প্রাণঘাতী অভিযান শ্রীলঙ্কার ইস্টার হামলার সংকট আরও গভীর করেছে
শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, পূর্ব শ্রীলঙ্কায় জঙ্গিদের আস্তানা সন্দেহে চালানো অভিযানের সময় গোলাগুলি ও তিনটি বিস্ফোরণে ছয় শিশুসহ ১৫ জন নিহত হন। কালমুনাই এলাকার সাইনথামারুথুতে এই সংঘর্ষ ঘটে, যখন নিরাপত্তা বাহিনী ইস্টার সানডের বোমা হামলার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজছিল। ওই হামলায় গির্জা ও হোটেলে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন।
সূচিপত্র
- প্রাণঘাতী অভিযান শ্রীলঙ্কার ইস্টার হামলার সংকট আরও গভীর করেছে
- বাড়িতে কী ঘটেছিল
- ইসলামিক স্টেটের দাবি ও উদ্ধার করা আলামত
- গ্রেপ্তারের সংখ্যা ও চলমান তল্লাশি
- ইস্টার হামলা ও সন্দেহভাজন মূল পরিকল্পনাকারী
- জরুরি ব্যবস্থা ও এক সপ্তাহের ক্রমবর্ধমান তল্লাশি
- বাসিন্দাদের পালিয়ে যাওয়া, গির্জায় সমাবেশ বন্ধ
- সতর্কবার্তা উপেক্ষায় চাপে নেতারা
- মূল বিষয়গুলো
পুলিশ জানায়, বাড়ির ভেতরে থাকা তিন ব্যক্তি কাছে আসা সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর পর বিস্ফোরক detonated করেন। এক সামরিক মুখপাত্র এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা গোলাগুলির কথা জানান। শনিবার সকালে তল্লাশিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির ভেতরে ও বাইরে মরদেহ পাওয়া যায়। আহত এক নারী ও শিশুকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
নিহতের ঘটনা চলমান তল্লাশি অভিযানের তাৎক্ষণিক ঝুঁকিগুলো স্পষ্ট করে দেয়: সন্দেহভাজন বোমা হামলাকারীরা তখনো পলাতক, বিস্ফোরক থাকা একটি বাড়িতে শিশুরা ছিল এবং আশপাশের বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। সংঘর্ষের সময় প্রায় ৬০০ মুসলিম একটি স্কুলে আশ্রয় নেন বলে বাসিন্দারা জানান।
প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপালা সিরিসেনা দেশের প্রতিটি বাড়িতে তল্লাশির অঙ্গীকার করেন। সন্দেহভাজনদের ধরতে কর্তৃপক্ষ জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করছিল, তবে তদন্তের ব্যাপ্তি তখনো স্পষ্ট ছিল না। গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রাথমিক প্রতিবেদনে ৭০ থেকে পরবর্তী প্রতিবেদনে ১০০-এর বেশি বলা হয়। ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা ব্যক্তির সংখ্যার হিসাবও ভিন্ন ছিল।
বাড়িতে কী ঘটেছিল
সাইনথামারুথুর একটি বাড়ি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর অভিযান চালানো হয়। শহরটি মূলত মুসলিম-অধ্যুষিত উপকূলীয় এলাকা, কলম্বো থেকে প্রায় ৩৬০ থেকে ৩৭০ কিলোমিটার দূরে। অন্য বিবরণে স্থানটির নাম কালমুনাই এলাকার সাইন্দামারুদু বলা হয়েছে। কথিত আছে, ইস্টার বোমা হামলার এক বা দুই দিন পর সন্দেহভাজনরা সেখানে আসে। তারা উঁচু দেয়াল ও কালো ধাতব ফটকের পেছনে থাকা নিচু একটি বাড়িতে হালকা ধূসর রঙের মিনিভ্যান থেকে বাক্স নামায়।
পুলিশ জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনারা কাছে এলে বন্দুকধারীরা গুলি চালায়। পরবর্তী সংঘর্ষে তিনটি বিস্ফোরণে বাড়িটির ছাদ ও একটি দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর কেউ হতাহত হয়নি বলে পুলিশ জানায়।
