিতে
- নগদ অর্থ কম থাকলে রুপিকে রক্ষা করা যায় কেন
- কর পরিশোধ ও নগদ উত্তোলনে চাপ বাড়ছে
- ব্যাংক কত চেয়েছে, কত পেয়েছে
- আরেক দফা রেপো হার না বাড়লেও ঋণের খরচ বাড়ছে
- অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের তহবিল সংগ্রহ ব্যয়বহুল হচ্ছে
- সরকারি ঋণপত্রের নিলামে চাপের চিত্র
- তেলের দামে আরবিআইয়ের সিদ্ধান্ত আরও জটিল
- নগদ সংকোচন কীভাবে কমতে পারে?
- মূল বিষয়গুলো
চাপ এখন ব্যাংক খাতের বাইরেও ছড়াচ্ছে। রাতারাতি ঋণের খরচ আরবিআইয়ের ৫.৫ শতাংশ নীতি রেপো হারের ওপরে উঠেছে, নতুন ব্যাংক সার্টিফিকেট অব ডিপোজিটের সুদ সাত মাসের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে এবং কিছু ব্যাংকবহির্ভূত ঋণদাতাকে অর্থ জোগাড়ে বেশি খরচ দিতে হচ্ছে। সরকারি ঋণপত্রের নিলামেও সরকার দুর্বল চাহিদা ও বেশি ঋণ নেওয়ার খরচের মুখে পড়েছে।
আরবিআই ২৬ অক্টোবর ১.৫ ট্রিলিয়ন রুপিসহ অস্থায়ী তহবিল জুগিয়েছে, তবে ব্যাংকগুলোর চাহিদার তুলনায় বারবার কম অর্থ দিয়েছে। আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাংক ও এমকে গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসের বিশ্লেষকদের ধারণা, সীমিত সহায়তা রুপির দরপতনের বিরুদ্ধে বাজি ধরতে নিরুৎসাহিত করার প্রচেষ্টার অংশ। তাই কঠোর পরিস্থিতি বজায় থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পরস্পরবিরোধী চাপের মুখে: রুপি ধার করা ব্যয়বহুল করলে মুদ্রাকে সমর্থন দেওয়া যায়, তবে একই সংকোচনে ব্যাংক, অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারের তহবিল সংগ্রহের খরচ বাড়ে।
নগদ অর্থ কম থাকলে রুপিকে রক্ষা করা যায় কেন
অক্টোবরের শুরুর দিকে রুপির দর রেকর্ড সর্বনিম্নের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। এরপর রুপিকে সমর্থন দিতে আরবিআই বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এর একটি প্রক্রিয়া সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে কাজ করে: কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করে রুপি নিলে, অন্য কোনো কার্যক্রমের মাধ্যমে সেই অর্থ আবার ব্যবস্থায় না ফেরানো পর্যন্ত প্রচলন থেকে রুপি তুলে নেওয়া হয়।
রুপির দর আরও কমবে বলে ধারণা করা কোনো ব্যবসায়ী রুপি ধার করে তা দিয়ে ডলার কিনতে পারেন। রুপি ধার করার খরচ বাড়লে এ অবস্থান ধরে রাখা আরও ব্যয়বহুল হয়। মুদ্রার আরও দরপতনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নেওয়ার খরচও বাড়তে পারে।
এমকে গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মাধবী অরোরা তারল্য সংকোচনকে একটি সচেতন সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন:
এই কড়াকড়ি ইচ্ছাকৃত বলেই মনে হচ্ছে,
অরোরা বলেন, রুপির দরপতনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নেওয়া এবং মুদ্রার বিপরীতে বাজি ধরা—দুটিরই খরচ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আরবিআই পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তার এই মূল্যায়ন ব্যাখ্যা করে, কেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক লেনদেন সচল রাখার মতো অর্থ দিতে পারে, কিন্তু সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বড় উদ্বৃত্ত আবার ফিরিয়ে না-ও দিতে পারে।
আরবিআই গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা বলেছেন, কখনো কখনো আর্থিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি মোকাবিলায় মুদ্রানীতি ব্যবহার করা যায়। সুদের হার মুদ্রা রক্ষার হাতিয়ারের অংশ হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সুদহার নির্ধারণ কমিটি বিষয়টি "নিশ্চয়ই বিবেচনা করে"। বর্তমান তারল্য সংকোচন কত দিন চলবে, তা ঘোষণা করা হয়নি।
