ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উপকূলীয় এলাকায় ভারতের পশ্চিমমুখী ডেটা ট্রাফিকের বেশির ভাগ প্রবাহিত হয়
ভারতের দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতি নির্ভর করছে আশ্চর্যজনকভাবে সীমিত একটি অবকাঠামোর ওপর। মুম্বাইয়ের আরব সাগর উপকূলের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ভারসোভার আশপাশে, প্রায় ছয় কিলোমিটারের মধ্যে দেশটির ১৮টি আন্তমহাদেশীয় সাবমেরিন কেবলের অন্তত ১৩টি তীরে উঠে এসেছে।
সূচিপত্র
- ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উপকূলীয় এলাকায় ভারতের পশ্চিমমুখী ডেটা ট্রাফিকের বেশির ভাগ প্রবাহিত হয়
- ব্ল্যাকআউটের মতোই কেন গতি কমে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ
- পুরোনো কেবল ঝুঁকির আরেকটি স্তর যোগ করছে
- ভারতের নিজস্ব কেবল মেরামতের জাহাজ নেই
- কেবল পরিকল্পনার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে ডেটা সেন্টার
- অনুমোদন পেতে কেন কয়েক বছর লাগতে পারে
- নতুন রুটে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে
- প্রযুক্তি সমুদ্রতল পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে
- ভারত কি আঞ্চলিক কেবল হাবে পরিণত হতে পারে?
- মূল কথা
এই কেবলগুলো একসঙ্গে ভারতের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত ইউরোপ, আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায় বহন করে। এর ফলে এই উপকূলীয় এলাকা ব্যাংকিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, সরকারি যোগাযোগ, অনলাইন সেবা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসার একটি প্রধান প্রবেশদ্বারে পরিণত হয়েছে।
সাবমেরিন কেবল হলো সমুদ্রতলদেশে বিছানো অপটিক্যাল ফাইবারের গুচ্ছ। এগুলো আলোর স্পন্দনের মাধ্যমে তথ্য পাঠায় এবং বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ট্রাফিকের প্রায় ৯৯ শতাংশ বহন করে। জনমনে স্যাটেলাইট বেশি মনোযোগ পেলেও, বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট ব্যবহারকে সাশ্রয়ী ও দ্রুত করে তোলা অদৃশ্য মহাসড়ক হলো এই কেবলগুলো।
তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের অন্বেষা সেন বলেন, এই কেবলগুলোর গুচ্ছবদ্ধ অবস্থান ভারতের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থানে বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে।
ভৌগোলিকভাবে তীব্র কেন্দ্রীভবনের কারণে এই নেটওয়ার্ক গুরুতর ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ওই কেবলগুলোর কয়েকটি একসঙ্গে—দুর্ঘটনাবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে—কেটে গেলে পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমমুখী ব্যান্ডউইথের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কেবল বিচ্ছিন্ন হলে দেশটি যে বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, তা নয়। নেটওয়ার্কগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে চেন্নাই ও কোচিসহ অন্য অবতরণকেন্দ্রের মাধ্যমে ট্রাফিকের পথ পরিবর্তন করা যায়। তবে বিঘ্নের খরচ অনেক হতে পারে। দীর্ঘ পথ ও বিকল্প রুটে চাপ বাড়লে তথ্য আদান-প্রদানে বেশি সময় লাগতে পারে। এই বিলম্বকে ল্যাটেন্সি বলা হয়। সামান্য বৃদ্ধি হলেও তা শেয়ার লেনদেন, ডিজিটাল পেমেন্ট, ক্লাউড অ্যাপ্লিকেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজকে প্রভাবিত করতে পারে।
ব্ল্যাকআউটের মতোই কেন গতি কমে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ
আধুনিক অনলাইন সেবাগুলো নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ওপর নির্ভর করে। লেনদেন প্রক্রিয়াকরণ ও বিদেশি ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগে ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক সংযোগ ব্যবহার করে। শেয়ারবাজারের জন্য সময়ের নির্ভুলতা জরুরি। ক্লাউড কোম্পানিগুলো সার্ভার, গ্রাহক ও ব্যাকআপ স্থানের মধ্যে তথ্য সরায়। প্রশাসন ও জনসেবার জন্য সরকারি নেটওয়ার্কের স্থিতিশীল সংযোগ প্রয়োজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চাপের আরেকটি স্তর যোগ করেছে। বড় মডেল প্রশিক্ষণে ডেটা সেন্টারগুলোর মধ্যে বিপুল পরিমাণ ডেটা সরাতে হয়, আর এআই অ্যাপ্লিকেশনগুলোর প্রায়ই কম্পিউটিং কেন্দ্র ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান প্রয়োজন হয়। কেবলের কোনো রুট ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই ট্রাফিককে দীর্ঘ পথ দিয়ে পাঠাতে হতে পারে, ফলে কার্যক্ষমতা কমবে বা পরিচালন ব্যয় বাড়বে।
সস্তা মোবাইল ডেটা, স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার এবং ডিজিটাল সেবার প্রসারে ভারতে ইন্টারনেট ব্যবহার উল্লেখযোগ্য গতিতে বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে ব্রডব্যান্ড গ্রাহকসংখ্যা একশ কোটির বেশি হয়েছে। শিল্পখাতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত ডেটার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভারত ব্যবহার করে, অথচ দেশটি বৈশ্বিক সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত।
এই ব্যবধান একটি মৌলিক ভারসাম্যহীনতা প্রকাশ করে। ভারত ডিজিটাল সেবার বড় ভোক্তা ও উৎপাদক হয়ে উঠছে, অথচ অন্য বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী ভৌত লিংকগুলোর তুলনাযোগ্য অংশ তার নেই।
ব্রডব্যান্ড ইন্ডিয়া ফোরামের চেয়ারপারসন অরুণা সুন্দররাজন বলেন, ভারতের উপকূলীয় প্রবেশদ্বারের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়াতে হবে। কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন হলো এমন স্থাপনা, যেখানে আন্তর্জাতিক কেবল স্থলভাগের ফাইবার নেটওয়ার্ক, ডেটা সেন্টার ও টেলিকম অপারেটরদের সঙ্গে যুক্ত হয়। বৈশ্বিক সক্ষমতা দেশের কোথায় প্রবেশ করবে এবং অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে কত সহজে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে, তা এসব স্টেশন নির্ধারণ করে।
পুরোনো কেবল ঝুঁকির আরেকটি স্তর যোগ করছে
ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবনই একমাত্র উদ্বেগ নয়। তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের একটি গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, ভারতের ১৮টি আন্তর্জাতিক কেবলের মধ্যে ১১টিই ২০ বছরের বেশি পুরোনো। সাধারণত সাবমেরিন ব্যবস্থা প্রায় ২৫ বছর চালু থাকার জন্য তৈরি করা হয়, যদিও রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে কোনো কোনো ব্যবস্থা এর চেয়েও বেশি সময় কাজ করতে পারে।
ডিজিটাল অবকাঠামো কোম্পানি লাইটস্টর্মের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমজিত গুপ্ত বলেন, ভারতের ল্যান্ডিং কেবলগুলোর বয়স নিয়ে উদ্বেগ যথার্থ। পুরোনো যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল হতে পারে এবং আজকের ডেটা চাহিদা মেটাতে তৈরি নতুন ব্যবস্থার তুলনায় এগুলোর সক্ষমতা কম হতে পারে।
ইচ্ছাকৃত হামলার তুলনায় কেবলে ত্রুটি অনেক বেশি ঘটে। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০টি ত্রুটির ঘটনা ঘটে। বেশির ভাগ ঘটনার জন্য দায়ী মাছ ধরার কার্যক্রম, জাহাজের নোঙর, পানির নিচের ভূমিধস, ঝড় ও যন্ত্রপাতির ত্রুটি। বিশেষত উপকূলের কাছে কেবলগুলো গুচ্ছবদ্ধ থাকলে ইচ্ছাকৃত হস্তক্ষেপ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তবে নিয়মিত সামুদ্রিক কর্মকাণ্ডই বেশি ঘনঘন বিপদ তৈরি করে।