শনিবারের তল্লাশি নিয়ে এক বিবরণে বলা হয়, বাড়ির ভেতরে তিন পুরুষ, তিন নারী ও ছয় শিশুর মরদেহ পাওয়া গেছে। বাইরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আরও তিন পুরুষের মরদেহ ছিল। পুলিশ বাইরে থাকা ব্যক্তিদের আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী বলে সন্দেহ করে। অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গোলাগুলির মধ্যে অন্তত একজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন। নিহত ১৫ জনের প্রকাশিত হিসাবের সঙ্গে ওই বেসামরিক ব্যক্তির অবস্থান কীভাবে মেলে, তা স্পষ্ট নয়।
পুলিশের মুখপাত্র রুয়ান গুনাসেকারা বলেন, নিহতদের বেশির ভাগই জঙ্গি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ওই মূল্যায়নে নিহত প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের পরিচয় বা ভূমিকা নিশ্চিত হয়নি; ছয় শিশুকে সন্দেহভাজন যোদ্ধাদের থেকে আলাদা করে বিবেচনা করতে হবে। আহত নারী ও শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও তাদের পরিচয় নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
ইসলামিক স্টেটের দাবি ও উদ্ধার করা আলামত
ইসলামিক স্টেট, আইএস বা আইএসআইএল নামেও পরিচিত, শনিবার দাবি করে যে তাদের তিন সদস্য বিস্ফোরকভর্তি জ্যাকেট detonated করার আগে কয়েক ঘণ্টা পুলিশের সঙ্গে লড়াই করেছেন। তাদের আমাক সংবাদমাধ্যম দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি। পুলিশের বিবরণে গোলাগুলি ও তিনটি বিস্ফোরণের ঘটনা সমর্থিত হলেও, ওই গোষ্ঠীর বক্তব্য থেকে স্বাধীনভাবে প্রমাণ হয়নি যে নিহত ব্যক্তিরা কারা ছিলেন বা অভিযানটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল।
আশপাশের এলাকায় আলাদা তল্লাশিতে তদন্তকারীরা ইস্টার হামলাকারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন—এমন সরঞ্জাম পাওয়া যায়। এক সামরিক মুখপাত্র জানান, কাছাকাছি আরেক অভিযানে ইসলামিক স্টেটের পতাকা, ১৫০টি জেলিগনাইটের কাঠি, হাজার হাজার স্টিলের গুলি এবং একটি ড্রোন ক্যামেরা উদ্ধার করা হয়। জেলিগনাইট একটি বিস্ফোরক; বোমার চারপাশে রাখা হলে স্টিলের গুলি প্রাণঘাতী খণ্ডে পরিণত হতে পারে।
গুলির লড়াইয়ের স্থান থেকে প্রায় নয় মাইল দূরে সাম্মানথুরাইয়ে অভিযানে ইসলামিক স্টেটের একটি পতাকা এবং ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা যায়। ইউনিফর্মগুলো একটি ভিডিওতে ইস্টার হামলার সন্দেহভাজন বোমা হামলাকারীদের পরা পোশাকের মতো ছিল। ভিডিওতে তারা গোষ্ঠীটির নেতার প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিল। এসব আবিষ্কার স্থানীয় জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে তদন্তকে সমর্থন করলেও, বিদেশে থাকা ইসলামিক স্টেটের নির্দেশনার ব্যাপ্তি নিজেরা প্রমাণ করে না।
ক্ষতিগ্রস্ত সাইনথামারুথুর বাড়ির ফুটেজেও বিস্ফোরক, ব্যাটারি, জেনারেটর ও একটি ড্রোন দেখা যায়। ড্রোনটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এর উপস্থিতিকে জঙ্গিদের আকাশপথে হামলার পরিকল্পনার প্রমাণ হিসেবে ধরা উচিত নয়।
গ্রেপ্তারের সংখ্যা ও চলমান তল্লাশি
তল্লাশি চলতে থাকায় আটক ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ে, তবে প্রতিবেদনগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব দেওয়া হয়। প্রাথমিক বিবরণে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছিল ৭০। পরবর্তী এক বিবরণে বলা হয়, শুক্রবার আরও ১০ জনকে গ্রেপ্তার করায় ইস্টার সানডের পর মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮০। অন্য প্রতিবেদনে অন্তত ৯৪ জনকে হেফাজতে রাখার কথা বলা হয়। পরে এক প্রতিবেদনে পুলিশের বরাতে বলা