একটি জনউদ্যান থেকে উদ্ধার হলো শত শত যুদ্ধাহতর দেহাবশেষ
হো চি মিন সিটির লে থি রিয়েং সাংস্কৃতিক উদ্যানে কয়েক মাস ধরে খননকাজ চালানোর পর ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর ১৯৬৮ সালের টেট আক্রমণে নিহত বলে ধারণা করা ৭৩১ জনের দেহাবশেষ সমাহিত করেছে ভিয়েতনাম। এ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় নিখোঁজদের শত শত জনকে কবরস্থানে নেওয়া হয়েছে, তবে অধিকাংশ পরিবার এখনো সবচেয়ে জরুরি উত্তরটি পায়নি: উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ কার?
সূচিপত্র
- একটি জনউদ্যান থেকে উদ্ধার হলো শত শত যুদ্ধাহতর দেহাবশেষ
- নগরীর নিচে কীভাবে রয়ে গেল কবর
- একটি ছবির সূত্রে সন্ধান মিলল কবরের খাতের
- মাসের পর মাস খনন, এরপর পরীক্ষাগারের কাজ
- একটি মানিব্যাগ ফিরিয়ে দিল এক সৈনিকের পরিচয়
- ২০২৭ সালের জুলাইয়ের সময়সীমা নিয়ে জাতীয় কর্মসূচি
- অসমাপ্ত অনুসন্ধান কতটা বড়?
- উন্নত ডিএনএ বিশ্লেষণ বনাম সময়ের সঙ্গে দৌড়
- পরিবারগুলোর কাছে দাফন ও উত্তর পাওয়া আলাদা দুটি ধাপ
- মূল তথ্য
উদ্যানটিতে আয়োজিত স্মরণসভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী লে মিন হুং। জায়গাটি একসময় দো থানহ কবরস্থানের অংশ ছিল। লং বিন ওয়ার্ডের হো চি মিন সিটি শহীদ কবরস্থান পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে হাজারো মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান। তাঁদের হাতে ছিল সাদা ফুল; কেউ প্রার্থনা করছিলেন, কেউবা ভিয়েতনামের জাতীয় পতাকায় ঢাকা পোড়ামাটির কফিন বহনকারী বাসগুলো দেখছিলেন।
নগর কর্তৃপক্ষ জানায়, সমাহিত দেহাবশেষের মধ্যে ৬৯৮টি পৃথক ব্যক্তির এবং একটি সম্মিলিত সেটে ৩৩ জনের দেহাবশেষ রয়েছে। মোট ৭৩১ জনের হিসাব উদ্ধারকাজের ব্যাপকতা তুলে ধরে, আর সম্মিলিত সমাধি দেখায় যে কয়েক দশক মাটির নিচে থাকার পর দেহাবশেষ আলাদা করা কত কঠিন হতে পারে।
২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ৭,০০০ যুদ্ধাহতর দেহাবশেষ উদ্ধারের জাতীয় কর্মসূচির অংশ এই অনুষ্ঠান। এ কর্মসূচির কাজ ছড়িয়ে আছে ব্যস্ত নগর উদ্যান থেকে ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ার সাবেক যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত; পাশাপাশি রয়েছে পুরোনো ছবির নথি ঘেঁটে দেখা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হাড় থেকে জিনগত তথ্য বের করার চেষ্টায় নিয়োজিত পরীক্ষাগারগুলো।
যুদ্ধাহতদের পরিচয় শনাক্তে নগরীর প্রচেষ্টার নেতৃত্বে থাকা হো চি মিন সিটির উপমেয়র নুয়েন মান কুয়ং ব্যাখ্যা করেন, পরিচয় শনাক্তের কাজ চলার মধ্যেই কেন দাফন করা হচ্ছে।
যুদ্ধের কঠোর পরিস্থিতি এবং সময়ের প্রবাহের কারণে, এই দলের অধিকাংশ শহীদের নাম, বয়স কিংবা নিজ এলাকার পরিচয় শনাক্ত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
নগরীর নিচে কীভাবে রয়ে গেল কবর
১৯৬৮ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে চান্দ্র নববর্ষের ছুটিতে দক্ষিণ ভিয়েতনামজুড়ে সমন্বিত কমিউনিস্ট হামলা চালানো হয়, যা টেট আক্রমণ নামে পরিচিত। উদ্ধারের বিবরণে প্রধান হামলার তারিখ ৩১ জানুয়ারি বলা হয়েছে, যদিও আক্রমণ শুরুর তারিখ হিসেবে ৩০ জানুয়ারির কথাও উল্লেখ করা হয়।
তৎকালীন সাইগন, বর্তমান হো চি মিন সিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস, সামরিক স্থাপনা ও সরকারি ভবনের আশপাশে তীব্র লড়াই হয়। সামরিকভাবে পরাজিত হলেও কমিউনিস্ট বাহিনীর হামলা ওয়াশিংটনকে নাড়িয়ে দেয় এবং যুদ্ধে মার্কিন জনসমর্থন দুর্বল করে।
ভিয়েতনাম সরকারের বিবরণ অনুযায়ী, দক্ষিণ ভিয়েতনাম সরকার লড়াইয়ের সময় ও পরে কমিউনিস্ট যোদ্ধা এবং বেসামরিক মানুষের মৃতদেহ সংগ্রহ করে গণকবরে রাখে। প্রায় ছয় দশক পর তদন্তকারীরা উদ্যানের নিচে এসব কবরের সন্ধানে সাবেক কবরস্থানে ফিরে আসেন।
সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ ১৯৬৮ সালের বিদ্রোহ দমনের সময় নিহত যোদ্ধাদের। অধিকাংশের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি। তাই এখনকার কাজে সমাধিস্থলের ইতিহাসের সঙ্গে প্রতিটি দেহাবশেষের সেটের সংশ্লিষ্ট প্রমাণও মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
একটি ছবির সূত্রে সন্ধান মিলল কবরের খাতের
স্থপতি নুয়েন জুয়ান থাং বছরের পর বছর যুদ্ধকালীন ছবি পর্যালোচনা করেছেন এবং পুরোনো সামরিক মানচিত্রের সঙ্গে আধুনিক শহরের তুলনা করেছেন। ১৯৬৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গাত্রোঁ নামে পরিচিত এক ফরাসি আলোকচিত্রীর তোলা রঙিন ছবিটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে।
ছবিতে কয়েকজনকে একটি মৃতদেহ বহন করতে দেখা যায়; আশপাশে অন্যরাও ছিলেন, পেছনে ছিল একটি পানির ট্যাংক। ছবির ক্যাপশনে বলা হয়েছিল, তিনটি বড় কবরের খাতে প্রায় ৩০০টি করে মৃতদেহ রাখা হয়েছিল। প্রতি খাতে প্রায় ২০০টি মৃতদেহের হিসাবও দেওয়া হয়েছে। পানির ট্যাংকটি ছিল একটি দৃশ্যমান চিহ্ন, যা গবেষকেরা মানচিত্র ও পরবর্তী জরিপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পেরেছিলেন।
ঐতিহাসিক নথির সঙ্গে স্থাপনা মিলিয়ে দেখতে থাং মোটরসাইকেলে হো চি মিন সিটির বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছেন। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাঁর দলের কাজের সময়কাল বলা হয়েছে ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত; ওই গবেষণার জন্য ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সময়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা ভিয়েতনাম ও বিদেশের ছবি, স্যাটেলাইট চিত্র, সামরিক মানচিত্র ও নথিপত্রের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের জরিপ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি মিলিয়ে দেখেছেন। প্রতিটি ধরনের প্রমাণ অনুসন্ধানের আলাদা প্রশ্নের উত্তর দিতে সাহায্য করেছে: কোথায় কবর খোঁড়া হয়েছিল, আশপাশের ভূখণ্ড কীভাবে বদলেছে এবং কোন এলাকায় খনন করা উচিত।
মাসের পর মাস খনন, এরপর পরীক্ষাগারের কাজ
ভিয়েতনাম সরকারের সংবাদ পোর্টাল অনুযায়ী, সাবেক দো থানহ কবরস্থানে খননকাজ শুরু হয় ২৩ জুন। শুরুর তারিখ হিসেবে ১২ জুন ও ১৩ জুনের কথাও বলা হয়েছে। জুলাইয়ের মধ্যে শত শত সেনা ও বিশেষজ্ঞ দেহাবশেষের স্তর ধরে কাজ করছিলেন।
বুলডোজার, খননযন্ত্র ও পানির পাম্প দিয়ে মাটি খোলা ও পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে, তবে কর্মীরা প্রায়ই হাত দিয়ে কাদা ছেঁকে দেখেছেন। হাড় ও হাড়ের টুকরোর পাশাপাশি তাঁরা অস্ত্র, গোলাবারুদ, সামরিক হ্যামক এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্র উদ্ধার করেছেন।
নগরীর সামরিক অনুসন্ধান ও উদ্ধার ইউনিট টিম কে৭৪ ১ অক্টোবর আরও ১৯টি দেহাবশেষের সেট খুঁজে পায়। সে পর্যায়ে তাদের দেওয়া স্থানটির মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০১। পরে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সমাহিত দেহাবশেষের সংখ্যা ৭৩১ বলা হয়।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের হিসাবে, ব্যক্তিগত জিনিসপত্রসহ উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের সেট ছিল ৩০৭টি, অর্থাৎ সমাহিত ৭৩১টির প্রায় ৪২ শতাংশ। ২৬৫ ও ২৪৫টির হিসাবও দেওয়া হয়েছে। দেহাবশেষের সঙ্গে পাওয়া জিনিস তদন্তকারীদের নাম, সামরিক ইউনিটের তথ্য কিংবা অন্য সূত্র দিতে পারে, যা নথি ও স্বজনদের বয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়।
ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয় হ্যানয়ের ভিয়েতনাম একাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে। ডিএনএ হলো বংশগত জিনগত তথ্য। দেহাবশেষ থেকে পাওয়া তথ্য জীবিত স্বজনদের নমুনার সঙ্গে তুলনা করে তদন্তকারীরা ব্যক্তির পরিচয় নির্ধারণে সহায়তা পান।
একটি মানিব্যাগ ফিরিয়ে দিল এক সৈনিকের পরিচয়
জুলাইয়ে কর্তৃপক্ষ স্কোয়াড নেতা হুয়িন ভান কুয়েনের পরিচয় শনাক্তের ঘোষণা দেয়। তাঁর দেহাবশেষের সঙ্গে পাওয়া একটি মানিব্যাগে নাম লেখা একটি বিবর্ণ সামরিক নথি ছিল; ডিএনএ নমুনাও তাঁর স্বজনদের সঙ্গে মিলে যায়।
কুয়েন ১ম লং আন ব্যাটালিয়নে কাজ করতেন। সাইগনের ওয়াই-আকৃতির সেতুতে সাত দিন ধরে চলা একটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল কমিউনিস্ট এই ইউনিট। তাঁর পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে জীবিত ব্যক্তিগত নথি, ইউনিটটির ইতিহাস এবং পরিবারের জিনগত প্রমাণ একসূত্রে মেলে।
নুয়েন মান কুয়ং বলেন, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরও কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান ও পরীক্ষা চালিয়ে যাবে। উপমেয়র নগরীর অঙ্গীকারের কথা এভাবে জানান:
নিহত সহযোদ্ধাদের খোঁজ চালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ বা পদ্ধতিকেই আমরা উপেক্ষা করব না।
কুয়েনের ঘটনা উদ্যানটিতে পাশাপাশি চলা দুটি কাজের চিত্র তুলে ধরে: নিহতদের দেহাবশেষ উদ্ধার এবং তাঁদের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়া। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কবরের জায়গা দেয়; আর পরিচয় শনাক্ত হলে স্বজনেরা জানতে পারেন পরিবারের নির্দিষ্ট সদস্য কোথায় শায়িত আছেন।
২০২৭ সালের জুলাইয়ের সময়সীমা নিয়ে জাতীয় কর্মসূচি
ভিয়েতনামের কর্মসূচিকে ৫০০ দিনের উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার লক্ষ্য ২০২৭ সালের জুলাইয়ের শেষ নাগাদ প্রায় ৭,০০০ সেট দেহাবশেষ উদ্ধার করা। যুদ্ধকালীন গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র কোয়াং ত্রি দুর্গে ২ এপ্রিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের তারিখ দেওয়া হয়েছে; জাতীয় অভিযান মার্চে শুরু হয়েছিল বলেও বর্ণনা করা হয়েছে।
ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ার সাবেক যুদ্ধক্ষেত্রে অনুসন্ধানে ১,৫০০ জনের বেশি কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। নথি সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে কাজ করছেন আরও হাজারো মানুষ। কর্মকর্তারা জানান, চার মাসের কাজে প্রায় ১,৫০০ সেট দেহাবশেষ উদ্ধার এবং সাতটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে।
২০২৫-২৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে কম্বোডিয়ায় ৮৫০ সেট দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে অনুসন্ধানকারী দল। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া পরের মৌসুমেও অভিযান চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে, ফলে দেশের সীমানা ছাড়িয়েও অনুসন্ধান চলবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফান ভান জিয়াং জুলাইয়ে বলেন, ভূখণ্ডের পরিবর্তন, অসম্পূর্ণ দাফন-সংক্রান্ত নথি ও মানচিত্র এবং সীমিত ডিএনএ পরীক্ষার সক্ষমতা কাজের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিতে থাকা জায়গাটি এখন হয়তো কৃষিজমি বা উন্নয়ন প্রকল্পের নিচে, আবার টিকে থাকা কোনো মানচিত্রে অনুসন্ধানে সরাসরি দিকনির্দেশ দেওয়ার মতো যথেষ্ট বিবরণ নাও থাকতে পারে।
যুদ্ধকালীন সমাধি থেকে নিহতদের পরিচয় শনাক্তের চলমান প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো হলো:
- ১৯৬৮ সালের জানুয়ারির শেষ ভাগ: টেট আক্রমণে সাইগন ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের অন্যান্য এলাকায় তীব্র লড়াই হয়।
- ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮: একটি ছবিতে কবর দেওয়ার দৃশ্য এবং পানির ট্যাংক ধারণ করা হয়, যা পরে গবেষকদের সমাধিস্থল খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
- জুন ২০২৬: লে থি রিয়েং উদ্যানে খননকাজ শুরু হয়।
- জুলাই ২০২৬: কর্তৃপক্ষ হুয়িন ভান কুয়েনের পরিচয় শনাক্তের ঘোষণা দেয়।
- ১৪ অক্টোবর ২০২৬: হো চি মিন সিটি শহীদ কবরস্থানে ৭৩১ জন যুদ্ধাহতকে সমাহিত করে ভিয়েতনাম।
- জুলাই ২০২৭-এর শেষ: জাতীয় উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার কথা।
অসমাপ্ত অনুসন্ধান কতটা বড়?
