প্রাচীন কার্বন বিষাক্ত ধোঁয়াশায় পরিণত, ইন্দোনেশিয়ার পিটভূমির দাবানলের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবীদের লড়াই

পড়তে 11 মিনিট
প্রাচীন কার্বন বিষাক্ত ধোঁয়াশায় পরিণত, ইন্দোনেশিয়ার পিটভূমির দাবানলের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবীদের লড়াই

বনের নিচে আগুন

ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিওর আকাশ বৃষ্টির কারণে নয়, ধোঁয়ায় অ্যাম্বারের মতো ভারী হয়ে উঠেছে। কালিমান্তানের বন ও কৃষিজমিতে জ্বলতে থাকা আগুনের ঘন ধোঁয়াশা ছড়িয়ে পড়েছে মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনে। এতে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে এবং শ্বাসকষ্ট নিয়ে মানুষকে হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।

সূচিপত্র
  1. বনের নিচে আগুন
  2. পিটের আগুন নেভানো এত কঠিন কেন
  3. আঞ্চলিক পরিণতিসহ এক কার্বন বোমা
  4. দেশের সীমানা পেরোচ্ছে ধোঁয়াশা
  5. আগুন বারবার ফিরে আসে কেন
  6. ক্লান্তি ও অদৃশ্য বিপদের মুখে অগ্নিনির্বাপকরা
  7. জরুরি সাড়া বাড়াচ্ছে ইন্দোনেশিয়া
  8. প্রতিরোধের জন্য পিটভূমি ভেজা রাখা জরুরি
  9. ধোঁয়ার আড়ালে মানুষের ক্ষতি
  10. মূল বিষয়গুলো

মাটিতে বিপদ প্রায়ই চোখের আড়ালে থাকে। মাটির ওপরের আগুন ছোট মনে হলেও নিচের শুকনো পিটের স্তর দিয়ে আগুন এগিয়ে যেতে পারে। স্বেচ্ছাসেবীরা মাটি খুঁড়ে, ভূগর্ভস্থ নালায় পানি পাম্প করে এবং রাতভর কাজ করে এমন আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন, যা নিভে গেছে বলে মনে হওয়ার কয়েক দিন পরও আবার জ্বলে উঠতে পারে।

এই প্রতিবেদনের জন্য সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরু থেকে ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিওজুড়ে প্রায় ২০০,০০০ হেক্টর বন ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক মৌসুমে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতির কারণে তীব্র হওয়া এই আগুন বৃহত্তর জাতীয় সংকটের অংশ। এ সময় ইন্দোনেশিয়াজুড়ে হাজার হাজার হটস্পট শনাক্ত হয়েছে।

৩৫ বছর বয়সী স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপক ডুই সুজাতমোকো এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করছেন। তাঁর ভাষায়, বাতাসটি কাঁদানে গ্যাসের মতো; নাক ও চোখে পড়ামাত্র এর প্রভাব টের পাওয়া যায়।

আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে অনেকের ক্ষতি হয়। শুধু মানুষের নয়, প্রাণী ও উদ্ভিদেরও। ভূগর্ভস্থ আগুন ছড়িয়ে পড়ে আর নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ক্ষয়ক্ষতি হয় বিপুল।

স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে অনেক আদিবাসী দায়াক ও বানজার জনগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন, যাঁরা এই ভূমি ও জলপথ চেনেন। তাঁরা হাতিয়ার, বহনযোগ্য পাম্প, ঠেলাগাড়ি, পাইপ ও অস্থায়ী কূপ ব্যবহার করে এমন আগুনের বিরুদ্ধে লড়েন, যা দৃশ্যমান শিখা ছাড়াই মাটির নিচ দিয়ে ছড়াতে পারে।

বিজ্ঞাপন

পিটের আগুন নেভানো এত কঠিন কেন

হাজার হাজার বছর ধরে জলাবদ্ধ পরিবেশে জমে থাকা আংশিক পচা উদ্ভিদ থেকে পিট তৈরি হয়। জলাভূমিতে অক্সিজেন কম থাকায় পচন ধীরে ঘটে। জৈব পদার্থের স্তর জমতে থাকে; কালিমান্তানের কিছু এলাকায় এর গভীরতা ২০ মিটারেরও বেশি।