কর পরিশোধ ও নগদ উত্তোলনে চাপ বাড়ছে
পণ্য ও পরিষেবা করের (জিএসটি) অর্থ পরিশোধ, দীপাবলির আগে নগদ উত্তোলন এবং দৈনিক নগদ রিজার্ভের কঠোরতর শর্তও ব্যাংকগুলোর ব্যবহারযোগ্য তহবিল কমিয়েছে। কর পরিশোধের অর্থ গ্রাহকের হিসাব থেকে সরকারি হিসাবে যায়; আর নগদ উত্তোলনে ব্যাংকের আমানত পরিবারের ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা নগদ মুদ্রায় রূপ নেয়।
বেশি রিজার্ভের শর্তে অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য ব্যাংকগুলোর হাতে কম নগদ থাকে। কঠোরতর দৈনিক শর্ত ১৬ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে। মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ ও মৌসুমি অর্থ পরিশোধের সঙ্গে ব্যাংকগুলো যখন আগে থেকেই খাপ খাইয়ে নিচ্ছিল, তখন এটি আরও একটি অর্থের উৎস কমিয়েছে।
আইসিআইসিআই ব্যাংকের হিসাবে, ২৩ অক্টোবর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত ছিল ৫০০ বিলিয়ন রুপি, যা নিট চাহিদা ও মেয়াদি দায়ের ০.২ শতাংশের সমান। এই পরিমাপে ব্যাংক আমানত ও নির্দিষ্ট কিছু অন্যান্য দায় অন্তর্ভুক্ত। দায়ের তুলনায় এত সামান্য উদ্বৃত্ত থাকলে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া পরিশোধের চাহিদা সামাল দেওয়ার সুযোগ কমে যায়।
এই উল্টে যাওয়ার আগে নগদ অর্থের প্রাচুর্য ছিল, যার একটি কারণ ছিল আরবিআইয়ের সঙ্গে প্রবাসী অনাবাসী ভারতীয়দের বৈদেশিক মুদ্রা আমানতের বিনিময়-চুক্তি। এ ধরনের চুক্তিতে পরে লেনদেনটি ফিরিয়ে নেওয়ার সমঝোতায় মুদ্রা বিনিময় করা হয়। আরবিআইয়ের তারল্য সমন্বয় ব্যবস্থার আওতায় দৈনিক নিট অর্থ শোষণের গড় পরিমাণ জুলাইয়ের ১.২ ট্রিলিয়ন রুপি থেকে আগস্টে ৫.৮ ট্রিলিয়ন রুপিতে উঠেছিল। সে সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত অর্থ তুলে নিচ্ছিল।
ব্যাংক কত চেয়েছে, কত পেয়েছে
অস্থায়ী নগদ অর্থ জোগাতে আরবিআই পরিবর্তনশীল সুদহারের রেপো নিলাম ব্যবহার করেছে। এসব কার্যক্রমে ব্যাংকগুলো জামানত হিসেবে গ্রহণযোগ্য সিকিউরিটিজ জমা রেখে তহবিলের জন্য দর হাঁকে; নিলামের মাধ্যমে ঋণের সুদহার নির্ধারিত হয়। কার্যক্রমের মেয়াদ শেষে অর্থ ফেরত দিতে হয়।
অক্টোবরের নিলামের ফল দেখায়, চাহিদা বারবার সরবরাহ করা অর্থের পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে:
- ১৪ অক্টোবর: আন্তঃব্যাংক কল রেট টানা সময়ের জন্য ৫.৫ শতাংশ রেপো হারের ওপরে থাকতে শুরু করে।
- ১৬ অক্টোবর: দৈনিক নগদ রিজার্ভের কঠোরতর শর্ত কার্যকর হয়।
- ১৯ অক্টোবর: ব্যাংকগুলো প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন রুপি চায় এবং ১ ট্রিলিয়ন রুপি পায়।
- ২২ অক্টোবর: ব্যাংকগুলো ১.৬২ ট্রিলিয়ন রুপি চায় এবং ৫০০ বিলিয়ন রুপি পায়।
- ২৬ অক্টোবর: ব্যাংকগুলো ১.৮৬ ট্রিলিয়ন রুপি চায় এবং ১.৫ ট্রিলিয়ন রুপি পায়। নগদ উদ্বৃত্ত ছিল ৪৬২ বিলিয়ন রুপি।
২২ অক্টোবর ব্যাংকগুলোর চাওয়া অর্থের প্রায় ৩১ শতাংশ জুগিয়েছিল আরবিআই। ২৬ অক্টোবর তা বেড়ে প্রায় ৮১ শতাংশে দাঁড়ায়। এতে বেশি স্বস্তি মিললেও ৩৬০ বিলিয়ন রুপির দর অনুদান পায়নি। এ সময়ে উল্লেখ করা সহায়তার সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল ১.৫ ট্রিলিয়ন রুপি।
১ ট্রিলিয়ন রুপির সাত দিনের একটি রেপো কার্যক্রমও ব্যাংকগুলোকে অস্থায়ী তহবিল জুগিয়েছে। আইসিআইসিআই ব্যাংক আরও তারল্য কার্যক্রমের প্রত্যাশা করছে। তবে অস্থায়ী অর্থায়নের মেয়াদ শেষ হয়, তাই নগদ সংকট অব্যাহত থাকলে অর্থ ফেরত দিতে বা বিকল্প তহবিল জোগাড় করতে হয়।
আরেক দফা রেপো হার না বাড়লেও ঋণের খরচ বাড়ছে
আন্তঃব্যাংক কল রেট, অর্থাৎ ব্যাংকগুলো একে অপরের কাছ থেকে রাতারাতি ঋণ নিতে যে খরচ দেয়, এই সময়ে তা ৫.৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৫.৯ শতাংশ হয়েছে। ৫.৯ শতাংশে এই হার আরবিআইয়ের ৫.৫ শতাংশ রেপো হারের চেয়ে ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
অক্টোবরের শুরুতে আরবিআই রেপো হার বাড়িয়ে ৫.৫ শতাংশ করেছিল এবং নীতিগত অবস্থানকে ধাপে ধাপে কঠোর করার পর্যায়ে নিয়েছিল। এতে আরও কঠোর করার প্রস্তুতির ইঙ্গিত ছিল। এরপর বাজারে সুদের হার বেড়ে যাওয়া দেখায়, আনুষ্ঠানিক নীতি সিদ্ধান্তের মাঝের সময়েও ঋণ নেওয়ার শর্ত কঠোর হতে পারে।
রেপো হার নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুদহার, তবে ব্যাংকগুলোর সেই হারে তহবিল পাওয়াও দরকার। নগদ অর্থ কম থাকলে এবং নিলামে চাহিদার চেয়ে কম তহবিল বরাদ্দ হলে ঋণদাতারা বাজারে বেশি খরচ দিতে পারে। এভাবেই তারল্য ব্যবস্থাপনার কারণে রেপো হার আবার বাড়ানোর ঘোষণা ছাড়াই অর্থের দাম বাড়তে পারে।
সাপ্তাহিক গড়ে কয়েকটি বাজারেই চাপ দেখা যায়। কল রেট ৫.৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.৭০ শতাংশ হয়েছে, বাজার রেপো রেট ৫.৩৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.৬৬ শতাংশ হয়েছে, আর ট্রাইপার্টি রেপো রেট ৫.৫৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে। রেপো লেনদেনে সিকিউরিটিজের বিপরীতে ঋণ নেওয়া হয়; ট্রাইপার্টি রেপোতে একজন মধ্যস্থতাকারী জামানত ও নিষ্পত্তি পরিচালনা করেন।
এসব বৃদ্ধিতে রাতারাতি সুদের হার আরবিআইয়ের নীতি সুদহারের করিডরের ওপরের সীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাতারাতি তহবিল শোষণ করতে যে হার দেয় এবং জরুরি রাতারাতি ঋণসুবিধায় যে হার নেয়, করিডরটি সেই দুই হারের মধ্যবর্তী সীমা।
অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের তহবিল সংগ্রহ ব্যয়বহুল হচ্ছে
তিন ও ছয় মাসে মেয়াদপূর্তির নতুন সার্টিফিকেট অব ডিপোজিটের সুদ আগের সপ্তাহে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে সাত মাসের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। সার্টিফিকেট অব ডিপোজিটের মাধ্যমে ব্যাংক নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য অর্থ ধার নিতে পারে। এক বেসিস পয়েন্ট এক শতাংশ পয়েন্টের একশ ভাগের এক ভাগ; অর্থাৎ ৫০ বেসিস পয়েন্ট সমান অর্ধেক শতাংশ পয়েন্ট।
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বেশি খরচ দিতে হচ্ছে। তাদের বাণিজ্যিক পত্রের ইল্ড অক্টোবরের মাঝামাঝি প্রায় ৭.৮৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৮.৪ শতাংশ হয়েছে, অর্থাৎ ৫৫ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। বাণিজ্যিক পত্র হলো ব্যাংকের প্রচলিত ঋণের বদলে কোম্পানির নেওয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণ।
তহবিল সংগ্রহের খরচ বাড়লে অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় চাপ পড়তে পারে, অথবা নতুন ঋণ দেওয়ার সময় তারা বেশি সুদ নিতে পারে। ঋণগ্রহীতাদের ওপর প্রভাব নির্ভর করে ঋণদাতা, ঋণচুক্তি এবং নতুন তহবিলের খরচ ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্তে কত দ্রুত প্রতিফলিত হয় তার ওপর।
ব্যাংকবহির্ভূত ঋণদাতা ক্যাপ্রি গ্লোবাল ক্যাপিটালের নির্বাহী পরিচালক অজয় মাংলুনিয়া বলেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও তেলের দাম বিনিয়োগকারীদের চাহিদাকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে:
এখন থেকে সুদের হার কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে অনেক অনিশ্চয়তা আছে। তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এমন থাকলে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম ধীরে ধীরে বাড়লে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগে বাড়তি মুনাফা চাইবেন,
মাংলুনিয়া আরও বলেন:
ঋণ নেওয়ার খরচের বক্ররেখা আরও খাড়া হতে পারে।
এর মানে, দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দেওয়ার জন্য বিনিয়োগকারীরা বাড়তি মুনাফা চাইতে পারেন। বিভিন্ন মেয়াদে ওভারনাইট ইনডেক্সড সোয়াপের হারও প্রায় ৩০ থেকে ৬০ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। এসব চুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট সুদহারের বিনিময়ে রাতারাতি সুদহারের সঙ্গে যুক্ত হার দেওয়া হয়। ফলে সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশা বদলালে তা বোঝার জন্য এগুলো কার্যকর সূচক।
সরকারি ঋণপত্রের নিলামে চাপের চিত্র
৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিনে মেয়াদপূর্তির সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ২৩০ বিলিয়ন রুপি তোলার লক্ষ্যে করা ট্রেজারি বিলের নিলামে সব দর বাতিল করেছে আরবিআই। বিনিয়োগকারীরা যে ঋণহার চাইছিলেন, তা নিয়ে অস্বস্তি থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেছেন ডিলাররা।
ট্রেজারি বিলের ইল্ড এরই মধ্যে দ্রুত বেড়েছিল। ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে ৯১ দিনে মেয়াদপূর্তির বিলের ইল্ড ৬৪ বেসিস পয়েন্ট, ১৮২ দিনের বিলের ৮৩ বেসিস পয়েন্ট এবং ৩৬৪ দিনের বিলের ৬৯ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে।
এর আগের নিলামে সংশ্লিষ্ট ইল্ড ছিল যথাক্রমে ৫.৭৩, ৬.২৯ ও ৬.৪৯ শতাংশ। ৩৬৪ দিনের বিলের ইল্ড ৫.৫ শতাংশ রেপো হারের চেয়ে ৯৯ বেসিস পয়েন্ট বেশি ছিল, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যবধান।
দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণপত্রেও চাপ পড়েছে। ১০ বছরে মেয়াদপূর্তির বেঞ্চমার্ক সরকারি বন্ডের দর আগের সেশনের ৭.৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭.৪৪ শতাংশে বন্ধ হয়েছে, যা ২০২২ সালের ৪ নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ। বন্ডের দাম কমলে ইল্ড বাড়ে, অর্থাৎ ক্রেতারা বেশি মুনাফা দাবি করেন।
সরকারি সিকিউরিটিজের একটি নিলামে আইসিআইসিআই ব্যাংকের হিসাবে গড় ঋণ নেওয়ার খরচ ছিল ৭.৬০ শতাংশ, যা ২০ বেসিস পয়েন্ট বেশি। প্রস্তাবিত অর্থের ১.৯ গুণ দর জমা পড়েছিল, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি গড় ২.৮ গুণ। এই কম অনুপাত নিলামে চাহিদার সুরক্ষা-ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
তেলের দামে আরবিআইয়ের সিদ্ধান্ত আরও জটিল
এই সময়ে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০-১০৫ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা তহবিল সংকোচনের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির উদ্বেগও বাড়িয়েছে। ভারত বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে। ফলে ডলারে দাম বাড়লে আমদানি খরচ ও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়তে পারে।
রুপির দর কমলে স্থানীয় মুদ্রায় ওই আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়। মুদ্রার ওপর চাপ ও তেলের দাম বৃদ্ধি এভাবে পরস্পরের প্রভাব বাড়াতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেশীয় তহবিলের শর্ত শিথিল করা আরবিআইয়ের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
আইসিআইসিআই ব্যাংকের ধারণা, কাছাকাছি সময়ে বেঞ্চমার্ক সরকারি বন্ডের ইল্ড ৭.৪০ থেকে ৭.৬০ শতাংশের মধ্যে থাকবে। ডিসেম্বরে রেপো হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়তে পারে—এমন বাজার প্রত্যাশাও বেড়েছে। তবে এটি বাজারের প্রত্যাশা, ঘোষিত সিদ্ধান্ত নয়।
নগদ সংকোচন কীভাবে কমতে পারে?
অক্টোবরের শেষ দিকে সরকারি ব্যয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের হাতে অর্থ ফিরিয়ে দিতে পারে। কর আদায়ে অর্থ তুলে নেওয়ার পর এতে আমানত ও ব্যাংকের তারল্য বাড়তে পারে। ৩৫৪ বিলিয়ন রুপির সরকারি সিকিউরিটিজেরও মেয়াদপূর্তি হওয়ার কথা ছিল, যা সেগুলোর মালিকদের হাতে নগদ অর্থ ছেড়ে দিতে পারে।
এসব অর্থপ্রবাহ রাতারাতি সুদের হারের চাপ কমাতে পারে। আরবিআইয়ের আরও রেপো কার্যক্রমও অস্থায়ী স্বস্তি দিতে পারে। অন্যদিকে ডলার বিক্রি অব্যাহত থাকা, নগদ অর্থের চাহিদা কিংবা রিজার্ভের শর্ত চাপ আরও বাড়াবে।
বিনিয়োগকারীরা ওই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংক অব জাপানের নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তথ্যও পর্যবেক্ষণ করছিলেন। বিদেশে সুদের হারের পরিবর্তন মুদ্রাবাজারের লেনদেন এবং ভারতীয় ঋণপত্রে বিনিয়োগকারীদের চাওয়া মুনাফাকে প্রভাবিত করতে পারে।
দেশীয় ঋণগ্রহীতাদের জন্য তাৎক্ষণিক বিষয় হলো, মেয়াদপূর্তির তহবিলের বদলে ব্যাংক ও অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানকে কত খরচে নতুন তহবিল জোগাড় করতে হচ্ছে। অক্টোবরের পরিসংখ্যান দেখায়, নীতি সুদহারে আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন না হলেও রুপিকে রক্ষার খরচ ভারতের অর্থ ও বন্ড বাজারে ইতিমধ্যে পড়ছে।
মূল বিষয়গুলো
- সেপ্টেম্বরের শুরুতে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত নগদ অর্থ ১১ ট্রিলিয়ন রুপি থেকে ২৬ অক্টোবর ৪৬২ বিলিয়ন রুপিতে নেমেছে, অর্থাৎ প্রায় ৯৬ শতাংশ কমেছে।
- মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ, কর, নগদ উত্তোলন ও রিজার্ভের শর্তে নগদ অর্থ কমেছে; আরবিআই বারবার ব্যাংকগুলোর চাহিদার চেয়ে কম অস্থায়ী তহবিল জুগিয়েছে।
- আন্তঃব্যাংক কল রেট প্রায় ৫.৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ৫.৫ শতাংশ রেপো হারের ওপরে।
- ব্যাংকের সার্টিফিকেট অব ডিপোজিটের সুদ ও ব্যাংকবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক পত্রের ইল্ড বেড়েছে, ফলে তহবিল সংগ্রহের খরচ বাড়ছে।
- সরকারি ঋণ নেওয়ার হার বাড়ার মধ্যে ২৩০ বিলিয়ন রুপির ট্রেজারি বিল নিলামে সব দর বাতিল করেছে আরবিআই।
- সরকারি ব্যয় ও মেয়াদপূর্তির সিকিউরিটিজ স্বস্তি দিতে পারে, অন্যদিকে তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি ও রুপির ওপর চাপ বাড়বে।