সরকারি হিসাবে, যেসব ভিয়েতনামি সৈনিকের দেহাবশেষ এখনো উদ্ধার করা যায়নি, তাঁদের সংখ্যা প্রায় ১,৭৫,০০০; প্রায় ১,৫০,০০০-এর কম হিসাবও উল্লেখ করা হয়েছে। আরও কয়েক লাখ মানুষকে পরিচয় নিশ্চিত না করেই সমাহিত করা হয়েছে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২,৩০,০০০টি কবর অশনাক্ত সৈনিকদের। আরও বিস্তৃত এক হিসাবে, যেসব কবরের পরিচয় পুরোপুরি নিশ্চিত নয় সেগুলোসহ পূর্ণাঙ্গ পরিচয়বিহীন কবরের সংখ্যা ৩,০০,০০০ ছাড়িয়েছে।
ভিয়েতনামের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ফ্রান্স এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে যুদ্ধে ১২ লাখ পর্যন্ত ভিয়েতনামি সৈনিক নিহত হন। নিখোঁজদের হাজারো মানুষ দুর্গম জঙ্গল, কৃষিজমি ও সাবেক যুদ্ধক্ষেত্রের নিচে রয়ে গেছেন বলে ধারণা করা হয়।
অভিযানের ৭,০০০ দেহাবশেষ উদ্ধারের লক্ষ্য এখনো নিখোঁজ থাকা আনুমানিক ১,৭৫,০০০ জনের প্রায় ৪ শতাংশ। এই তুলনা দেখায়, বড় ধরনের অভিযান হলেও ২০২৭ সালের জুলাইয়ের পর অনেক পরিবারকে অপেক্ষা করতে হবে। অনুসন্ধানের পাশাপাশি সরকার অশনাক্ত কবর থেকে নমুনা সংগ্রহ, দেহাবশেষের ১৮,০০০টি নমুনা বিশ্লেষণ এবং স্বজনদের জিনগত তথ্যের একটি ডেটাবেইস তৈরির পরিকল্পনা করেছে।
উন্নত ডিএনএ বিশ্লেষণ বনাম সময়ের সঙ্গে দৌড়
হ্যানয়ের ডিএনএ শনাক্তকরণ কেন্দ্রে পরীক্ষার জন্য উপাদান সংগ্রহ করতে কর্মীরা হাড়ের টুকরো কাটেন। কেন্দ্রের পরিচালক ট্রান ত্রুং থান বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত দেহাবশেষ নিয়ে কাজের একটি পদ্ধতি সংগ্রহ ও উন্নয়ন করেছে।
ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন মিসিং পারসনসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে প্রযুক্তি ব্যবহার করে চালানো এক পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে ৫৮টি নমুনার মধ্যে ৫৪টি থেকে জিনগত তথ্য বের করা গেছে। সাফল্যের হার প্রায় ৯৩ শতাংশ; কঠিন প্রক্রিয়াকরণের প্রয়োজন হয় এমন হাড় থেকেও তদন্তকারীরা কার্যকর জিনগত তথ্য পেয়েছেন।
জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমি একই কমিশনের সহায়তায় আরও নতুন একটি সিকোয়েন্সিং পদ্ধতি তৈরি করেছে, যা ৫,০০০-এর বেশি জিনগত মার্কার পরীক্ষা করে। মার্কার হলো জিনগত তথ্যের এমন বিন্দু, যা বিভিন্ন নমুনার মধ্যে তুলনা করা যায়। কাও ব্যাং প্রদেশের একটি যুদ্ধকবরস্থানে পরীক্ষামূলক প্রয়োগে ব্যবহারযোগ্য ডিএনএ পাওয়া হাড়ের হার প্রায় ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮০ শতাংশের বেশি হয়েছে, যা আগের হারের অন্তত চার গুণ।
থান সতর্ক করে বলেন, এ প্রক্রিয়ায় সময় লাগে। প্রাকৃতিক পরিবেশে হাড় ক্রমাগত ক্ষয় হওয়ায় জিনগত উপাদান উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। জীবিত স্বজনেরাও বয়স্ক হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন, ফলে তুলনার জন্য নমুনা দিতে পারেন এমন নিকটাত্মীয়ের সংখ্যা কমছে।
তাই কবর অনুসন্ধানের পাশাপাশি পরীক্ষাগারের কাজেও পরিবারের ভূমিকা রয়েছে। দেহাবশেষ পরীক্ষার জন্য পৌঁছালে স্বজনের নমুনা পরীক্ষাগারের কর্মীদের প্রয়োজনীয় তুলনা করতে সাহায্য করতে পারে।
পরিবারগুলোর কাছে দাফন ও উত্তর পাওয়া আলাদা দুটি ধাপ
৩৬ বছর বয়সী লে নক মাই উয়েন তাঁর দাদির নামে রাখা উদ্যানটিতে নিয়মিত যেতেন। পরে বুঝতে পারেন, তাঁর দাদির মরদেহ হয়তো সেখানেই সমাহিত। স্মৃতিফলকের কাছে ধূপ জ্বালিয়ে তিনি জায়গাটির সঙ্গে নিজের অনুভূতির সম্পর্কের কথা জানান।
এই উদ্যানকে আমি সব সময়ই পবিত্র বলে অনুভব করেছি,
উয়েন বলেন, দাদির সন্ধান পাওয়া "ভীষণ কঠিন" হবে, তবে তিনি "দৃঢ় বিশ্বাস" ধরে রেখেছেন যে দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়া যাবে। তাঁর পরিবারের অনুসন্ধান এখন এমন একটি স্থানে খনন ও পরিচয় শনাক্তের কাজের ওপর নির্ভর করছে, যার সঙ্গে তাঁর আগে থেকেই পরিচয় রয়েছে।
৬৮ বছর বয়সী দোয়ান ভান কং এবং তাঁর পরিবার বছরের পর বছর কবরস্থান ঘুরেছেন ও সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেছেন তাঁর চাচাকে নিয়ে। চাচা ১৯৫০ সালে বিশের কোঠার গোড়ার দিকে মারা যান। পরিবারের ধারণা, বাড়ি থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ফরাসি সেনাদের অতর্কিত হামলার পর তাঁকে অন্য কমিউনিস্ট যোদ্ধাদের সঙ্গে সমাহিত করা হয়। সন্দেহভাজন স্থানগুলোতে খনন হয়নি। কং সরকারি অভিযানকে তাঁর শেষ ভরসা বলে বর্ণনা করেছেন।
১৫ অক্টোবর আরও কয়েকটি স্থানে দাফনের পরিকল্পনা ছিল: তুয়েন কুয়াংয়ে ৯৩টি, হাই ফংয়ে ৬৫টি এবং কান থোতে ১২০টি দেহাবশেষ। তুয়েন কুয়াংয়ের সংখ্যা ৮২ বা ৭৩ এবং হাই ফংয়ের সংখ্যা ৪৫ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। হো চি মিন সিটিতে সমাহিত অধিকাংশের পরিচয় এখনো অজানা; তাঁদের পরিচয় শনাক্তের কাজ কবে শেষ হবে, সে তারিখ কর্তৃপক্ষ জানায়নি।
মূল তথ্য
- লে থি রিয়েং উদ্যানে দেহাবশেষ উদ্ধারের পর ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর ৭৩১ জন যুদ্ধাহতকে সমাহিত করেছে ভিয়েতনাম।
- দেহাবশেষগুলো ১৯৬৮ সালের টেট আক্রমণে নিহতদের বলে ধারণা করা হয়; অধিকাংশের পরিচয় এখনো অজানা।
- যুদ্ধকালীন ছবি, মানচিত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও মাঠপর্যায়ের জরিপ তদন্তকারীদের কবরগুলো খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।
- একটি সামরিক নথি ও ডিএনএ তুলনার মাধ্যমে স্কোয়াড নেতা হুয়িন ভান কুয়েনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে।
- ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ৭,০০০ সেট দেহাবশেষ উদ্ধারের লক্ষ্য নিয়েছে জাতীয় কর্মসূচি।
- উন্নত ডিএনএ পদ্ধতি তদন্তকারীদের সহায়তা করছে, তবে দেহাবশেষের ক্ষয় এবং স্বজনদের বয়স বেড়ে যাওয়ায় কাজটি জরুরি হয়ে উঠেছে।