এ কারণে পিটভূমি কার্বনের মূল্যবান ভান্ডার। উদ্ভিদের শোষণ করা কার্বন দ্রুত বায়ুমণ্ডলে ফিরে না গিয়ে মাটির নিচে আটকে থাকে। ইন্দোনেশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পিটভূমি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক কার্বন ভান্ডারগুলোর মধ্যে অন্যতম।

তবে পিটভূমির পানি নিষ্কাশন করলে এই বৈশিষ্ট্যই ভয়াবহ অগ্নিঝুঁকি তৈরি করে। বাগান গড়ে তুলতে সাধারণত খাল ও পাম্পের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামানো হয়। মাটি শুকিয়ে গেলে আগুন লাগা সহজ হয় এবং দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলেও তা দাহ্য থাকতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ার সংরক্ষণ সংস্থা ইয়ায়াসান কনসারভাসি আলাম নুসান্তার পিটভূমি গবেষক ড. নিসা নোভিতা জানান, গভীর পিটে প্রতি হেক্টরে ৬,০০০ টনেরও বেশি কার্বন থাকতে পারে। গবেষকের দেওয়া তুলনা অনুযায়ী, তা প্রায় ৪,৮০০টি গাড়ির এক বছরের কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের সমান।

পিটভূমি অত্যন্ত কার্যকর কার্বন ভান্ডার, কারণ জলাবদ্ধ পরিবেশে পচন ধীর হয় এবং হাজার হাজার বছর ধরে কার্বন মাটির নিচে জমা হতে পারে। কিন্তু এ কারণেই এগুলো পানি নিষ্কাশন বা পুড়িয়ে ফেললে কার্বন বোমায় পরিণত হতে পারে; তখন সেই কার্বন দ্রুত বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে।

আগুন এই উপাদানে পৌঁছালে তা কয়েক সপ্তাহ ধরে মাটির নিচে ধিকিধিকি জ্বলতে পারে। ওপর থেকে ঢালা পানি জ্বলন্ত স্তর পর্যন্ত নাও পৌঁছাতে পারে। অগ্নিনির্বাপকদের পিট প্রায় জাউয়ের মতো নরম হওয়া পর্যন্ত মাটি ভেজাতে হয় এবং নিচে তাপ ও ধোঁয়া আছে কি না, তা বারবার পরীক্ষা করতে হয়।

আঞ্চলিক পরিণতিসহ এক কার্বন বোমা

পিট পোড়ালে কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও মিথেন নির্গত হয়। কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মিথেন বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায়, আর উচ্চ ঘনত্বে কার্বন মনোক্সাইড বিষাক্ত। আগুন থেকে তৈরি সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসের গভীরতম অংশে ঢুকে রক্তপ্রবাহে মিশতে পারে।

লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুসান পেইজ গত তিন দশক ধরে এশিয়ার পিটভূমি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, ধোঁয়াশার নিচে বসবাসকারী মানুষ বিষাক্ত গ্যাস ও অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা, দুই-ই শ্বাসের সঙ্গে নিচ্ছেন।

তাঁরা বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড শ্বাসের সঙ্গে নিচ্ছেন, পাশাপাশি অতিসূক্ষ্ম কণাও নিচ্ছেন, যা ফুসফুসের অ্যালভিওলাই পেরিয়ে রক্তপ্রবাহে যেতে পারে এবং শরীরের অন্যত্র, এমনকি হৃদ্‌যন্ত্রেও সমস্যা তৈরি করতে পারে।

কার্বন বোমা বলতে বিপুল পরিমাণ সঞ্চিত কার্বন হঠাৎ নির্গত হওয়াকে বোঝায়। এর মানে এই নয় যে প্রতিটি হেক্টর পিট একবারে তার সব কার্বন ছেড়ে দেবে। বরং এর অর্থ, ধীরে ধীরে জমা হওয়া প্রাকৃতিক কার্বনভান্ডার ভূমি শুকিয়ে পুড়িয়ে ফেললে দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসে রূপান্তরিত হতে পারে।

আগুন পিটকে ভেজা ও স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করা উদ্ভিদও ধ্বংস করে। আগুনের পর উন্মুক্ত মাটি আরও দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে, ফলে পরবর্তী আগুনের আশঙ্কা বাড়ে। বারবার আগুন লাগলে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি পুনরুদ্ধার করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

পেইজ বলেন, নিষ্কাশন করা পিটভূমি আগুন না জ্বললেও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করে। সে অর্থে আগুন হলো বৃহত্তর সমস্যার সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশ; এই সমস্যার মধ্যে রয়েছে পানি নিষ্কাশন, ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি নির্গমন।

বিজ্ঞাপন

দেশের সীমানা পেরোচ্ছে ধোঁয়াশা

ইন্দোনেশিয়ার আগুনের ধোঁয়া মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনের কিছু অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু এলাকায় বায়ুমানের মাত্রা অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরবরাহ করা তথ্যে বর্ণিত সবচেয়ে গুরুতর ক্ষেত্রে দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত মাত্রার প্রায় ৭৫ গুণে পৌঁছেছে বলে জানানো হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথিতে জুলাই ও আগস্টের মধ্যে ভূমি ও বনভূমির আগুনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫০,০০০-এর বেশি শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২,০০০-এর বেশি রোগী পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি বানজারবারুতে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। এক শিক্ষক সহকারী এমন পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে মানুষ নিজের পায়ের দিকেও ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিল না। বাসিন্দারা কাশি, গলাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া, মাথাব্যথা ও চোখ জ্বালাপোড়ার কথা জানিয়েছেন।

মালয়েশিয়ার সারাওয়াক রাজ্যে তীব্র দূষণের সময় প্রায় ৬০০টি স্কুল বন্ধ ছিল, এতে প্রায় ২০০,০০০ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বায়ুর মান আরও খারাপ হলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিঙ্গাপুর এন৯৫ মাস্ক মজুত করেছে এবং স্কুলে বাইরের কার্যক্রম কমানোর পরিকল্পনা করেছে। ফিলিপাইনের পালাওয়ান প্রদেশের বাসিন্দারা পোড়া গন্ধ এবং চোখ ও গলায় জ্বালাপোড়ার কথা জানিয়েছেন।

ধোঁয়াশায় পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে। ধোঁয়া গাড়িচালকদের দৃশ্যমানতা কমায় এবং বিমানবন্দর, নৌপথ ও সড়ক চলাচলে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে আগুনের উৎস থেকে দূরের সম্প্রদায়গুলোরও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়; আর আগুনের সবচেয়ে কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি পড়েন।

আগুন বারবার ফিরে আসে কেন

ইন্দোনেশিয়ার পিটভূমি সংকটের শিকড় কয়েক দশকের ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনে। সুহার্তো আমলে কালিমান্তানের বিস্তীর্ণ বনভূমি ও জলাভূমি লগিং, বাগান এবং বড় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। শত শত বছর ধরে ভেজা থাকা পিটভূমির পানি খাল কেটে নিষ্কাশন করা হয়।

বাগানভিত্তিক কৃষির সঙ্গে প্রায়ই তেলপাম ও অন্যান্য ফসলের চাষ জড়িত, যা বিস্তৃত ও একরূপ এলাকাজুড়ে করা হয়। এসব প্রকল্পে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ আসতে পারে, তবে বন পরিষ্কার ও পানি নিষ্কাশনের ফলে আশপাশের ভূদৃশ্য আগুনের ঝুঁকিতে পড়ে। এরপর প্রবল বাতাস, শুকনো উদ্ভিদ এবং নিচে নেমে যাওয়া পানির স্তর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করে।

কিছু ঐতিহ্যবাহী চাষপদ্ধতিতে ছোট জমি পরিষ্কারে নিয়ন্ত্রিতভাবে আগুন ব্যবহৃত হয় বলে কখনও কখনও আদিবাসী সম্প্রদায়কে আগুনের জন্য দায়ী করা হয়েছে। পশ্চিম কালিমান্তানের দায়াক কানায়াতন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি টোনো বলেন, এসব সম্প্রদায়কে প্রায়ই বলির পাঁঠা করা হয়।

পাহাড়ি এলাকায় চাষাবাদ প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে পরিকল্পনা, সতর্কতা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা জ্ঞান কাজে লাগে।

ছোট পরিসরের নিয়ন্ত্রিত আগুন এবং শিল্পকারখানার জন্য ভূমি পরিষ্কারের মাত্রা ও ঝুঁকি এক নয়। ঐতিহ্যবাহী কৃষকেরা সীমিত সময়ের মধ্যে এবং স্থানীয় নিয়ম মেনে কাজ করতে পারেন; অন্যদিকে বড় ভূমি বরাদ্দ হাজার হাজার হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত হতে পারে এবং পুরো পিটভূমির জলব্যবস্থা বদলে দিতে পারে। প্রতিটি আগুনের কারণ জানতে তদন্ত করা জরুরি। তবে সামগ্রিক চিত্রে ভূমির পানি নিষ্কাশন, দুর্বল আইন প্রয়োগ, শুষ্ক আবহাওয়া এবং অনিরাপদভাবে জমি পরিষ্কারের সম্মিলিত ভূমিকা দেখা যায়।

এই প্রতিবেদনের জন্য সরবরাহ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কালিমান্তানে প্রায় ১৬০,০০০ হেক্টর বন হারিয়ে গেছে, যা ইন্দোনেশিয়াজুড়ে বন হারানোর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। উজাড় হওয়া জমির বড় অংশ বাগান ও অন্যান্য একফসলি কৃষিতে রূপান্তর করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ক্লান্তি ও অদৃশ্য বিপদের মুখে অগ্নিনির্বাপকরা

আগুনের সরাসরি সংস্পর্শ এড়ালেও স্বেচ্ছাসেবী দলগুলো এমন পরিস্থিতিতে কাজ করছে, যা তাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। ধোঁয়ার সংস্পর্শ অবিরাম, কিছু এলাকায় সুরক্ষাসামগ্রী সীমিত এবং মাটির ফাটল থেকে হঠাৎ তাপ বেড়ে যেতে পারে।

খবরে বলা হয়েছে, মধ্য কালিমান্তানে আগুন নেভানোর সময় দুই স্বেচ্ছাসেবীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং তাঁদের মৃত্যু হয়। অন্য দলগুলো আগুনের রেখার কাছাকাছি ঘুমিয়েছে, যাতে ভূগর্ভস্থ আগুন মাটির ওপরে ছড়িয়ে পড়লে তারা দ্রুত সাড়া দিতে পারে।

পানি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অগ্নিনির্বাপকরা পুকুর ও কূপ খনন করেন, খাল খুলে দেন বা মেরামত করেন এবং মাটির নিচে পানি পৌঁছে দিতে পিটের মধ্যে পাইপ ঢোকান। দুর্গম এলাকায় যানবাহনে পৌঁছানো নাও যেতে পারে; তখন দলগুলোকে ছোট পাম্প ও হাতে বয়ে নেওয়া সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করতে হয়।

সুজাতমোকো বলেন, দলগুলো ক্লান্ত এবং পরিবারের কথা মনে পড়ে, তবু নিজেদের সম্প্রদায়কে রক্ষার দায়িত্ববোধ থেকে তাঁরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

আমরা অবশ্যই ক্লান্ত। অবসন্ন হয়ে পড়ি, পরিবার, সন্তান, স্ত্রীকে মনে পড়ে। কিন্তু আপাতত আমরা সবাই এসব এক পাশে সরিয়ে রেখেছি। ধোঁয়াশার এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সাহায্য করার জন্য যথাসাধ্য করছি, কারণ এটা আমাদের দায়িত্ব।

বৃষ্টি হলে উপকার হবে, তবে ভারী বৃষ্টিপাত একা নিষ্কাশন করা পিটভূমি পুনরুদ্ধার করতে পারে না। পানির স্তর ফিরিয়ে এনে তা বজায় রাখতে হবে। মাটি আবার শুকিয়ে যাওয়া ঠেকাতে খাল বন্ধ করা, ক্ষতিগ্রস্ত উদ্ভিদ নতুন করে লাগানো এবং ভবিষ্যৎ ভূমি ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন হতে পারে।

জরুরি সাড়া বাড়াচ্ছে ইন্দোনেশিয়া

কর্তৃপক্ষ স্থল ও আকাশপথে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম বাড়িয়েছে। সুমাত্রা ও বোর্নিওতে ২৪,০০০-এর বেশি স্থলভিত্তিক অগ্নিনির্বাপক মোতায়েন করা হয়েছে, যদিও কিছু হটস্পটে পৌঁছানো এখনও সম্ভব হয়নি।

যেসব এলাকায় কর্মীরা পৌঁছাতে পারেন না, সেখানে পানি ছিটানোর জন্য কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত উড়োজাহাজ চেয়েছে। ইন্দোনেশিয়া পানি ছিটানো ও আকাশপথে টহলে সহায়তার জন্য বিদেশে নিবন্ধিত ৩৫টি উড়োজাহাজ ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছে, তবে সেগুলোকে জাতীয় বিমান চলাচল নিরাপত্তাবিধি মানতে হবে।

ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষের উদ্ধৃত তথ্যে দক্ষিণ সুমাত্রায় ১,৪২৯টি, পশ্চিম কালিমান্তানে ১,২২৬টি এবং মধ্য কালিমান্তানে ৮১১টি হটস্পটের কথা বলা হয়েছে। পূর্ব কালিমান্তানে ৫৭৬টি এবং রিয়াউতে ৫০৩টি হটস্পট নথিভুক্ত হয়েছে। বন বিভাগের তথ্য বলছে, শুধু জুলাই মাসেই প্রায় ৯৪,০০০ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে।

প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো মধ্য কালিমান্তান, রিয়াউ ও দক্ষিণ সুমাত্রার আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সরকার অগ্নিনির্বাপকদের জন্য আরও পানি ছিটানোর হেলিকপ্টার ও অক্সিজেন সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জনসচেতনতা ও আগুন প্রতিরোধে স্থানীয় কর্মকর্তাদের সহায়তার জন্য ইন্দোনেশিয়া সামরিক ও পুলিশ সদস্যও মোতায়েন করছে।

ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া মেঘে লবণের কণা ছড়িয়ে বৃষ্টি নামানোর চেষ্টা হিসেবে ক্লাউড সিডিং কার্যক্রম শুরু করেছে। অভিন্ন সীমান্তের কাছে ক্লাউড সিডিংয়ের জন্য ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমায় উড়োজাহাজ পাঠানোর অনুমতি পেয়েছে মালয়েশিয়া; প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছে দেশটি।

এসব পদক্ষেপ তাৎক্ষণিক বিপদ কমাতে পারে, তবে উড়োজাহাজ ও জরুরি কর্মীরা ভূদৃশ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প নন। আকাশ থেকে পানি ছিটিয়ে আগুন ঠান্ডা করা গেলেও তা পিটের গভীরতম স্তরে পৌঁছাতে নাও পারে। ক্লাউড সিডিংয়ের জন্যও উপযুক্ত মেঘ দরকার; এটি শুষ্ক মৌসুমের অবসান ঘটাতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

প্রতিরোধের জন্য পিটভূমি ভেজা রাখা জরুরি

পিটের আগুন কমানোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো পিট শুকিয়ে যাওয়া ঠেকানো। এর অর্থ প্রাকৃতিক পানির স্তর ফিরিয়ে আনা, পানি নিষ্কাশনের খাল বন্ধ করা, অবশিষ্ট বন রক্ষা করা এবং গভীর পিটের স্তরে উন্নয়ন সীমিত রাখা।

আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ছোট আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই সম্প্রদায়গুলোকে পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করতে পারে। স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে হটস্পট শনাক্ত হয়; স্থানীয় দল মাটির তাপ পরীক্ষা করতে পারে, যা ধোঁয়া বা উদ্ভিদের আড়ালে স্যাটেলাইটের পক্ষে সবসময় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। গ্রামগুলোতে আগুন প্রতিরোধের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম দেওয়াও বিপজ্জনক জরুরি তৎপরতার প্রয়োজন কমাতে পারে।

জবাবদিহিও প্রতিক্রিয়ার অংশ। কিছু আগুন লাগানোর সন্দেহে ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ ৭২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। কম খরচে জমি পরিষ্কার করতে আগুন ব্যবহারের অভিযোগে চারটি কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। ইচ্ছাকৃতভাবে জমি পরিষ্কার, দুর্ঘটনাজনিত আগুন এবং ঐতিহ্যবাহী চর্চার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের পাশাপাশি কোম্পানিগুলো আইনসম্মত পানিব্যবস্থাপনা ও অগ্নিনিরাপত্তা বজায় রেখেছে কি না, তাও তদন্তে খতিয়ে দেখা দরকার।

আদিবাসী সম্প্রদায়কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্দেহভাজন না ধরে আগুন প্রতিরোধ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। ঋতুভিত্তিক আবহাওয়া, মাটির অবস্থা ও স্থানীয় জলপথ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান আগুন পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে শুষ্ক আবহাওয়ায় যেকোনো ধরনের আগুন ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট নিয়ম দরকার, বিশেষ করে পানি নিষ্কাশন করা পিটভূমির কাছে।

ধোঁয়াশার আঞ্চলিক বিস্তার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনের মধ্যে সহযোগিতার দাবি জানায়। ধোঁয়া জাতীয় সীমানা মানে না; তাই দ্বীপাঞ্চলজুড়ে আগুন ছড়ালে তথ্য বিনিময়, উড়োজাহাজ চলাচলের অনুমতি, স্বাস্থ্য সতর্কতা এবং সমন্বিত জরুরি পরিকল্পনা দরকার।

ধোঁয়ার আড়ালে মানুষের ক্ষতি

কার্বন বোমা কথাটি ইন্দোনেশিয়ার পিটের আগুনের জলবায়ুগত বিপদ তুলে ধরে, কিন্তু এই সংকট তাৎক্ষণিক ও ব্যক্তিগতও। শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না, পরিবারগুলো দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে এবং স্বেচ্ছাসেবীরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাড়ির বাইরে কাটাচ্ছেন। মাটির অনেক নিচে শুরু হওয়া দুর্যোগ থেকে সম্প্রদায়গুলোকে রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে কয়েকজন অগ্নিনির্বাপকের মৃত্যু হয়েছে।

প্রাচীন জলাভূমিকে ফাঁকা জমি হিসেবে বিবেচনা করলে কী ঘটে, ধোঁয়া তা-ই মনে করিয়ে দেয়। পিটভূমি ভেজা থাকে বলেই কার্বন সঞ্চয় করে। পানি নিষ্কাশন ও খরা সেই সুরক্ষা কেড়ে নিলে সঞ্চিত পদার্থ জ্বালানিতে পরিণত হয়, বাতাস বিপজ্জনক হয়ে ওঠে এবং আগুনের প্রভাব মূল উৎস থেকে বহুদূরে ছড়িয়ে পড়ে।

বৃষ্টি বোর্নিওকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষার জন্য দরকার পানিব্যবস্থাপনা, ভূমি পরিষ্কারের ওপর জোরদার নজরদারি, স্থানীয় অগ্নিনির্বাপকদের সহায়তা এবং আগুনের মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়েও ধারাবাহিক মনোযোগ। আগুনের মুখে এখন যারা কাজ করছেন, শুধু জরুরি পদক্ষেপ দিয়ে তাঁদের কাজের সমাধান সম্ভব নয়।

মূল বিষয়গুলো

  • জুলাইয়ের শুরু থেকে ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিওতে প্রায় ২০০,০০০ হেক্টর বন ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
  • পিট হাজার হাজার বছর ধরে কার্বন সঞ্চয় করতে পারে, তবে পানি নিষ্কাশন করলে তা ভূগর্ভস্থ আগুনের ঝুঁকিতে পড়ে।
  • ধোঁয়া ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনে ছড়িয়েছে।
  • জুলাই ও আগস্টের মধ্যে আগুনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫০,০০০-এর বেশি শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে ইন্দোনেশিয়া।
  • মাটির নিচের আগুন নেভাতে স্বেচ্ছাসেবীরা পাম্প, কূপ, খাল ও পাইপ ব্যবহার করছেন।
  • কর্তৃপক্ষ স্থলভিত্তিক অভিযান, পানি ছিটানো, ক্লাউড সিডিং ও তদন্তের পরিসর বাড়িয়েছে।
  • দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ নির্ভর করছে পিটভূমি ভেজা রাখা এবং ভূমি পরিষ্কারের ওপর নিয়ন্ত্রণে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে