পুনর্মিলন, যা হয়ে উঠেছিল আজীবন অনুসন্ধান
সামরিক চিকিৎসক ত্রান ভান বান ১৯৭৬ সালের শেষ দিকে পরিবারের কাছে ফিরে এসে দেখেন, তাঁর স্মরণে একটি বেদি স্থাপন করা হয়েছে। তাঁর মা ছেলের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিলেন এবং সাত বছর ধরে তাঁর শোকে দিন কাটিয়েছিলেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর, ৮২ বছর বয়সী এই প্রবীণ সেনাসদস্য এখন সেইসব সৈনিকের দেহাবশেষ উদ্ধারে সহায়তা করছেন, যাঁদের পরিবারের সদস্যরা এখনও তাঁদের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।
সূচিপত্র
- পুনর্মিলন, যা হয়ে উঠেছিল আজীবন অনুসন্ধান
- বাতির আলোয় যিনি বারবার ছেলেকে দেখতেন
- আহত সৈনিক থেকে সামরিক চিকিৎসক
- অন্য মায়েদের জন্য দরকার ছিল ভিন্ন ধরনের ঘরে ফেরা
- পাঁচটি নোটবই আর ট্রেনে বাড়ি ফেরার যাত্রা
- পুরোনো একটি ছবি যেভাবে কবরের অবস্থান খুঁজে পেতে সাহায্য করল
- উদ্ধারকাজের পেছনের তারিখগুলো
- উদ্ধার হওয়া একটি নাম দেখায়, শনাক্তকরণে কতটা কাজ লাগে
- দেহাবশেষ উদ্ধার ও পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা
- জাতীয় অভিযান, আর অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো
- মূল তথ্য
২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর হো চি মিন সিটির লে থি রিয়েং সাংস্কৃতিক পার্কে ‘খুক ত্রি আন’ স্মরণ অনুষ্ঠানে বান তাঁর অসাধারণ ফিরে আসার গল্প বলেন। পার্কের নিচে উদ্ধারকারী দল ৭৩১ জনের দেহাবশেষ পেয়েছে, যাঁদের কর্তৃপক্ষ শহীদ সৈনিক হিসেবে শনাক্ত করেছে; তাঁদের অধিকাংশের নাম বা নিজ এলাকার পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
১৪ অক্টোবরের স্মরণ ও দাফন অনুষ্ঠানের আগে এই আয়োজন করা হয়। বানের কাছে অনুষ্ঠানটি তাঁর জীবনের দুটি অধ্যায়কে একসূত্রে এনেছে: মায়ের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে আসা ছেলে এবং অন্য মায়েদের সন্তানদের ঘরে ফেরাতে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে যাওয়া এক জীবিত মানুষ।
১৯৭৯ সাল থেকে তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে ২,৩০০টিরও বেশি সমাধিস্থলের অবস্থান যাচাই, ১৩৪ জনের দেহাবশেষ তাঁদের নিজ এলাকায় ফিরিয়ে নিতে সহায়তা এবং ২০০টিরও বেশি পরিবারের তথ্য যাচাই। ঐতিহাসিক ছবি, সামরিক নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি ও ডিএনএ পরীক্ষার সমন্বয়ে পরিচালিত আরও বড় একটি কার্যক্রমে এখন তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগছে।
প্রতিটি পদ্ধতি আলাদা প্রশ্নের উত্তর দেয়। ছবি দেখে খননের সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করা যায়। কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর মনে থাকতে পারে সেখানে কাকে দাফন করা হয়েছিল। টিকে থাকা কোনো নথি বা জেনেটিক মিল অবশেষে কোনো পরিবারের কাছে পরিচয়টি স্পষ্ট করতে পারে। এসব সূত্রকে একত্রে মেলানোর চেষ্টা করেই কেটেছে বানের কয়েক দশক।
বাতির আলোয় যিনি বারবার ছেলেকে দেখতেন
