২০ শতাংশ পতনে চীনের বাজারে সরকারি সহায়তার পরীক্ষা
চীনের CSI 300 সূচক বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬-এ জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ২০ শতাংশ পড়ে যায়। হতাশাজনক আয় এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনার আশা ম্লান হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক পতনের মধ্যে সূচকটি বিয়ার মার্কেট হিসেবে পরিচিত সীমায় পৌঁছায়।
সূচিপত্র
- ২০ শতাংশ পতনে চীনের বাজারে সরকারি সহায়তার পরীক্ষা
- যেভাবে এই পর্যায়ে পৌঁছাল পতন
- প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি
- শিল্প খাতের শক্তির আড়ালে চাপের ইঙ্গিত CATL
- সরকারি মুনাফার পরিসংখ্যানে অর্থনীতির বিভক্ত চিত্র
- বকেয়া পাওনা ও মজুত পণ্যে বাড়তি চাপ
- রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারীদের হাতে অর্থ আছে, তবে সামনে দীর্ঘ পথ
- পতন ধীর করা সহজ, আস্থা ফেরানো কঠিন
- নিরাপত্তা নাকি সম্ভাব্য পুনরুদ্ধার, তা ভাবছেন পরিবারগুলো
- মূল বিষয়গুলো
সাংহাই ও শেনঝেনে তালিকাভুক্ত ৩০০টি বৃহত্তম কোম্পানির শেয়ার অনুসরণ করা এই বেঞ্চমার্ক বৃহস্পতিবারের লেনদেনে একপর্যায়ে ১.৬ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে। টানা ১০ সপ্তাহ পতনের রেকর্ড গড়ার পর চলতি সপ্তাহে এ পর্যন্ত সূচকটি প্রায় ২.৬ শতাংশ কমেছে। হংকংয়ে তালিকাভুক্ত বড় চীনা কোম্পানিগুলোর একটি সূচক বৃহস্পতিবার একপর্যায়ে ২.৯ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যায়।
রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারীদের কেনার লক্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উন্নতি সত্ত্বেও লোকসান অব্যাহত ছিল। তৃতীয় প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৫ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৩ শতাংশ। তবু বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ ছিল দুর্বল পারিবারিক চাহিদা, কোম্পানির মুনাফার ওপর চাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের শেয়ার থেকে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের দিকে।
বাজার স্থিতিশীল করার উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়া রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারী সেন্ট্রাল হুইজিন ইনভেস্টমেন্টের শেয়ার কেনার জন্য এখনো প্রায় ১৮৮ বিলিয়ন ডলার থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো, এই অর্থ ব্যয় করে এমন একটি বাজারকে স্থিতিশীল করা যাবে কি না, যেখানে পরিবারগুলো ক্রমেই ব্যাংক আমানতকে বেশি পছন্দ করছে এবং আগের দরবৃদ্ধির পর প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সামনে আরও কঠোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে পতনের মাত্রা বোঝাতেই বিয়ার মার্কেট শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কোনো বিনিয়োগকারীর শেয়ারের দর যদি ঠিক CSI 300-এর সঙ্গে ওঠানামা করত, তাহলে জুনের সর্বোচ্চ অবস্থানে ১০০ ইউয়ান মূল্যের বিনিয়োগ ফি বা লভ্যাংশের হিসাবের আগে কমে প্রায় ৮০ ইউয়ানে দাঁড়াত।
যেভাবে এই পর্যায়ে পৌঁছাল পতন
জুনের সর্বোচ্চ অবস্থানের পর CSI 300-এর পতন শুরু হয় এবং টানা কয়েক সপ্তাহ বিক্রির চাপে তা আরও গভীর হয়। সপ্তাহের শুরুর দিকে সূচকটি ওই সর্বোচ্চ অবস্থানের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ নিচে ছিল। এর আগের পাঁচটি লেনদেন দিবসে প্রায় ৩.৪ শতাংশ পতন হয়েছিল। শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান প্রকাশের পর সোমবার সূচকটি সাময়িকভাবে ০.৩ শতাংশ বাড়লেও সামগ্রিক পতনের ধারা থামেনি।
এই ধারাবাহিকতা দেখায়, আস্থা ফেরানোর একের পর এক উদ্যোগের পরও কীভাবে নতুন করে শেয়ার বিক্রি শুরু হয়েছে:
