আটটি উড়োজাহাজ বান কিউনকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে
আটটি উড়োজাহাজ, প্রায় ২,০০০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে এবং চলমান নির্মাণকাজ—সব মিলিয়ে সদ্য চালু হওয়া চীন-লাওস সামরিক বিমান চলাচল স্থাপনাটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে। ভিয়েনতিয়েনের প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে বান কিউনে অবস্থিত এই স্থাপনা চীনকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে সামরিক প্রবেশের নতুন সুযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে লাওসের বিমানবাহিনীর পাইলটদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রও তৈরি হচ্ছে।
সূচিপত্র
- আটটি উড়োজাহাজ বান কিউনকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে
- কেন্দ্রটি কী করবে বলে জানিয়েছে চীন
- উড়োজাহাজ ও রানওয়ে থেকে কী বোঝা যায়
- পুরোনো বিমানঘাঁটিতে নতুন স্থাপনা
- এটিকে ঘাঁটি বলা নিয়ে বিশ্লেষকদের মতভেদ কেন
- পশ্চিম সীমান্ত ও সমুদ্র—দুই দিকেই নজর ভিয়েতনামের
- রেলপথ লাওসকে সুবিধা ও দায়—দুটিই দিচ্ছে
- প্রবেশাধিকারের নিয়ম কেন গুরুত্বপূর্ণ, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া তা দেখায়
- লাওসের বাইরেও কী বদলাতে পারে
- মূল বিষয়গুলো
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চীন-লাওস যৌথ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করা হয়েছে এবং দুই দেশ যৌথভাবে এটি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করবে। এই প্রকল্পে চীন-লাওস মৈত্রী বিমান চলাচল একাডেমিও রয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ১১ মাসেরও কম সময়ে নতুন স্থাপনাটি নির্মাণ করেছে। এর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে এমন একটি বিমানঘাঁটি, যার ইতিহাস ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কার গোপন মার্কিন অভিযান পর্যন্ত বিস্তৃত।
৯月 ৩০ তারিখে তোলা বাণিজ্যিক উপগ্রহচিত্রে সহায়ক যানবাহনের পাশে আটটি উড়োজাহাজ দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের শনাক্ত করা এসব উড়োজাহাজ হংডু জেএল-৮, যা কে-৮ নামেও পরিচিত। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের তালিকায় লাওসের কাছে এ ধরনের চারটি উড়োজাহাজ আছে। ফলে বান কিউনে দেখা আটটি উড়োজাহাজ ওই তালিকাভুক্ত বহরের দ্বিগুণ। এগুলোর মালিকানা ও পরিচালনার ব্যবস্থা তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
বেইজিং প্রকল্পটিকে বাস্তবভিত্তিক সামরিক সহযোগিতা হিসেবে তুলে ধরেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এর সম্ভাব্য ব্যবহার জ্বালানি ভরা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং চীনা উড়োজাহাজকে সহায়তা করার কাজ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে এখন এমন একটি স্থাপনা মূল্যায়ন করতে হবে, যার বর্তমান প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সক্ষমতার প্রভাব ভিন্ন। বান কিউনের রানওয়ে, উড়োজাহাজ ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে ৮ অক্টোবরের মূল্যায়নে যে উদ্বোধনের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছিল, এই অগ্রগতি তারই পরবর্তী ধাপ।
কেন্দ্রটি কী করবে বলে জানিয়েছে চীন
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দুটি উদ্দেশ্যের কথা জানিয়েছে: লাওসের বিমানবাহিনীর পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং যৌথ মহড়ায় রসদ সহায়তা দেওয়া। রসদ বলতে সামরিক কার্যক্রম চালু রাখতে প্রয়োজনীয় লোকজন, জ্বালানি, সরঞ্জাম ও অন্যান্য উপকরণের পরিবহন এবং সরবরাহ বোঝায়।
ঘোষণায় পরিচালনাব্যবস্থা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে মন্ত্রণালয় বলেছে:
দুই পক্ষের যৌথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায় এই কেন্দ্রের লক্ষ্য হলো লাওসকে তার বিমানবাহিনীর পাইলটদের প্রশিক্ষণ জোরদারে সহায়তা করা।
মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, স্থাপনাটি “কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে তৈরি হয়নি” এবং এটি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে। লাওসের সরকারি সংবাদ সংস্থা উদ্বোধনকে সামরিক বিমান চলাচলে সহযোগিতার নতুন পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
২০১৭ সাল থেকে লাওসে চীন ও লাওস আটটি যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে। একটি স্থায়ী সহায়তা কেন্দ্র এসব কর্মকাণ্ডের জন্য নিয়মিত স্থান দেবে এবং প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সহায়তার আয়োজন সহজ করতে পারে। লাওসের পাইলটদের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধা হলো এমন প্রশিক্ষণ ও স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ, যা ছোট বিমানবাহিনীর পক্ষে এককভাবে জোগানো কঠিন হতে পারে।
কেন্দ্রটিতে কতজন কাজ করবেন, কী কী সরঞ্জাম থাকবে বা সেখানে চীনের প্রবেশাধিকারের শর্ত কী—কোনো সরকারই তা বিস্তারিত জানায়নি। এসব ব্যবস্থাই নির্ধারণ করবে কেন্দ্রটির দৈনন্দিন কার্যক্রমের কতটা লাওসের প্রশিক্ষণে এবং কতটা চীনের সামরিক বাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মির কাজে ব্যবহৃত হবে।
উড়োজাহাজ ও রানওয়ে থেকে কী বোঝা যায়
কে-৮ দুই আসনের একটি উড়োজাহাজ, যা পাইলটদের জেট উড়ানো ও আরও উন্নত কাজ শেখাতে ব্যবহৃত হয়। হালকা আক্রমণ অভিযানে এটি অস্ত্রও বহন করতে পারে। একাডেমিতে এই উড়োজাহাজের উপস্থিতি প্রশিক্ষণের সঙ্গে মানানসই, তবে এতে উড়োজাহাজটির সম্ভাব্য যুদ্ধকালীন ভূমিকাও রয়েছে।
ভ্যান্টর উপগ্রহচিত্রে এ ধরনের আটটি উড়োজাহাজ এবং দুই ডজনের বেশি সহায়ক যানবাহন দেখা গেছে। রানওয়ের আশপাশে নির্মাণকাজ চলছিল; এর মধ্যে সম্ভাব্য সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত কাজও রয়েছে। উপগ্রহচিত্রে ভবন, পাকা জায়গা ও পার্ক করা উড়োজাহাজ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে কেন্দ্রটি কীভাবে কাজ করে, তার পূর্ণ চিত্র দেবে পরিচালনার সময়সূচি ও প্রবেশাধিকারের চুক্তি।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মসূচির গবেষণা সহযোগী ডেভিড ভ্যালান্সের মূল্যায়ন, পিপলস লিবারেশন আর্মি বিমানবাহিনীর বোমারু উড়োজাহাজের জন্য রানওয়েটি খুব ছোট; তাঁর মতে, ওই উড়োজাহাজের প্রায় ৩,০০০ মিটার রানওয়ে প্রয়োজন। বান কিউনের রানওয়ে প্রায় ২,০০০ মিটার, অর্থাৎ ওই দৈর্ঘ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
প্যাসিফিক ফোরামের সহযোগী ফেলো আলেকজান্ডার নিল বলেছেন, নকশাটি সম্প্রসারণের সুযোগ রাখে বলে মনে হচ্ছে:
বড় উড়োজাহাজ চলাচলের সুযোগ করে দিতে রানওয়ে সম্প্রসারণের উপযোগী করে বিমানঘাঁটিটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
রানওয়ে দীর্ঘ হলে বান কিউনে ব্যবহারযোগ্য উড়োজাহাজের ধরন বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম চালাতে উপযুক্ত পার্কিংয়ের জায়গা, রক্ষণাবেক্ষণ স্থাপনা ও জ্বালানির সরবরাহও প্রয়োজন হবে। যুদ্ধাভিযানের জন্য লাগবে গোলাবারুদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা। রানওয়ের দৈর্ঘ্যের পাশাপাশি এসব সহায়ক ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
পুরোনো বিমানঘাঁটিতে নতুন স্থাপনা
চীনের সম্পৃক্ততার বহু দশক আগেই বান কিউনের সামরিক ইতিহাস শুরু। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বিমানঘাঁটিটি লিমা সাইট ৪৪ নামে পরিচিত ছিল এবং এয়ার আমেরিকা এটি ব্যবহার করত। এয়ার আমেরিকা ছিল মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর গোপনে মালিকানাধীন বিমান সংস্থা।
লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ রায়ান উলফসন-ফোর্ড বিমানঘাঁটির নথিপত্র থেকে এই ইতিহাস শনাক্ত করেছেন। পুরোনো বিমানঘাঁটিটি পুনর্ব্যবহারের ফলে লাওসে একসময় মার্কিন গোপন অভিযানের সঙ্গে যুক্ত স্থানে চীনের সহায়তায় সামরিক প্রকল্প গড়ে উঠছে।
নতুন স্থাপনাটির উন্নয়ন দ্রুত এগিয়েছে, তবে আশপাশের পরিবহন-সংযোগ গড়ে তুলতে লেগেছে বহু বছর:
- ২০১৬: চীন-লাওস রেলপথ নির্মাণ শুরু হয়।