হাইফংয়ের ভিন বাও ছেড়ে ১৯৬৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন বান। দক্ষিণ ভিয়েতনামে দায়িত্ব পালনের সময় পরিবারের সঙ্গে যুদ্ধকালীন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বাড়িতে স্বজনেরা তাঁর মৃত্যুসংবাদ পান এবং তাঁর স্মরণে বেদি স্থাপন করেন।
১৯৭৬ সালের শেষ দিকে তিনি যখন অবশেষে বাড়ি ফেরেন, বিস্ময়ে প্রতিবেশীরা জড়ো হন। তাঁর দুই ছোট বোন তাঁকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। ঘরে ঢুকে নিজের স্মরণে স্থাপিত বেদি দেখার পরই তিনি তাঁদের প্রতিক্রিয়ার কারণ বুঝতে পারেন।
স্বজনেরা তাঁর মাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন, যাতে তিনি ছেলেকে দেখতে পারেন। প্রায় এক দশক বিচ্ছিন্ন থাকার পর ছেলেকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও তিনি সহজে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে সে বেঁচে আছে।
সেদিন রাতে মা হাতে তেলের বাতি নিয়ে তাঁর বিশ্রামের জায়গায় যান। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাঁকে দেখেন, শরীর ছুঁয়ে দেখেন, তারপর চলে গিয়ে আবার ফিরে আসেন। তৃতীয়বার আসার পর বান তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তাঁর ছেলে জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরেছে। তখনই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বানের ফিরে আসা গ্রামের অন্য মায়েদের কাছে দ্রুত আশার উৎস হয়ে ওঠে। সরকারি নথিতে মৃত ঘোষিত কোনো ছেলে যদি বাড়ি ফিরতে পারে, তবে তাঁদের নিখোঁজ ছেলেরাও হয়তো একদিন ফিরে আসবে—এই আশা জাগে তাঁদের মনে।
আহত সৈনিক থেকে সামরিক চিকিৎসক
বানের সামরিক দায়িত্ব তাঁকে নিয়ে যায় কু চি, বেন কাত ও ত্রাং বাংয়ে—যে এলাকাটি ‘আয়রন ট্রায়াঙ্গল’ নামে পরিচিত—এবং বৃহত্তর সাইগন ও জিয়া দিন যুদ্ধক্ষেত্রে। আশপাশের আহত সৈনিকদের প্রয়োজন থেকেই তাঁর চিকিৎসা-পেশার বিকাশ ঘটে।
১৯৭০ সালে গুরুতর আহত হলে তাঁকে সামরিক চিকিৎসা ইউনিট সি১০-এ নেওয়া হয়। উত্তর ভিয়েতনাম ছাড়ার আগে তিনি প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। নিজের চেয়ে গুরুতর আহত সৈনিকদের ক্ষত বাঁধা, ইনজেকশন দেওয়া ও সেবা করার কাজে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসেন।
পরে কম্বোডিয়ায় দুই বছর সামরিক চিকিৎসাবিদ্যা পড়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যান, এবার যুদ্ধকালীন চিকিৎসাকর্মী হিসেবে। যুদ্ধের পর আরও চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ে তিনি চিকিৎসক হন।
যুদ্ধকালীন চিকিৎসাকর্মী হিসেবে নিজের দায়িত্বের কথা বলতে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার সময়কার বিপদের কথা স্মরণ করেন বান:
সামরিক চিকিৎসকও ছিলেন একজন সৈনিক। আমাদের অস্থায়ী হাসপাতালগুলো ছিল বোমা আর গোলার মাঝখানে। শান্তিকালীন অপারেশন থিয়েটারের মতো শান্তি ও নিরাপত্তা সেখানে ছিল না।