হয়, ১০০ জনের বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলো মিলিয়ে একটি যাচাইকৃত হিসাব তৈরি করা যায় না। অভিযানের বিভিন্ন পর্যায়ে হালনাগাদ হওয়ার কারণে সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে, তবে সেগুলোর সমন্বিত কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। গ্রেপ্তার হওয়াই অপরাধ প্রমাণ করে না, কিংবা সব আটক ব্যক্তি বোমা হামলার জন্য দায়ী গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন—এমনটিও প্রমাণ করে না।
অবশিষ্ট হুমকির হিসাবও অনিশ্চিত ছিল। সিরিসেনা বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা শ্রীলঙ্কায় ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১৩০ জন রয়েছেন এবং ৭০ জন এখনো পলাতক, যাদের পুলিশ খুঁজছে। অন্য এক বিবরণে সন্দেহভাজন সংযোগ রয়েছে—এমন প্রায় ১৪০ জনের কথা বলা হয়।
প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেও বলেন, প্রায় ৭০ জনকে এখনো খোঁজা হচ্ছে। তিনি তাদের ইস্টার হামলার জন্য দায়ী সেলের সমর্থক ও সহানুভূতিশীল ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। তাদের কেউ কেউ আত্মঘাতী বোমা হামলা চালাতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
সন্দেহভাজন, আটক ব্যক্তি এবং যাদের খোঁজা হচ্ছে—এই শ্রেণিগুলোর পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো পরস্পরের বিকল্প নয়, এবং এই সংখ্যাগুলো থেকে বোমা হামলার নেটওয়ার্কের কতজন সদস্য ধরা পড়েছেন তার নির্ভরযোগ্য হিসাব করা যায় না।
ইস্টার হামলা ও সন্দেহভাজন মূল পরিকল্পনাকারী
রবিবার, ২১ এপ্রিল, ইস্টারের উপাসনায় পরিপূর্ণ গির্জা এবং পর্যটকদের ব্যবহৃত হোটেলগুলোতে সমন্বিত বোমা হামলার পর তল্লাশি শুরু হয়। সে সময়ের প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা অন্তত ২৫০ বা অন্তত ২৫৩ বলা হয়, আহত হন ৫০০ জনের বেশি। তাই প্রকাশিত নিহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রতিবেদনে ভিন্ন ছিল, যদিও সব কটিতেই ব্যাপক প্রাণহানির কথা বলা হয়।
কর্তৃপক্ষ স্থানীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ন্যাশনাল তাওহীদ জামাতকে দায়ী করে। ইংরেজিতে গোষ্ঠীটির নামের বানানও একাধিকভাবে লেখা হয়েছে। হামলায় ভূমিকার দাবি করে ইসলামিক স্টেট। তদন্তকারীরা নয়জনকে বোমা হামলার জন্য সন্দেহ করছিলেন।
সিরিসেনা বলেন, কথিত মূল পরিকল্পনাকারী জাহরান হাশিম কলম্বোর শাংগ্রি-লা হোটেলে হামলার সময় নিহত হন। তার পরিচয় চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে কর্মকর্তারা ডিএনএ পরীক্ষা করছিলেন। সাইনথামারুথুতে উদ্ধার করা নারী ও শিশুটি তার স্ত্রী ও মেয়ে হতে পারে বলেও পুলিশের ধারণা ছিল, তবে এই পরিচয় তখনো প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল।
সন্দেহভাজন দুই বোমা হামলাকারী মসলা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইউসুফ ইব্রাহিমের ছেলে বলে খবর প্রকাশিত হয়। তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এক ছেলে, ইলহাম ইব্রাহিম, হাশিমের সঙ্গে শাংগ্রি-লা হোটেলে হামলা চালিয়েছিলেন বলে জানানো হয়। অন্যজনের বিরুদ্ধে সিনামন গ্র্যান্ড হোটেলের রেস্তোরাঁয় হামলার অভিযোগ ছিল।
সিনামন গ্র্যান্ডের ব্যবস্থাপক রোহান কার বলেন, সন্দেহভাজন বোমা হামলাকারী আগের সন্ধ্যায় হোটেলে ওঠেন। পরদিন সকালে পিঠে ব্যাগ নিয়ে রেস্তোরাঁয় যান। কারের ভাষ্য, লোকটি খাওয়ার পর বুফের কাছে অতিথিরা জড়ো হওয়ার অপেক্ষা করেন, তারপর হামলা চালান।
তিনি বসেছিলেন, খেয়েছিলেন, বুফের কাছে লোকজন জড়ো হওয়ার অপেক্ষা করেছিলেন। যখন দেখলেন বড় একটি ভিড় হয়েছে, তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সর্বোচ্চ ক্ষতি করার জন্য এটাই উপযুক্ত সময়।
জরুরি ব্যবস্থা ও এক সপ্তাহের ক্রমবর্ধমান তল্লাশি
সিরিসেনা জরুরি ব্যবস্থার আওতায় ন্যাশনাল তাওহীদ জামাত এবং আরেকটি সন্দেহভাজন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করেন। একটি প্রতিবেদনে দ্বিতীয় গোষ্ঠীটির নাম জামাতেই মিল্লাথু বলা হয়েছে। পুলিশের তল্লাশিতে সহায়তার জন্য সেনা মোতায়েন করা হয়। সন্দেহভাজন হামলাকারী এবং তাদের সমর্থন করেছেন বলে মনে করা ব্যক্তিদের খোঁজার মধ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়।
ঘটনাক্রমে দেখা যায়, ইস্টার বোমা হামলার তদন্ত থেকে প্রতিক্রিয়া কত দ্রুত আবাসিক এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর মুখোমুখি হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছিল:
- ২১ এপ্রিল: ইস্টার সানডেতে গির্জা ও হোটেলে সমন্বিত বোমা হামলা হয়।
- ২২ বা ২৩ এপ্রিল: সন্দেহভাজন বাসিন্দারা কথিতভাবে সাইনথামারুথুর বাড়িটিতে ওঠেন।
- ২৩ এপ্রিল: এক বিবরণ অনুযায়ী, সিরিসেনা শর্তসাপেক্ষে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।
- ২৬ এপ্রিল: নিরাপত্তা বাহিনী বাড়িটিতে অভিযান চালায়; শুরু হয় গোলাগুলি ও তিনটি বিস্ফোরণ।
- ২৭ এপ্রিল: তল্লাশিতে নিহতদের বিষয়ে তথ্য নথিভুক্ত হয়, ইসলামিক স্টেট সংঘর্ষে জড়িত থাকার দাবি করে এবং সিরিসেনা দুটি গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন।
দেশজুড়ে তল্লাশি শেষ করার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হবে বলে সিরিসেনা জানান, তবে এটি যাচাইকৃত সময়সূচি নয়, বরং একটি আশ্বাস ছিল।
বাসিন্দাদের পালিয়ে যাওয়া, গির্জায় সমাবেশ বন্ধ
অভিযানে মূলত মুসলিম-অধ্যুষিত একটি এলাকার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়; বাসিন্দারা আরও সহিংসতার আশঙ্কা করছিলেন। প্রায় ৬০০ জন একটি স্কুলে আশ্রয় নেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িটির আশপাশের সড়ক ছেড়ে প্রতিবেশীরা চলে যান। শুক্রবারের নামাজের সময় মসজিদগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। প্রতিশোধমূলক হামলার ভয়ে কিছু মুসলিম নামাজে যাননি।
ক্যাথলিক চার্চ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জনসমক্ষে রবিবারের প্রার্থনাসভা স্থগিত করে। কলম্বোর আর্চবিশপ কার্ডিনাল ম্যালকম রঞ্জিত বলেন, আরও হামলার সতর্কবার্তা-সংবলিত একটি ফাঁস হওয়া নিরাপত্তা নথি তিনি দেখেছেন। তিনি ধর্মবিশ্বাসীদের ঘরে থাকতে ও প্রার্থনা করতে বলেন।
কার্ডিনালের বাসভবনে একটি ছোট প্রার্থনাসভা আয়োজন করে তা জাতীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারের পরিকল্পনা ছিল। নেগোম্বোর সেন্ট সেবাস্তিয়ান গির্জার বাইরের একটি তাঁবুতে আরেকটি প্রার্থনাসভার আয়োজনের খবরও প্রকাশিত হয়। ইস্টারের প্রার্থনাসভার সময় ওই গির্জায় ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন। গির্জার সমাবেশ স্থগিতের বৃহত্তর সিদ্ধান্ত থেকে এই আয়োজনগুলোর কথা আলাদাভাবে জানানো হয়।
নিষেধাজ্ঞার অর্থ, হামলার প্রভাব বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। বাস্তুচ্যুত মুসলিম বাসিন্দা, নিয়মিত প্রার্থনায় যেতে না-পারা ক্যাথলিক এবং শুক্রবারের নামাজ এড়িয়ে চলা মানুষ—চলমান হুমকির কারণে সবাই তাৎক্ষণিকভাবে দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তনের মুখে পড়েন।
সতর্কবার্তা উপেক্ষায় চাপে নেতারা
স্থানীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী গির্জায় আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করছে—এমন বিদেশি গোয়েন্দা সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় সরকারের ওপর ক্ষোভ বাড়ছিল। ব্যর্থতার কারণে পুলিশপ্রধান পুজিথ জয়াসুন্দর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হেমাসিরি ফার্নান্দো পদত্যাগ করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়।
কার্ডিনাল রঞ্জিত বলেন, গির্জার নেতাদের সতর্কবার্তা সম্পর্কে জানানো হয়নি। কলম্বোর ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের প্রধান হিসেবে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন:
আমার মনে হয়েছে, কিছুটা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছি। আমি দুঃখ পেয়েছি। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আমাদের এ বিষয়ে না জানানোর যে ব্যর্থতা, তা অত্যন্ত গুরুতর।
শুক্রবার সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষমা চান বিক্রমাসিংহে:
আমরা সম্মিলিতভাবে দায় নিচ্ছি এবং এই মর্মান্তিক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় সহনাগরিকদের কাছে ক্ষমা চাইছি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সতর্কবার্তা তার কাছে পৌঁছায়নি। যে তথ্য তিনি পাননি, সে বিষয়ে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে তার পদত্যাগ করা উচিত—এমন পরামর্শও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তথ্য আদান-প্রদানে ব্যর্থতা সিরিসেনার সঙ্গে তার টানাপোড়েনের সম্পর্কের দিকে নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট তাকে বরখাস্ত করেছিলেন; আদালতের রায়ের পর ডিসেম্বরে তিনি পুনর্বহাল হন।
তাৎক্ষণিকভাবে যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি, সেগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট: অভিযানে নিহতদের পরিচয়, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে হাশিমের মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করা, পলাতক সন্দেহভাজনদের সংখ্যা ও সক্ষমতা এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষার দায়। এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তির জন্য কোনো শুনানির তারিখ বা সময়সীমা জানানো হয়নি।
মূল বিষয়গুলো
- ২৬ এপ্রিল সাইনথামারুথুতে অভিযানে ছয় শিশুসহ ১৫ জন নিহত হন।
- পুলিশ গোলাগুলি ও তিনটি বিস্ফোরণের কথা জানায়। আহত এক নারী ও শিশু বেঁচে যান।
- ইসলামিক স্টেট সংঘর্ষে জড়িত থাকার দাবি করলেও কোনো প্রমাণ দেয়নি।
- গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রাথমিকভাবে ৭০ থেকে পরে ১০০-এর বেশি বলা হয়। প্রায় ৭০ জন পলাতক রয়েছেন বলে জানানো হয়।
- আশপাশের তল্লাশিতে বিস্ফোরক, স্টিলের গুলি, ইসলামিক স্টেটের পতাকা ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
- প্রায় ৬০০ মুসলিম বাসিন্দা একটি স্কুলে আশ্রয় নেন; ক্যাথলিকদের জনসমক্ষে উপাসনা স্থগিত করা হয়।
- গোয়েন্দা সতর্কবার্তা উপেক্ষার ঘটনায় পদত্যাগ ও সরকারের ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা ঘটে।