- ২০১৭ সাল থেকে: চীন ও লাওস লাওসে আটটি যৌথ সামরিক মহড়া চালায়।
- ডিসেম্বর ২০২১: চীন-লাওস রেলপথ চালু হয়।
- ২০২৫ সালের শেষ দিকে: উপগ্রহচিত্রে বান কিউনের নতুন স্থাপনার নির্মাণকাজ শুরু হতে দেখা যায়।
- ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬: চীন যৌথ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উদ্বোধনের ঘোষণা দেয়।
- ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬: উপগ্রহচিত্রে বিমানঘাঁটিতে আটটি উড়োজাহাজ দেখা যায়, নির্মাণকাজও চলতে থাকে।
এই সময়রেখায় দুটি অগ্রগতির যোগসূত্র দেখা যায়: সামরিক সহযোগিতা বছরের পর বছর ঘনিষ্ঠ হয়েছে এবং পরিবহন নেটওয়ার্ক চীন থেকে লাওসে যাতায়াত সহজ করেছে। বান কিউন সেই সম্পর্কে একটি বিমান চলাচল স্থাপনা যুক্ত করেছে।
এটিকে ঘাঁটি বলা নিয়ে বিশ্লেষকদের মতভেদ কেন
সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো কলিন কোহ বান কিউনকে ভবিষ্যতে চীনের সামরিক অবস্থান শক্ত করার সম্ভাব্য কেন্দ্র বলে মনে করেন। তাঁর মতে, বিমানঘাঁটিটি জ্বালানি ভরা ও পুনরায় সরবরাহের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও অনুসন্ধানের কাজে সহায়তা করতে পারে। এই শেষের তিনটি কাজের মধ্যে রয়েছে তথ্য সংগ্রহ, কোনো এলাকার ওপর নজর রাখা এবং সম্ভাব্য সামরিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ।
কোহের আরও ধারণা, বাণিজ্যিক বিমানবন্দর হিসেবে বিদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ব্যাপকভাবে খুলে দেওয়ার বদলে স্থাপনাটি মূলত লাওসের বিমানবাহিনী ও পিপলস লিবারেশন আর্মি বিমানবাহিনী ব্যবহার করবে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ জশুয়া কুরলানজিক একে বিদেশে চীনের প্রথম বিমানবাহিনীর ঘাঁটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আবুধাবির রাবদান একাডেমির সহকারী অধ্যাপক অলি পেক্কা সুর্সা এর বর্তমান সামরিক মূল্যকে আরও সীমিতভাবে দেখেন। নিজ দেশের বাইরে দীর্ঘ সময় অভিযান চালাতে যে জায়গা ও অবকাঠামো লাগে, তিনি সেদিকে নজর দিয়েছেন: উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের বড় এলাকা, আশ্রয়স্থল, জ্বালানি ও গোলাবারুদ সংরক্ষণ।
চীনের সামরিক বিষয়ক ভাষ্যকার সং ঝোংপিংয়ের বক্তব্য, স্থাপনাটি সম্পূর্ণ লাওসের মালিকানাধীন; সেখানে চীনের কোনো স্বতন্ত্র সেনা ছাউনি নেই এবং একচেটিয়া ব্যবহারের অধিকারও নেই। তাঁর বর্ণনা, কোহের পূর্বাভাস ও সুর্সার মূল্যায়ন—এই তিনটিই বিষয়টির ভিন্ন ভিন্ন দিক নিয়ে: মালিকানা, প্রবেশাধিকার ও কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা।
প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য বাস্তব প্রশ্ন হলো, চীনা উড়োজাহাজ কত ঘন ঘন সেখানে আসে, কর্মীরা কত দিন থাকেন এবং কী ধরনের সহায়ক অবকাঠামো গড়ে ওঠে। আনুষ্ঠানিক নামের চেয়ে এসব প্রবণতাই বান কিউনের সামরিক ভূমিকা আরও সরাসরি নির্ধারণ করবে।
পশ্চিম সীমান্ত ও সমুদ্র—দুই দিকেই নজর ভিয়েতনামের
যুদ্ধকালীন সহযোগিতা ও দুই দেশের ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিত্তিতে লাওসের সঙ্গে ভিয়েতনামের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। লাওসে চীনের সামরিক উপস্থিতি বাড়লে হ্যানয়ের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় পশ্চিম দিকের একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়; পাশাপাশি দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের সঙ্গে ভিয়েতনামের ভূখণ্ডগত বিরোধও রয়েছে।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক হান্টার মার্স্টনের মতে, উদ্বেগের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে। তাঁর যুক্তি, লাওস ও কম্বোডিয়ায় চীনের শক্তিশালী অবস্থান ভিয়েতনামের জন্য আঞ্চলিক পরিবেশে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমিয়ে দেয়।
দেশটির অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক ভিয়েতনামি কর্মকর্তা তুলনামূলক সতর্কভাবে হ্যানয়ের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, স্থাপনাটি মূলত প্রশিক্ষণ ও মানবিক ত্রাণে মনোযোগী; তবে লাওসে চীনের প্রভাব জোরদার করার মাধ্যম হিসেবেও একে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আলোচনার অনুমতি না থাকায় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
তাই ভিয়েতনামের প্রতিক্রিয়া চীনা উড়োজাহাজ কত দূর যেতে পারে, তা হিসাব করার মধ্যেই সীমিত নয়। হ্যানয়কে ভিয়েনতিয়েনের সঙ্গে সম্পর্কও ধরে রাখতে হবে। সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিয়ে জনসমক্ষে চাপ তৈরি হলে সহযোগিতা কঠিন হতে পারে। নির্ভরযোগ্য পরিবহন প্রকল্প, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এই বন্ধন বজায় রাখার আরেকটি উপায়।
রেলপথ লাওসকে সুবিধা ও দায়—দুটিই দিচ্ছে
চীন-লাওস রেলপথ থেকে বোঝা যায়, চীনের সহযোগিতা লাওসের নেতাদের কাছে কেন আকর্ষণীয়। ২০১৬ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে রেলপথটি ২০২১ সালের ডিসেম্বরে চালু হয়। এর ব্যয় ছিল প্রায় ৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সে সময় লাওসের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। মোট দেশজ উৎপাদন হলো এক বছরে কোনো অর্থনীতিতে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মূল্য।
সমুদ্র উপকূলবিহীন একটি দেশের জন্য বিদেশি বাজারে দ্রুত পৌঁছানোর সুযোগ বাস্তবিকই গুরুত্বপূর্ণ। আগে যে পার্বত্য এলাকায় যাতায়াত ধীরগতির ও অনিশ্চিত ছিল, সেই পথ ধরে রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করা যায়। তবে এতে বড় আর্থিক দায়ও তৈরি হয়েছে এবং লাওসের অর্থনীতিতে চীনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক র্যাচেল ভ্যানডেনব্রিঙ্ক ভূগোল ও প্রবেশাধিকারের যোগসূত্র তুলে ধরেছেন:
চীনের সঙ্গে অভিন্ন সীমান্ত এবং রেলপথসহ অবকাঠামোগত সংযোগ থাকায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে সহজে প্রবেশযোগ্য অবস্থান হিসেবে লাওসের কিছু ভূকৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
বান কিউন রেলপথের করিডরের কাছে অবস্থিত, যা চীন থেকে লোকজন ও সরঞ্জাম আনার সম্ভাব্য পথ তৈরি করে। ভিয়েতনামের প্রস্তাবিত ভিয়েনতিয়েন-ভুং আং রেলপথ ভিয়েতনামের উপকূল দিয়ে লাওসকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরেকটি সংযোগ দেবে। তবে অর্থায়নের জটিলতা প্রকল্পটির উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
ফলে লাওসের সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে অংশীদাররা কী দিতে পারে, তার ওপর। চীনের অবকাঠামো পরিবহন ও বিনিয়োগের সুবিধা দিচ্ছে; অন্যদিকে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা সম্পর্কটির গুরুত্ব বাড়াচ্ছে। বাস্তব অর্থনৈতিক সুযোগের পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রভাব নিয়েও ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চলছে।
প্রবেশাধিকারের নিয়ম কেন গুরুত্বপূর্ণ, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া তা দেখায়
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ হলেও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা থাইল্যান্ড প্রকাশ্যে সংযত অবস্থান নিয়েছে। থাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল সুরাসান্ত কংসিরি বলেছেন, চীনা স্থাপনার অনুমতি দেওয়া লাওসের সার্বভৌম অধিকার।
সুরাসান্ত ব্যাংককের চলমান আগ্রহের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন:
তা সত্ত্বেও, বিশেষ করে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিষয়টি কীভাবে এগোয়, সে বিষয়ে থাইল্যান্ড ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখবে।
চীনের অর্থায়নে সম্প্রসারিত কম্বোডিয়ার রিয়াম নৌঘাঁটি এবং সেখানে যৌথ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠায় তুলনাটি প্রাসঙ্গিক। কম্বোডিয়ার বক্তব্য, ঘাঁটিটি তাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত। ২০২৫ সালের এপ্রিলে জাপান ও ভিয়েতনামের নৌযান সেখানে যায়; এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যায় মার্কিন নৌবাহিনীর একটি জাহাজ।
এই সফরগুলো দেখায়, চীনের সহায়তায় নির্মিত অবকাঠামোর কৌশলগত তাৎপর্য প্রবেশাধিকারের ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। কম্বোডিয়ার সংবিধানের ৫৩ অনুচ্ছেদে স্থায়ী নিরপেক্ষতার অঙ্গীকার রয়েছে এবং বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বান কিউনের যৌথ পরিচালনা নিয়ে ভিন্ন ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে চীনের সামরিক ব্যবহারের শর্ত।
রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব নম পেনের জুনিয়র গবেষক ও প্রভাষক সেরেইসোভাথানা মগনের মতে, লাওস ও কম্বোডিয়ার নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং অংশীদার বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। তাঁর যুক্তি আঞ্চলিক একটি টানাপোড়েন তুলে ধরে: প্রতিবেশীরা চীনের প্রবেশাধিকার নিয়ে আশ্বাস চায়, আর ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তাবিষয়ক সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রণ চায়।
লাওসের বাইরেও কী বদলাতে পারে
ভবিষ্যতে বান কিউন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডজুড়ে চীনা উড়োজাহাজকে জ্বালানি ভরা, সরবরাহ নেওয়া বা তথ্য সংগ্রহের আরেকটি জায়গা দিতে পারে। এর অবস্থান চীনের প্রবেশাধিকারের পরিসর কম্বোডিয়ার উপকূল ও জিবুতির রসদঘাঁটির বাইরেও বিস্তৃত করে।
তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের সু ত্জু-ইউন ধারণা দিয়েছেন, তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে সংঘাতের সময় উন্নত স্থাপনাটি ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া থেকে ইন্দোচীনের ওপর দিয়ে যাওয়া মার্কিন উড়োজাহাজকে বাধা দিতে চীনকে সহায়তা করতে পারে। এটি সম্ভাব্য যুদ্ধকালীন ভূমিকার একটি পূর্বাভাস, যা সেখানে মোতায়েন উড়োজাহাজ ও সহায়ক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।
মার্স্টনও বলেছেন, বড় উড়োজাহাজ রাখার উপযোগী করে রানওয়ে সম্প্রসারণ করা হলে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামজুড়ে সামরিক পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে; এর মধ্যে থাইল্যান্ডে বহুজাতিক মহড়া নিয়ে সিদ্ধান্তও রয়েছে। নিলের ধারণা, ভবিষ্যতে ইলেকট্রনিক সংকেত সংগ্রহ ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত উড়োজাহাজও সেখানে রাখা হতে পারে।
লাওস এখন বিমান চলাচল প্রশিক্ষণের একটি স্থাপনা পাচ্ছে। চীন পাচ্ছে আরও উন্নয়নের সুযোগসহ যৌথভাবে পরিচালিত একটি কেন্দ্র। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো হবে অবকাঠামো ও পরিচালনায়: রানওয়ের কাজ, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা, উড়োজাহাজ মোতায়েন এবং চীনা কর্মীদের ব্যবহারের ধরন। ঘোষিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বাইরে বান কিউনের ভূমিকা কতটা বাড়বে, তা এসবই নির্ধারণ করবে।
মূল বিষয়গুলো
- চীন ও লাওস ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ভিয়েনতিয়েনের প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে বান কিউন যৌথ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উদ্বোধন করেছে।
- চীনের বক্তব্য, যৌথভাবে পরিচালিত স্থাপনাটিতে লাওসের পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং সামরিক সহযোগিতায় সহায়তা করা হবে।
- উপগ্রহচিত্রে আটটি সম্ভাব্য কে-৮ উড়োজাহাজ, সহায়ক যানবাহন এবং প্রায় ২,০০০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে দেখা গেছে।
- বিশ্লেষকেরা ভবিষ্যতে রসদ ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখছেন; তবে বর্তমানে চীনের বিমানঘাঁটি হিসেবে এর সক্ষমতা নিয়ে তাঁদের মতভেদ রয়েছে।
- লাওসে প্রভাব বিস্তারের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ভিয়েতনাম নিরাপত্তা-উদ্বেগ বিবেচনা করছে; থাইল্যান্ড বলেছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
- ভবিষ্যতে উড়োজাহাজ মোতায়েন, নির্মাণকাজ ও প্রবেশাধিকারের ব্যবস্থা আঞ্চলিক গুরুত্ব নির্ধারণ করবে।