- এপ্রিল ২০২৫: শুল্ক নিয়ে উদ্বেগের সময় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনেন; সহায়তার পরিমাণ আনুমানিক ২৭ থেকে ২৮ বিলিয়ন ডলার।
- জুন ২০২৬: CSI 300 সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়; পরবর্তী ২০ শতাংশ পতনের হিসাব এই অবস্থান থেকে করা হয়।
- জুলাই ও আগস্ট ২০২৬: নিয়ন্ত্রক সংস্থা, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারী, বিমা কোম্পানি ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের নিয়ে বাজার স্থিতিশীল করার ব্যাপক উদ্যোগে আনুমানিক ২৭ থেকে ২৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়।
- ৯ থেকে ২০ অক্টোবর: বিস্তৃত বাজার সূচক অনুসরণ করা তহবিলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারীরা আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন।
- ২২ অক্টোবর: বৃহস্পতিবারের লেনদেনে CSI 300 বিয়ার মার্কেটের পর্যায়ে পৌঁছায়।
টানা ১০ সপ্তাহের পতন ছিল এই বেঞ্চমার্কের রেকর্ড দীর্ঘ দরপতনের ধারা। বৃহস্পতিবার নাগাদ বাজার আরও এক সপ্তাহের পতনের পথে ছিল, যাতে টানা একাদশ সপ্তাহ লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়।
প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি
চীনের প্রযুক্তি সূচকগুলো CSI 300-এর তুলনায় অনেক বেশি পড়েছে। সাংহাইয়ের প্রযুক্তি বোর্ডের বড় কোম্পানিগুলোকে অনুসরণ করা STAR 50 চলতি ছয় মাসে প্রায় ৪০ শতাংশ হারিয়েছে। শেনঝেনের ChiNext সূচক পড়েছে প্রায় ৩৬ শতাংশ। চিপ নির্মাতা MetaX ও Moore Threads—দুই কোম্পানিরই বাজারমূল্য প্রায় অর্ধেক কমেছে।
বছরের শুরুতে জোরালো দরবৃদ্ধির পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের শেয়ারগুলোই পতনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির আশায় বিনিয়োগকারীরা যে দাম দিচ্ছেন, তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। পাশাপাশি এআই খাতে বিশ্বজুড়ে শেয়ার বিক্রির চাপও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।
কোনো কোম্পানির মূল্যায়ন বলতে তার আয় বা প্রত্যাশিত আয়ের বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা কত দাম দিতে প্রস্তুত, তা বোঝায়। প্রত্যাশা দ্রুত বাড়লে বর্তমান মুনাফার তুলনায় শেয়ারের দাম বেশি দ্রুত বাড়তে পারে। তখন আস্থার পরিবর্তনে ব্যবসা সম্প্রসারিত হতে থাকলেও শেয়ারের দামে বড় পতন ঘটতে পারে।
চীনের ক্রমবর্ধমান এআই সক্ষমতা দেশটির শেয়ার নিয়ে আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির একটি অংশ। স্টেট স্ট্রিট মার্কেটসের জ্যেষ্ঠ মাল্টি-অ্যাসেট কৌশলবিদ ড্যানিয়েল জেরার্ড বলেন, কোম্পানির আয় পুনরুদ্ধারের আগেই এই সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে ফিরিয়ে আনতে পারে। আপাতত যে খাত নতুন করে আগ্রহ ফেরাতে পারে, সেখানেই সবচেয়ে বড় লোকসানের কিছু দেখা যাচ্ছে।
শিল্প খাতের শক্তির আড়ালে চাপের ইঙ্গিত CATL
কনটেম্পোরারি অ্যাম্পেরেক্স টেকনোলজি, যা CATL নামেই বেশি পরিচিত, বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নীতিগত সহায়তা কমে আসার মধ্যে প্রান্তিক মুনাফা প্রত্যাশার চেয়ে কম বাড়ায় বুধবার কোম্পানিটির শেয়ার ১২ শতাংশ পড়ে। ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী।
পেলা ফান্ডসের চেয়ারম্যান ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা জর্ডান সিভেতানোভস্কি বলেন, উৎপাদন সক্ষমতায় বছরের পর বছর বিনিয়োগ চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি করছে। তিনি সমস্যাটি এভাবে ব্যাখ্যা করেন:
আমার মনে হয়, অতীতে সক্ষমতা অতিরিক্ত বাড়ানোসহ যেসব সমস্যা চীনের ছিল, সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশটি সত্যিই হিমশিম খাচ্ছে,
তবু সিভেতানোভস্কি ব্যাটারি খাতে বেছে বেছে বিনিয়োগের সুযোগ দেখছেন। তাঁর মূল্যায়নে এই শিল্পের সামনে থাকা টানাপোড়েনটি স্পষ্ট: চীনা উৎপাদকরা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হলেও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাজারে মুনাফা ধরে রাখতে সমস্যায় পড়তে পারেন।
অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা বলতে বোঝায়, কারখানাগুলো লাভজনক দামে ক্রেতাদের চাহিদার চেয়ে বেশি পণ্য উৎপাদন করতে পারে। অর্ডার পেতে কোম্পানিগুলো দাম কমাতে পারে, ফলে প্রতিটি বিক্রি থেকে হাতে থাকে কম অর্থ। তাই উৎপাদন বা বিক্রি বাড়লেই শেয়ারধারীদের সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। খরচ মেটানোর পর কোম্পানির হাতে কত মুনাফা থাকছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি মুনাফার পরিসংখ্যানে অর্থনীতির বিভক্ত চিত্র
জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর শিল্প মুনাফা প্রতিবেদন দেখায়, সাম্প্রতিক বাজার পতনের আগেই কোম্পানিগুলোর ফলাফল কতটা অসম হয়ে পড়েছিল। বছরে মূল ব্যবসা থেকে অন্তত ২০ মিলিয়ন ইউয়ান আয় করা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টে ১৫.৭ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৫.২৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে। তবে আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মুনাফা বৃদ্ধির হার ছিল অনেক কম, ৪.২ শতাংশ।
আট মাসে উৎপাদন খাতের মুনাফা ১৭.৪ শতাংশ বেড়েছে, তবে শিল্পভেদে ফলাফলে বড় পার্থক্য ছিল। কম্পিউটার, যোগাযোগ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উৎপাদনে মুনাফা বেড়েছে ১০৯.৯ শতাংশ। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম খাতে মুনাফা কমেছে ৫.২ শতাংশ, আর যানবাহন উৎপাদনে কমেছে ১৬ শতাংশ।
আয় ও খরচের পরিসংখ্যান চাপের কারণ ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কোম্পানিগুলোর আয় ১১.৫ শতাংশ বাড়লেও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুত, ১২.৬ শতাংশ। যানবাহন নির্মাতাদের আয় বেড়েছে ২.৯ শতাংশ, আর পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ৪ শতাংশ। দুই শিল্পেই কোম্পানিগুলো বেশি বিক্রি করেও কম মুনাফা করেছে।
শিল্প খাতের পুরো জরিপে মুনাফার হার বেড়ে ৫.৬৬ শতাংশ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ০.৪৪ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। এর মানে জরিপে অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলো প্রতি ১০০ ইউয়ান আয়ে প্রায় ৫.৬৬ ইউয়ান মুনাফা করেছে। জাতীয় পর্যায়ে উন্নতির পাশাপাশি শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিল্পে উল্লেখযোগ্য পতনও দেখা গেছে।
বকেয়া পাওনা ও মজুত পণ্যে বাড়তি চাপ
চীনা শিল্প কোম্পানিগুলোর গুদামে পণ্যের পরিমাণও বাড়ছিল, আর পাওনা আদায়ে সময় লাগছিল বেশি। আগস্টের শেষে অবিক্রীত তৈরি পণ্যের মজুত বেড়ে ৭.৩৬ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে দাঁড়ায়, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। গ্রাহকদের কাছে পাওনা অর্থ, অর্থাৎ হিসাবপ্রাপ্য, ৯ শতাংশ বেড়ে ২৯.৪৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছায়।
দুটি সূচকই শিল্প খাতের আয়ের চেয়ে দ্রুত বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে আগস্টে শিল্প আয় বেড়েছে ৬.৬ শতাংশ। পাওনা আদায়ের গড় সময় বেড়ে ৭২.২ দিনে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ০.৯ দিন বেশি। গুদামে তৈরি পণ্য গড়ে ২১.৩ দিন ছিল, যা ০.৬ দিন বেশি।
কোনো কারখানার হিসাবে মুনাফা থাকলেও পাওনা পেতে দেরি হলে দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানো কঠিন হতে পারে। মজুরি, সরবরাহকারীদের পাওনা এবং সুদ দিতে নগদ অর্থ দরকার হয়। গুদামে পড়ে থাকা পণ্যও এমন অর্থ আটকে রাখে, যা অন্যথায় নতুন অর্ডার পূরণ বা ঋণ পরিশোধে কাজে লাগত।
উৎপাদনের মোট পরিমাণের বাইরেও বিনিয়োগকারীরা কেন নজর দিচ্ছেন, পরিসংখ্যানগুলো তা বুঝতে সাহায্য করে। নির্ভরযোগ্যভাবে পাওনা আদায়, নিয়ন্ত্রণযোগ্য মজুত এবং টেকসই মুনাফার সঙ্গে উৎপাদন বাড়লে তা শেয়ারধারীদের জন্য বেশি আকর্ষণীয় হয়।
রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারীদের হাতে অর্থ আছে, তবে সামনে দীর্ঘ পথ
রেবেকা সিন ও অন্য বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ETF) বিক্রি করে সেন্ট্রাল হুইজিন ২৩১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে। জুলাইয়ে আবার কেনাকাটা শুরু হওয়ার পর এর মধ্যে ৪৩ বিলিয়ন ডলার পুনর্বিনিয়োগ করা হয়েছে। ফলে আনুমানিক ১৮৮ বিলিয়ন ডলার অবশিষ্ট রয়েছে, যা সাম্প্রতিক গতিতে প্রায় ৭৫টি লেনদেন দিবসের কেনাকাটার অর্থ জোগাতে পারে।
এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড বা ETF একগুচ্ছ বিনিয়োগ ধরে রাখে এবং স্টক এক্সচেঞ্জে কেনাবেচা হয়। বিস্তৃত বাজার সূচক অনুসরণ করা কোনো তহবিল কিনলে একটিমাত্র মাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারীরা অনেকগুলো শেয়ারকে সহায়তা দিতে পারেন। এই উদ্যোগে অংশ নেওয়া চীনের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ‘ন্যাশনাল টিম’ নামে পরিচিত।
৯ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা আগের দুই দফা সহায়তায় প্রতিবার ব্যয় করা প্রায় ২৭ থেকে ২৮ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে কম। সাম্প্রতিক তহবিল প্রবাহেও প্রযুক্তি খাতের প্রতি বেশি মনোযোগের ইঙ্গিত মিলছে। অক্টোবরে রাষ্ট্রীয় কেনাকাটার আনুমানিক ৩২ শতাংশ গেছে STAR 50 ও ChiNext-এ, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে এ দুই সূচকের সম্মিলিত অংশ ছিল ১১ শতাংশ। CSI 300-এর অংশ ৫৫ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৪৫ শতাংশ হয়েছে।
অক্টোবরে ই ফান্ড ChiNext ETF-এ প্রায় ১৯.৪ বিলিয়ন ইউয়ান এসেছে, আর ChinaAMC STAR 50 ETF-এ নিট অর্থপ্রবাহ ছিল ২২.৭ বিলিয়ন ইউয়ানের বেশি। ইয়াও জিওয়েইসহ চায়না সিকিউরিটিজের বিশ্লেষকেরা বড় তহবিলে বিপুল অর্থপ্রবাহ এবং বাজার বন্ধের কাছাকাছি সময়ে বেশি লেনদেনকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সর্বশেষ রাষ্ট্রীয় কেনাকাটার পরিমাণ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
পতন ধীর করা সহজ, আস্থা ফেরানো কঠিন
বেইজিংয়ে অ্যাসিম্পটোট ইনভেস্টমেন্ট রিসার্চের প্রধান ঝু ঝেনশিন বলেন, বিপজ্জনক গতিতে পতন ঠেকাতেই হস্তক্ষেপের লক্ষ্য ছিল; বাজারের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া নয়। বিক্রির গতি কীভাবে আরও কেনাকাটাকে প্রভাবিত করতে পারে, তা তিনি ব্যাখ্যা করেন:
বাজার খুব দ্রুত পড়লে ন্যাশনাল টিম সম্ভবত কেনাকাটা চালিয়ে যাবে, যদিও এই হস্তক্ষেপ বাজারের গতিপথ ঘোরানোর জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে," তিনি বলেন। "পতন ধীর হলে বা বাজার একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা করলে সম্ভবত কেনাকাটা বন্ধ হবে।
দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে পতন চললে বিনিয়োগকারীরা বিক্রি অব্যাহত রাখায় বারবার কেনাকাটা করতে হতে পারে। সিনের মূল্যায়ন ছিল, বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে পুনরুদ্ধার না এলে হঠাৎ আতঙ্কে বিক্রির ঢেউ সামলানোর তুলনায় এভাবে বেশি অর্থ ব্যয় হতে পারে।
আগের দফার সহায়তা এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। রাষ্ট্রীয় কেনাকাটার পর আগস্টে সাংহাই কম্পোজিট ৪ শতাংশের বেশি বাড়ে, কিন্তু পরে আবার পতন শুরু হয় এবং অক্টোবরে আগের বছরের আগস্টের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছায়। ২০২৪ সালেও গ্রীষ্মজুড়ে ETF কেনাকাটা বাজারের পতন ঠেকিয়েছিল; তবে সেপ্টেম্বরে ব্যাপক নীতিগত পদক্ষেপে আস্থা বাড়ার পরই স্থায়ীভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যায়।
