কাশ্মীরে বই পর্যালোচনা ঘিরে ইতিহাস, নিরাপত্তা ও শিক্ষার স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক

পড়তে 11 মিনিট
কাশ্মীরে বই পর্যালোচনা ঘিরে ইতিহাস, নিরাপত্তা ও শিক্ষার স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক

শিক্ষার প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত পর্যালোচনা

ভারত-শাসিত কাশ্মীরে কর্তৃপক্ষ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং সেন্টার ও গণগ্রন্থাগারগুলোকে তাদের সব সংগ্রহে যাকে তারা অনুপযুক্ত বা আপত্তিকর বিষয়বস্তু বলছে, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে। পর্যালোচনায় রয়েছে মুদ্রিত বই, সাময়িকী, গবেষণাপত্র, অভিসন্দর্ভ, ডক্টরাল থিসিস এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট বা ইলেকট্রনিক সংগ্রহশালায় রাখা ডিজিটাল উপকরণ।

সূচিপত্র
  1. শিক্ষার প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত পর্যালোচনা
  2. দুটি বই কীভাবে বৃহত্তর তদন্তের সূত্রপাত করল?
  3. সরকারের দাবি, তারা কী ঠেকাতে চাইছে?
  4. শব্দচয়ন নিয়ে শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ কেন?
  5. ২৫টি বইয়ের আগের নিষেধাজ্ঞায় কী ঘটেছিল?
  6. কাশ্মীরের বিতর্কিত ইতিহাসে এই বিরোধের প্রভাব কী?
  7. ২০১৯ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
  8. পর্যালোচনা কি নিরাপত্তার বদলে নীরবতা তৈরি করতে পারে?
  9. শিক্ষার্থী ও গ্রন্থাগারের জন্য কী ঝুঁকিতে?
  10. মূল কথা

প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন প্রকাশনা শনাক্ত করে প্রতিবেদন দিতে হবে, যা ধর্মীয় অনুভূতি, ভারতীয় আইন, শিক্ষাগত মূল্যবোধ বা প্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি লঙ্ঘন করতে পারে। কর্তৃপক্ষের মতে, সন্ত্রাসবাদ, সহিংস উগ্রবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, উগ্রপন্থায় দীক্ষা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বা ভারতের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের প্রচার, গৌরবগান, বৈধতা দান বা সমর্থন করে—এমন উপকরণের কথাও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আপত্তিকর উপকরণের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্দেশনায় দেওয়া হয়নি। এই অনিশ্চয়তাই এখন বিরোধের মূল বিষয় হয়ে উঠেছে। স্কুল শিক্ষা বিভাগের পরিচালক নাসির আহমদ ওয়ানি বলেছেন, স্কুল ও গ্রন্থাগারের বই পর্যালোচনায় একটি কমিটি কাজ করবে। অন্যদিকে, কোনো প্রকাশনাকে চিহ্নিত করলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের তার শিরোনাম, লেখক, প্রকাশক, প্রকাশনার বছর ও কপির সংখ্যা জানাতে বলা হয়েছে।

শিক্ষা বিভাগগুলো প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ধাপ এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ব্যক্তিগত জবাবদিহির ব্যবস্থাও চালু করেছে। কলেজগুলোতে পর্যালোচনার নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বিভাগ থেকে জেলা কার্যালয়, তারপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর কথা। এই প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমে আবারও চালানো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

দুটি বই কীভাবে বৃহত্তর তদন্তের সূত্রপাত করল?

সমগ্র শিক্ষা শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় সরকারি স্কুলের গ্রন্থাগারগুলোতে সরবরাহ করা দুটি বইকে ঘিরে বিতর্কের শুরু। Personalities and Legends of J&K এবং Great Personalities of Jammu and Kashmir শিরোনামের বই দুটিতে রাজনীতিক, লেখক, কর্মী, কবি ও ইতিহাসবিদদের পরিচিতি ছিল। কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পরিচিতিও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

জাতীয় পর্যায়ে ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমালোচকেরা আপত্তি জানান, কারণ বইগুলোতে কয়েকজন বিচ্ছিন্নতাবাদী ব্যক্তিত্বকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা শহীদ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বইগুলোতে India Held Kashmir ও India Occupied Kashmir-এর মতো শব্দবন্ধও ছিল, যা অঞ্চলটিকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বর্ণনা করার নয়াদিল্লির অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে। বিজেপি প্রতিনিধিদের বক্তব্য, বইগুলো তরুণদের বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সশস্ত্র সহিংসতার দিকে প্রভাবিত করতে পারে।

আরও বড় একটি সংগ্রহ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বইগুলো অনুমোদিত হয়েছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাজার হাজার সরকারি স্কুলে বিতরণের জন্য কর্মকর্তারা শত শত প্রকাশকের কাছ থেকে শত শত শিরোনাম নির্বাচন করেছিলেন। বিতর্কিত দুটি বইয়ের সন্ধান পাওয়ার পর সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়, সংগ্রহ প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্ত শুরু হয় এবং শিক্ষা বিভাগের আট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কর্তৃপক্ষ ও তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বইগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনজনকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করে।

পরে জম্মু ও কাশ্মীরের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোজ সিনহা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই ঢোকার আগে তা পর্যালোচনার জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। জম্মু বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্কিত বইগুলো নিষিদ্ধ করে এবং সেগুলোর লেখক ও প্রকাশকদের কালোতালিকাভুক্ত করে। কিছু প্রতিষ্ঠানকে অনলাইন উপকরণও খতিয়ে দেখে কর্মকর্তাদের আপত্তিকর মনে হওয়া ফাইল সরিয়ে ফেলতে বলা হয়।

সরকারের দাবি, তারা কী ঠেকাতে চাইছে?

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এটি পড়াশোনার ওপর সাধারণ বিধিনিষেধ নয়, বরং নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ। তাদের যুক্তি, কাশ্মীরে সশস্ত্র সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে এবং শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গৌরবগান বা রাজনৈতিক সহিংসতায় উৎসাহ দেওয়া হতে পারে।

বিজেপির মুখপাত্র সুনীল শেঠি বলেছেন, একাডেমিক স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদের সমর্থকদের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের প্রশংসা করতে দেওয়া উচিত নয়। তাঁর যুক্তি, অনেক কষ্টে শান্তি ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং বিতর্কিত শিক্ষাসামগ্রী সেই স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

জম্মু ও কাশ্মীরে ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল কনফারেন্সের মুখপাত্র ইমরান নবী দার বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে বই পড়ার সুযোগ বন্ধ করা নয়, বরং শ্রেণিকক্ষ থেকে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক দূরে রাখাই এর উদ্দেশ্য। প্রশাসন আরও বলেছে, স্কুলে ব্যবহৃত উপকরণ তথ্যগতভাবে সঠিক, শিক্ষার্থীদের বয়সের উপযোগী এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।

সহিংসতার সরাসরি আহ্বান জানানো প্রকাশনা এবং সহিংসতার কারণ অনুসন্ধান করা গবেষণাধর্মী কাজের মধ্যে যথার্থ পার্থক্য রয়েছে। কাশ্মীরের বিতর্কটি হলো, কর্মকর্তারা এই সীমারেখা কোথায় টানছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কারা এবং সব রাজনৈতিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ হবে কি না।

ভারতীয় আইন জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও সহিংসতায় উসকানির মতো ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিধিনিষেধের অনুমতি দেয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর যুক্তি, এসব বিধিনিষেধ হতে হবে সুনির্দিষ্ট, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক। তাদের মতে, সব গ্রন্থাগারে ব্যাপক তল্লাশি চালালে সহিংসতার সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র না দেখিয়েই ইতিহাস নিয়ে আলোচনা নিরাপত্তাজনিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শব্দচয়ন নিয়ে শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ কেন?

‘আপত্তিকর বিষয়বস্তু’ কথাটি নানা ধরনের উপকরণকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে সহিংসতার স্পষ্ট আহ্বান, তথ্যগত ভুল, ইতিহাসের বিতর্কিত ব্যাখ্যা, সরকারি নীতির সমালোচনা অথবা কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আঘাত করে এমন ভাষা। স্পষ্ট মানদণ্ড না থাকলে শাস্তির ভয়ে গ্রন্থাগারিক ও শিক্ষকরা বই সরিয়ে ফেলতে পারেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাশ্মীরের এক শিক্ষক বলেছেন, অঞ্চলটির ইতিহাস, শিক্ষা ও পরিচয় গভীরভাবে বিতর্কিত। তাঁর মতে, এই পর্যালোচনা একাডেমিক স্বাধীনতা এবং কোন বয়ান গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারণে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নূর আহমদ বাবা বলেছেন, এ ধরনের বিধিনিষেধ সংবিধানে সুরক্ষিত বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আরও সতর্ক করেছেন, বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা উল্টো ফল দিতে পারে, কারণ সরিয়ে ফেলা উপকরণ অনলাইনে বা অঞ্চলটির বাইরে থেকে পাওয়া যায়।

লেখক ও সাংবাদিক অনুরাধা ভাসিন, যাঁর কাজ ২০২৫ সালে নিষিদ্ধ ২৫টি বইয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল, সর্বশেষ পদক্ষেপকে পাঠক ও লেখকদের ভয় দেখানোর চেষ্টা বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, বইকে অস্ত্রের মতো বিবেচনা করা উচিত নয়। কর্মকর্তারা কীভাবে হাজার হাজার প্রকাশনা খতিয়ে দেখে নির্ভরযোগ্যভাবে সেগুলোর প্রেক্ষাপট বিচার করবেন, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।

এখানে-সেখানে আপত্তিকর বিষয়বস্তু থাকলেও তাতে কী আসে যায়? শেষ পর্যন্ত বই তো বোমা নয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুমন্ত্র বসু, যাঁর বইও আগের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত ছিল, নতুন প্রক্রিয়াকে অযৌক্তিক বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, কোন ইতিহাসের বিবরণ পাওয়া যাবে তা নির্ধারণের পোক্ত ভিত্তি তৈরি না করেই বিপুলসংখ্যক বই খুঁজে দেখতে কোনো কর্তৃপক্ষকে বিপুল সময় ব্যয় করতে হতে পারে।

২৫টি বইয়ের আগের নিষেধাজ্ঞায় কী ঘটেছিল?

সর্বশেষ নিরীক্ষার আগে ২০২৫ সালের আগস্টে জারি করা আলাদা এক নির্দেশে ২৫টি বই সরকার বাজেয়াপ্ত করেছে বলে ঘোষণা করা হয়। তালিকায় অরুন্ধতী রায়, এ.জি. নূরানি, সুমন্ত্র বসু, ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ডসহ অন্যান্য শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও লেখকের কাজ ছিল। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বইগুলো মিথ্যা বয়ান ছড়ায়, বিচ্ছিন্নতাবাদে উৎসাহ দেয় বা সন্ত্রাসবাদকে অনুকূলভাবে তুলে ধরে। নিষেধাজ্ঞাকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

বইগুলোতে কাশ্মীর বিরোধের ইতিহাস, জোরপূর্বক গুম, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, নারীবাদী প্রতিরোধ, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পর শাসনব্যবস্থা এবং বেসামরিক মানুষের অভিজ্ঞতার মতো বিষয় উঠে এসেছে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস ও ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার বলেছে, নির্দেশটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং একাডেমিক স্বাধীনতা লঙ্ঘন করেছে। তাদের বক্তব্য, প্রকাশনাগুলো থেকে সরাসরি ও তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি তৈরি হয়েছে—কর্তৃপক্ষ তার প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

গোষ্ঠী দুটি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় ভারতের দায়বদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেছে। এসব চুক্তিতে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে এমন মতামতসহ তথ্য খোঁজা, গ্রহণ ও ভাগ করে নেওয়ার অধিকার সুরক্ষিত। একাডেমিক স্বাধীনতার মধ্যে সাধারণত গবেষণা করা, ফলাফল প্রকাশ করা এবং সরকারি বয়ান খতিয়ে দেখার সুযোগ অন্তর্ভুক্ত।

২০২৫ সালের নির্দেশ কার্যকর করতে শ্রীনগরের বইয়ের দোকানে অভিযান চালিয়ে বই জব্দ করা হয়। এক অভিযানে জামায়াতে ইসলামি এবং ইসলামি পণ্ডিত আবুল আলা মওদুদীর লেখার সঙ্গে সম্পর্কিত ৬০০টির বেশি বই পুলিশ জব্দ করে। কর্তৃপক্ষ বলেছে, বইগুলো কাশ্মীরে নিষিদ্ধ একটি সংগঠনের আদর্শ প্রচার করে। বই বিক্রেতাদের বক্তব্য, অনেক বই বৈধভাবে প্রকাশিত হয়েছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে ভারতে পাওয়া যাচ্ছিল।

কয়েকজন দোকানমালিক বলেছেন, অভিযানের পর তাঁরা সরবরাহকারীদের কাছে বই ফেরত দিতে এবং দোকানের তাক থেকে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল উপকরণ সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হন। আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা স্পষ্ট না হলেও গ্রেপ্তার, জব্দ বা জিজ্ঞাসাবাদের আশঙ্কায় মানুষ নিজেই মতপ্রকাশে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কাশ্মীরের বিতর্কিত ইতিহাসে এই বিরোধের প্রভাব কী?

কাশ্মীরের পুরো অঞ্চল ভারত ও পাকিস্তার—দুই দেশই নিজেদের বলে দাবি করে; অঞ্চলটির বিভিন্ন অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। ভারত-শাসিত অংশে ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিক থেকে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহ চলছে। ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের অভিযোগ করেছে, আর পাকিস্তান তা অস্বীকার করে। সংঘাতে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বাস্তুচ্যুতি, আটক, গুম ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিস্তৃত বেসামরিক ইতিহাস তৈরি হয়েছে।

এই ইতিহাসকে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান থেকে সহজে আলাদা করা যায় না। কাশ্মীর নিয়ে পড়াশোনায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, মহারাজা হরি সিংয়ের শাসন, ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি দাবি, জাতিসংঘ, বিদ্রোহ, সামরিক অভিযান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে হতে পারে।

সরকারের সমর্থকদের বক্তব্য, সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রশংসা করা বা ভারতকে দখলদার শক্তি হিসেবে তুলে ধরা বয়ান শিক্ষা নয়, রাজনৈতিক প্রচারণা। সমালোচকদের জবাব, শিক্ষার্থীদের সামনে শুধু সরকারি জাতীয় বয়ান তুলে ধরলে তারা বিরোধটি বুঝতে পারবে না। কোনো দাবি নিয়ে অধ্যয়ন করা মানে সেই দাবিকে সমর্থন করা নয়, তারা বলেন।

শ্রীনগরের সংসদ সদস্য সৈয়দ আঘা রুহুল্লাহ মেহেদি বলেছেন, গ্রন্থাগারের কাজ জ্ঞান সংরক্ষণ করা, সরকারের পছন্দের রাজনৈতিক আখ্যানের হাতিয়ার হওয়া নয়।

গ্রন্থাগারে কোনো বই থাকা মানেই তার বক্তব্য সমর্থন করা নয়। এর অর্থ হলো, জ্ঞানচর্চার জন্য তথ্যপ্রাপ্তি, বিতর্ক ও সমালোচনামূলক অনুসন্ধান জরুরি—এ কথা স্বীকার করা।

কাশ্মীরি লেখক ও সাংবাদিক রাও ফারমান আলী বলেছেন, নিরাপত্তার দৃষ্টিতে প্রতিরোধ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে উপকরণ বিপজ্জনক মনে হতে পারে, কিন্তু অঞ্চলটির অতীত বোঝার জন্য তা এখনো জরুরি। তাঁর বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উৎস এবং পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যায় প্রবেশাধিকার দরকার।

২০১৯ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

২০১৯ সালের আগস্টে নয়াদিল্লি জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বিলোপ করে এবং সাবেক রাজ্যটিকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে। এর ফলে অঞ্চলটি আরও সরাসরি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর সেখানে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার ফিরে এসেছে, যদিও প্রশাসন ও নিরাপত্তার বিষয়ে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে।

সমালোচকদের মতে, ২০১৯ সালের পর সাংবাদিক, কর্মী, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ আরও কঠোর হয়েছে। তারা বই নিরীক্ষাকে জনআলোচনা নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখেন, যার পাশাপাশি অঞ্চলটিকে স্থিতিশীল ও স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

সরকারের সমর্থকেরা এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁদের বক্তব্য, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো সংবেদনশীল এবং সহিংসতায় উৎসাহ দিতে পারে—এমন উপকরণ ঠেকাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব রয়েছে। প্রশাসন স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতি গঠন ও সাংবিধানিক শিক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করেছে; বিচ্ছিন্নতাবাদী বয়ানের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান শূন্য সহনশীলতার।

এই মতবিরোধ ভারতে একাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কেরই প্রতিফলন। ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ, প্রকাশ্যে সমালোচনা, গবেষণার বিষয় ও পাঠ্যসামগ্রী নিয়ে গবেষকেরা চাপের মুখে পড়েছেন। একাডেমিক স্বাধীনতা সূচকে গত দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতের স্কোরে তীব্র পতন নথিভুক্ত হয়েছে, যদিও সেই র‌্যাঙ্কিংয়ের কারণ ও ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে।

বিজ্ঞাপন

পর্যালোচনা কি নিরাপত্তার বদলে নীরবতা তৈরি করতে পারে?

উসকানি ঠেকানোর উদ্দেশ্যে করা পর্যালোচনাও মানদণ্ড অস্পষ্ট হলে আরও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। গ্রন্থাগারিকরা কাশ্মীর নিয়ে বই কেনা এড়িয়ে যেতে পারেন। সরকারি নজর কাড়তে পারে—এমন বিষয় শিক্ষকরা পড়ানো বাদ দিতে পারেন। রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন করতে শিক্ষার্থীরা দ্বিধা বোধ করতে পারে। লেখকেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে অঞ্চলটি নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ডের বই Kashmir in Conflict নিষিদ্ধ ২৫টি বইয়ের মধ্যে ছিল। তিনি বলেন, তথ্যপ্রাপ্তি সীমিত করতে সরকারগুলো প্রায়ই বই নিষিদ্ধ করেছে। তাঁর যুক্তি, সংলাপ ও পুনর্মিলনের জন্য সংঘাতের সব পক্ষকে বোঝা জরুরি।

তথ্যগুলো সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত না হলে কোনো সংঘাতের সমাধান করা যায় না।

সমালোচকেরা আরও সতর্ক করেছেন, গ্রন্থাগার থেকে বই সরালেই কৌতূহল দূর হয় না। শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেটে, ব্যক্তিগত সংগ্রহে বা জম্মু ও কাশ্মীরের বাইরে অনেক বই খুঁজে পেতে পারে। নিষেধাজ্ঞায় বইটির প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে, আবার নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সুবিধা নেই—এমন শিক্ষার্থীরা বইটি মনোযোগ দিয়ে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

নিরীক্ষার সমর্থকদের জবাব, কোনো বই পাওয়া যায় বলেই তা স্কুলের গ্রন্থাগারের উপযোগী হয়ে যায় না। তাঁদের বক্তব্য, কম বয়সী শিক্ষার্থীদের বয়সোপযোগী উপকরণ দরকার এবং প্রচারণাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে তুলে ধরার প্রত্যাশা শিক্ষকদের কাছে করা উচিত নয়। তাঁদের পছন্দের সমাধান হলো আরও কঠোরভাবে বই সংগ্রহ করা এবং যোগ্য শিক্ষাবিদদের দিয়ে তা পর্যালোচনা করানো।

কয়েকজন শিক্ষাবিদ প্রস্তাব করেছেন, ইতিহাসবিদ, গ্রন্থাগারিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিষয়বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বাধীন কমিটি বিতর্কিত বই পর্যালোচনা করুক। তাঁদের মতে, কোনো বই সরানোর সিদ্ধান্ত হলে তার লিখিত কারণ দিতে হবে, আপিলের সুযোগ রাখতে হবে এবং বিশ্লেষণ, সমর্থনমূলক প্রচার ও উসকানির মধ্যে পার্থক্য করতে হবে।

শিক্ষার্থী ও গ্রন্থাগারের জন্য কী ঝুঁকিতে?

গ্রন্থাগার ঐতিহ্যগতভাবে এমন জায়গা, যেখানে পাঠকেরা পরস্পরবিরোধী ধারণার মুখোমুখি হন। সরকারি যোগাযোগ দপ্তরের ভূমিকা এর থেকে আলাদা। কোনো বইয়ে বিতর্কিত দাবি থাকলেও গ্রন্থাগার সেটি সংগ্রহে রাখতে পারে, আর শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের অন্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দাবিগুলো যাচাই করতে সহায়তা করতে পারেন।

বর্তমান প্রক্রিয়ায় গ্রন্থাগারিক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানেরা কঠিন অবস্থানে পড়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বড় সংগ্রহ খতিয়ে দেখতে হচ্ছে, পাশাপাশি পরে কর্তৃপক্ষ বেআইনি বলে বিবেচনা করতে পারে—এমন উপকরণ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হলে আইনি পদক্ষেপের ঝুঁকিও রয়েছে। এতে সংগ্রহের মান নির্ধারিত হতে পারে পাণ্ডিত্যপূর্ণ মূল্য দিয়ে নয়, বরং সরকারি প্রতিক্রিয়ার ভয়ে।

কাশ্মীরের শিক্ষার্থীদের জন্য এর প্রভাব পড়ার তালিকার বাইরেও পৌঁছায়। বিরোধের পরস্পরবিরোধী বয়ান গড়ে তুলেছে—এমন উৎসে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার দরকার। বাস্তুচ্যুতি, শোক ও প্রতিরোধের কথা বলা লেখকদের পড়া সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি। আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক যুক্তি ও নিরাপত্তা আইন খতিয়ে দেখা দরকার। এসব উপকরণ সরিয়ে দিলে শিক্ষার্থীরা যেসব প্রশ্ন করতে পারে, তার পরিসর সংকুচিত হতে পারে।

নতুন পর্যালোচনায় শেষ পর্যন্ত কত বই সরানো হবে বা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ফলাফল প্রকাশ করবে কি না, সরকার তা জানায়নি। আগের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আদালতে করা চ্যালেঞ্জও নির্ধারণ করতে পারে, গবেষণাধর্মী ও সাংবাদিকতামূলক কাজের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কতটা বিস্তৃতভাবে নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করতে পারবে।

মূল কথা

  • ভারত-শাসিত কাশ্মীরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বই, গবেষণা ও ডিজিটাল উপকরণ পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
  • বিচ্ছিন্নতাবাদী ব্যক্তিত্বদের পরিচিতি এবং কাশ্মীরের বিতর্কিত বর্ণনা থাকা দুটি বইকে ঘিরে বিতর্কের পর এই পর্যালোচনা শুরু হয়।
  • সরকারের বক্তব্য, শ্রেণিকক্ষে উসকানি, উগ্রপন্থায় দীক্ষা ও বেআইনি প্রচারণা ঠেকানোই এর উদ্দেশ্য।
  • শিক্ষাবিদ ও বিরোধী নেতাদের আশঙ্কা, অস্পষ্ট মানদণ্ডে মানুষ নিজেই মতপ্রকাশে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে এবং বিতর্কিত ইতিহাস মুছে যেতে পারে।
  • ২০২৫ সালের পৃথক এক নির্দেশে বিশিষ্ট লেখক ও শিক্ষাবিদদের ২৫টি বই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল; ওই পদক্ষেপকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
  • মূল বিরোধ হলো, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল উপকরণ গ্রন্থাগার থেকে সরানো হবে, নাকি সমালোচনামূলক অধ্যয়নের জন্য সংরক্ষণ করা হবে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে