পুলিশপ্রধানের বক্তব্যে জবাবদিহির দাবি
সরকারের অনুমতি থাকলে এবং প্রয়োজন হলে পুলিশ ক্রসফায়ারে যাবে বলে মন্তব্য করার পর জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর সোমবার ঢাকায় তাঁর এ বক্তব্যের সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ও একজন সংসদ সদস্য। এতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকারের অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সূচিপত্র
- পুলিশপ্রধানের বক্তব্যে জবাবদিহির দাবি
- পুলিশের ক্ষমতা নিয়ে যা বলেছেন ফকির
- বিতর্কের কেন্দ্রে সরকারের অনুমোদন কেন
- কখন প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমতি আছে
- সেপ্টেম্বরের অঙ্গীকার, অক্টোবরে নতুন প্রশ্ন
- অতীতের হত্যাকাণ্ড নিয়ে টিআইবির সতর্কতা
- পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা বললেন পুলিশপ্রধান
- স্থানীয় নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষতার আহ্বান হাসনাতের
- জনসমালোচনা ও জবাবদিহির সুযোগ
- মূল বিষয়গুলো
২৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে টিআইবি পুলিশপ্রধানের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়েছে এবং তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্তভাবে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে ক্রসফায়ারকে তুলে ধরা জনসাধারণের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কাছে বিপজ্জনক বার্তা পাঠায়।
চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামি ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন ফকির। তিনি ব্যাংকটির চেয়ারম্যানও। পুলিশের ক্ষমতা ও জনশৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ক্রসফায়ার ব্যবহারের শর্ত হিসেবে সরকারের অনুমতির কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন:
সরকার অনুমতি দিলে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও অপরাধ দমনে প্রয়োজন হলে আমরা ক্রসফায়ারে যেতে দ্বিধা করব না।
টিআইবির মূল আপত্তি হলো, সরকারের অনুমতি আইনের বিকল্প হতে পারে না। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পুলিশের কাজ অপরাধ তদন্ত করা, আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা। এ প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে হত্যা করা নির্বাহী বিভাগের অনুমোদন পেলেই বৈধ হয়ে যেতে পারে না।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিও (এইচআরএসএস) এ বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সরকার সমর্থন করে কি না, নাকি ফকির ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করেছেন, তা স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। দুই সংগঠনই সরকারের ওপর নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা এবং পুলিশ যাতে আইনসীমার মধ্যে কাজ করে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছে।
পুলিশের ক্ষমতা নিয়ে যা বলেছেন ফকির
পুলিশকে ক্ষমতায়ন, জনসাধারণের সহযোগিতা এবং সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধার আহ্বানের পাশাপাশি ক্রসফায়ার নিয়ে বক্তব্য দেন ফকির। ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে যাওয়ার ঠিক আগে তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যরা আইন প্রয়োগ করবেন এবং সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন।
পুলিশপ্রধানের যুক্তি, কঠোর পদক্ষেপ নিলেও পুলিশ সমালোচনার মুখে পড়ে, আবার সংযত থাকলেও সমালোচিত হয়। তিনি বলেন, লাঠিপেটা করলে পুলিশকে ফ্যাসিস্ট বলা হয়, আর নীরব থাকলে দুর্বল বলা হয়। কর্মকর্তারা যাতে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে রকম পরিবেশের দাবি জানান তিনি। বাহিনীকে অকার্যকর করার চেষ্টা হলে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেন।
গুজব ও পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এড়াতে, নিজের হাতে আইন তুলে না নিতে এবং পুলিশকে সহযোগিতা করতে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান ফকির। তিনি বলেন, পুলিশ ও নাগরিক—উভয়েরই আইন ও সংবিধান মেনে চলা উচিত।
সরকারের অনুমোদনে ক্রসফায়ার ব্যবহারের সম্ভাবনার ইঙ্গিতের সঙ্গে এসব অঙ্গীকারের সরাসরি বিরোধ রয়েছে বলে মনে করে টিআইবি। পুলিশের হাতে কী ধরনের পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত এবং সেসব পদ্ধতি আইনি সুরক্ষা মেনে চলে কি না, সেটিই সংগঠনটির কাছে মূল প্রশ্ন।
বিতর্কের কেন্দ্রে সরকারের অনুমোদন কেন
টিআইবি ও এইচআরএসএসের আপত্তির ভিত্তি বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ। ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিয়ে, আর ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত করে। সহজ কথায়, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রকে মানুষের সঙ্গে আচরণের সময় আইন মেনে চলতে হবে।
নির্বাহী বিভাগের অনুমতি বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দিতে পারে—এ ধারণা কেন তিনি প্রত্যাখ্যান করেন, তা ব্যাখ্যা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান:
সরকারের কোনো অনুমোদনই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত আইনের আশ্রয় লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে খর্ব করা যায় না। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে কাউকে হত্যা করার ক্ষমতা পুলিশের নেই।
যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বলতে অভিযোগ তদন্ত ও বিচার করার আইনি ধাপগুলো অনুসরণ করাকে বোঝায়। পুলিশ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করে এবং প্রমাণ সংগ্রহ করে; অপরাধের দায় নির্ধারণ করেন আদালত। টিআইবি বলেছে, এই দায়িত্ব বিভাজনের বিকল্প হতে পারে না ক্রসফায়ার।
কখন প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমতি আছে
টিআইবি বলেছে, পুলিশের যেকোনো বলপ্রয়োগ হতে হবে আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক। অর্থাৎ পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি ভিত্তি থাকতে হবে, প্রয়োজন হলেই কেবল বলপ্রয়োগ করতে হবে এবং পরিস্থিতি যতটুকু ন্যায্যতা দেয়, তার মধ্যে তা সীমিত রাখতে হবে।
টিআইবির উদ্ধৃত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রাণঘাতী উদ্দেশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার কেবল জীবন রক্ষার জন্য একান্ত অনিবার্য হলেই অনুমোদিত। সংগঠনটি একে কঠোরভাবে সীমিত ব্যতিক্রম হিসেবে বর্ণনা করেছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হিসেবে মানুষ হত্যার অনুমতি হিসেবে নয়।
এইচআরএসএসও একই ধরনের যুক্তি দিয়েছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামের সই করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে আইনসম্মত প্রক্রিয়া, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার বিভাগের কর্তৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে। অপরাধের অভিযোগ থাকলেও কোনো ব্যক্তির জীবন ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার বিলুপ্ত হয় না।
বাস্তবে, একজন কর্মকর্তা কী উদ্দেশ্যে কাজ করছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের ওপর তাৎক্ষণিক হুমকি থেকে কাউকে রক্ষা করার আইনি যুক্তি, সন্দেহভাজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার যুক্তির চেয়ে আলাদা। টিআইবি ও এইচআরএসএস জোর দিয়ে বলেছে, অপরাধের শাস্তি বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই দিতে হবে।
সেপ্টেম্বরের অঙ্গীকার, অক্টোবরে নতুন প্রশ্ন
সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকার ক্রসফায়ারের আশ্রয় নেবে না, কারণ বিদ্যমান আইন যথেষ্ট—১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রীর এ বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেছে টিআইবি। পরে ফকিরের মন্তব্যে ক্রসফায়ার ব্যবহারের সম্ভাব্য পথ হিসেবে সরকারের অনুমতির কথা উঠে আসে।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় সরকারের ঘোষিত নীতি ও পুলিশপ্রধানের বক্তব্য পাশাপাশি এসেছে:
- ১৪ সেপ্টেম্বর: আইনমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকার ক্রসফায়ার ব্যবহার করবে না এবং বিদ্যমান আইনই যথেষ্ট।
- ২৬ অক্টোবর: চকবাজারের ব্যাংকিং সেবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফকির বলেন, প্রয়োজন হলে এবং সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ ক্রসফায়ারে যাবে।
- ২৬ অক্টোবর: টিআইবি ব্যাখ্যা, বক্তব্য প্রত্যাহার, ক্ষমা প্রার্থনা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবি জানায়। সরকারকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানায় এইচআরএসএসও।
এখানে বর্ণিত বিবৃতি ও বক্তব্যে টিআইবির দাবির বিষয়ে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত, আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার কিংবা জবাব দেওয়ার সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। অসংগতি ব্যাখ্যা করতে এবং ঘোষিত অবস্থান কীভাবে কার্যকর করা হবে তা স্পষ্ট করতে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
অতীতের হত্যাকাণ্ড নিয়ে টিআইবির সতর্কতা
পুলিশপ্রধানের বক্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব কেন, তা ব্যাখ্যা করতে ইফতেখারুজ্জামান তিনটি ঘটনার উল্লেখ করেন: সিনহা হত্যা মামলা, টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হককে হত্যা এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলা।
সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে টিআইবি। রায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে আসা অভিযোগের কথাও বলেছে সংগঠনটি, যেখানে অর্থ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার জন্য ক্রসফায়ার ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল। আইনসম্মত তদন্ত ও জবাবদিহি জোরদার করার কারণ হিসেবে এসব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছে সংগঠনটি।
টিআইবি বলেছে, কথিত বন্দুকযুদ্ধে একরামুল হকের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার একটি অডিও রেকর্ডিং প্রকাশ করে এবং তাঁকে হত্যার অভিযোগ তোলে। নতুন করে ক্রসফায়ারের কথা ওঠা কেন উদ্বেগজনক, তার পটভূমির অংশ হিসেবে পরিবারের অভিযোগগুলো উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
টিআইবির মতে, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সাবেক কর্মকর্তাদের দণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপরাধমূলক অপব্যবহারের আরেকটি বিচারিক দৃষ্টান্ত।
ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তারা পুলিশপ্রধানের বক্তব্যকে বেআইনি বলপ্রয়োগের পরোক্ষ অনুমতি হিসেবে বুঝতে পারেন। পুলিশ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা যখন জনপরিসরে গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন অতীতের অপরাধ থেকে বাহিনী কী শিক্ষা নিয়েছে, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা বললেন পুলিশপ্রধান
বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে ফকির বলেন, আগের দুই মাসে প্রায় ২৭ জন পুলিশ সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অপরাধে জড়িত কর্মকর্তাদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না এবং পুলিশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশের কিছু সদস্য মাদক ব্যবসায় জড়িত ছিলেন এবং কেউ কেউ এখনো জড়িত—এ কথা স্বীকার করেন আইজিপি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের কিছু নেতা মাদক বিস্তারে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন এবং পুলিশ শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করছে।
বাহিনীর ভেতরের অনিয়ম মোকাবিলায় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের বর্ণনা দিয়ে ফকির বলেন:
আপনারা যেমন দেখতে পাচ্ছেন, আমরা আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করছি। তবু এ বিষয় নিয়েও নানা ভুল ব্যাখ্যা ছড়ানো হচ্ছে।
টিআইবির দাবি শুধু ব্যক্তিগতভাবে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কীভাবে পুলিশি কার্যক্রম চালানো যেতে পারে, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্যের জন্য বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে জবাবদিহি চেয়েছে সংগঠনটি। টিআইবি বলেছে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধানে পেশাগত পদক্ষেপ দরকার, যার মধ্যে রয়েছে উন্নত তদন্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মামলা পরিচালনা।
স্থানীয় নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষতার আহ্বান হাসনাতের
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সোমবার বিকেলে ঢাকার মুগদায় এক জনসংযোগ কর্মসূচিতে ফকিরের সমালোচনা করেন। তিনি আইজিপিকে ‘গুণ্ডা’ বলেন এবং আওয়ামী লীগ শাসনামলে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক প্রধান হারুন অর রশিদের আচরণের সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের তুলনা করেন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে পুলিশি নিরপেক্ষতার সঙ্গে বিতর্কটি যুক্ত করেন হাসনাত। পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, জনসাধারণের জন্য কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে হাসনাত বলেন:
আপনারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুলিশ নন, প্রধানমন্ত্রীর পুলিশও নন। আপনাদের পরা পোশাক জনগণের করের টাকায় কেনা। এ কথা ভুলে যাবেন না।
বিএনপিকে ভোট দেওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুঃখ প্রকাশের পর ময়মনসিংহে গ্রেপ্তার হওয়া এক নারীকে মুক্তি দেওয়ার দাবিও জানান হাসনাত। মোংলায় ছয় মাসের বেশি সময় ধরে মিরাজ শেখের নিখোঁজ থাকার ঘটনাও তোলেন তিনি এবং অভিযোগ করেন, কোস্টগার্ড তাঁকে তুলে নিয়ে গেছে। এগুলো ছিল হাসনাতের বক্তব্যে করা অভিযোগ ও দাবি।
নির্বাচন নিয়ে তাঁর বক্তব্যে বিতর্কটি ফকিরের মন্তব্যের ভাষার বাইরে বিস্তৃত হয়েছে। দলের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেয়র প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর পক্ষে প্রচারের সময় এনসিপি নেতা সুষ্ঠু পুলিশি কার্যক্রম ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার আহ্বান জানান।
জনসমালোচনা ও জবাবদিহির সুযোগ
ব্যাংকিং সেবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার বাসায় অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ১০১ নাগরিকের বিবৃতিরও জবাব দেন ফকির। অভিযানটির সমালোচনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি, মদ্যপান ও মাদক সেবনের অভিযোগের কথা বলেন এবং আইন মেনে চললেই স্বাধীনতা থাকে বলে মন্তব্য করেন।
পুলিশপ্রধানের যুক্তি, দেশের নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ মেনে মানুষের আচরণ করা উচিত। মিথ্যা অভিযোগ এড়াতে এবং পুলিশকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে জনসাধারণের প্রতি তাঁর বৃহত্তর আহ্বানের সঙ্গে এ মন্তব্যও এসেছে।
পুলিশ ও জনসমালোচনার সম্পর্কের আরেকটি দিক তুলে ধরেছে টিআইবি: সাংবাদিকরা টাকা না পাওয়ায় পুলিশের সমালোচনা করেন—এমন অভিযোগ। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক আচরণের নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহির ভূমিকা দুর্বল করে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে বলে সতর্ক করেছে টিআইবি। পুলিশের পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও সংগঠনটি জোর দিয়ে বলেছে, এসব প্রয়োজন বৈধ সমালোচনা এড়ানোর অজুহাত হতে পারে না।
টিআইবির দাবিগুলো নির্দিষ্ট: ফকিরের ব্যাখ্যা, বক্তব্য প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি; এর মধ্যে জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে অপসারণের দাবিও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইনের মধ্যে রাখার বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট অঙ্গীকার চেয়েছে এইচআরএসএস। দুই সংগঠনই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে জীবন সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে রেখেছে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, প্রয়োজন হলে এবং সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ ক্রসফায়ারে যাবে।
- টিআইবি ব্যাখ্যা, বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবি জানিয়েছে; জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে অপসারণের দাবিও করেছে।
- টিআইবি ও এইচআরএসএস জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের আশ্রয় লাভের সাংবিধানিক অধিকারের কথা বলেছে।
- টিআইবি বলেছে, আইনমন্ত্রী ১৪ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিলেন, ক্রসফায়ার ছাড়াই সন্ত্রাসবাদ দমনে বিদ্যমান আইন যথেষ্ট।
- ফকির বলেন, আগের দুই মাসে প্রায় ২৭ জন পুলিশ সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
- এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বক্তব্যটির নিন্দা জানিয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পুলিশকে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।