বেইজিং বড় ধরনের রাজস্ব প্রণোদনা প্যাকেজের বদলে লক্ষ্যভিত্তিক ও ধাপে ধাপে সহায়তা দেওয়াকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে, যদিও কিছু বিনিয়োগকারী এমন প্যাকেজ আশা করেছিলেন। তৃতীয় প্রান্তিকে ৪.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, যা ৪.৪ শতাংশের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি, বার্ষিক সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে প্রবৃদ্ধি রেখেছে। প্রথম নয় মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৬ শতাংশ, আর সেপ্টেম্বরে শিল্প উৎপাদন বেড়েছে ৫.৫ শতাংশ।
নিরাপত্তা নাকি সম্ভাব্য পুনরুদ্ধার, তা ভাবছেন পরিবারগুলো
এইচএসবিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীনে দৈনিক লেনদেনের প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের, যেখানে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে এ হার প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। চীনের অংশ তাই প্রায় চার গুণ বেশি, ফলে দৈনিক লেনদেনে পরিবারগুলোর আস্থার পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
চায়না মার্কেট রিসার্চ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শন রেইন ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, এআই খাতে বুদ্বুদের আশঙ্কা এবং ভোক্তা-আস্থা দুর্বল হওয়াকে আরও বিক্রির চাপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আবাসন ও কর্মসংস্থানের দুর্বল পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা মেয়াদি আমানত বেছে নিচ্ছেন। এতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ জমা রেখে সুদ পাওয়া যায়।
নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতি এই ঝোঁক ব্যাখ্যা করে রেইন বলেন:
চীনাদের কাছে বিষয়টি সম্পদ ধরে রাখার,
তবে রেইন এই বিক্রির চাপকে অতিরিক্ত বলে অভিহিত করেছেন। তিনি স্থিতিশীল রপ্তানি এবং বড় শহরগুলোতে আবাসনের দাম উন্নতির লক্ষণের কথা উল্লেখ করেন। এর আগে আবাসন খাতে অসম পুনরুদ্ধারের লক্ষণ হিসেবে দেখা গিয়েছিল, ১ থেকে ২৩ মার্চের মধ্যে সাংহাইয়ে প্রায় ২২ হাজার পুরোনো বাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির একই সময়ের তুলনায় ১৭০ শতাংশ বেশি। সম্পদশালী ক্রেতাদের মধ্যে এ পুনরুজ্জীবন বেশি শক্তিশালী ছিল, তবে আবাসন নির্মাতারা ঋণ ও নির্মাণসংক্রান্ত সমস্যায় পড়ে ছিলেন।
২০২৭ সালে চীনের শেয়ারবাজারে জোরালো পুনরুদ্ধার হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন রেইন। মুনাফা বাড়ার প্রমাণ খুঁজতে বিনিয়োগকারীরা এখন তৃতীয় প্রান্তিকের কোম্পানিগুলোর আরও ফলাফলের দিকে নজর রাখবেন। পাশাপাশি পরিবারগুলোর চাহিদা বাড়াতে নীতিগত পদক্ষেপের ঘোষণাও পর্যবেক্ষণ করবেন তাঁরা। বৃহত্তর প্রণোদনা প্যাকেজের কোনো সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
মূল বিষয়গুলো
- ২২ অক্টোবর লেনদেনের সময় CSI 300 জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ২০ শতাংশ পড়ে যায়; এর আগে টানা ১০ সপ্তাহ পতন হয়েছিল।
- প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে আরও বেশি ক্ষতি হয়েছে; চলতি ছয় মাসে STAR 50 প্রায় ৪০ শতাংশ পড়েছে।
- প্রান্তিক মুনাফা বৃদ্ধির হার বিনিয়োগকারীদের হতাশ করায় বুধবার CATL-এর শেয়ার ১২ শতাংশ কমেছে।
- জানুয়ারি থেকে আগস্টে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী শিল্প মুনাফা ১৫.৭ শতাংশ বেড়েছে, তবে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও যানবাহন উৎপাদনে মুনাফা কমেছে।
- বিশ্লেষকদের ধারণা, আরও শেয়ার কেনার জন্য সেন্ট্রাল হুইজিনের হাতে প্রায় ১৮৮ বিলিয়ন ডলার থাকতে পারে।
- তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪.৫ শতাংশ হয়েছে, তবে পরিবারগুলোর দুর্বল আস্থা ও কোম্পানির মুনাফার ওপর চাপ শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলছে।






