টোকিওতে বিদায়, রূপ নিচ্ছে নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা
নিজের অর্জনের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বড় এক লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর টোকিওর আরিয়াকে কলিসিয়ামে বিদায়ের আয়োজন শেষ করেন কেই নিশিকোরি: আরও বেশি জাপানি ও এশীয় খেলোয়াড়কে বিশ্বের শীর্ষ ৫০ ও শীর্ষ ৩০-এ পৌঁছাতে সহায়তা করা। প্রায় ৯,০০০ দর্শকের উপস্থিতিতে ইউনিক্লোর এক অনুষ্ঠানের পর ৩৬ বছর বয়সী সাবেক বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ৪ নম্বর খেলোয়াড় এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে রজার ফেদেরারও তাঁর সঙ্গে কোর্টে ছিলেন।
সূচিপত্র
- টোকিওতে বিদায়, রূপ নিচ্ছে নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা
- ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান যা বলে
- ইউএস ওপেনের যে দৌড় বদলে দিয়েছিল তাঁর প্রত্যাশা
- ফেদেরারের ফিরিয়ে দেওয়া প্রশংসা
- অলিম্পিক পদকের ভিন্ন তাৎপর্য
- শেষ কয়েক সপ্তাহ ও পাশে থাকা মানুষগুলো
- যে উদ্যাপনে একত্র হয়েছিলেন ভিন্ন প্রজন্মের খেলোয়াড়েরা
- অবসরে ব্যথার অর্থ বদলে যায়
- বিদেশে খেলার সুযোগ কেন তাঁর পরিকল্পনার কেন্দ্রে
- যা চূড়ান্ত, আর যা এখনো ভাবনা
- মূল বিষয়গুলো
নিশিকোরির শেষ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচটি হয়েছিল ১ অক্টোবর, কিনোশিতা গ্রুপ জাপান ওপেন টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপসের প্রথম রাউন্ডে। তাঁর অবসরের মধ্য দিয়ে পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে প্রায় ১৯ বছরের ক্যারিয়ারের ইতি ঘটল। এই সময়ে তিনি জিতেছেন ১২টি এটিপি শিরোপা, ট্যুর পর্যায়ে ৪৫২টি ম্যাচ এবং গ্র্যান্ড স্ল্যামের এককে ফাইনালে ওঠা প্রথম এশীয় পুরুষ খেলোয়াড় হয়েছেন।
অবসরের ঘোষণা-সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে নিশিকোরি জীবনের এতটা সময় একটি লক্ষ্যেই উৎসর্গ করতে পারার তৃপ্তির কথা বলেন। জাপানি ভাষায় তাঁর বক্তব্যের অনুবাদে এসব অর্জনের পেছনের ত্যাগের কথাও উঠে আসে।
আমার জীবনের অবিশ্বাস্য দীর্ঘ একটা সময় পুরোপুরি টেনিসে ঢেলে দিতে পেরেছি। সবাই জীবনের সবটা একটি বিষয়ের পেছনে দিতে পারে না। আমার মনে হয়, এতে ডুবে থেকে কাটানো সময়টা সত্যিই আনন্দের ছিল।
অবসরের পর কী করবেন, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। তিনি একটি একাডেমি, টেনিস ক্লাব এবং বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য জুনিয়র খেলোয়াড়দের আর্থিক সহায়তার কথা বলেছেন। তবে স্পষ্ট করেছেন, এগুলো এখনো ভাবনার পর্যায়ে, কোনো প্রকল্প ঘোষিত হয়নি। আপাতত অবসর তাঁকে প্রতিযোগিতার চাপ থেকে স্বস্তি দিচ্ছে, একই সঙ্গে গুরুতর ম্যাচের জগৎ ছেড়ে যাওয়ার বেদনাও রয়েছে।
ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান যা বলে
এটিপির ক্যারিয়ার-সংক্রান্ত স্মারক প্রতিবেদনে ১২টি ট্যুর শিরোপার পাশাপাশি আরও ১৫টি ফাইনালে ওঠার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ছিল মাস্টার্স ১০০০ টুর্নামেন্টে। পুরুষদের টুর্নামেন্টের মর্যাদাক্রমে এসব আসর চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যামের পরেই। নিশিকোরি কোনো মাস্টার্স ১০০০ শিরোপা জেতেননি, তবে এই আসরগুলোর ফাইনালে বারবার ওঠা দেখায়, তিনি কত ঘন ঘন টেনিসের শীর্ষ পর্যায়ে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।
শীর্ষ খেলোয়াড়দের নিয়ে মৌসুমের শেষ টুর্নামেন্ট এটিপি ফাইনালসে তিনি চারবার খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন এবং দুবার সেমিফাইনালে ওঠেন। দুই মৌসুম তিনি শীর্ষ পাঁচে এবং আরও দুই মৌসুম শীর্ষ ১০-এ থেকে শেষ করেন।
কাছাকাছি লড়াইয়ের ম্যাচ জেতার ক্ষমতাই হয়তো পরিসংখ্যানের বিচারে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এটিপির উদ্ধৃত ইনফোসিস এটিপি উইন/লস ইনডেক্স অনুযায়ী, জয়-পরাজয় নির্ধারণী সেটে ২১৮টির মধ্যে ১৫৮টি জিতেছেন নিশিকোরি। সাফল্যের হার ৭২.৫ শতাংশ। ট্যুরের ঐতিহাসিক রেকর্ডে এটি তৃতীয়; তাঁর ওপরে আছেন বিজর্ন বর্গ (৭৩.৪ শতাংশ) ও জন ম্যাকেনরো (৭২.৮ শতাংশ)।
দুই খেলোয়াড় সমানসংখ্যক সেট জিতলে যে শেষ সেটটি জয়ী নির্ধারণ করে, সেটিই নির্ধারণী সেট। ম্যাচ পঞ্চম সেটে গড়ালে নিশিকোরির রেকর্ড ছিল আরও ভালো: ২৯ জয়, ৮ হার; সাফল্যের হার ৭৮.৪ শতাংশ। বিদায় অনুষ্ঠানে তাঁর লড়াকু মানসিকতার যে প্রশংসা করা হয়েছে, এই পরিসংখ্যান তার পরিমাপযোগ্য ভিত্তি তুলে ধরে।
ইউএস ওপেনের যে দৌড় বদলে দিয়েছিল তাঁর প্রত্যাশা
নিশিকোরির ক্যারিয়ারের বড় মোড় আসে ২০১৪ সালের ইউএস ওপেনে। চতুর্থ রাউন্ডে পাঁচ সেটের লড়াইয়ে মিলোশ রাওনিচকে হারান তিনি। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে স্তান ওয়ারিঙ্কাকে হারাতেও পাঁচ সেট খেলতে হয়। এই দুই ম্যাচে কোর্টে আট ঘণ্টারও বেশি সময় কাটানোর পর তাঁর প্রতিপক্ষ হন বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ১ নম্বর নোভাক জোকোভিচ।
জোকোভিচকে চার সেটে হারিয়ে গ্র্যান্ড স্ল্যামের এককে ফাইনালে ওঠা প্রথম এশীয় পুরুষ খেলোয়াড় হন নিশিকোরি। শিরোপার লড়াইয়ে তাঁকে হারান মারিন চিলিচ। ফলে শৈশব থেকে জেতার স্বপ্ন দেখা মেজর শিরোপাটি অধরাই থেকে যায়।
বিদায় অনুষ্ঠানে নিশিকোরি বলেন, টুর্নামেন্টটি তাঁর টেনিসজীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা। তাঁর স্মৃতিচারণায় ফাইনালে হারের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, ওই পর্যায়ে পৌঁছানোর সামর্থ্য আবিষ্কার করা।
এটি আমাকে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। ফাইনালে হেরেছিলাম, কিন্তু এতে আমার প্রেরণা আরও বেড়েছিল। গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনালে পৌঁছানোর সামর্থ্য আমার আছে, এটা জানার পরই পরবর্তী অর্জনগুলো সম্ভব হয়েছে।
সেই সাফল্য আসে এমন এক মৌসুমে, যখন তিনি ৫৪টি ম্যাচ জেতেন, ১৪টিতে হারেন এবং চারটি শিরোপা জেতেন। তাঁর ক্যারিয়ারের মোট ১২টি এটিপি শিরোপার এক-তৃতীয়াংশই ছিল ওই চারটি। একই বছর তিনি এটিপি ফাইনালসে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা প্রথম এশীয় পুরুষ খেলোয়াড় হন। এরপর ২০১৫ সালের মার্চে ক্যারিয়ার-সর্বোচ্চ ৪ নম্বর র্যাঙ্কিংয়ে ওঠেন।
ফেদেরারের ফিরিয়ে দেওয়া প্রশংসা
ফেদেরারের অংশগ্রহণ টোকিওর বিদায় অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিশিকোরির শুরুর দিকের টেনিসজীবনের ব্যক্তিগত যোগসূত্র তৈরি করে। নিশিকোরি স্মরণ করেন, ১৬ বছর বয়সে সুইস খেলোয়াড়ের সঙ্গে অনুশীলন করেছিলেন। তাঁর শটের মান এবং প্রস্তুতির নিষ্ঠা, দুটো থেকেই শিখেছিলেন।
সাবেক বিশ্ব এক নম্বর ও গ্র্যান্ড স্ল্যামের এককে ২০টি শিরোপার মালিক ফেদেরার বলেন, অনুশীলনের সঙ্গীদের মধ্যে তরুণ নিশিকোরি আলাদা করে নজর কেড়েছিলেন। বিদায় অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণায় তিনি জাপানি খেলোয়াড়ের ব্যাকহ্যান্ডেরও প্রশংসা করেন এবং তাঁর বিপক্ষে খেলাকে কঠিন বলে উল্লেখ করেন।
তোমার বিপক্ষে যতবার খেলেছি, প্রতিবারই তা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই খেলায় সফল হতে যে গুণগুলো দরকার, সবই তোমার ছিল; তোমার টেনিস ক্রমেই আক্রমণাত্মক হয়েছে, আর আমার বিশ্বাস, ইতিহাসের সেরাদের মধ্যে তোমার ব্যাকহ্যান্ড অন্যতম।
তাঁদের ১১টি প্রতিযোগিতামূলক মুখোমুখি লড়াইয়ের আটটিতে জেতেন ফেদেরার, নিশিকোরির জয় তিনটি। ফেদেরার, রাফায়েল নাদাল ও জোকোভিচের বিপক্ষে নিশিকোরির মোট সাতটি জয়ের রেকর্ড রয়েছে এটিপির হিসাবে: ফেদেরারের বিপক্ষে তিনটি, আর অন্য দুজনের বিপক্ষে দুটি করে।
প্রশংসার জবাবে নিশিকোরি রসিকতা করে বলেন, এর প্রায় অর্ধেকই তোষামোদ। সে সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বর্ণনায় অবশ্য তিনি গম্ভীর ছিলেন: ফেদেরার, জোকোভিচ, নাদাল ও অ্যান্ডি মারে এতটাই শক্তিশালী ছিলেন যে তাঁদের দলে ঢোকার চেষ্টা খেলোয়াড়দের জন্য বড় প্রেরণা হয়ে উঠেছিল।
অলিম্পিক পদকের ভিন্ন তাৎপর্য
নাদালের বিপক্ষে নিশিকোরির দুটি জয়ের একটি তাঁকে ২০১৬ সালের রিও ডি জেনেইরো অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ এনে দেয়। এটিপির তথ্য অনুযায়ী, ৯৬ বছরে জাপানের প্রথম অলিম্পিক টেনিস পদক এটি। ফলে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে আরেকটি জয়ের বাইরেও ফলটির জাতীয় তাৎপর্য ছিল।
বিদায় অনুষ্ঠানে নিশিকোরি অলিম্পিকের সঙ্গে পেশাদার ট্যুরের সাধারণ প্রতিযোগিতার পার্থক্য তুলে ধরেন; ট্যুরে খেলোয়াড়েরা প্রাইজমানি ও র্যাঙ্কিং পয়েন্টের জন্য খেলেন। তিনি বলেন, যাঁরা তাঁর খেলা দেখে আনন্দ পেতে পারেন, তাঁদের জন্য খেলতে পারা তাঁকে অন্য ধরনের শক্তি জুগিয়েছিল।
ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচে জয়ের প্রেরণা ব্যাখ্যা করে নিশিকোরি বলেন:
আমার ক্ষেত্রে, এমনকি অল্প কয়েকজনও খুশি হবেন, কিংবা অন্য কারও জন্য খেলছি—এটা ভেবে খেললে আমি অবিশ্বাস্য রকম শক্তিশালী হয়ে উঠতাম। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নাদালকে হারিয়ে পদক জিততে এই ব্যাপারটাই আমাকে সাহায্য করেছিল।
তিনি বলেন, এই জয়ের কৃতিত্ব তিনি নিজেকে দিতে পারেন। পাঁচ বছর পর, ২০২১ সালে টোকিও অলিম্পিকে পঞ্চম বাছাই আন্দ্রেই রুবলেভকে প্রথম ম্যাচে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেন তিনি।
অলিম্পিকের স্মৃতির সঙ্গে তাঁর পরবর্তী উচ্চাকাঙ্ক্ষারও যোগ রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জাপানে টেনিস ও খেলাধুলার মর্যাদা বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষার কথা বলেন। দেশের প্রতিনিধিত্বের সময় মানুষের সঙ্গে যে সংযোগ অনুভব করেছিলেন, তা আরও বিস্তৃত করতে চান।
শেষ কয়েক সপ্তাহ ও পাশে থাকা মানুষগুলো
একটি মাত্র বিদায় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নয়, একাধিক পৃথক আয়োজনের মধ্য দিয়ে নিশিকোরির অবসরপর্ব এগিয়েছে। তাঁর শেষ ম্যাচ, জাপান ওপেনের অনুষ্ঠান এবং ইউনিক্লোর আয়োজন তাঁকে টেনিসজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলার সুযোগ দেয়।
- এপ্রিল ২০২৬: অবসরের ঘোষণা দেন নিশিকোরি। বলেন, টেনিসের প্রতি ভালোবাসা ও নিজের উন্নতি সম্ভব—এই বিশ্বাসই তাঁকে বারবার কোর্টে ফিরিয়ে এনেছে।
- ১ অক্টোবর: টোকিওতে জাপান ওপেনের প্রথম রাউন্ডে হারেন, এটিই ছিল তাঁর শেষ আনুষ্ঠানিক ম্যাচ।
- ৬ অক্টোবর: জাপান ওপেনের ভেন্যুতে অবসর উপলক্ষে বক্তব্য দেন। উপস্থিত ছিলেন জুনিয়র খেলোয়াড়দের পৃষ্ঠপোষক মাসাকি মোরিতা এবং সাবেক কোচ মাইকেল চ্যাং।
- ১১ অক্টোবর: আরিয়াকে কলিসিয়ামে ইউনিক্লোর বিদায় অনুষ্ঠানে প্রায় ৯,০০০ দর্শক উপস্থিত ছিলেন। এরপর হয় অবসর-সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলন।
৬ অক্টোবরের অনুষ্ঠানে নিশিকোরি তাঁর বাবা-মা, বোন, কর্মী ও সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান। পাঁচ বছর বয়সে টেনিস শুরু করার কথা স্মরণ করে তিনি বোনকে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উল্লেখ করেন। বাবার অঙ্গীকার এবং মায়ের সমর্থনের কথাও বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় তাঁর বয়স কত ছিল, সে বিষয়ে বিবরণে পার্থক্য রয়েছে। অনুষ্ঠানের বক্তব্যে নিশিকোরি বলেন, মোরিতার সহায়তায় ১৩ বছর বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। এটিপির স্মারক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪ বছর বয়সে ফ্লোরিডার আইএমজি একাডেমিতে যান এবং ইংরেজি না জেনেই সেখানে পৌঁছান। উভয় বিবরণেই বিদেশে প্রশিক্ষণকে তাঁর বিকাশের বড় পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
যে উদ্যাপনে একত্র হয়েছিলেন ভিন্ন প্রজন্মের খেলোয়াড়েরা
কেই নিশিকোরিকে নিয়ে ‘ইউনিক্লো লাইফওয়্যার ডে টোকিও ২০২৬’ অনুষ্ঠানটি প্রায় চার ঘণ্টা চলে। প্রকাশ্য লটারিতে নির্বাচিত হয়ে প্রায় ৯,০০০ দর্শক এতে অংশ নেন। দীর্ঘদিনের পৃষ্ঠপোষক ইউনিক্লো, যার বৈশ্বিক দূত হিসেবে নিশিকোরি কাজ করেন, এই উদ্যোজনের আয়োজন করে।
প্রদর্শনী ম্যাচে ফেদেরার ও নিশিকোরি জুটি বেঁধে সাবেক জাপানি খেলোয়াড় গো সোয়েদা ও সাতোশি ইওয়াবুচির বিপক্ষে খেলেন। আরেক ম্যাচে হুইলচেয়ার টেনিস চ্যাম্পিয়ন শিঙ্গো কুনিয়েদার সঙ্গে নিশিকোরির জুটি হয়; তাঁদের প্রতিপক্ষ ছিলেন ফেদেরার ও গর্ডন রিড। দিনের টেনিস আয়োজনগুলোতে আর্থার রিন্ডারকনেখও অংশ নেন।
ভিন্ন ভিন্ন জুটি গড়ে তোলায় বিদায় অনুষ্ঠানটি শুধু একের পর এক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। কিশোর বয়সে যাঁকে শ্রদ্ধা করতেন, সেই প্রতিদ্বন্দ্বীর পাশে খেলতে পেরেছেন নিশিকোরি; পাশাপাশি জাপানি ও হুইলচেয়ার টেনিসের পরিচিত মুখদের সঙ্গে কোর্ট ভাগ করে নিয়েছেন।
দর্শকদের উদ্দেশে কথা বলার সময় নিশিকোরি তাঁদের সমর্থন নিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করতে পারার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর প্রকাশ্য বিদায়ে ছিল মেনে নেওয়ার সুর, যদিও আগের অনুষ্ঠানে তিনি এমন কিছু ফল অর্জন করতে না পারার আক্ষেপের কথাও বলেছিলেন।
এই অনুভূতিগুলো পরস্পরবিরোধী নয়। নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেন, আবার গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা, আরও উঁচু র্যাঙ্কিং কিংবা বেশি সময় খেলতে পারার আকাঙ্ক্ষাও থাকতে পারে। এপ্রিলে অবসর ঘোষণার সময়ই তিনি বলেছিলেন, খেলা চালিয়ে যেতে চান; তবে গর্ব করে বলতে পারেন যে নিজের সবটুকু দিয়েছেন।
অবসরে ব্যথার অর্থ বদলে যায়
সংবাদ সম্মেলনে এই পরিবর্তনের আরও ব্যক্তিগত ছবি উঠে আসে। নিশিকোরি বলেন, জাপান ওপেনের পরও তাঁর ব্যথা হচ্ছিল, তবে পরদিনের ম্যাচের চাহিদার সঙ্গে প্রতিটি অস্বস্তিকে মিলিয়ে দেখার দায় আর নেই।
ক্যারিয়ারের পরের ভাগে বারবার চোটের কারণে বিরতি নেওয়া এই খেলোয়াড়ের জন্য এটি ছিল বড় পরিবর্তন। এই নিরন্তর দুশ্চিন্তা দূর হওয়াকে তিনি স্বস্তি হিসেবে বর্ণনা করেন; অবসরে শারীরিক সমস্যাগুলো সেরে গেছে, এমন দাবি করেননি।
নিশিকোরি আরও জানান, খেলার সময় ডোপিং পরীক্ষার উদ্বেগ ওষুধ নেওয়ার পদ্ধতিকে প্রভাবিত করত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ সর্দি হলেও তিনি হাসপাতালে যেতেন এবং উপযুক্ত ওষুধের ব্যবস্থাপত্র নিতেন। এখন ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনতে পারায় দৈনন্দিন জীবন সহজ হয়েছে। এটি তাঁর নিজের সতর্কতার বিবরণ; ফার্মেসির সব ওষুধই ক্রীড়াবিদদের জন্য নিষিদ্ধ, এমন বক্তব্য নয়।
অন্য কিছু স্বাধীনতা ছিল আরও ছোট ও আনন্দের: দুপুরের খাবারে দুটি ডেজার্ট অর্ডার করা এবং জাপানে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার আশা। তবে তিনি এ-ও বলেন, প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ ছেড়ে আসার বিষয়টি প্রতিদিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এটিপির রেকর্ডে তাঁর প্রতিযোগিতার দীর্ঘস্থায়ী আগ্রহের একটি দৃষ্টান্ত আছে। ২০২৫ সালে, ৩৫ বছর বয়সে, হংকংয়ের ফাইনালে ওঠেন তিনি। ব্রিসবেনে তাঁর আগের এটিপি শিরোপা জয়ের ছয় বছর পর সেই দৌড়ে তৃতীয় বাছাই কারেন খাচানভকেও হারান।
বিদেশে খেলার সুযোগ কেন তাঁর পরিকল্পনার কেন্দ্রে
জুনিয়র খেলোয়াড়দের সহায়তায় নিশিকোরির ভাবনাগুলো জাপান ছেড়ে যাওয়ার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই এসেছে। তিনি বলেন, পেশাদার টেনিসের প্রধান কেন্দ্রগুলো ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর মতে, উচ্চ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় মানসিক দৃঢ়তা গড়তে তরুণ খেলোয়াড়দের সেখানকার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দরকার।
তিনি আরও বলেন, এশিয়ায় থেকে সেই অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হতে পারে। তাঁর মূল্যায়নে, সমান প্রাইজমানির ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের টুর্নামেন্টের তুলনায় কিছু এশীয় টুর্নামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মান দুর্বল। এটি খেলোয়াড় গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে তাঁর মতামত, এটিপির প্রকাশিত কোনো টুর্নামেন্ট-র্যাঙ্কিং নয়।
বাস্তব বাধাটি হলো খরচ। নিশিকোরি স্বীকার করেন, বিদেশে প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া কঠিন এবং ব্যয়বহুল; প্রতিটি পরিবারের পক্ষে তাঁর নেওয়া পথ অনুসরণ করাও সম্ভব নয়। তাঁর প্রস্তাবিত একাডেমি, ক্লাব, ফাউন্ডেশন বা তহবিল এই ব্যবধানের কোনো একটি অংশ কমানোর চেষ্টা করবে।
তিনি যে লক্ষ্য বর্ণনা করেছেন, তা একজন উত্তরসূরি তৈরি করার চেয়ে বড়। অনেক খেলোয়াড়কে শীর্ষ ৫০ বা শীর্ষ ৩০-এ পৌঁছাতে সাহায্য করতে চান তিনি। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: এতে একটি অসাধারণ ক্যারিয়ারের ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম খেলোয়াড়দের বড় একটি গোষ্ঠী গড়ার ইঙ্গিত রয়েছে।
চোট কাটিয়ে ফেরার অভিজ্ঞতাও ভাগ করে দিতে চান নিশিকোরি। প্রতিযোগিতায় ফিরতে যে নিরিবিলি, পুনরাবৃত্তিমূলক পরিশ্রম দরকার, তা তাঁকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে বলে তিনি জানান। এই অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান।
যা চূড়ান্ত, আর যা এখনো ভাবনা
নিশিকোরি এখনো কোনো একাডেমি, অর্থায়ন কর্মসূচি বা ফাউন্ডেশন চালুর ঘোষণা দেননি। জুনিয়রদের সহায়তার জন্য কোনো শুরুর তারিখ, অবস্থান, বাজেট বা বাছাইপ্রক্রিয়াও জানাননি। কীভাবে সবচেয়ে কার্যকরভাবে সহায়তা করা যায়, তা ঠিক করতে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করতে চান বলে জানিয়েছেন।
কার সঙ্গে কথা বলতে চান—এমন প্রশ্নে তিনি রসিকতা করে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নাম বলেন। সংবাদ সম্মেলনে এতে হাসির রোল ওঠে, তবে এটি কোনো বৈঠক, সরকারি সম্পৃক্ততা বা সরকারি অর্থায়নের ঘোষণা ছিল না।
জাপানের প্রত্যাশার ভার বহন করার প্রসঙ্গে নাওমি ওসাকার কথা বলেন তিনি। নতুন প্রজন্মের যেসব খেলোয়াড়ের অগ্রগতিতে সহায়তা করতে চান, তাঁদের মধ্যে রেই সাকামোতোর নামও উল্লেখ করেন। এটিপির স্মারক প্রতিবেদনে সাকামোতোর ছোটবেলায় নিশিকোরিকে দেখে বড় হওয়ার বিবরণ রয়েছে, যা পরবর্তী প্রজন্মের ওপর ২০১৪ সালের সেই সাফল্যের প্রভাব তুলে ধরে।
যুক্তরাষ্ট্র ওপেনের বাছাইপর্বে পরে নিশিকোরিকে হারানো তরুণ জাপানি খেলোয়াড় সাকামোতো এটিপিকে বলেন:
[জাপানের] অনেক মানুষ তাঁর কারণে টেনিস অনুসরণ করেন। তিনি একজন সুপারস্টার।
নিশিকোরির তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা হলো বিশ্রাম নেওয়া, তারপর কীভাবে টেনিসের সঙ্গে যুক্ত থাকা যায় তা খতিয়ে দেখা। পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে শিরোপার জন্য তাঁর প্রতিযোগিতার এখানেই ইতি। পরবর্তী অবদানের কাঠামো এখনো ঠিক হয়নি, তবে তাঁর উল্লেখ করা অগ্রাধিকারগুলো সুনির্দিষ্ট: জাপান ও এশিয়ার টেনিসকে আরও শক্তিশালী করা, বিদেশে প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়ানো এবং আরও বেশি খেলোয়াড়কে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।
মূল বিষয়গুলো
- ৩৬ বছর বয়সী নিশিকোরি ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর জাপান ওপেনে শেষ আনুষ্ঠানিক ম্যাচ খেলেন।
- ১১ অক্টোবর আরিয়াকে কলিসিয়ামে তাঁর বিদায় অনুষ্ঠানে প্রায় ৯,০০০ দর্শক উপস্থিত ছিলেন; অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন ফেদেরার।
- ক্যারিয়ারে তিনি ১২টি এটিপি শিরোপা, ট্যুর পর্যায়ে ৪৫২টি জয় এবং সর্বোচ্চ ৪ নম্বর র্যাঙ্কিং অর্জন করেন।
- ২০১৪ সালের ইউএস ওপেনের ফাইনালে ওঠেন এবং ২০১৬ সালে রিওতে অলিম্পিক ব্রোঞ্জ জেতেন।
- নির্ধারণী সেটে তাঁর সাফল্যের হার ৭২.৫ শতাংশ, এটিপির ঐতিহাসিক র্যাঙ্কিংয়ে যা তৃতীয়।
- আরও বেশি জাপানি ও এশীয় খেলোয়াড়কে শীর্ষ ৫০ ও শীর্ষ ৩০-এ পৌঁছাতে সহায়তা করতে চান, তবে কোনো কর্মসূচি বা শুরুর তারিখ ঘোষণা করেননি।