তাঁর স্মৃতিচারণায় ভয়াবহ প্রাণহানির বিবরণ রয়েছে: ৬০০ জনের বেশি সদস্যের একটি ইউনিটে নতুন সদস্য যোগ হয়ে সংখ্যা প্রায় ১,০০০ হলেও পুনরেকত্রীকরণের সময় জীবিত ছিলেন মাত্র ১০০ জনের কিছু বেশি। তাঁর সামরিক জীবনের আরেক বিবরণে বলা হয়েছে, তাঁর সঙ্গে দক্ষিণে যাওয়া ৬৫৩ জন সৈনিকের মধ্যে ৫০ জনেরও কম বেঁচে ছিলেন।
অন্য মায়েদের জন্য দরকার ছিল ভিন্ন ধরনের ঘরে ফেরা
বানের নিজ শহরের ২৯ জন তরুণ ১৯৬৭ সালের ২৫ মার্চ একসঙ্গে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বানের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের পর তাঁদের মধ্যে মাত্র দুজন জীবিত ফিরে আসেন—দলের প্রায় সাত শতাংশ। ওই দলের ১৩ জনের দেহাবশেষ পরে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন নুয়েন বা হোয়া ও নুয়েন চুং কিয়েন। শৈশব, পড়াশোনা, সেনাবাহিনীতে যোগদান এবং দক্ষিণে সামরিক দায়িত্ব—সবই তাঁরা একসঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন। দুজনই যুদ্ধে মারা যান।
বান বেঁচে থাকলেও তাঁর পরিবার তাঁর মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিল। হোয়া ও কিয়েনের পরিবার শুরুতে তাঁদের মৃত্যুর সরকারি নিশ্চিতকরণ পায়নি। বান বাড়ি ফিরলে তাঁদের মায়েরা নতুন আশায় তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। পরে ছেলেদের মৃত্যুর নিশ্চিত খবর পাওয়ার পর তাঁরা বানের কাছে জানতে চান, তাঁদের কোথায় দাফন করা হয়েছে।
বিভিন্ন বিবরণে বলা হয়েছে, বানের ফেরার পর তাঁদের এই সাক্ষাৎ হয় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে—কয়েক দিন থেকে শুরু করে প্রায় এক বছর পরের এক সফর পর্যন্ত। তাঁদের মূল অনুরোধটি মনে রেখেছিলেন বান: তাঁরা ছেলেদের খুঁজে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।
১৯৭৯ সালে তিনি নিয়মিতভাবে অনুসন্ধান শুরু করেন। সাবেক যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দাফনের তথ্যের সঙ্গে তাঁদের স্মৃতি মিলিয়ে দেখেন। শুরুর দিকের সফরগুলো তিনি করতেন একটি পুরোনো সাইকেলে, কখনো কখনো ভোর তিনটায় যাত্রা শুরু করে। ছুটির দিন ও কাজ থেকে অবসর পাওয়া সময়টুকু কাজে লাগিয়ে খোঁজ চালিয়ে যান।
পাঁচটি নোটবই আর ট্রেনে বাড়ি ফেরার যাত্রা
নাম, হাতে আঁকা নকশা ও মানচিত্রে ভরা পুরোনো পাঁচটি নোটবইয়ে দাফনের তথ্য সংরক্ষণ করেছিলেন বান। যুদ্ধের সময় তিনি কাগজে সহযোদ্ধাদের নাম লিখে কাচের শিশিতে ভরে মুখ বন্ধ করতেন, তারপর দাফনের আগে সেই শিশি তাঁদের মুখে রাখতেন—ফিরে এসে তাঁদের শনাক্ত করতে পারবেন, এই আশায়।
পরে মৃতদের উদ্ধারে তাঁর নোটবইগুলো কার্যকর উপকরণ হয়ে ওঠে। তিনি সেগুলোর তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিয়েতনাম ভেটেরানস অব আমেরিকার ‘ভেটেরানস ইনিশিয়েটিভ’-এর সংরক্ষিত নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। যুদ্ধের সময় নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য এই উদ্যোগে বিনিময় করা হয়।
নিখোঁজ মার্কিন সেনাদের খুঁজে পেতে আমেরিকান উদ্ধারকারী দলগুলোকেও সহায়তা করেন বান। ফলে তাঁর অনুসন্ধান নিজের সাবেক সহযোদ্ধাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়; যুদ্ধক্ষেত্রের যৌথ তথ্য কাজে লাগিয়ে তিনি দুই পক্ষের পরিবারেরই সহায়তা করেন।
যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা ও উদ্ধারকাজ নিয়ে লেখা একটি সাহিত্যকর্ম ১৯৯৭ সালে ভিয়েতনামের একটি বড় সাহিত্য পুরস্কার লাভ করে।
একটি অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত তাঁকে হোয়ার দেহাবশেষের কাছে নিয়ে যায়। বন্ধুকে উত্তরে বাড়ি পৌঁছে দিতে আরও একটি কঠিন যাত্রা করতে হয় তাঁকে। বান স্মরণ করেন, তাঁর ট্রেনের টিকিটে মানুষের দেহাবশেষ বহন নিষিদ্ধ ছিল; তবু ছোট পুঁটলিটি বুকে আগলে তিনি ট্রেনে উঠেছিলেন।
তিন দিন ও তিন রাত হোয়াকে সঙ্গে নিয়ে রেলপথে বাড়ির দিকে যাত্রা করেন তিনি। পৌঁছে দেহাবশেষটি পরিবারের বেদিতে রাখেন। ধানখেত থেকে ফিরে হোয়ার মা সেই পুঁটলির দিকে হাত বাড়ান—এত দিন ধরে যার ফেরার অপেক্ষা করেছিলেন, সেই সন্তানের দেহাবশেষ ছিল তাতে।
পুরোনো একটি ছবি যেভাবে কবরের অবস্থান খুঁজে পেতে সাহায্য করল
লে থি রিয়েং পার্কটি সাবেক দো থানহ কবরস্থানের স্থানে অবস্থিত। ঐতিহাসিক গবেষণা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে জানা যায়, ১৯৬৮ সালের তেত আক্রমণের সময় লড়াইয়ের পর সেখানে গণকবর দেওয়া হয়েছিল। ওই আক্রমণে কমিউনিস্ট বাহিনী দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিভিন্ন শহর ও সামরিক অবস্থানে হামলা চালায়।
স্থপতি নুয়েন সুয়ান থাং ও তাঁর গবেষক দল প্রায় আট বছর ধরে ঐতিহাসিক ছবি পরীক্ষা এবং পুরোনো স্থাপনার সঙ্গে আধুনিক পার্কের তুলনা করেন। ১৯৬৮ সালের একটি ছবিতে দেখা পানির ট্যাংকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকচিহ্ন হিসেবে কাজে আসে।
গবেষণায় ১৯৭২ সালের মার্কিন সামরিক আকাশচিত্র, সামরিক অভিযানের নকশা এবং দুই পক্ষের প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিও ব্যবহার করা হয়। গবেষকদের ধারণা, তিনটি গণকবরে প্রায় ৯০০ জনের দেহাবশেষ থাকতে পারে।
১৯৬৮ সালে দাফনের ঘটনা দেখার সময় নুয়েন থান ফুওকের বয়স ছিল ১২ বছর। তিনি মনে করতে পারেন, মরদেহগুলো স্তরে স্তরে রাখা হয়েছিল; সেগুলোর মাঝে ছিল কাঠের তক্তা ও সাদা জীবাণুনাশক গুঁড়া। পরে পার্ক সংস্কারের সময় হাড়, রাবারের স্যান্ডেল ও গুলির ম্যাগাজিন বেরিয়ে আসে।
উপপ্রধানমন্ত্রী ফাম থি থানহ ত্রার সভাপতিত্বে ৮ জুনের এক কর্মশালায় কর্মকর্তারা ঐতিহাসিক প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য ও জরিপের ফল একত্র করেন। উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী নুয়েন ভান গাউ বলেন, এসব তথ্য তেতের লড়াইয়ে নিহত সৈনিক, কর্মকর্তা ও বেসামরিক মানুষের গণকবর ওই এলাকায় রয়েছে—এমন ধারণাকে সমর্থন করে।
মাটির গভীরে সংকেত পাঠানো রাডার ব্যবহার করে মাটির নিচে নাড়াচাড়া হওয়া স্থান শনাক্ত করা হয়। খননযন্ত্র দিয়ে বিপুল পরিমাণ মাটি সরানো হয়; সম্ভাব্য দেহাবশেষ দেখা গেলেই সৈনিকেরা সতর্কতার সঙ্গে হাতে খনন শুরু করেন।
উদ্ধারকাজের পেছনের তারিখগুলো
ঐতিহাসিক সূত্রের তুলনা থেকে শুরু করে দেহাবশেষ উদ্ধার ও জনসমক্ষে শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি পর্যন্ত—পার্কে অভিযানটি কয়েক মাস ধরে এগিয়েছে। এর গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো হলো:
- ৮ জুন, ২০২৬: সাবেক কবরস্থানের দাফনসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে একটি কর্মশালায় বিভিন্ন প্রমাণ একত্র করা হয়।
- ২৩ জুন: ‘এ’ এলাকায় প্রথম পাঁচজনের দেহাবশেষ ও তাঁদের সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র পাওয়া যায়। বান স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সেখানে কাজ শুরু করেন।
- ৬ জুলাই: হুয়েন ভান কুয়েনের নাম লেখা একটি নথির তথ্য প্রকাশ করা হয়।
- ২৬ জুলাই: হো চি মিন সিটি সামরিক কমান্ড কুয়েনের দেহাবশেষ শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
- ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর: ‘এ’ এলাকায় আরেকটি কবরের খাত শনাক্ত করেন দলগুলো।
- ১৩ অক্টোবর: ৭৩১ জন উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির পরিকল্পিত দাফনের আগে শহীদদের সম্মানে ‘খুক ত্রি আন’ অনুষ্ঠান হয়।
- ১৪ অক্টোবর: হো চি মিন সিটি শহীদ সমাধিক্ষেত্রে দাফনসহ স্মরণ ও দাফন অনুষ্ঠানের দিন ধার্য হয়।
একটি অভিযানের কালপঞ্জিতে ৬ জুলাই অভিযান শুরুর কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, অনুসন্ধানমূলক খনন শুরু করার দুই দিন পর প্রথম কবরের খাতটি পাওয়া যায়; তবে উদ্ধারকাজের বিস্তারিত কালপঞ্জিতে প্রথম দেহাবশেষ পাওয়ার তারিখ ২৩ জুন। অভিযানের বিবরণে খাতটির দৈর্ঘ্য ২৫ মিটার ও প্রস্থ তিন মিটার বলা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া একটি নাম দেখায়, শনাক্তকরণে কতটা কাজ লাগে
২৩ জুন দেহাবশেষের পাশে পাওয়া প্লাস্টিকে মোড়ানো এক টুকরো কাগজ থেকে হুয়েন ভান কুয়েনের শনাক্তকরণ শুরু হয়। কাগজে টিকে থাকা লেখায় তাঁর নাম, ‘সাউদার্ন লিবারেশন আর্মি’ এবং ৯৬২ নম্বর ইউনিটের উল্লেখ ছিল।
তায় নিন প্রদেশের ভাম কো কমিউনের হুয়েন ভান মুয়োই ও হুয়েন ভান নো মনে করেন, নামটি তাঁদের ভাইয়ের হতে পারে। কয়েক দশক ধরে তাঁকে খুঁজছিল পরিবারটি।
একটি অক্ষরের কারণে নথিপত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। পুরোনো মৃত্যুসংবাদে তাঁর নাম ছিল হুয়েন ভান কুয়েন; আর পরিবারের জাতীয় স্বীকৃতিপত্রে তাঁর আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে নাম লেখা ছিল হুয়েন ভান কুয়েন—উদ্ধার হওয়া নথির নামের সঙ্গে যা মেলে। ২৬ জুলাই পরিচয় নিশ্চিত করার আগে কর্তৃপক্ষ নথিগুলো পর্যালোচনা করে।
যুদ্ধে যাওয়ার আগে তাঁকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং ৫৮ বছর অবিবাহিত ছিলেন নুয়েন থি লে। ১৮ জুলাই তায় নিনের স্বরাষ্ট্র দপ্তর তাঁকে কুয়েনের স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২৩ জুলাই পার্কে তিনি কুয়েনের একটি পুনর্নির্মিত প্রতিকৃতি পান।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর কলম, চিরুনি, মানিব্যাগ ও ঔষধি তেলের বোতল পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সংশোধিত মৃত্যুসংবাদে তাঁর সঠিক নাম পুনঃস্থাপন করা হয়। ঘটনাটি দেখায়, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, পরিবারের সাক্ষ্য ও প্রশাসনিক নথি একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে কীভাবে নিখোঁজের রহস্যের সমাধান হতে পারে।
দেহাবশেষ উদ্ধার ও পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা
আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ করা উদ্ধারকারী বাহিনীর সদস্য না হয়েও পার্কে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন বান। দেহাবশেষ আলাদা করে সাজানো, শারীরিক গঠন দেখে শনাক্তকরণ এবং পরীক্ষার জন্য হাড়ের টুকরো ও দাঁত সংরক্ষণে তিনি সহায়তা করেন।
তাঁর ব্যক্তিগত হিসাব অনুযায়ী, তিনি ২,৩০০টিরও বেশি সমাধিস্থলের অবস্থান যাচাই করেছেন এবং ১৩৪ জনের দেহাবশেষ নিজ এলাকায় ফিরিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন। অন্য প্রবীণ সেনাসদস্যদের সঙ্গে মিলে কাজ করে বান ২,৪০০ জনেরও বেশি মানুষের দেহাবশেষ খুঁজে পেতে সহায়তা করেছেন বলে একটি সামগ্রিক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হো চি মিন সিটি ফরেনসিক সেন্টারের ফরেনসিক পরীক্ষক ভুয়ং জিয়া বাও ব্যাখ্যা করেন, হাড় ও দাঁত শারীরিকভাবে শক্ত থাকতে পারে, যদিও ভেতরের ডিএনএ ভেঙে খণ্ডিত হয়ে গেছে। তাপ, আর্দ্রতা, ভূগর্ভস্থ পানি ও অণুজীব কয়েক দশকে এই জেনেটিক উপাদানের ক্ষতি করতে পারে।
ডিএনএ বংশগত জৈবিক তথ্য বহন করে। তদন্তকারীরা দেহাবশেষে টিকে থাকা জেনেটিক উপাদানের সঙ্গে স্বজনদের নমুনা তুলনা করে দেখতে পারেন; পাশাপাশি নথি ও অন্যান্য প্রমাণও বিবেচনায় নেন। গুলিয়ে ফেলা ও দূষণ এড়াতে নমুনায় লেবেল লাগিয়ে, সিল করে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করতে হয়।
নাম নথিভুক্ত করতে না পেরে কাউকে উদ্ধার করার মানসিক কষ্টের কথা বলেন বান:
সবচেয়ে কষ্টের হলো, কলম হাতে নিয়ে আমার সহযোদ্ধার নাম না জানা।
স্মরণ অনুষ্ঠানে তিনি এমন এক দেহাবশেষের কথাও বলেন, যা তাঁর ধারণায় একজন নারীর। সেখানে নখ ও বাঁধার মতো উপকরণ পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর ধারণা, ওই নারী গোপন অভিযানে যুক্ত কর্মী বা বার্তাবাহক হতে পারেন, যাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তাঁর পরিচয়, ভূমিকা ও মৃত্যুর পরিস্থিতি এখনও নিশ্চিত নয়।
জাতীয় অভিযান, আর অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো
১৩ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ হিসাবে, ৫০০ দিন-রাতের জাতীয় অভিযানে মোট ৩,৬১১ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে: ভিয়েতনামে ২,৩৭৪ জন, লাওসে ২১৭ জন এবং কম্বোডিয়ায় ১,০২০ জন। পার্কে পাওয়া ৭৩১ জন এই মোট সংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। অভিযানের লক্ষ্য প্রায় ৭,০০০ জনকে উদ্ধার করা।
১,৫৮৮ জন সদস্য নিয়ে ৩২টি দল অনুসন্ধান চালাচ্ছিল। এই কাজের মধ্যে রয়েছে অবিস্ফোরিত অস্ত্র অপসারণ, পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং শনাক্তকরণের জন্য একটি ডেটাবেস তৈরি।
পর্যালোচনা করা ২,১১,৩০১টি কবরের মধ্যে ১,৪৭,৬৪০টি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব এবং ৬৩,৬৬১টি থেকে সম্ভব নয় বলে নির্ধারণ করা হয়। কর্তৃপক্ষ স্বজনদের কাছ থেকে ২,৬৫,৭৬১টি জৈবিক নমুনা সংগ্রহ করেছে; এর মধ্যে ৭১,১০২টি বিশ্লেষণ করেছে এবং ৬৬,৯০৯টি ডেটাবেসে অন্তর্ভুক্ত করেছে। দেহাবশেষ থেকে প্রায় ১৮,০০০টি নমুনার ডিএনএ পরীক্ষাও অভিযানের লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে।
জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে পিতৃবংশের স্বজনদের কাছ থেকে আরও নমুনা সংগ্রহের আহ্বান জানান ফাম থি থানহ ত্রা। এ কাজের জন্য আরও এক মাস নিবিড়ভাবে কাজ করার এবং ২০২৬ সালের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেন তিনি।
১৪ অক্টোবরের শেষ বিদায় অনুষ্ঠান সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে ফুল ও ধূপ নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল। এরপর সকাল ৮টায় পরিদর্শন ও স্মরণ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। প্রথম শববাহী বহর সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরের সমাধিক্ষেত্রের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। উদ্ধার হওয়া ৭৩১ জনের মধ্যে ৬৯৮ জনের তথ্য আলাদাভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে; বাকি ৩৩ জনকে একটি সম্মিলিত দল হিসেবে রাখা হয়েছে।
আগের সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে বানের পাশে ছিল শিল্পী লে সা লংয়ের আঁকা একটি প্রতিকৃতি, যাতে তাঁর উদ্ধারকাজ দেখানো হয়েছে। শহরের সংস্কৃতি ও ক্রীড়া দপ্তরের আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মকর্তা নুয়েন চং ন্গিয়া এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ফাম থি থানহ ত্রা।
দাফনের পর দেহাবশেষের জন্য একটি রক্ষণাবেক্ষণ করা সমাধিস্থল থাকবে; তবে নমুনা, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও নথির সাহায্যে পরিচয় শনাক্তের কাজ চলবে। বানের মতে, বয়স্ক প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ায় এই কাজ ক্রমেই জরুরি হয়ে উঠছে: কোনো স্মৃতি হারালে তার সঙ্গে সেই সূত্রটিও হারিয়ে যেতে পারে, যা কোনো পরিবারের এখনও প্রয়োজন।
মূল তথ্য
- পরিবার সাত বছর ধরে তাঁর শোক করার পর ১৯৭৬ সালের শেষ দিকে বাড়ি ফেরেন ত্রান ভান বান।
- ১৯৭৯ সাল থেকে তিনি ২,৩০০টিরও বেশি সমাধিস্থলের অবস্থান যাচাই করেছেন এবং ১৩৪ জনের দেহাবশেষ নিজ এলাকায় ফিরিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন।
- লে থি রিয়েং সাংস্কৃতিক পার্কে উদ্ধারকারী দল ৭৩১ জন শহীদ সৈনিকের দেহাবশেষ পেয়েছে; তাঁদের অধিকাংশের পরিচয় এখনও নিশ্চিত নয়।
- ঐতিহাসিক ছবি, প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, সামরিক নথি ও ডিএনএ পরীক্ষা শনাক্তকরণে সহায়তা করছে।
- ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে স্মরণ ও দাফন অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল; এরপরও পরিচয় শনাক্তের কাজ চলবে।






