তাইপেই বলেছে, ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষকেই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে
বেইজিংয়ের অভিযোগ, ১০ অক্টোবর জাতীয় দিবসের ভাষণে প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন এবং শান্তি নষ্ট করছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও বলেছে, তাইওয়ান ও চীন কেউ কারও অধীন নয়। মন্ত্রণালয় বলেছে, তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ সম্মিলিতভাবে নির্ধারণের অধিকার দেশটির ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের, আর এতে হস্তক্ষেপের অধিকার চীনের নেই।
সূচিপত্র
- তাইপেই বলেছে, ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষকেই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে
- শান্তি ও স্বাধীনতা নিয়ে লাই যা বলেছেন
- স্থিতাবস্থা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দুই সংজ্ঞা
- প্রতিরক্ষা ব্যয় বিরোধের কেন্দ্রে
- তাইওয়ানের চারপাশে মহড়ার পক্ষে চীনের সামরিক বাহিনী
- রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও যুদ্ধকালীন ইতিহাস নিয়ে সমালোচনা
- অস্ত্র চুক্তির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়, শান্তির পক্ষে ওয়াশিংটন
- ভাষণ ও সামরিক প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতা
- যেসব সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি
- মূল কথা
তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তি বজায় রাখার অর্থ কী, তা নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। তাইপেইয়ের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বাইরে বক্তব্যে লাই বলেন, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা যুদ্ধ ঠেকানো এবং সংলাপ এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। চীনের তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তর এ ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে তাইওয়ানকে চীনের অংশ বলে বর্ণনা করেছে এবং এই অবস্থানকেই প্রকৃত স্থিতাবস্থা বলেছে।
প্রণালির দুই পাশে গণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্য স্বীকার করতে বেইজিংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। উত্তেজনা বাড়াতে পারে এমন আক্রমণ বন্ধ করতে এবং স্থিতাবস্থা বদলাতে শক্তি প্রয়োগের পথ পরিত্যাগ করতেও চীনকে আহ্বান জানিয়েছে তারা।
এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দুই বেসামরিক প্রশাসনের বাইরেও ছড়িয়েছে। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র চেন শি তাইওয়ানের চারপাশে পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) মহড়াকে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও বাইরের হস্তক্ষেপ ঠেকানোর প্রতিবন্ধক হিসেবে সমর্থন করেছেন। লাইয়ের শান্তির অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, নিয়মিত একটি ভাষণকে জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
শান্তি ও স্বাধীনতা নিয়ে লাই যা বলেছেন
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই স্বাধীনতা ও শান্তিকে এমন অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা তাইওয়ান একসঙ্গে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। তাঁর ভাষণে বিনিময় ও যোগাযোগের আমন্ত্রণের পাশাপাশি রাজনৈতিক অধীনতা প্রত্যাখ্যানের কথাও ছিল।
"তাইওয়ান শান্তিকে মূল্য দেয়, কিন্তু আমরা আমাদের স্বাধীনতা ছেড়ে দেব না। আমরা বিনিময় ও যোগাযোগে উন্মুক্ত, তবে অধীনতা মেনে নেব না," তিনি বলেন।
তিনি বলেন, শুধু ইচ্ছার ওপর শান্তি নির্ভর করতে পারে না; চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা তাইওয়ানকে সংলাপের সুযোগ বন্ধ না করে "সমতা ও মর্যাদার" ভিত্তিতে আলোচনা চালানোর সুযোগ দেবে।
লাই আরও বলেন, তাইওয়ানের মানুষের অস্তিত্বের অধিকারকে সম্মান করতে হবে। তাইওয়ানের নিরাপত্তাকে তিনি বৃহত্তর এক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেন: আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন শক্তি প্রয়োগের মুখে টিকে থাকতে পারবে কি না এবং ক্ষমতাধর দেশগুলো মানুষকে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে কি না।
তাঁর বক্তব্যে তাইওয়ান প্রণালির দুই পাশ কেউ কারও অধীন নয়—লাইয়ের বহুল ব্যবহৃত এই বাক্যবন্ধের ভাষা কিছুটা আলাদা ছিল। এই ভাষণে তিনি পুরো বাক্যটি পুনরাবৃত্তি করেননি, যদিও বলেছেন তাইওয়ান অধীনতা মেনে নেবে না। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই পক্ষের পারস্পরিক অনধীনতার অবস্থানটি স্পষ্টভাবে জানায়।
স্থিতাবস্থা নিয়ে পরস্পরবিরোধী দুই সংজ্ঞা
তাইওয়ান ও চীনের মধ্যে অধীনতার সম্পর্ক না থাকার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃত এক বাস্তবতা এবং তাইওয়ানের মানুষের ঐকমত্য বলে বর্ণনা করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এটি তাইওয়ানের সরকারি অবস্থান; প্রতিটি সরকার তাইওয়ানকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, এমন প্রমাণ নয়।
বেইজিংয়ের তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তর ভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, একটিই চীন আছে, তাইওয়ান তার অংশ এবং এটাই প্রণালিতে প্রকৃত স্থিতাবস্থা। তারা লাইয়ের বিরুদ্ধে বাস্তবতা উপেক্ষা, জনসাধারণকে বিভ্রান্ত এবং চীনের সামরিক হুমকিকে অতিরঞ্জিত করার অভিযোগ এনেছে।
তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কর্তৃত্ব কার, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। তাইপেই এ সিদ্ধান্তের অধিকার তাইওয়ানের ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের বলে মনে করে। বেইজিংয়ের বক্তব্য, তাইওয়ানের মানুষসহ সব চীনা জনগণের যৌথভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। এগুলো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি, সামরিক কর্মকাণ্ডের নিছক ভিন্ন বর্ণনা নয়।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও টেকসই উন্নয়ন রক্ষায় গণতান্ত্রিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে, তাইওয়ানের প্রতি বাইরের সমর্থনকে বেইজিং এমন একটি বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে মনে করে, যেটিকে তারা অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। এই বিভাজন ব্যাখ্যা করে, একই কূটনৈতিক বা প্রতিরক্ষা উদ্যোগকে এক পক্ষ কেন সুরক্ষা এবং অন্য পক্ষ কেন হুমকি হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
প্রতিরক্ষা ব্যয় বিরোধের কেন্দ্রে
সামরিক সংস্কার অব্যাহত রাখা, অসমমিত যুদ্ধের সক্ষমতা জোরদার এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন লাই। অসমমিত যুদ্ধ বলতে বোঝায়, প্রতিপক্ষের চেয়ে শক্তিশালী বাহিনীর সঙ্গে অস্ত্রে-অস্ত্রে পাল্লা দেওয়ার পরিবর্তে তাকে প্রতিরোধের উপযোগী সক্ষমতা ব্যবহার করা। উন্নত যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরি এবং বিপুল ক্ষেপণাস্ত্রবাহিনীসহ অনেক বড় চীনা সামরিক বাহিনীর মুখোমুখি তাইওয়ান।
তাইওয়ানের সর্বসমাজ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কমিটি, সামরিক মহড়া, বেসামরিক ও সামরিক সংস্থার যৌথ মহড়া, যুদ্ধকালীন প্রতিক্রিয়া কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত বেসামরিক স্থাপনা এবং বিদেশ থেকে অস্ত্র কেনারও সমালোচনা করেছে বেইজিং। ফলে বিরোধটি সশস্ত্র বাহিনীর বাইরেও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি পর্যন্ত বিস্তৃত।
নানজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের তাইওয়ানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লিউ শিয়াংপিং যুক্তি দিয়েছেন, লাইয়ের সহনশীলতা নীতি জনকল্যাণের ব্যয়ে সামরিক ব্যয় বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে কাজ করছে। তাঁর মতে, এ ব্যয় সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের ক্ষতি করছে।
"জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ে সামরিক সম্প্রসারণে ঢালাওভাবে ব্যয় করলে শেষ পর্যন্ত তা হিতে বিপরীত হবে," লিউ বলেন।
লিউ আরও অভিযোগ করেন, লাই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর অনুগ্রহ পেতে চাইছেন। তাঁর বক্তব্যে লাইয়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে; প্রতিরক্ষা পদক্ষেপের বাজেটগত প্রভাব এতে প্রমাণিত হয়নি। এই সমালোচনার সঙ্গে ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাবও দেওয়া হয়নি।
তাইওয়ানের চারপাশে মহড়ার পক্ষে চীনের সামরিক বাহিনী
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র চেন শি রোববার লাইয়ের ভাষণের সমালোচনা করেন। তিনি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সামরিক সম্প্রসারণ ও বাইরের সমর্থনের মাধ্যমে তাইওয়ানের স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা এবং ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির বিরুদ্ধে স্থিতিশীলতার বিনিময়ে দলীয় স্বার্থ রক্ষার অভিযোগ তোলেন।
চেন বলেন, তাইওয়ানের চারপাশে পিপলস লিবারেশন আর্মির নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য স্বাধীনতাপন্থী কর্মকাণ্ড ও বাইরের হস্তক্ষেপ ঠেকানো এবং তাইওয়ানের বাসিন্দাদের সুরক্ষা দেওয়া। তাঁর বক্তব্যে চীনের সামরিক অভিযানকে বিচ্ছিন্নতাবাদের জবাব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা তাইপেইয়ের বর্ণনার সরাসরি বিপরীত; তাইপেই এসব কর্মকাণ্ডকে চাপ হিসেবে দেখে।
বেইজিংয়ের অবস্থান সমর্থন করতে তাইওয়ানের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে চেন বলেন:
"আমরা আশা করি, তাইওয়ানের স্বদেশিরা বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই, বাইরের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা, শান্তি রক্ষা এবং জাতীয় পুনর্জাগরণের সুফল ভাগ করে নিতে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগ দেবেন," চেন আরও বলেন।
এই বক্তব্যে সামরিক মহড়ার উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে, তবে নতুন কোনো অভিযান, মোতায়েনের সময়সূচি বা মহড়ার এলাকা ঘোষণা করা হয়নি। তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা চীন নাকচ করেনি। ফলে সামরিক উদ্দেশ্য নিয়ে মতভেদের বাস্তব গুরুত্ব বক্তব্যের পাল্টাপাল্টির বাইরেও রয়েছে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও যুদ্ধকালীন ইতিহাস নিয়ে সমালোচনা
চাইনিজ একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের তাইওয়ান স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের গবেষক চেন গুইচিং অভিযোগ করেন, শান্তি ও বিনিময়ের পক্ষে কথা বললেও লাই সংঘাত উসকে দিচ্ছেন। তিনি আরও যুক্তি দেন, ভাষণে তাইওয়ানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির নির্বাচনী স্বার্থে তা ব্যবহার করা হয়েছে।
আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গেও এ অভিযোগ যুক্ত করেন চেন, যদিও তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনের কোনো তারিখ উল্লেখ করা হয়নি।
লাইয়ের ভাষণে তাইওয়ানের সামনে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে," চেন বলেন। "আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে ডিপিপির স্বার্থে বক্তব্যগুলো দেওয়া হয়েছে বলে স্পষ্টতই মনে হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে লাইয়ের বক্তব্যেরও সমালোচনা করা হয়েছে। রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়না ক্রস-স্ট্রেইট রিলেশনস রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ওয়াং ইংজিন লাইয়ের "যুদ্ধের সমাপ্তি" কথাটি ব্যবহারের বিরোধিতা করেন। তাঁর যুক্তি, লাইয়ের জাপানের বিরুদ্ধে বিজয় এবং তাইওয়ানের চীনের কাছে প্রত্যাবর্তনের কথা বলা উচিত ছিল।
লাই বলেন, তিনি "দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতি কখনোই হতে দেবেন না"। ওয়াংয়ের অভিযোগ, লাই নিজেই ঠিক সেটিই করছেন। এ বিরোধে ভাষণের ঐতিহাসিক শব্দচয়ন তাইওয়ানের অবস্থান নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে; বিষয়টি নিছক স্মরণানুষ্ঠানের ভাষা নিয়ে বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
প্রতিবেদনগুলোতে তারিখের অসংগতি রয়েছে: ওয়াংয়ের সমালোচনায় চীনের কাছে তাইওয়ানের প্রত্যাবর্তনের ৮০তম বার্ষিকীর কথা বলা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের দিকে ইঙ্গিত করে; অন্য একটি প্রতিবেদনে চেন শির জবাবের তারিখ স্পষ্টভাবে ১১ অক্টোবর ২০২৬ বলা হয়েছে। এ দুটি উল্লেখকে একই নিশ্চিত সময়রেখার অংশ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
অস্ত্র চুক্তির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়, শান্তির পক্ষে ওয়াশিংটন
তাইওয়ান প্রণালিজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নাম প্রকাশ না করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, ভাষণটিকে আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে দেখা উচিত নয়।
"নিয়মিত একটি ভাষণ আক্রমণাত্মক বা জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপের কোনো অজুহাত নয়"।
আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও তাইওয়ানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমর্থক যুক্তরাষ্ট্র। এর ভূমিকার মধ্যে রাজনৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি অস্ত্র বিক্রিও রয়েছে; উভয় বিষয়েই বেইজিং আপত্তি জানায় এবং এগুলোকে বাইরের হস্তক্ষেপ বলে মনে করে।
তাইওয়ানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজকে রেকর্ড চুক্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রস্তাবিত প্যাকেজটি আগেরটির চেয়ে ৩ বিলিয়ন ডলার বড়, অর্থাৎ প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি; তবে এটি এখনো অনুমোদিত অস্ত্র বিক্রি নয়।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা সামলাতে এবং সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে সংলাপের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের প্রচেষ্টাকেও স্বাগত জানিয়েছেন লাই। তাইওয়ানের এক কর্মকর্তা বলেছেন, আগের মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-চীন শীর্ষ বৈঠকের প্রসঙ্গে তিনি এ কথা বলেছেন। আঞ্চলিক শান্তি রক্ষায় ইন্দো-প্যাসিফিকের গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বানের পাশাপাশি এমন আলোচনার প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন লাই।
ভাষণ ও সামরিক প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতা
এর আগে জাতীয় দিবসের ভাষণকে ঘিরেও বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তবে চীনের সামরিক প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। ধারাবাহিকতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো ভাষণের নিন্দা জানিয়েছে বেইজিং—এ থেকেই নতুন করে মহড়া শুরু হয়েছে বলে প্রমাণ হয় না।
- ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে লাইয়ের প্রথম জাতীয় দিবসের ভাষণের পরপরই চীন তাইওয়ানের চারপাশে সামরিক মহড়া চালায়।
- ২০২৫ সালের জাতীয় দিবসের ভাষণের সময় চীন একই ধরনের মহড়া চালায়নি।
- ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ১১ বিলিয়ন ডলারের যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র চুক্তির খবরের পর তাইওয়ানের কাছে চীনা মহড়া হয়।
- শনিবার, ১০ অক্টোবর, তাইপেইয়ের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বাইরে সর্বশেষ বিরোধের কেন্দ্রে থাকা ভাষণটি দেন লাই।
- ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চেন শি রোববার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া জানান।
শনিবার ও রোববারের উল্লেখ ২০২৬ সালের ১০ ও ১১ অক্টোবরের সঙ্গে মেলে। তবে ৮০তম বার্ষিকীর আলাদা উল্লেখটি আগের বছরের দিকে ইঙ্গিত করে। তাই সব উদ্ধৃত সমালোচনাকে বিতর্কহীন একটি তারিখে ফেলার পরিবর্তে এই অসংগতি রেখেই মূল ধারাবাহিকতা বর্ণনা করা হয়েছে।
এই বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকের মহড়াগুলোকে সর্বশেষ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যের সঙ্গে নতুন কোনো মহড়ার ঘোষণা বা পরবর্তী কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য নেই।
যেসব সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি
বক্তব্যগুলোতে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে। প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে; সিদ্ধান্তের কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক সমালোচনায় নতুন সামরিক পদক্ষেপের কোনো সময়সূচি নেই। আর তাইপেই সংলাপের আহ্বান জানালেও কোনো বৈঠক বা আলোচনার প্রক্রিয়া ঘোষণা করেনি।
তাইওয়ানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের পরিধিই মূল বিরোধ। তাইপেই বলেছে, দ্বীপটির মানুষকেই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সেই অধিকার রক্ষা করবে। বেইজিংয়ের দাবি, তাইওয়ান চীনের অংশ; তাদের ভাষ্য, একীভূত হওয়ার বিরোধিতা এবং বিদেশি সমর্থনই শান্তির জন্য হুমকি।
দুই সরকারই স্থিতিশীলতার কথা বলছে, তবে তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ভিন্ন। তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জোরপূর্বক পরিবর্তন প্রত্যাখ্যান করতে চায়। বেইজিং তাইওয়ানের ওপর নিজেদের দাবি জানাচ্ছে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রতিবন্ধক হিসেবে সামরিক চাপকে সমর্থন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া শান্তিপূর্ণ আচরণের পক্ষে, তবে তা এই অন্তর্নিহিত বিরোধের সমাধান করে না।
মূল কথা
- তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তাইওয়ান ও চীন কেউ কারও অধীন নয় এবং ২ কোটি ৩০ লাখ তাইওয়ানবাসীকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে।
- লাই বলেছেন, বিনিময় ও সংলাপের জন্য উন্মুক্ত থেকেও তাইওয়ান তার স্বাধীনতা রক্ষা করবে।
- বেইজিং ভাষণটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এক চীনের অংশ হিসেবে তাইওয়ানের অবস্থানই প্রকৃত স্থিতাবস্থা।
- চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র চেন শি বিচ্ছিন্নতাবাদ ও বাইরের হস্তক্ষেপ ঠেকানোর উপায় হিসেবে সামরিক মহড়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
- লাইয়ের শান্তির অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র; প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ এখনো অনুমোদিত হয়নি।
- প্রতিবেদনগুলোতে তারিখের অসংগতি রয়েছে: একটিতে ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রতিক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে, অন্যটিতে বার্ষিকীর উল্লেখ ২০২৫ সালের দিকে ইঙ্গিত করে।
- নতুন সামরিক মহড়ার সময়সূচি, সংলাপ বৈঠক বা অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদনের সময়সীমা জানানো হয়নি।






