ব্রাসেলসের কঠোর অবস্থান
মে মাসের শুরুতে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় কমিশনের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টেফান সেজুর্নে এবং বাণিজ্য কমিশনার মারোস সেফচোভিচ যখন জাপানের বাণিজ্যমন্ত্রী রিয়োসেই আকাজাওয়া ও পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইওয়া হোরির সঙ্গে বৈঠকে বসেন, তখন আলোচনায় এমন এক জরুরিতার সুর ছিল, যা এক দশক আগেও কল্পনা করা কঠিন হতো। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের সপ্তম উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক সংলাপ বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্পর্কে দুই শক্তির দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একসময় দক্ষতার চালিকাশক্তি হিসেবে প্রশংসিত সরবরাহ শৃঙ্খল এখন ভূরাজনৈতিক জবরদস্তির সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সূচিপত্র
বৈঠকটি ছিল জাপান-ইইউ প্রতিযোগিতা জোটের অগ্রগতি পর্যালোচনার একটি ধাপ। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্মেলনে এই উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। দুই পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ব্যাটারি, প্রতিরক্ষা শিল্প, হাইড্রোজেন, সামুদ্রিক বায়ুবিদ্যুৎ এবং সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা তৈরি করে। কূটনৈতিক শিষ্টাচারের কারণে প্রতিটি বাক্যে বেইজিংয়ের নাম না এলেও, অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল স্পষ্ট। কোনো একক প্রভাবশালী শক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন প্রক্রিয়াকরণ ও পরিশোধন সক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবনে সৃষ্ট ঝুঁকি কমানোই ছিল সংলাপের মূল লক্ষ্য।
জাপানি কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট একটি উদ্বেগ নিয়ে ব্রাসেলসে এসেছিলেন। আকাজাওয়া ইউরোপীয় শিল্প ত্বরান্বিতকরণ আইনের প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মার্চে প্রস্তাবিত এই আইন ইইউর ভেতরে উৎপাদিত পণ্যকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। টোকিওর আশঙ্কা, এমন অগ্রাধিকার দুই পক্ষের গড়ে তোলার চেষ্টা করা শিল্প সহযোগিতাকেই অনিচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই আলোচনা দেখিয়েছে, অভিন্ন অবস্থান গড়ার সময় একই লক্ষ্যে থাকা অংশীদারদেরও নিজ নিজ দেশের স্বার্থের টানাপোড়েন সামলাতে হয়।
ব্রাসেলসের আলোচনা কয়েক সপ্তাহ আগে দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে শুরু হওয়া কথোপকথনের ধারাবাহিকতা। জানুয়ারিতে আকাজাওয়া ও সেজুর্নে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং যৌথ উদ্যোগে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। মে মাস নাগাদ সেই প্রতিশ্রুতি সুইজারল্যান্ডের তুষারঢাকা করিডর থেকে ইউরোপীয় কমিশনের আনুষ্ঠানিক বৈঠককক্ষে পৌঁছেছে। এর মধ্যে চীনের নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং বিরল মৃত্তিকা ও ব্যাটারি উপকরণের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার বাড়তে থাকা আশঙ্কা এই উদ্যোগকে আরও দৃঢ় করেছে।
বাণিজ্য চুক্তি যেভাবে নিরাপত্তা চুক্তিতে রূপ নিল
ব্রাসেলসের সংলাপের পেছনে থাকা অংশীদারত্বটি শুরুতে অর্থনৈতিক যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়নি। ২০১৮ সালের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিতে মূলত শুল্ক কমানো এবং নিয়ন্ত্রক মান সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ২০১৯ সালে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর পণ্য বাণিজ্য প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে এবং সেবা বাণিজ্য বেড়েছে ৪২ শতাংশ। তবে এই বাণিজ্যিক কাঠামোতে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগ যাচাই বা সংকটে সমন্বিত প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা ছিল না।
টোকিওই প্রথম মোড় পরিবর্তনের মুখে পড়ে। ২০১০ সালে বেইজিংয়ের সঙ্গে সামুদ্রিক বিরোধের পর চীন হঠাৎ বিরল মৃত্তিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, যা জাপানকে কঠিন শিক্ষা দেয়। তখন জাপানের বিরল মৃত্তিকার ৯০ শতাংশের বেশি আসত চীন থেকে। সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য আনার ফলে এই হার প্রায় ৬০ শতাংশে নেমে এলেও কৌশলগতভাবে সরবরাহ শ্বাসরোধের সেই স্মৃতি রয়ে গেছে। এর জবাবে জাপান ২০২২ সালে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা উন্নয়ন আইন পাস করে, যার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সুরক্ষা ও জরুরি উপকরণের মজুত গড়ে তোলার আইনি কাঠামো তৈরি হয়।
ইউরোপের অগ্রগতি ছিল ধীর। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ এবং মহামারির সময় উন্মোচিত সরবরাহ শৃঙ্খলের ফাটল ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তৎপর করে তোলে। ২০২৩ সালের জুনে ইইউ তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করে। অতিরিক্তভাবে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমানো, অর্থাৎ ঝুঁকি হ্রাস, এই কৌশলের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়। তবে জোটের ভেতরের মতপার্থক্যের কারণে এর বাস্তবায়ন জটিল হয়েছে। জার্মানির গাড়ি ও রাসায়নিক শিল্পের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো চীনের সঙ্গে গবেষণা ও উৎপাদন সম্পর্ক আরও গভীর করছে, আর হাঙ্গেরির মতো কিছু সদস্যরাষ্ট্র চীনা প্রত্যক্ষ বিনিয়োগকে সক্রিয়ভাবে আকৃষ্ট করছে। এই বিভক্তির কারণে ব্রাসেলসের পক্ষে কৌশলগত ঐকমত্যকে প্রায়ই সমন্বিত পদক্ষেপে রূপ দেওয়া কঠিন হয়।
২০২২ সালে চালু হওয়া ইইউ-জাপান ডিজিটাল অংশীদারত্ব সম্পর্কটিতে ভবিষ্যৎমুখী গতির নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই চুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অন্যতম প্রধান প্রকল্প ইউরোপ ও জাপানকে যুক্ত করা একটি আর্কটিক সাবমেরিন কেবল, যার লক্ষ্য রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর পথ এড়িয়ে সম্ভাব্য বিঘ্নের মুখে ডিজিটাল সক্ষমতা আরও দৃঢ় করা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যমান বিচ্ছিন্ন চুক্তিগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক জবরদস্তির জবাব সমন্বয় বা কৌশলগত খনিজের যৌথ ক্রয়ের জন্য নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। ব্রাসেলসের সংলাপ সেই শূন্যতা পূরণের পথে আরেকটি পদক্ষেপ।
কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ
ইইউ-জাপান সমন্বয়ের মূলে রয়েছে অভিন্ন এক দুর্বলতা: আধুনিক অর্থনীতিকে চালিত করা খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ। বিরল মৃত্তিকা, গ্রাফাইট, গ্যালিয়াম, জার্মেনিয়াম ও লিথিয়াম যৌগের পরিশোধন ও প্রক্রিয়াকরণে চীনের আধিপত্য রয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, বায়ু টারবাইন, রোবট, মহাকাশযানের যন্ত্রাংশ এবং উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এসব উপকরণের বিকল্প নেই। এই আধিপত্যকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখিয়েছে, ফলে টোকিও ও ব্রাসেলসের ঝুঁকি নিরূপণের পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে।
২০২৩ সালে গৃহীত এবং ২০২৪ সালে কার্যকর হওয়া ইউরোপীয় গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আইন কেন্দ্রীভূত সরবরাহ থেকে মুক্ত হওয়ার ইউরোপীয় প্রচেষ্টার আইনি ভিত্তি। ব্রাসেলসের উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক সংলাপে কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৌশলগত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন এবং আরও যৌথ খনিজ উদ্যোগে সহায়তার অঙ্গীকার করেন। উন্নত উপকরণ প্রক্রিয়াকরণ, ব্যাটারি রসায়ন এবং নির্ভুল উৎপাদনে জাপানের কয়েক দশকের দক্ষতা এই প্রচেষ্টাকে সহায়তা করে। ইইউ দিতে পারে বিপুল অর্থায়ন সক্ষমতা, ২৭টি জাতীয় বাজারজুড়ে নিয়মকানুনের সমন্বয় এবং বিশাল ক্রয়ক্ষমতা। একসঙ্গে তারা এমন সমান্তরাল শিল্পব্যবস্থা গড়তে চায়, যা চীনের উল্লম্বভাবে সমন্বিত আধিপত্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
তাদের সহযোগিতা খনিজ উত্তোলন থেকে পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত বিস্তৃত। মাঝের ধাপের পরিশোধন, ক্যাথোড উৎপাদন এবং বিরল মৃত্তিকা পৃথকীকরণ যদি চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে শুধু খনির উৎসে বৈচিত্র্য আনাই যথেষ্ট নয়। দুই পক্ষই স্বীকার করে, প্রকৃত স্থিতিস্থাপকতার জন্য পরবর্তী প্রজন্মের উৎপাদন এবং ব্যবহারকাল শেষে পণ্যের পুনর্ব্যবহারসহ পুরো মূল্যশৃঙ্খলে সক্ষমতা গড়া দরকার। কৌশলগত শিল্পের জন্য বিকল্প বৈশ্বিক অবকাঠামো তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য।
তবে চীনের শিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়েও দুই শক্তির উদ্বেগ বাড়ছে। ভর্তুকিপ্রাপ্ত চীনা উৎপাদনে বৈশ্বিক বাজার ইস্পাত, সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে সয়লাব হয়েছে, আর দাম নেমে গেছে এমন পর্যায়ে, যার সঙ্গে অনেক প্রতিযোগী পেরে উঠতে পারে না। এতে সবুজ রূপান্তরের কিছু দিক ত্বরান্বিত হলেও টোকিও ও ব্রাসেলসের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বিকল্প সরবরাহ নেটওয়ার্ক বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হওয়ার আগেই নিজস্ব শিল্পভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বেসরকারি খাতের চাপ বাড়ছে
ব্রাসেলস ও টোকিওর সরকারি কর্মকর্তারা একা কাজ করছেন না। বেসরকারি খাতের নেতারাও একই সতর্কবার্তা জোরালো করছেন। ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ইইউ-জাপান ব্যবসায়িক গোলটেবিল বৈঠকে প্রায় ১০০ জন করপোরেট নির্বাহী দ্রুত ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে আরও গভীর সহযোগিতার জোরালো আহ্বান জানান। নির্বাহীরা কাঁচামাল ও প্রযুক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি ঠেকানোর পাশাপাশি বিরল মৃত্তিকা ও সেমিকন্ডাক্টরের সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
গোলটেবিল বৈঠকের পর দেওয়া যৌথ ঘোষণায় করপোরেট নির্বাহীরা বর্তমান সময়কে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য তীব্র ঝুঁকির মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেন। দুই অঞ্চলের বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যবসায়ী নেতারা রপ্তানি বাধার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন এবং জবরদস্তিমূলক বাণিজ্যচর্চার পাল্টা চাপ হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি চিহ্নিত করতে সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। তাঁদের ভাষায়, জাপান ও ইইউ বহুপক্ষীয় সহযোগিতার স্বাভাবিক সমর্থক।
ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নজিরবিহীন পরিবর্তনের এই সময়ে আমরা জাপান ও ইইউর মধ্যে আরও গভীর সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছি,
বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি এ কথা জানিয়ে আরও বলে, পণ্য ও সেবাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দুই পক্ষেরই নিজেদের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব কাজে লাগানো উচিত। তবে নির্বাহীরা কঠিন বাস্তবতাও স্বীকার করেন: গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও ভোগ্যপণ্যের প্রধান রপ্তানিকারক এবং নিজস্ব শিল্পের জন্য অপরিহার্য বাজার হিসেবে চীনের সঙ্গে উভয় অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
গোলটেবিল বৈঠকে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভেতরের টানাপোড়েনও উঠে আসে। তাইওয়ান নিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মন্তব্য ঘিরে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার পর থেকে জাপানকে লক্ষ্য করে চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ জোরদার হয়েছে। সরকার ঝুঁকি কমানোর আহ্বান জানালেও প্রতিষ্ঠানগুলো এমন বাণিজ্যিক প্রয়োজনের চাপে রয়েছে, যা এখনো সাশ্রয়ী দামের চীনা উপকরণের ওপর নির্ভরশীল। এই টানাপোড়েনই দেখায়, ব্রাসেলসের সংলাপ শুধু মন্ত্রণালয়ের জন্য নয়, দুই মহাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদের জন্যও কেন গুরুত্বপূর্ণ।
করপোরেট বিবৃতিতে বলা হয়, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং শিল্প প্রতিযোগিতায় সমন্বয় ঘটালে দুই অংশীদার অভিন্ন মূল্যবোধ বিসর্জন না দিয়েই সুরক্ষাবাদ ও নিয়ন্ত্রক জটিলতার চ্যালেঞ্জ সামলাতে পারবে। এ ধরনের সমর্থন খনিজ মজুত ও যৌথ প্রক্রিয়াকরণ স্থাপনা দ্রুত বাস্তবায়নের পক্ষে থাকা কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক গতি জোগায়।
ওয়াশিংটনের সমর্থন বাড়ছে
ইইউ-জাপানের উদ্যোগ ক্রমেই বৃহত্তর পশ্চিমা কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বিষয়ে কৌশলগত অংশীদারত্বের ঘোষণা দেয় এবং মেক্সিকোর সঙ্গে একটি কর্মপরিকল্পনাও ঘোষণা করে। ত্রিপক্ষীয় কাঠামোতে কৌশলগত পণ্যের ন্যূনতম মূল্য, সমন্বিত মজুত এবং খনন, প্রক্রিয়াকরণ ও বাণিজ্যের জন্য সমন্বিত মানদণ্ডের পরিকল্পনা রয়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা নিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে সমঝোতা স্মারকের খসড়া তৈরিতে ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলস অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে, অন্যদিকে টোকিও ও ওয়াশিংটন খনিজ বিনিয়োগ নিয়ে সমন্বয় অব্যাহত রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি এই উদ্যোগকে এমন এক সংকেত হিসেবে তুলে ধরেছেন যে বৃহত্তম মুক্তবাজার অর্থনীতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যের নতুন কাঠামো গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন দেশীয় মজুত গড়ে তুলতে এমপি ম্যাটেরিয়ালস, ইউএসএ রেয়ার আর্থ এবং উত্তর আমেরিকার লিথিয়াম সরবরাহকারীদের মতো প্রতিষ্ঠানে অংশীদারি কিনছে। এমপি ম্যাটেরিয়ালসের সঙ্গে প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটি চুক্তিতে ইতিমধ্যে ক্রয়ের নিশ্চয়তা এবং ন্যূনতম মূল্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যার উদ্দেশ্য চীনের বাজার কারসাজি থেকে দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষা দেওয়া।
ব্রাসেলস ও টোকিওর জন্য ওয়াশিংটনের অন্তর্ভুক্তি যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি জটিলতাও বাড়ায়। মার্কিন অংশীদারত্বে পুঁজি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তবে অনিশ্চিত শুল্কনীতি এবং দ্রুত বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের চাপও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করে; এর গতি ইউরোপ বা জাপানের শিল্প প্রস্তুতির চেয়ে বেশি হতে পারে। স্বার্থের অমিল এড়াতে এই ত্রিপক্ষীয় সমন্বয়ে দক্ষ কূটনীতি দরকার হবে।
বিচ্ছিন্ন হওয়ার কঠিন হিসাব
বক্তৃতায় যতই গতি থাকুক, চীনের আধিপত্য সরিয়ে দেওয়ার বাস্তব বাধাগুলো এখনো বড়। কয়েক দশকের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, লক্ষ্যভিত্তিক শিল্পনীতি এবং ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানোর ফলে বিরল মৃত্তিকা ও ব্যাটারি উপকরণের বৈশ্বিক পরিশোধন ও প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতার বড় অংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে। ইউরোপে নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা খুবই সীমিত, আর প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হওয়া সত্ত্বেও জাপান এসব উপকরণের বেশির ভাগই এখনো চীনা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আমদানি করে। এই সম্পর্ক ছিন্ন করা কেবল নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি শিল্পব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর এমন এক প্রকল্প, যার জন্য কয়েক দশক ও শত শত বিলিয়ন ডলার লাগতে পারে।
খরচের হিসাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সৌর বিদ্যুৎ ইনভার্টার ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জামসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো থেকে চীনা সরবরাহকারীদের বাদ দেওয়ার ইউরোপীয় প্রচেষ্টায় বিপুল প্রতিস্থাপন ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, কৌশলগত খাতজুড়ে চীনা সরঞ্জাম খুলে বদলাতে আগামী পাঁচ বছরে জোটটির শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে। এর সঙ্গে ডিজিটালায়নে বিলম্ব, সেবা বিঘ্ন এবং কর্মসংস্থানে সমন্বয়ের কারণে বাড়তি ক্ষতি যোগ হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধির চাপ পড়বে।
পরিষ্কার প্রযুক্তিতে এই দ্বিধা সবচেয়ে স্পষ্ট। নিজেদের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ইউরোপীয় ও জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সাশ্রয়ী দামের চীনা সৌর প্যানেল, ব্যাটারির যন্ত্রাংশ এবং পরিশোধন সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল। এসব আমদানি সীমিত করলে দেশীয় ব্যয় বাড়তে পারে এবং সবুজ রূপান্তরের গতি কমে যেতে পারে, ঠিক যখন দুই পক্ষই উচ্চাভিলাষী নিট-শূন্য নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল প্রায়ই পরিবেশগত আপত্তি, প্রযুক্তিগত অপরিপক্বতা এবং বেশি শ্রমব্যয়ের মুখে পড়ে; দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ভর্তুকি ছাড়া এসব কারণে সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না।
আকাজাওয়াও এই টানাপোড়েনের কথা স্বীকার করেছেন। জানুয়ারিতে দাভোসে আলোচনার সময় তিনি ইউরোপীয় প্রতিপক্ষদের সঙ্গে বাজারবহির্ভূত নীতি নিয়ে উদ্বেগ ভাগ করে নেন, অথচ জাপানের শিল্প খাতও একই সরবরাহ নেটওয়ার্কে গভীরভাবে জড়িত। এই দ্বিধা দুই পক্ষেরই: কারখানার কাজ চালু রাখতে এবং রূপান্তরের লক্ষ্য নাগালে রাখতে দরকারি উপকরণের সরবরাহ বজায় রেখেই রাজনীতিক ও নির্বাহীদের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন থেকে ঝুঁকি কমাতে হবে। এই বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয়, ইইউ-জাপান সমন্বয় প্রান্তিক ক্ষেত্রে স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে পারে, তবে নিকট ভবিষ্যতে চীনের সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্প অবস্থান মৌলিকভাবে দুর্বল করার সম্ভাবনা কম।
শেষ পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতা শুধু খনিজের জন্য নয়, সময়ের সঙ্গেও। চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র স্থায়ীভাবে বদলে দেওয়ার আগেই ইউরোপ ও জাপানকে বিকল্প শিল্পব্যবস্থা গড়তে হবে। ব্রাসেলসের সংলাপ সেই সময়সীমায় কয়েক ধাপ এগিয়েছে, তবে গন্তব্য এখনো অনেক দূরে এবং ব্যয়বহুল।
মূল বিষয়গুলো
- মে মাসের শুরুতে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের সপ্তম উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে সহযোগিতা জোরদার হয়।
- ইইউ-জাপান প্রতিযোগিতা জোটের অধীনে দুই পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ব্যাটারি, হাইড্রোজেন, সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সমন্বয় বাড়াচ্ছে।
- জাপান উন্নত উপকরণ ও ব্যাটারি বিষয়ে দক্ষতা দিচ্ছে, আর ইইউ দিচ্ছে অর্থায়ন সক্ষমতা ও বৃহৎ বাজার; লক্ষ্য মাঝের ধাপের প্রক্রিয়াকরণ ও পরিশোধনে চীনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা।
- দুই অঞ্চলের ব্যবসায়ী নেতারা সরকারি ও বেসরকারি খাতের সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন এবং রপ্তানি বাধা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।
- সমন্বিত মজুত ও ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণের পরিকল্পনাসহ ইইউ ও জাপানের সঙ্গে কৌশলগত খনিজ অংশীদারত্বের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রও এই উদ্যোগে যোগ দিয়েছে।
- উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সত্ত্বেও ইউরোপ ও জাপান এখনো চীনা সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বৈচিত্র্য আনতে উচ্চ ব্যয়, প্রযুক্তিগত ঘাটতি ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা রয়েছে, যা বছরের পর বছর অগ্রগতি ধীর করতে পারে।