লোহিত সাগরে বিঘ্ন দেখিয়েছে, কীভাবে একটি আঞ্চলিক সমস্যা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে প্রভাবিত করতে পারে। ওই অঞ্চলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিছু ট্রাফিক সিঙ্গাপুর হয়ে পূর্ব দিকে ঘুরিয়ে পরে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে পাঠানো হয়। বিকল্প পথে পাঠানোয় সংযোগ বজায় ছিল, তবে পথ দীর্ঘ হওয়ায় বিকল্প রুটগুলোর ওপর চাপও বেড়েছিল।
লোহিত সাগর ঘিরে থাকা রুটগুলোর ওপর ভারতের নির্ভরতার কারণে সংযোগের পথ বৈচিত্র্যময় করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলে আরও ল্যান্ডিং পয়েন্ট থাকলে কোনো একটি করিডর ক্ষতিগ্রস্ত বা যানজটপূর্ণ হলে অপারেটরদের হাতে অতিরিক্ত বিকল্প থাকবে।
ভারতের নিজস্ব কেবল মেরামতের জাহাজ নেই
মেরামত সক্ষমতা দেশটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি। বর্তমানে ভারতে সাবমেরিন কেবল মেরামতের জন্য নিজস্ব কোনো বিশেষায়িত জাহাজ নেই। ভারতীয় জলসীমায় কেবল বিচ্ছিন্ন হলে সাধারণত বিদেশ থেকে—প্রায়ই দুবাই বা সিঙ্গাপুর থেকে—জাহাজ আনতে হয় এবং পরে ভারতীয় জলসীমায় কাজের অনুমতি নিতে হয়।
এই প্রক্রিয়ায় মেরামতের কাজে কয়েক সপ্তাহ বাড়তি লাগতে পারে। প্রযুক্তিবিদেরা ক্ষতিগ্রস্ত কেবলে পৌঁছানোর পরই শুধু বিলম্ব শুরু হয় না। অপারেটরদের প্রথমে ত্রুটির স্থান শনাক্ত করতে, উপযুক্ত জাহাজ নির্ধারণ করতে, সরঞ্জামের ব্যবস্থা করতে এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নিতে হয়। আবহাওয়া ও সমুদ্রের অবস্থার কারণে সময় আরও বাড়তে পারে।
সেন বলেন, বিদেশি মেরামতকারী জাহাজ এবং লাইসেন্স নেওয়ার প্রক্রিয়া বারবার ঝুঁকি তৈরি করে। গুপ্তের যুক্তি, ট্রাফিকের বিকল্প পথ বের করার সক্ষমতার চেয়ে স্থানীয় মেরামত সক্ষমতার অভাবই বড় সমস্যা।
ভারতীয় জলসীমায় প্রতিটি কেবল ত্রুটির ক্ষেত্রে দুবাই বা সিঙ্গাপুরের বিদেশি মেরামতকারী জাহাজের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিদেশি জাহাজ নির্ধারিত হলে ভারতীয় জলসীমায় কাজের জন্য তাকে লাইসেন্স নিতে হয়, ফলে এমনিতেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় আরও কয়েক সপ্তাহ যোগ হয়।
নিজস্ব মেরামতকারী জাহাজ থাকলেই সব বিলম্ব দূর হবে না। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ কর্মীদল ও সরঞ্জাম দ্রুত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। মেরামতকারী জাহাজ, অতিরিক্ত কেবল, প্রশিক্ষিত কর্মীদল এবং আগে থেকে অনুমোদিত পদ্ধতি নিয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক ব্যবস্থাও সেবা বন্ধ থাকার সময় কমাতে পারে।
কেবল পরিকল্পনার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে ডেটা সেন্টার
ক্লাউড সেবা ও এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সক্ষমতা ভারত গড়ে তুলছে। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ডেটা সেন্টারের স্থাপিত সক্ষমতা ২০২০ সালের প্রায় ৩৭৫ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১,৫৭৫ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে। শিল্পখাতের অনুমান অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা ৪.৫ গিগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ডেটা সেন্টারে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগে এবং ব্যবহারকারী, কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম ও অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানে নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক কেবল সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার আগেই নতুন কোনো কেন্দ্র চালু হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে পারে।
সাবমেরিন কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগে। পরিকল্পনায় তিন থেকে চার বছর লাগতে পারে; এরপর রুট অনুযায়ী কেবল তৈরি ও স্থাপনে আরও দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগে। দ্রুত এগিয়ে চলা এআই ও ক্লাউড বিনিয়োগের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে দেশটি সময়ের এই ব্যবধানের সমস্যায় পড়ছে।
সুন্দররাজন বলেন, ডেটা সেন্টার উন্নয়নের পাশাপাশি কেবল সক্ষমতার পরিকল্পনা করতে হবে, পরে যোগ করলে চলবে না। গুপ্তও একই যুক্তি তুলে ধরে বলেন, যানজট দেখা দেওয়ার অপেক্ষায় না থেকে চাহিদার আগেই শিল্পখাতকে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সমস্যাটি কেবলের বাইরেও বিস্তৃত। আন্তর্জাতিক সক্ষমতাকে অভ্যন্তরীণ ফাইবার রুট, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও ডেটা সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। দূরবর্তী এলাকায় ল্যান্ডিং স্টেশন থাকলেও, স্থলভাগের লিংকগুলো তার ট্রাফিককে প্রধান কম্পিউটিং ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে না পারলে এর মূল্য সীমিত।
অনুমোদন পেতে কেন কয়েক বছর লাগতে পারে
একমাত্র সমস্যা ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি নয়। সাবমেরিন কেবল প্রকল্পে টেলিযোগাযোগ, প্রতিরক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, নৌপরিবহন, বন্দর, পরিবেশ ও রাজ্য প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর অনুমোদন লাগতে পারে।
সুন্দররাজন বলেন, ১৬টি পর্যন্ত সংস্থা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে পারে, আর একটি ল্যান্ডিং স্টেশনের জন্য অন্তত ১৬টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ৫০টি অনুমোদন লাগতে পারে। নির্মাণ, সামুদ্রিক জরিপ, কেবল স্থাপন, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতকারী জাহাজের জন্য কোম্পানিগুলোকে আলাদা প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়।
এই খণ্ডিত প্রক্রিয়া বিনিয়োগে অনীহা তৈরি করতে পারে এবং জরুরি মেরামতকে ধীর করতে পারে। নতুন ল্যান্ডিং সাইট বেছে নেওয়াও কোম্পানিগুলোর জন্য কঠিন হতে পারে, কারণ প্রতিটি স্থানের জন্য নতুন করে অনুমতি ও কারিগরি মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
ব্রডব্যান্ড ইন্ডিয়া ফোরাম একক-জানালা ব্যবস্থার মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ বিভাগকে প্রধান সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। শিল্পখাতের প্রতিনিধিরাও চান, দুই উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলে একাধিক ল্যান্ডিং সাইট আগেভাগে চিহ্নিত ও অনুমোদিত হোক এবং নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মানসম্মত শর্ত নির্ধারণ করা হোক।
ভারত ইতোমধ্যে সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই মর্যাদা দ্রুত অনুমোদন, জরুরি মেরামত প্রক্রিয়া এবং কেবল করিডরের আইনি সুরক্ষায় সহায়তা করতে পারে। ল্যান্ডিং সাইট ও পরিচিত কেবল রুটের কাছে নোঙর করা ও ট্রলিংয়ে বিধিনিষেধ দিয়ে সুরক্ষিত এলাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
নতুন রুটে ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে
ভারত নিষ্ক্রিয় নেই। চারটি নতুন সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে এবং আরও তিনটি পরিকল্পনাধীন। বড় প্রকল্পগুলোর একটি হলো আই-টু-সিইএ, ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে পরিকল্পিত সংযোগ। লাইটস্টর্মসহ বিভিন্ন শিল্পখাতের অংশীদারদের নিয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছে।
এই ব্যবস্থায় ভারতের দুটি ল্যান্ডিং পয়েন্ট—মাচিলিপত্তনম ও দক্ষিণ চেন্নাই—ব্যবহারের কথা রয়েছে। মাচিলিপত্তনম রুটটি হায়দরাবাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সংযোগ দেবে, যেখানে ক্লাউড ও এআই কম্পিউটিংয়ের চাহিদা বাড়ছে। দ্বিতীয় ল্যান্ডিং পয়েন্টটি মুম্বাইয়ের বাইরে সক্ষমতা ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যোগ করবে।
অন্যান্য প্রকল্পও নতুন কেন্দ্র গড়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পূর্ব উপকূলে বিশাখাপত্তনম সম্ভাব্য প্রবেশদ্বার হিসেবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি, টেলিকম অপারেটর ও ডেটা সেন্টার নির্মাতাদের অংশগ্রহণে সেখানে পরিকল্পনা চলছে। নতুন সংযোগ ভারতকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত করতে পারে।
এয়ারটেল ও জিওর মতো টেলিকম কোম্পানিগুলো তাদের কেবল নেটওয়ার্ক বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সরাসরি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করছে। এতে বৈশ্বিক পর্যায়ে আরও বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটছে। গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজন কেবল সক্ষমতার বড় ক্রেতা থেকে সরে এসে কেবল ব্যবস্থায় অর্থায়ন করছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেগুলোর মালিকও হচ্ছে।
প্রথমে ভিডিও ও স্ট্রিমিং ট্রাফিক, এরপর ক্লাউড সেবা ও এআই এই পরিবর্তনকে চালিত করছে। হাইপারস্কেলাররা তাদের ডেটা সেন্টার যুক্তকারী রুটের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ চায়। এতে সক্ষমতা পরিকল্পনা উন্নত হতে পারে এবং তৃতীয় পক্ষের নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
প্রযুক্তি সমুদ্রতল পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে
ঝুঁকি মোকাবিলার প্রধান উপায় থাকবে ভৌতভাবে কেবল ও ল্যান্ডিং পয়েন্টের বিস্তার, তবে পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি অজ্ঞাতসারে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কমাতে পারে। ডিস্ট্রিবিউটেড অ্যাকুস্টিক সেন্সিং কেবলের ভেতরের অপটিক্যাল ফাইবারকে দীর্ঘ সেন্সর হিসেবে ব্যবহার করে। আলোর ধরনে পরিবর্তন হলে জাহাজ, নোঙর বা পানির নিচের যান থেকে তৈরি কম্পন শনাক্ত করা যায়।
এ ধরনের ব্যবস্থা কোনো জাহাজ কেবল করিডরের বিপজ্জনকভাবে কাছে এলে অপারেটরদের সতর্ক করতে পারে। এগুলো সব দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারে না, আর শনাক্তকরণ মেরামত সক্ষমতার বিকল্পও নয়। তবে আগাম সতর্কবার্তা পেলে কেবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগেই কর্তৃপক্ষ বা জাহাজ পরিচালকেরা ব্যবস্থা নিতে পারেন।
নিরাপত্তার জন্য নির্ভুল মানচিত্র, নিয়মিত পরিদর্শন এবং টেলিকম অপারেটর, বন্দর, মৎস্যজীবী সম্প্রদায় ও সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে সহযোগিতাও জরুরি। কিছু উপকূলের কাছে কেবল মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়, আবার গভীর পানিতে থাকা কেবল সরাসরি সমুদ্রতলে থাকে। ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন।
দেশটির বিশেষায়িত শিল্পদক্ষতাও প্রয়োজন। ভারতীয় নির্মাতাদের স্থলভাগের অপটিক্যাল ফাইবার তৈরির অভিজ্ঞতা আছে, তবে সাবমেরিন খাতে আরও উন্নত জলতল-উপযোগী সরঞ্জাম দরকার। এর মধ্যে রয়েছে সাঁজোয়া কেবল, রিপিটার এবং পানির নিচে কয়েক দশক ধরে কাজ করার জন্য তৈরি অন্যান্য উপাদান। দেশের নিজস্ব মেরামত বহর ও স্থানীয় উৎপাদন জোরদার হলে বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
ভারত কি আঞ্চলিক কেবল হাবে পরিণত হতে পারে?
আরও আন্তর্জাতিক কেবল আকর্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বাজারের আকার, ডেটার চাহিদা ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ ভারতের রয়েছে। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংযোগ তৈরি করে। বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল ব্যবসা ও সম্প্রসারণশীল ডেটা সেন্টার শিল্পও দেশটির আকর্ষণ বাড়ায়।
সমন্বিত কেবল হাব কেমন হতে পারে, সিঙ্গাপুর তার উদাহরণ। নগররাষ্ট্রটির অল্প কয়েকটি ল্যান্ডিং সাইটে বহু কেবল এসে মিলেছে, যার সহায়ক হিসেবে রয়েছে অনুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, শক্তিশালী স্থলভাগের নেটওয়ার্ক এবং দ্রুত মেরামতসেবার সুবিধা। ভারতের উপকূল অনেক দীর্ঘ এবং ভৌগোলিকভাবে কেবল ছড়িয়ে দেওয়ার জায়গাও বেশি, তবে কোম্পানিগুলো যাতে এই সুবিধা কাজে লাগাতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বিদ্যমান অবকাঠামো, গ্রাহক ও কারিগরি দক্ষতা আগে থেকেই মুম্বাইয়ে কেন্দ্রীভূত থাকায় ঐতিহাসিকভাবে সংযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে শহরটি। একই বাণিজ্যিক যুক্তি এখন নিরাপত্তার দুর্বলতা তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রের বাইরে অপারেটরদের আকৃষ্ট করতে নতুন উপকূলীয় প্রবেশদ্বারগুলোর জন্য শক্তিশালী ব্যাকহল নেটওয়ার্ক, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, দক্ষ কর্মী ও সুস্পষ্ট নিয়ম প্রয়োজন।
ভারতের জন্য বাস্তব অগ্রাধিকারগুলো স্পষ্ট: ল্যান্ডিং স্টেশন বাড়ানো, সেগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া, পুরোনো কেবল বদলানো, রুট সুরক্ষিত করা, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দেশের নিজস্ব মেরামত সক্ষমতা গড়ে তোলা। এসব পদক্ষেপ ক্লাউড কম্পিউটিং, ডিজিটাল জনসেবা ও এআই খাতে দেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও সহায়তা করবে।
মূল কথা
- ভারতের ১৮টি আন্তমহাদেশীয় সাবমেরিন কেবলের অন্তত ১৩টি মুম্বাইয়ের ভারসোভার কাছে প্রায় ছয় কিলোমিটারের মধ্যে তীরে উঠে এসেছে।
- এই কেবলগুলো ইউরোপ, আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত বহন করে।
- ভারত বৈশ্বিক ডেটার প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবহার করে, অথচ বিশ্বের সাবমেরিন কেবলের প্রায় ৩ শতাংশ দেশটিতে রয়েছে।
- ভারতের ১৮টি আন্তর্জাতিক কেবলের মধ্যে ১১টিই ২০ বছরের বেশি পুরোনো।
- বিশ্বজুড়ে বেশির ভাগ কেবল ত্রুটির কারণ নোঙর, মাছ ধরা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা যন্ত্রপাতির ত্রুটি।
- ভারত বিদেশি মেরামতকারী জাহাজের ওপর নির্ভরশীল; ভারতীয় জলসীমায় কাজ করতে এসব জাহাজকে অনুমতি নিতে হয়।
- আই-টু-সিইএর মতো নতুন প্রকল্প এবং মাচিলিপত্তনম, দক্ষিণ চেন্নাই ও বিশাখাপত্তনমে পরিকল্পিত ল্যান্ডিং পয়েন্টের লক্ষ্য সংযোগের ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়া।
- দ্রুত অনুমোদন, সুরক্ষিত কেবল করিডর এবং দেশের নিজস্ব মেরামত সক্ষমতা ঝুঁকি কমানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।






