ক্রেমলিন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী উমর ক্রেমলেভের সঙ্গে মঙ্গোলিয়ায় দুই দিন শিকার করেন ট্রাম্প জুনিয়র

পড়তে 9 মিনিট
Trump Jr. Spent Two Days Hunting in Mongolia With Kremlin Linked Businessman Umar Kremlev

রাজনৈতিক যোগাযোগসহ দুর্গম অঞ্চলে শিকারযাত্রা

ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ২০২৬ সালের আগস্টে রুশ ব্যবসায়ী উমর ক্রেমলেভের সঙ্গে পশ্চিম মঙ্গোলিয়ার একটি শিকারশিবিরে দুই দিন কাটান। ওই সফরে তিনি মঙ্গোলিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এ সময় সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টদের হোটেলকক্ষের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি খাতায় ১৮,৭১৫ ডলার ব্যয়ের তথ্যও নথিভুক্ত হয়।

সূচিপত্র
  1. রাজনৈতিক যোগাযোগসহ দুর্গম অঞ্চলে শিকারযাত্রা
  2. দুজন কীভাবে শিবিরে পৌঁছালেন
  3. ভিডিওতে অভিযান দেখা গেলেও দুজনকে একসঙ্গে দেখা যায়নি
  4. দুর্লভ ভেড়া শিকার ও আরও এক সপ্তাহের অভিযান
  5. সরকারের ১৮,৭১৫ ডলারের ব্যয়ে কী ছিল
  6. ক্রেমলেভের রুশ যোগাযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ
  7. মঙ্গোলিয়া সফরের আগের বন্ধুত্ব
  8. বিয়ের খরচ নিয়ে কংগ্রেসের নজরদারি
  9. প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক, বর্ণনা ভিন্ন
  10. নিরাপত্তা উদ্বেগের কেন্দ্রে যোগাযোগের সুযোগ
  11. মূল তথ্য

আন্তর্জাতিক বক্সিং অ্যাসোসিয়েশনের (আইবিএ) সভাপতি ক্রেমলেভ ২৭ আগস্ট কাজাখস্তান থেকে চার্টার বিমানে উলানবাটরে আসেন। এরপর তিনি উভস প্রদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বড় ছেলে ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে যোগ দেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ভসখোদ নামের একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিলের অংশীদার আর্থার মার্তিরোসভ। তহবিলটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।

এই সাক্ষাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের একজন সদস্যের সঙ্গে এমন এক ব্যবসায়ীর যোগসূত্র তৈরি হয়, যাঁর যোগাযোগ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নিরাপত্তাবলয় পর্যন্ত বিস্তৃত। এর আগে বাহামাসে বিয়ের অনুষ্ঠান ঘিরে উৎসব হয়েছিল, যার জন্য ক্রেমলেভ কয়েক লাখ ডলার দিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে দ্বীপ ভাড়া ও আতশবাজির খরচও ছিল।

ট্রাম্প জুনিয়রের প্রতিনিধি বলেন, দুজন ব্যক্তিগত বন্ধু, তাঁদের মধ্যে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই। শিকারিদের মহলে এক অভিন্ন পরিচিতির মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

গাইড ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ফ্লাইটের নথি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও এবং সরকারি ব্যয়ের নথি অনুসরণ করে করা এক অনুসন্ধানের মাধ্যমে ২৭ অক্টোবর মঙ্গোলিয়া সফরের কথা প্রকাশ্যে আসে। এর বিবরণে তিনটি বিষয় উঠে এসেছে: ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব, প্রেসিডেন্টের পরিবারের একজন সদস্যের নিরাপত্তায় সরকারি ব্যয় এবং জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ।

ক্রেমলেভ চলে যাওয়ার পর ট্রাম্প জুনিয়র পশ্চিম মঙ্গোলিয়ায় আরও প্রায় এক সপ্তাহ শিকার চালিয়ে যান। পরে তিনি রাজধানীতে ফিরে প্রেসিডেন্ট উখনাগিন খুরেলসুখের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধিরা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা দেন।

বিজ্ঞাপন

দুজন কীভাবে শিবিরে পৌঁছালেন

আগস্টের শেষ দিকে ট্রাম্প জুনিয়র উলানবাটরে যান, এরপর কয়েক শ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে উভস প্রদেশের একটি শিবিরে পৌঁছান। তাঁর আগের আন্তর্জাতিক শিকার সফরের সঙ্গী এবং দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান দাতা কেভিন স্মলসহ ছোট দলটির সহায়তায় ছিলেন গাইড, চালক ও রাঁধুনিরা।

ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে মঙ্গোলিয়ায় শিকার সফরে যাওয়ার একটি সুযোগ দাতব্য নিলামের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল। নিলামে বিজয়ী একজন পাহাড়ি ভেড়া শিকারে অভিযানে যোগ দেন। ক্রেমলেভ ওই নিলামে অংশ না নিয়েই দলে যোগ দেন।

২৭ আগস্ট কাজাখস্তানে আইবিএর সংবাদ সম্মেলন থেকে রওনা দিয়ে রাতভর চার্টার ফ্লাইটে মঙ্গোলিয়ায় যান ক্রেমলেভ। এরপর তিনি ও মার্তিরোসভ শিবিরে পৌঁছান। সেখানে ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে দুই দিন কাটিয়ে উলানবাটরে ফিরে যান ক্রেমলেভ।

সফরের ধারাবাহিকতা ও পরে তা প্রকাশ্যে আসার ঘটনাক্রম ছিল:

  • ২৩ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর: মঙ্গোলিয়ায় সিক্রেট সার্ভিসের একটি অনির্দিষ্ট “সফর”-এর হোটেল খরচের তথ্য সরকারি ব্যয়ের নথিতে ছিল।
  • ২৭ আগস্ট: শিকারি দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আগে ক্রেমলেভ কাজাখস্তান থেকে উলানবাটরে যান।
  • ৩০ আগস্ট: ক্রেমলেভ যাত্রাসংশ্লিষ্ট দুটি ভিডিও টেলিগ্রামে পোস্ট করেন।
  • শিবিরে দুই দিন কাটানোর পর: ক্রেমলেভ রাজধানীতে ফিরে যান, এরপর বক্সিংয়ের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ইয়াকুতস্কে যান।
  • সেপ্টেম্বর: ট্রাম্প জুনিয়রের বিয়ের অনুষ্ঠানে ক্রেমলেভের আর্থিক সহায়তার কথা প্রকাশ্যে আসে, যার পর কংগ্রেসের নজরদারি শুরু হয়।
  • ২৭ অক্টোবর: মঙ্গোলিয়ায় শিকারের সময় দুজনের সাক্ষাতের বিবরণ প্রকাশিত হয়।

ভিডিওতে অভিযান দেখা গেলেও দুজনকে একসঙ্গে দেখা যায়নি

৩০ আগস্ট ক্রেমলেভের টেলিগ্রাম পোস্টে একটি ভিডিও ছিল, যেখানে তিনি বলেন, মার্তিরোসভের সঙ্গে মঙ্গোলিয়ায় যাচ্ছেন। আরেকটি ভিডিওতে সফরের দৃশ্য দেখা যায়। একটি ক্যাপশনে দর্শকদের শিকার সম্পর্কে তাঁদের মতামত জানতে চাওয়া হয়।

ভিডিওতে ট্রাম্প জুনিয়রকে দেখা যায়নি, যদিও তাঁর শিকার সফরের দুই আয়োজক সেখানে ছিলেন। স্থানীয় এক অংশগ্রহণকারী বলেন, শিবিরে থাকার সময় ট্রাম্প জুনিয়র ও ক্রেমলেভ একসঙ্গে ছবি তোলা এড়ানোর চেষ্টা করেন।

গাইড ও কর্মকর্তারা সফরের বিবরণ দেন। ফ্লাইটের নথি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য থেকেও যাত্রীদের চলাচলের সূত্র মেলে। এরপর দুজন ভিন্ন পথে যান: ক্রেমলেভ আইবিএর একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ইয়াকুতস্কে যান, আর ট্রাম্প জুনিয়র মঙ্গোলিয়ায় অবস্থান চালিয়ে যান।

বিজ্ঞাপন

দুর্লভ ভেড়া শিকার ও আরও এক সপ্তাহের অভিযান

এক গাইডের ভাষ্য, অভিযানে ট্রাম্প জুনিয়র একটি আলতাই আরগালি শিকার করেন। প্রাণীটি পাহাড়ি ভেড়ার একটি বিরল প্রজাতি। বড় শিংয়ের জন্য ট্রফি শিকারিদের কাছে এর কদর রয়েছে এবং সফরের বিবরণে একে বিপন্ন প্রজাতি বলা হয়েছে।

খবরে বলা হয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে মঙ্গোলিয়ায় ট্রাম্প জুনিয়র অন্তত আরও দুটি আলতাই আরগালি শিকার করেছেন। সর্বশেষ শিকারটি ধরলে তাঁর শিকারের সংখ্যা অন্তত তিনটিতে দাঁড়ায়। মঙ্গোলিয়ায় তাঁর আগের শিকারের অভিজ্ঞতা ২০২২ সালের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘লস্ট ইন মঙ্গোলিয়া’তেও উঠে এসেছিল।

ক্রেমলেভ চলে যাওয়ার পর ট্রাম্প জুনিয়র পশ্চিম মঙ্গোলিয়ার আরেক এলাকা বায়ান-ওলগি প্রদেশে সাইবেরীয় আইবেক্স শিকারে যান। আইবেক্স খাড়া পাহাড়ি ভূখণ্ডে চলাচলে অভিযোজিত বুনো ছাগল, আর আরগালি বুনো ভেড়া।

ট্রাম্প জুনিয়র উলানবাটরে ফেরার আগে শিকার প্রায় আরও এক সপ্তাহ চলে। এই সফরে শিকার করা প্রাণীগুলোর অনুমতিপত্র বা সংরক্ষণ ফি সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

সরকারের ১৮,৭১৫ ডলারের ব্যয়ে কী ছিল

সরকারি ব্যয়ের নথি অনুযায়ী, ২৩ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিক্রেট সার্ভিসের একটি অনির্দিষ্ট “সফর”-এর জন্য উলানবাটরে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস হোটেলকক্ষ ভাড়া বাবদ ১৮,৭১৫ ডলার দেয়। ট্রাম্প জুনিয়র প্রেসিডেন্টের পরিবারের সদস্য হওয়ায় এজেন্টরা তাঁর সঙ্গে সফর করেন।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে খাতওয়ারি মূল নথিটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

নথিভুক্ত ব্যয়টি ছিল নিরাপত্তা দলের থাকার ব্যবস্থাসংশ্লিষ্ট। শিকার অভিযান, ব্যক্তিগত যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং এজেন্টদের হোটেল বুকিং ব্যয়ের পৃথক খাত। নথিতে চিহ্নিত নির্দিষ্ট সরকারি ব্যয়টি ছিল হোটেলকক্ষের জন্য।

বুকিংয়ের সময়কাল ১৫টি ক্যালেন্ডার দিন জুড়ে ছিল। এটি ক্রেমলেভের ২৭ আগস্ট আগমনের আগেই শুরু হয় এবং সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে। ফলে নিরাপত্তা অভিযানের সময়সীমা শিবিরে দুজনের একসঙ্গে কাটানো দুই দিনের চেয়ে বিস্তৃত ছিল।

এ পর্যন্ত প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের নির্দিষ্ট ব্যয়টি হলো দূতাবাসের হোটেল খরচ। সফরকারীদের জন্য সিক্রেট সার্ভিসের উপস্থিতির অর্থ ছিল, মঙ্গোলিয়ার রাজধানী থেকে অনেক দূরে ব্যক্তিগত এক অভিযানের সঙ্গেও সরকারি নিরাপত্তা অভিযান যুক্ত হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

ক্রেমলেভের রুশ যোগাযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ

৪৩ বছর বয়সী ক্রেমলেভ ২০২০ সাল থেকে আইবিএর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর আগে ২০১৭ সাল থেকে তিনি রুশ বক্সিং ফেডারেশনের প্রধান ছিলেন। তাঁর আগের পদবি ছিল লুতফুল্লোয়েভ। তাঁর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জ্বালানি কোম্পানি গাজপ্রমের কাছ থেকে কয়েক কোটি ডলার পায়।

আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবসহ বিভিন্ন উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ২০২৩ সালে আইবিএর স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে। এর ফলে অলিম্পিক বক্সিং আয়োজনের দায়িত্ব থেকে সংস্থাটি বাদ পড়ে। এতে ক্রীড়াঙ্গনে ক্রেমলেভের আন্তর্জাতিক অবস্থান শাসনব্যবস্থা ও অর্থসংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

বক্সিংয়ের বাইরেও ক্রেমলেভের ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। ২০২৪ সালে তিনি বড় গাড়ি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান রলফের মালিক হন। প্রতিষ্ঠানটির আগের মালিক ছিলেন ব্যবসায়ী সের্গেই পেত্রভ। মালিকানা বদলের আগে পুতিন কোম্পানিটিকে অস্থায়ী ব্যবস্থাপনার আওতায় রেখেছিলেন।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রলফ অধিগ্রহণের সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান আলেক্সেই রুবেঝনির সঙ্গে ক্রেমলেভের বন্ধুত্বের যোগসূত্র দেখানো হয়েছে। একই সম্পর্ক লটারি ও বুকমেকিং ব্যবসায় সম্পদ পেতেও তাঁকে সাহায্য করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ইউক্রেন ক্রেমলেভের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে পুতিন তাঁকে রাশিয়ার অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপে ভূষিত করেন। পরের মাসে তিনি রুশ প্রেসিডেন্টের চীন সফরকারী প্রতিনিধিদলে ছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ছেলের কাছে তাঁর পৌঁছানোর সুযোগ কেন এত মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, এসব যোগাযোগ তার ব্যাখ্যা দেয়।

মঙ্গোলিয়া সফরের আগের বন্ধুত্ব

ট্রাম্প জুনিয়র ও ক্রেমলেভের প্রথম পরিচিত প্রকাশ্য সাক্ষাৎ হয় ২০২৫ সালে ইস্তাম্বুলে আইবিএর এক অনুষ্ঠানে। সেখানে বক্সার ম্যানি প্যাকিয়াও ছিলেন। অর্থাৎ মঙ্গোলিয়া অভিযান ও বিয়ের খরচ নিয়ে নজরদারি শুরুর আগেই তাঁদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জুনিয়রের মুখপাত্র বন্ধুত্ব ও তাঁদের পরিচয়ের সূত্র সম্পর্কে বলেন:

ডন স্পষ্ট করেছেন যে উমরের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব আছে, ব্যবসায়িক সম্পর্ক নয়। শিকার, মাছ ধরা ও প্রকৃতির প্রতি দুজনের অভিন্ন ভালোবাসার ওপরই তাঁদের বন্ধুত্ব মূলত গড়ে উঠেছে। এ বছরের শুরুর দিকে তাঁরা একসঙ্গে শিকারে গিয়েছিলেন—এতে কারও অবাক হওয়ার কথা নয়।

শিবিরে ক্রেমলেভের উপস্থিতি মুখপাত্রের বর্ণিত অভিন্ন অবসর-বিনোদনের আগ্রহের সঙ্গে মেলে। মার্তিরোসভের অংশগ্রহণ অভিযানে আরও একটি রুশ ব্যবসায়িক যোগসূত্র যুক্ত করে; তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন ভসখোদ তহবিলের অংশীদার।

শিকারের বাইরেও এই সম্পর্কের একটি আর্থিক দিক ছিল: ২০২৬ সালের মে মাসে বাহামাসে বেটিনা অ্যান্ডারসনের সঙ্গে ট্রাম্প জুনিয়রের বিয়ে ঘিরে উৎসবের খরচে ক্রেমলেভের সহায়তা।

বিজ্ঞাপন

বিয়ের খরচ নিয়ে কংগ্রেসের নজরদারি

খবরে বলা হয়, বিয়ের অনুষ্ঠান ঘিরে কয়েক লাখ ডলারের খরচ, যার মধ্যে ব্যক্তিগত দ্বীপ ভাড়া ও আতশবাজিও ছিল, ক্রেমলেভ বহন করেন। মঙ্গোলিয়া সফরের কয়েক সপ্তাহ পর সেপ্টেম্বরে এসব অর্থের কথা প্রকাশ্যে আসে।

কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটরা ব্যবসায়ী ও প্রেসিডেন্টের ছেলের আর্থিক যোগসূত্র খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ ইঙ্গিত দেন, তিনি বিয়ের বিষয়টি তদন্ত করবেন না।

এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তাঁর ছেলে ক্রেমলেভকে অর্থ ফেরত দিয়েছেন। এর আগে প্রেসিডেন্টের প্রতিক্রিয়ার বর্ণনায় বলা হয়েছিল, তাঁর ছেলে অর্থ ফেরত দেবেন। অক্টোবরের শুরুতে ক্রেমলেভ জানান, অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে।

অর্থ দেওয়া ও ফেরত দেওয়ার বক্তব্য এমন এক বন্ধুত্বের তদন্তের কেন্দ্রে আসে, যার সঙ্গে ব্যয়বহুল উৎসব, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ জড়িত। কংগ্রেসের অনুসন্ধানের বিষয় ছিল এসব আর্থিক যোগসূত্র, আর ট্রাম্প জুনিয়রের মুখপাত্র সম্পর্কটিকে ব্যক্তিগত বলেই বর্ণনা করতে থাকেন।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক, বর্ণনা ভিন্ন

উলানবাটরে ফেরার পর ট্রাম্প জুনিয়র মঙ্গোলিয়ার প্রেসিডেন্ট খুরেলসুখের সঙ্গে দেখা করেন। মঙ্গোলীয় সরকারের এক প্রতিনিধি প্রথমে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে লেখেন, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও মঙ্গোলিয়ার সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য ব্যবসার সুযোগ নিয়ে কথা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর পোস্টটি মুছে ফেলা হয়।

ট্রাম্প জুনিয়রের প্রতিনিধি সাক্ষাৎটিকে অনানুষ্ঠানিক এবং প্রকৃতি ও বাইরের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা বলে বর্ণনা করেন; আরেক বর্ণনায় সংরক্ষণ বিষয়ের কথা বলা হয়। খুরেলসুখের এক প্রতিনিধি বলেন: “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছেলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক ও একবেলা খাবার খেয়েছেন। সম্পর্ক মোটামুটি ভালো। তাঁরা রাজনীতি বা সরকারি সফর নিয়ে আলোচনা করেননি।”

কেউ কেউ খাবারের সময়টিকে রাতের খাবার বলেছেন, আর খুরেলসুখের প্রতিনিধি বলেছেন দুপুরের খাবার। তবে আলোচনার বিষয় নিয়ে মতভেদটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ: প্রথম প্রকাশ্য পোস্টে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও ব্যবসার কথা ছিল, আর পরের বিবৃতিগুলোতে অভিন্ন আগ্রহ নিয়ে ব্যক্তিগত কথোপকথনের বর্ণনা দেওয়া হয়।

শিকারকে কেন্দ্র করে আয়োজিত সফরে খুরেলসুখের অংশগ্রহণ ট্রাম্প জুনিয়রকে মঙ্গোলিয়ার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দপ্তরে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়। বৈঠক সম্পর্কে ভিন্ন বর্ণনার ফলে পাঠকের সামনে সাক্ষাতের দুটি আলাদা উদ্দেশ্য উঠে আসে, একটিমাত্র সর্বসম্মত বিবরণ নয়।

বিজ্ঞাপন

নিরাপত্তা উদ্বেগের কেন্দ্রে যোগাযোগের সুযোগ

ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্সির সময় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলে পাল্টা গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক পরিচালক হোল্ডেন ট্রিপলেট সতর্ক করে বলেন, রুশ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের বন্ধুত্বকে নির্দোষ মনে করলেও তাঁর উদ্বেগ কেন প্রযোজ্য, তা ব্যাখ্যা করেন ট্রিপলেট:

মানুষের উদ্দেশ্য পুরোপুরি স্বচ্ছ কি না, তাতে আসলে কিছু যায় আসে না। রুশ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখনই বুঝবে, গুরুত্বপূর্ণ কারও সঙ্গে কারও সম্পর্ক আছে, তখনই তারা সেটিকে হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করবে।

পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রম বলতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য সংগ্রহ বা সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা শনাক্ত করা ও প্রতিহত করাকে বোঝায়। ট্রিপলেটের সতর্কবার্তার কেন্দ্রে রয়েছে যোগাযোগের সুযোগ: বন্ধু বা অবসর কাটানোর সঙ্গীর সঙ্গে কোনো জাতীয় নেতার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির বারবার যোগাযোগ তৈরি হতে পারে।

ইস্তাম্বুলের অনুষ্ঠানে দেখা হওয়া ও বাহামাসের উৎসবের পর মঙ্গোলিয়া সফরেও এমন ধারাবাহিক যোগাযোগ ছিল। ট্রাম্প জুনিয়রের অবস্থান, ক্রেমলেভ তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু। তবে প্রকাশিত ভ্রমণ, অর্থ লেনদেন ও রাজনৈতিক বৈঠকের বিবরণে বোঝা যায়, শিকারিদের মহলের বাইরেও কেন এ সম্পর্ক নজরদারির মধ্যে এসেছে।

মূল তথ্য

  • ২০২৬ সালের আগস্টে ট্রাম্প জুনিয়র ও আইবিএর সভাপতি উমর ক্রেমলেভ পশ্চিম মঙ্গোলিয়ার একটি শিকারশিবিরে একসঙ্গে দুই দিন কাটান।
  • ক্রেমলেভ কাজাখস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাধীন ভসখোদ তহবিলের অংশীদার আর্থার মার্তিরোসভকে সঙ্গে নিয়ে আসেন।
  • সরকারি নথিতে ২৩ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিক্রেট সার্ভিসের একটি অনির্দিষ্ট “সফর”-এর জন্য দূতাবাসের হোটেল খাতে ১৮,৭১৫ ডলার ব্যয়ের তথ্য রয়েছে।
  • এক গাইডের ভাষ্য, ট্রাম্প জুনিয়র একটি আলতাই আরগালি শিকার করেন। এরপর আইবেক্স শিকারে তাঁর সফর চলতে থাকে।
  • খবরে বলা হয়, বাহামাসে ট্রাম্প জুনিয়রের বিয়ে ঘিরে অনুষ্ঠানের কিছু খরচ ক্রেমলেভ দিয়েছিলেন। পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ক্রেমলেভ দুজনই বলেন, অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
  • ট্রাম্প জুনিয়রের মুখপাত্র ব্যবসায়িক সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে বলেন, শিকার, মাছ ধরা ও প্রকৃতিতে অবসর কাটানোর আগ্রহ থেকেই তাঁদের বন্ধুত্ব।
  • ট্রাম্প জুনিয়র মঙ্গোলিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও দেখা করেন। ব্যবসা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে বর্ণনা ভিন্ন।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে