আর্থিক শক্তি কাজে লাগাচ্ছে বেইজিং
ধীরগতির অর্থনীতিকে চাঙা করা এবং আর্থিক ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে নীতিনির্ধারকেরা কাজ করছেন। এর অংশ হিসেবে চীন আটটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানে ৩৬০ বিলিয়ন ইউয়ান (৫৩.৬ বিলিয়ন ডলার) মূলধন জোগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সূচিপত্র
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এই কর্মসূচির আওতায় তিনটি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ও পাঁচটি বিমা কোম্পানি নতুন মূলধন পাবে। ঋণের চাহিদা দুর্বল এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসার সময়ে ক্ষতি সামাল দেওয়া, ঋণদান অব্যাহত রাখা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করার সক্ষমতা বাড়াতে এ অর্থ দেওয়া হবে।
একসঙ্গে একাধিক চাপের মুখে রয়েছে চীন। অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় দুর্বল, আবাসন বাজার দীর্ঘস্থায়ী মন্দার মধ্য দিয়ে গেছে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ইরান যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত তেলের উচ্চমূল্যও এমন এক অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে এসেছে, যা শিল্প কার্যক্রম ও জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
চীনের নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক স্থিতিশীলতাকে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখে আসছেন। নতুন এই প্যাকেজ দেখাচ্ছে, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে বেইজিং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করতে প্রস্তুত।
কোন প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ পাবে?
চীনের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী কয়েকটি আর্থিক গোষ্ঠী এই পরিকল্পনার আওতায় রয়েছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে আছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না, অ্যাগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না এবং এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়না।
বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে চায়না লাইফ ইন্স্যুরেন্স, চায়না তাইপিং ইন্স্যুরেন্স গ্রুপ, পিপলস ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি অব চায়না, চায়না এক্সপোর্ট অ্যান্ড ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন এবং চায়না রিইন্স্যুরেন্স গ্রুপ। একত্রে এসব প্রতিষ্ঠান সঞ্চয়কে কাজে লাগানো, বাণিজ্যে অর্থায়ন এবং সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারে সহায়তার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে।
দেশটির বৃহত্তম জীবনবিমা প্রতিষ্ঠান চায়না লাইফ পাবে ৩৫ বিলিয়ন ইউয়ান। চায়না তাইপিং পাবে ৭ বিলিয়ন ইউয়ান। পিপলস ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি অব চায়না অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে দেশীয় এ-শেয়ার ব্যক্তিগতভাবে বরাদ্দের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৫ বিলিয়ন ইউয়ান সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে।
ব্যাংকগুলোর মধ্যে অ্যাগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না সর্বোচ্চ ১৬০ বিলিয়ন ইউয়ান এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না সর্বোচ্চ ১০০ বিলিয়ন ইউয়ান সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। এ অর্থ দিয়ে তাদের মূল টিয়ার-১ মূলধন বাড়ানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ব্যাংকের মূলধনের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ মানের অংশ, যা ক্ষতি সামলাতে ও ঋণদান অব্যাহত রাখতে ব্যবহৃত হয়।
এখন কেন ব্যাংকের মূলধন বাড়াচ্ছে বেইজিং?
চীনের ব্যাংকগুলো বড় এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলেও ঋণের দুর্বল চাহিদা ও মুনাফা কমে যাওয়ার চাপে রয়েছে। আবাসনমূল্য, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ বিক্রি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে কোম্পানি ও পরিবারগুলো ঋণ নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক। কম গ্রাহক ঋণ চাইলে ব্যাংকগুলোর আয় করা এবং প্রচলিত ঋণদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সহায়তা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখে। দীর্ঘদিন ধরে সুদের হার কম থাকায় বিনিয়োগ থেকে আয় কমেছে। একই সময়ে দুর্বল আর্থিক পরিস্থিতি ছোট ও মাঝারি আকারের কোম্পানিগুলোর মুনাফা ও সলভেন্সি অনুপাতকে প্রভাবিত করেছে। সলভেন্সি অনুপাত দিয়ে বোঝা যায়, দাবি ও অন্যান্য দায় মেটানোর জন্য বিমা প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত মূলধন আছে কি না। বড় রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা প্রতিষ্ঠানে মূলধন বাড়লে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামলানো এবং সমস্যা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নিয়ন্ত্রকদের হাতে বেশি সুযোগ থাকবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই অর্থায়নের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাইরের ধাক্কা সামলাতে সহায়তা করা। মূলধনের ভিত্তি শক্ত হলে মন্দার সময় নিজেদের আর্থিক অবস্থান রক্ষায় দ্রুত ঋণ কমানোর বদলে ব্যাংকগুলো ঋণদান চালিয়ে যেতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া বলেছে, এই মূলধন জোগান প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা, ঝুঁকি মোকাবিলার সামর্থ্য এবং প্রকৃত অর্থনীতিতে সেবা দেওয়ার ক্ষমতা বাড়াবে। চীনের সরকারি নীতিভাষায় ‘প্রকৃত অর্থনীতি’ বলতে সাধারণত আর্থিক লেনদেনের বাইরে থাকা ব্যবসা, কারখানা, পরিবার ও অবকাঠামো প্রকল্পকে বোঝায়।
এই পদক্ষেপ তাদের সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা, ঝুঁকি মোকাবিলার সামর্থ্য এবং প্রকৃত অর্থনীতিতে সেবা দেওয়ার ক্ষমতা আরও বাড়াতে সহায়তা করবে।
মূলধন পুনর্গঠন কীভাবে হবে?
এই প্যাকেজে সরাসরি সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি শেয়ারের ব্যক্তিগত বরাদ্দও রয়েছে। ব্যক্তিগত বরাদ্দে নতুন শেয়ার সাধারণ বাজারে সবার কাছে না ছেড়ে বাছাই করা বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হয়। এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং চায়না ন্যাশনাল টোব্যাকো করপোরেশন ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারীরা নতুন মূলধনের বড় অংশ জোগাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে ২৯০ বিলিয়ন ইউয়ান পাবে। দেশটির প্রধান নীতিগত ব্যাংকগুলোর একটি এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়না অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে ৩০ বিলিয়ন ইউয়ান পাবে। বাণিজ্য, অবকাঠামো ও কৌশলগত শিল্পের মতো খাতে নীতিগত ব্যাংকগুলো অর্থায়ন করে, যেগুলোকে বাণিজ্যিক ঋণদাতারা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ বা দীর্ঘমেয়াদি বলে মনে করতে পারে।
এই অর্থ স্বল্পমেয়াদি ব্যয় কর্মসূচিতে ব্যবহারের বদলে মূলধনের ভিত্তিতে যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। মূলধন জোগালেই সমপরিমাণ অর্থ সরাসরি ভোক্তাদের হাতে যায় না বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নতুন ঋণ নেবে, এমন নিশ্চয়তাও তৈরি হয় না। বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মূলধনের শর্ত বজায় রেখেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ ও বিনিয়োগ করার সুযোগ বাড়ে।
এর আগেও চীন একই ধরনের মূলধন পুনর্গঠনের পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। বর্তমান পরিকল্পনাটি মার্চে বার্ষিক সংসদ অধিবেশনে প্রথম উপস্থাপন করা হয়। আগের বছর কয়েকটি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে শক্তিশালী করতে যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল, এটি তারই ধারাবাহিকতা।
ব্যাংকগুলোর কাছে অর্থনীতি কী চায়?
বেসরকারি খাতের চাহিদা দুর্বল থাকায় বেইজিং রাষ্ট্রায়ত্ত ঋণদাতাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতে বলছে। অগ্রাধিকার খাতের মধ্যে রয়েছে উৎপাদন, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্যান্য খাত। নতুন মূলধন ব্যাংকগুলোকে মূলধন অনুপাত দুর্বল না করেই ঋণ দিতে সহায়তা করতে পারে, যদিও শুধু এ দিয়ে ঋণের চাহিদার ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়।
বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শেয়ারবাজার ও অর্থনীতির অন্যান্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রিমিয়াম থেকে তাদের বিপুল তহবিল তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বিনিয়োগ মূলধনের উৎস হতে পারে। স্বল্পমেয়াদি লেনদেনের প্রভাব কমাতে কর্তৃপক্ষ বড় বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধৈর্য ধরে বিনিয়োগের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে সহায়তা করতে বলেছে।
চায়না লাইফ বলেছে, এই মূলধন জোগান ঝুঁকি সামলানো ও অর্থনীতিতে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াবে। চায়না তাইপিং বলেছে, অর্থটি তাদের সলভেন্সি ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সূচক উন্নত করবে।
প্রকৃত অর্থনীতিতে সেবা দেওয়ার আর্থিক খাতের সক্ষমতা জোরদার এবং আর্থিক ও বিমা শিল্পের উচ্চমানের উন্নয়নে সহায়তা করতে দেশের এই মূলধন জোগান একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এই নীতিগত লক্ষ্য থেকে বোঝা যায়, বেইজিং অর্থায়নকে আবারও জল্পনামূলক আবাসন বিনিয়োগে না ঢেলে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে নিতে চায়। এ পদ্ধতি বাছাই করা কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করতে পারে, তবে বাজারে চাহিদা সীমিত থাকলেও রাষ্ট্রের পছন্দের শিল্পে মূলধন প্রবাহ অব্যাহত রাখতে পারে।
প্রবৃদ্ধি বেইজিংয়ের লক্ষ্যের নিচে নেমেছে
জুলাইয়ে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেড়েছে ৪.৩ শতাংশ। বছরের প্রথম তিন মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ। ফলাফলটি মার্চে নির্ধারিত সরকারের বার্ষিক ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের নিচে।
১৯৯১ সালের পর এটিই ছিল চীনের সর্বনিম্ন বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য। কিছু বিশ্লেষক মনে করেছেন, তুলনামূলক কম এই লক্ষ্য নির্ধারণের মধ্য দিয়ে নীতিনির্ধারকেরা আগের দশকগুলোর দ্রুত প্রবৃদ্ধির হার ফেরানোর প্রতিশ্রুতি না দিয়ে বিদ্যমান দুর্বলতাকে স্বীকার করার কিছুটা সুযোগ রেখেছেন।
রপ্তানি এখনো প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী উৎস, তবে তা দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রভাব পুষিয়ে দিতে পারেনি। আবাসন খাতের মন্দায় নির্মাণকাজ ও পরিবারের আস্থা কমেছে। একই সঙ্গে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়া এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাওয়ায় শ্রমের জোগান সীমিত হচ্ছে, আর সরকারি অর্থের ওপর চাপ বাড়ছে।
বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ রপ্তানিকারক ও উৎপাদনকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত জ্বালানি ব্যয় চাপের আরেকটি উৎস। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা প্রবৃদ্ধিতে সহায়তার পাশাপাশি একটি প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপও।
শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা কি চাহিদা বাড়াতে পারবে?
মূলধন পুনর্গঠন ঋণসংকট ঠেকাতে, আস্থা রক্ষা করতে এবং চাপের সময়েও বড় ঋণদাতাদের কার্যক্রম চালু রাখতে পারে। অবকাঠামো, শিল্প বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে অর্থায়নের জন্য ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল সরকারি কর্মসূচিতেও সহায়তা করতে পারে।
তবে সীমাবদ্ধতাগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসংস্থান ও আবাসন নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ থাকলে ব্যাংকের হাতে বাড়তি মূলধন আছে বলে তারা বেশি ঋণ নাও নিতে পারে। পণ্যের পর্যাপ্ত চাহিদা দেখতে না পেলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও নতুন ঋণ এড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়লেও বাস্তবে ঋণদান নাও বাড়তে পারে।
রাষ্ট্রীয় সহায়তায় অনাদায়ী ঋণের বিষয়টি স্বীকার করতে দেরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। দুর্বল আবাসন খাতের উদ্যোক্তা বা লোকসানি কোম্পানিকে অর্থায়ন চালিয়ে গেলে ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে, তবে ভবিষ্যতের ক্ষতিও বাড়তে পারে। তাই ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আছে এমন গ্রহীতাদের দিকে অর্থপ্রবাহ পরিচালনা এবং ঘুরে দাঁড়াতে অক্ষম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তা সীমিত রাখা নিয়ন্ত্রকদের জন্য বড় কাজ।
ঘোষণায় আর্থিক বাজারের প্রতিক্রিয়া ছিল সংযত। প্যাকেজটিকে বড় ধরনের সহায়তামূলক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হলেও চীনা শেয়ারে ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটেনি। এ প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, বিনিয়োগকারীরা নতুন মূলধন উচ্চতর মুনাফা, স্বাস্থ্যকর ঋণপ্রবাহ ও ভোক্তা-আস্থার উন্নতিতে রূপ নেয় কি না, তার প্রমাণ চাইতে পারেন।
চীনের অর্থনৈতিক মডেলের বৃহত্তর পরীক্ষা
এই পরিকল্পনা চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থার সুবিধা ও ব্যয়—দুটিই তুলে ধরে। বড় ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকায় দ্রুত মূলধন জোগাড় করা এবং একসঙ্গে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব। এ কাঠামো আকস্মিক আর্থিক আতঙ্কের ঝুঁকি কমাতে পারে।
রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের অর্থ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিক মুনাফার পাশাপাশি জননীতির লক্ষ্যও পূরণ করতে হতে পারে। তারা কৌশলগত শিল্পে ঋণ দিতে, শেয়ারবাজারে সহায়তা করতে বা আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বল অংশগুলোকে সমর্থন করতে পারে। এসব দায়িত্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করলেও ভবিষ্যৎ মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং ঋণগ্রহীতাদের প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য পরিমাপ করা কঠিন করে তুলতে পারে।
বেইজিংয়ের জন্য এই প্যাকেজ সম্পত্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে উৎপাদন, প্রযুক্তি, সেবা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর অর্থনীতিতে যাওয়ার বৃহত্তর প্রচেষ্টার একটি অংশ। শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানকে এই রূপান্তরে সহায়তা করার সময় দেবে।
এই মূলধন জোগান জনসংখ্যাগত পরিবর্তন উল্টে দিতে, একাই আবাসন বাজার পুনরুদ্ধার করতে বা বাণিজ্যিক উত্তেজনা দূর করতে পারবে না। তবে নীতিনির্ধারকেরা এসব চাপ সামলানোর চেষ্টা করার সময় এটি চীনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় সুরক্ষাবলয় দেবে, যাতে কোনো একটি খাতের দুর্বলতা বৃহত্তর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে না পড়ে।
মূল কথা
- আটটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানে ৩৬০ বিলিয়ন ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ৫৩.৬ বিলিয়ন ডলার, জোগাবে চীন।
- তিনটি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান মূলধনের ভিত্তি পুনরায় পূরণে সম্মিলিতভাবে ২৯০ বিলিয়ন ইউয়ান পাবে।
- চায়না লাইফ ইন্স্যুরেন্স পাবে ৩৫ বিলিয়ন ইউয়ান এবং চায়না তাইপিং পাবে ৭ বিলিয়ন ইউয়ান।
- ঋণদান, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় সহায়তা করাই এই পরিকল্পনার লক্ষ্য।
- দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতি ৪.৩ শতাংশ বেড়েছে, যা বার্ষিক ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ লক্ষ্যের নিচে।
- দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা, আবাসন খাতের সমস্যা, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।






