মহানগর ছাড়ার ঢল আরও তীব্র
সাশ্রয়ী জীবনযাপনের খোঁজে বাসিন্দারা রাজধানী ছেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ায় ঐতিহাসিক মাত্রার জনসংখ্যা স্থানান্তর দেখা যাচ্ছে। তথ্য ও পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম তিন মাসে ৮৩,৯৮৪ জন সিউল থেকে গিয়ংগি প্রদেশে চলে গেছেন। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এ সংখ্যা ৩০.৯ শতাংশ বেশি এবং এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ১১.৭ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালের শেষ তিন মাসের পর এটি সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক সংখ্যা; সে সময় একই পথে পাড়ি দিয়েছিলেন ৮৫,৪৮১ জন।
সূচিপত্র
‘সিউল ছাড়ার ঢল’ নামে বহুল পরিচিত এই প্রবণতা আবাসনবাজারের ক্রমবর্ধমান চাপের প্রতিফলন। এ চাপ সাধারণ পরিবারগুলোকে তাদের আর্থিক সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতে বাধ্য করেছে। বাসিন্দাদের নিবন্ধন স্থানান্তরের প্রতিবেদন থেকে নেওয়া এ তথ্য প্রশাসনিক জেলাগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার চলাচল অনুসরণ করে এবং একটি স্পষ্ট প্রবণতা তুলে ধরে। দাম কিছুটা সংশোধিত হওয়ার পরও সিউলের অ্যাপার্টমেন্টগুলো দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আবাসনের মধ্যে রয়েছে। সিউলের ‘জেনসে’ ভাড়াব্যবস্থা—যেখানে মাসিক ভাড়ার বদলে এককালীন জামানত দিতে হয়—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়েছে। জেনসে বাসার বিজ্ঞাপন কমে যাওয়া ও দাম আবার বাড়তে থাকায় অনেক পরিবারের পক্ষে বিপুল ঋণের বোঝা না নিয়ে রাজধানীতে আবাসন নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
এই বহির্গমন শুধু প্রতিষ্ঠিত পরিবারগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নানা বয়স ও শ্রেণির মানুষ স্থানান্তরিত হচ্ছেন, তবে তরুণ পেশাজীবী ও সদ্য বিবাহিত দম্পতিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। মহামারির বছরগুলোতে যে প্রবণতা অল্প অল্প করে শুরু হয়েছিল, তা এখন ধারাবাহিক স্রোতে পরিণত হয়েছে। এতে জনসংখ্যার মানচিত্র বদলে যাচ্ছে এবং নীতিনির্ধারকদের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কোরিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত রাজধানীকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির দায়িত্ব যাদের ওপর, সেই প্রজন্মের কাছেই ক্রমেই আর্থিকভাবে নাগালের বাইরে বলে মনে হচ্ছে।
আবাসন ব্যয় ছাড়াচ্ছে সামর্থ্য
সিউলে থেকে যাওয়ার আর্থিক বাধা সাধারণ পরিবারের জন্য প্রায় অতিক্রম-অযোগ্য হয়ে উঠেছে। রাজধানীর অ্যাপার্টমেন্টের দাম এখনো এমন পর্যায়ে রয়েছে যে মধ্যম আয়ের ক্রেতাদের পক্ষে বাড়ির মালিক হওয়া প্রায় অসম্ভব। সম্প্রতি কার্যকর হওয়া এক ব্যাপক ঋণ নিয়ন্ত্রণে গৃহঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০০ মিলিয়ন ওন, যা প্রায় ৪৩০,০০০ ডলার। জল্পনামূলক কেনাকাটা কমানো ও দাম স্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে করা হলেও, এ নিয়মে শ্রমজীবী পরিবারের স্বপ্নে বড় ধাক্কা লেগেছে। সিউলে অ্যাপার্টমেন্টের গড় দাম এখন প্রায় ১.৪৬ বিলিয়ন ওন। সর্বোচ্চ ঋণের যোগ্যতা অর্জন করা ক্রেতাদেরও কেনাকাটা সম্পন্ন করতে অন্তত ৮৬০ মিলিয়ন ওন নগদ লাগবে। কার্যত এ নীতি বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ সীমিত করছে বিপুল নগদ অর্থ হাতে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে।
এ নিয়ন্ত্রণে ১.২৭ মিলিয়নের বেশি পরিবার প্রভাবিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা সিউলের ১.৭১ মিলিয়ন অ্যাপার্টমেন্টের প্রায় ৭৪ শতাংশ। গ্যাংনাম ও সেওচো-র মতো উচ্চমূল্যের এলাকায় গড় দাম ৩ বিলিয়ন ওনের বেশি। আগে ক্রেতারা সম্পত্তির মূল্যের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারতেন, যার পরিমাণ দাঁড়াত ১.৫ বিলিয়ন ওন বা তারও বেশি। নতুন ব্যবস্থায় ঋণের সীমা ৬০০ মিলিয়ন ওন; এসব এলাকার সম্পত্তি কিনতে নগদে ২.৫ বিলিয়ন ওনের বেশি লাগবে। সিউলের এক আবাসন নীতিবিষয়ক গবেষক সতর্ক করে বলেছেন, বাজারটি ক্রমেই শুধু ধনীদের কথা মাথায় রেখে পরিচালিত হচ্ছে, যা রাজধানী অঞ্চলে আর্থসামাজিক বিভাজন আরও গভীর করতে পারে।
বিশ্বের সর্বোচ্চ গৃহস্থালি ঋণের বোঝাগুলোর একটির সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার এই ঋণ নিয়ন্ত্রণের সময়কাল মিলে গেছে। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় গৃহস্থালি ঋণের অনুপাত দাঁড়ায় ৯১.৭ শতাংশে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, ৩৮টি প্রধান দেশের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ১০০.৬ শতাংশ অনুপাত নিয়ে কেবল কানাডা এর ওপরে ছিল। ব্যাংক অব কোরিয়ার গভর্নর রি চ্যাং-ইয়ং এ অনুপাত ধীরে ধীরে প্রায় ৮০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত ঋণ আর্থিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তবে আবাসন ব্যয় বেড়ে চলায় অনেক বাসিন্দার মনে হচ্ছে, বিপজ্জনক ঋণের বোঝা নেওয়া অথবা পুরোপুরি শহর ছেড়ে যাওয়া—এই দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে।
গিয়ংগি হয়ে উঠছে নতুন গন্তব্য
সিউল ছেড়ে যাওয়া মানুষদের অধিকাংশই উন্নত পরিবহন যোগাযোগ ও আবাসন অবকাঠামোসমৃদ্ধ গিয়ংগি প্রদেশের বড় শহরগুলোতে বসতি গড়েছেন। প্রথম প্রান্তিকে অন্য অঞ্চল থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ এসেছে সুয়নে, নতুন বাসিন্দার সংখ্যা ১৩,৭১২। কাছাকাছি অবস্থানে থাকা গয়াংয়ে এসেছেন ১৩,৩১৭ জন, ইয়ংগিনে ১৩,০০৫ জন এবং সিওংনামে ১২,০৮৮ জন। হোয়াসং ও পিয়ংতেক—দুই শহরেই নতুন বাসিন্দার সংখ্যা ১০,০০০ ছাড়িয়েছে। প্রদেশটির মধ্যে গওয়াংমিয়ংয়ে নিট জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল সর্বোচ্চ; প্রান্তিকটিতে সেখানে ৮,২০৩ জন বাসিন্দা বেড়েছে।
সিউলের বাসিন্দাদের আবাসন চাহিদা সম্পত্তি কেনাবেচার তথ্যেও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের নিবন্ধন তথ্যব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, মার্চে গিয়ংগি প্রদেশে অ্যাপার্টমেন্টের ক্রেতাদের ১৫.৬৯ শতাংশ ছিলেন সিউলের বাসিন্দা। ২০২২ সালের জুনের পর এটি সর্বোচ্চ হার। শুধু গত বছরেই সিউলে বসবাসকারী মানুষ প্রদেশটিতে ১৭,০৯৩টি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন, যা এক বছর আগে নথিভুক্ত ১৩,৪২৯টির তুলনায় ২৭.৩ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে সক্রিয় বাজার ছিল গয়াং: সিউল থেকে আসা ক্রেতারা কিনেছেন ১,৭৩৬টি অ্যাপার্টমেন্ট। এরপর রয়েছে নামইয়াংজুতে ১,৪০৯টি, হানামে ১,২৫২টি এবং উইজংবুতে ১,১০৯টি। যে সাতটি শহরে লেনদেনের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়েছে, সেখানে গিয়ংগি প্রদেশের মোট অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচার ৫৩.৭ শতাংশ করেছেন রাজধানীর বাসিন্দারা; এ সংখ্যা ৯,১৮৩টি।
চাহিদার এই উল্লম্ফনে স্থানীয় সম্পত্তির দাম দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কোরিয়া রিয়েল এস্টেট বোর্ডের তথ্য বলছে, এ বছরের এপ্রিলের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত ইয়ংগিনের সুজি-গুতে অ্যাপার্টমেন্টের দাম বেড়েছে ৭.২৪ শতাংশ। সিওংনামের বুন্দাং-গুতে বেড়েছে ৪.৫৯ শতাংশ, আর সুয়নের ইয়ংতং-গু ও হোয়াসংয়ের ডংতান-গুতে যথাক্রমে বেড়েছে ৩.৬৭ ও ২.৮৮ শতাংশ। একই সময়ে সিউলে গড় দাম বেড়েছে মাত্র ২.৬৫ শতাংশ। যাতায়াতনির্ভর এসব শহরে দাম দ্রুত বাড়ার অর্থ, রাজধানী ছাড়ার এই প্রবণতা শুধু বাসিন্দাদের স্থানান্তর নয়; গোটা মহানগর এলাকার আবাসনবাজারের মৌলিক পুনর্বিন্যাসও ঘটছে।
সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে তরুণ কোরীয়রা
তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্থানান্তরের প্রবণতা বিশেষভাবে স্পষ্ট। তাদের কাছে সিউল সুযোগের শহর থেকে বদলে আর্থিক ফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত বছর প্রকাশিত কোরিয়া পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রাজধানী থেকে আশপাশের রাজধানী অঞ্চলে ১৯ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের নিট বহির্গমন ছিল ১০,০০০ জন। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ২,০০০, অর্থাৎ পাঁচ গুণ কম। এসব তরুণ অভিবাসীর ৬,০০০ জনকে আশ্রয় দিয়েছে গিয়ংগি প্রদেশ; ইনচনে নিট আগমন হয়েছে ৪,০০০ জনের। কাজ বা শিক্ষার সুযোগের জন্য অনেক তরুণ কোরীয় প্রথমে সিউলে আসেন, কিন্তু পরে দেখেন, আবাসন ব্যয়ের কারণে দীর্ঘমেয়াদে সেখানে থাকা টেকসই নয়।
আবাসন সাবস্ক্রিপশন ব্যবস্থার কার্যকারিতা ভেঙে পড়ায় এই সংকট আরও জটিল হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথমবারের মতো বাড়ি কিনতে আগ্রহীদের, বিশেষ করে তরুণ আবেদনকারীদের, নিয়ন্ত্রিত দামে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে সহায়তা করার জন্য একটি বিশেষ সাবস্ক্রিপশন অ্যাকাউন্ট কর্মসূচি রয়েছে। তবে নতুন অ্যাপার্টমেন্টের প্রারম্ভিক দাম বিদ্যমান বাজারদরকে ক্রমেই ছাড়িয়ে যাওয়ায় ব্যবস্থাটি এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। আবাসন প্ল্যাটফর্ম জিগব্যাংয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশজুড়ে চালু হওয়া বেসরকারি খাতের ২৪টি অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের মধ্যে ১৯টির প্রতি ৩.৩ বর্গমিটারের গড় দাম একই এলাকার গত দুই বছরে সম্পন্ন হওয়া অ্যাপার্টমেন্টগুলোর দামের চেয়ে বেশি ছিল। সিউলের সেওদেমুন-গুর ডিফাইন ইয়োনহির মতো কমপ্লেক্সগুলোর প্রারম্ভিক দাম জেলার গড় প্রারম্ভিক দামের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ এবং সাম্প্রতিক বাজারদরের চেয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি ছিল।
দামের ব্যবধান থেকে সম্ভাব্য মুনাফা কমে যাওয়ায় সাবস্ক্রিপশন বাজারে আগ্রহও ফিকে হচ্ছে। সাবস্ক্রিপশন অ্যাকাউন্টধারীর সংখ্যা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ২৬.৯৭৯ মিলিয়ন থেকে কমে এ বছরের জানুয়ারিতে দাঁড়িয়েছে ২৬.১৩২ মিলিয়নে; কমেছে প্রায় ৮৪০,০০০। তিন থেকে পাঁচ বছর ধরে অ্যাকাউন্ট চালু রাখা মধ্যম পর্যায়ের গ্রাহকদের মধ্যে পতন ছিল সবচেয়ে বেশি, তাঁদের সংখ্যা ১.৫ মিলিয়নেরও বেশি কমেছে। দশ বছর বা তার বেশি সময় ধরে অ্যাকাউন্ট চালু রাখা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, কম অগ্রাধিকার স্কোর থাকা তরুণ আবেদনকারীরা এই ব্যবস্থা ছেড়ে দিচ্ছেন। জমির দাম, কাঁচামাল, শ্রম ও অর্থায়নের ব্যয় বাড়ায় নির্মাণ খরচ বেড়েছে; ফলে সাবস্ক্রিপশনকে একসময় আকর্ষণীয় করে তোলা ছাড় দেওয়া এখন নির্মাতাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কোয়াংউন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিয়েল এস্টেট আইনের অধ্যাপক সিও জিন-হিয়ং ব্যাখ্যা করেছেন, বাড়ি কেনার বাইরেও ভাড়াবাজারে এই চাপের প্রভাব পড়ছে।
সিউলে আবাসনের দাম অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় পুরোনো বাসিন্দারা বাইরের এলাকায় চলে যাচ্ছেন। একই সময়ে, আঞ্চলিক এলাকা থেকে রাজধানী অঞ্চলে আসা মানুষ সরাসরি সিউলে বসতি গড়ার চেষ্টা না করে ক্রমেই গিয়ংগি বা ইনচনকে বেছে নিচ্ছেন।
সিও আরও বলেন, ইনচন ও গিয়ংগির অনেক শহর এখনো কাজের জন্য সিউলে যাতায়াতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে সাশ্রয়ের আশায় স্থানান্তরিত বাসিন্দারা আবাসন ব্যয়ে সাশ্রয়ের বিনিময়ে যাতায়াতের চাপ বাড়ার মুখে পড়েন।
সরকারি নীতি ও বাজারের প্রতিক্রিয়া
সিউলের কর্মকর্তারা সংকটটি স্বীকার করেছেন এবং আবাসনের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ উদ্যোগ এগোতে পারবে কি না। ভূমিমন্ত্রী কিম ইউন-দুক ঘোষণা করেছেন, সিউল মহানগর এলাকায় তরুণ ও সদ্য বিবাহিত দম্পতিদের জন্য সরকার দ্রুত আবাসনের সরবরাহ বাড়াবে। জাতীয় পরিষদে ক্ষমতাসীন কোরিয়া ডেমোক্রেটিক পার্টি ও সরকারের মধ্যে এক পরামর্শ বৈঠকে এই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সেখানে ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে শহরে আবাসনের সরবরাহ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়। কিম বলেন, দুরবস্থায় বসবাস করা এবং উচ্চমূল্য নিয়ে উদ্বিগ্ন মানুষের জন্য স্থিতিশীল আবাসনের ব্যবস্থা করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
এর আগে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশজুড়ে ১.৩৫ মিলিয়নের বেশি বাড়ি নির্মাণ শুরুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিম জানান, সরবরাহ বাড়ানোর প্রস্তুতি নিতে গত বছর বিধিমালা সংশোধনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল; এ বছর বাস্তবায়নের কাজ দ্রুততর হবে। ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা মেং সিওং-গিউ সরকারকে সিউল মহানগর এলাকার রাষ্ট্রায়ত্ত জমি ও পুরোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবন কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। সময়মতো নির্মাণ নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি জোর দেন।
বেসরকারি খাতে নির্মাতারা বাইরের এলাকাগুলোতে চাহিদা পূরণে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। লোটে কনস্ট্রাকশন উইজংবুর লোটে ক্যাসল নারিবেক সিটি প্রকল্পে আর্থিক সুবিধার প্যাকেজ দিচ্ছে। এতে রয়েছে ৫ শতাংশ অগ্রিম মূল্য পরিশোধ, প্রথম কিস্তি নির্ধারিত ১০ মিলিয়ন ওন এবং ঋণের সুদে সহায়তা। স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি ইনচনে রেমিয়ান সংদো স্টেশন সেন্ট্রিপোল প্রকল্প চালু করেছে; ১৯টি ভবনে এতে রয়েছে ২,৫৪৯টি ইউনিট। কোরিয়া ল্যান্ড অ্যান্ড হাউজিং কর্পোরেশন গয়াং চাংনেউং জেলায় ৩৯১টি ইউনিটের জন্য আবেদন নিচ্ছে, আর লোটে কনস্ট্রাকশন গিমপোতে পুংমু স্টেশন লোটে ক্যাসল সিগনেচার প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা করছে। এসব প্রকল্পে শিল্পখাতের বৃহত্তর প্রবণতা প্রতিফলিত হচ্ছে: কেন্দ্রীয় সিউল থেকে রাজধানী অঞ্চলের প্রান্তিক এলাকাগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়া।
তবে নীতিগত পরিবেশ এখনো জটিল। ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার অনুপাতসংক্রান্ত কঠোর নিয়মে সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে বাড়ির মালিক হওয়া ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে তৈরি মূল্যসীমা ব্যবস্থা নির্মাণ ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতিকে বিবেচনায় নিচ্ছে না। কিছু অর্থনীতিবিদ ‘বেলুন প্রভাব’ নিয়ে সতর্ক করছেন: সিউলে দমিয়ে রাখা চাহিদা গিয়ংগি ও ইনচনের কম ও মধ্যম দামের এলাকায় চলে গিয়ে সেখানকার দাম বাড়াতে পারে। বানপো-দংয়ের এক রিয়েল এস্টেট এজেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, কঠোর নিয়ম প্রায়ই ক্রেতাদের বিকল্প ঋণদাতার কাছে, এমনকি অবৈধ অর্থায়নের পথে ঠেলে দেয়। এতে মূল সাশ্রয়যোগ্যতার সমস্যার সমাধান না করেই নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়।
যাতায়াতের বৈপরীত্য
মানুষ বিপুল সংখ্যায় বাইরে চলে গেলেও দক্ষিণ কোরিয়ার অবিসংবাদিত অর্থনৈতিক কেন্দ্র সিউলই। ফলে যাতায়াতের এক বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে, যা পরিবহন নেটওয়ার্ক ও ব্যক্তিগত অর্থের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ইনচন ও গিয়ংগির অনেক শহর কর্মসংস্থানের জন্য সিউলে যাতায়াতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অর্থাৎ আবাসনের খরচ কমলেও তার বিনিময়ে দীর্ঘ যাত্রাপথ ও পরিবহন ব্যয়ের বোঝা বাড়ে। ২০২২ ও ২০২৩ সালের শুরুর দিকে আবাসনের দাম অল্প সময়ের জন্য কমার পর আবার বাড়তে শুরু করে; গত বছর আবাসন ব্যয়ের চাপ আরও তীব্র হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। অনেক পরিবার এখন সিউলের ঠিকানার মর্যাদার চেয়ে সাশ্রয়ী আবাসন ও যাতায়াতের সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, ক্রমবর্ধমান বহির্গমন বৃহত্তর মহানগর এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে না দিয়ে সিউলকেন্দ্রিক চাকরি ও যাতায়াতের কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে তরুণ কর্মীরা দ্বিমুখী চাপে রয়েছেন: কর্মস্থলের কাছে বসবাসের সামর্থ্য তাঁদের নেই, আবার পেশাগত অগ্রগতির জন্য প্রতিদিন কর্মস্থলে ফিরতে হয়। এতে কঠোর ভৌগোলিক স্তরবিন্যাস তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যেখানে রাজধানী অর্থনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখে আর আবাসন সংকট ঠেলে দেয় আশপাশের এলাকায়। বৈপরীত্যটি স্পষ্ট। সিউলে বসবাসের সামর্থ্য না থাকায় মানুষ শহরটি ছেড়ে যাচ্ছেন, অথচ কাজের জন্য প্রতিদিন তাঁদের আবার ফিরতে হচ্ছে। ফলে তাঁরা কার্যত রাজধানীর অর্থনীতিকে ভর্তুকি দিচ্ছেন, আর উপশহরগুলোতে সম্পদ গড়ার চেষ্টা করছেন, যেখানে এখন দাম দ্রুত বাড়ছে।
এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব হতে পারে গভীর। গিয়ংগির শহরগুলোতে যদি সিউলের আবাসন চাহিদা বাড়তে থাকে, অথচ সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান না বাড়ে, তবে অঞ্চলটিতে স্থায়ী স্থানিক বৈষম্যের ধরন গড়ে উঠতে পারে। তখন কোথায় বসবাস করা হবে, তা পছন্দের বদলে সম্পদের ওপর নির্ভর করবে। একসময় সাশ্রয়ী ছিল এমন উপশহরগুলো ব্যয়বহুল যাতায়াতনির্ভর শহরে পরিণত হলে, বৃহত্তর ভৌগোলিক পরিসরে সিউলের সংকটেরই পুনরাবৃত্তি হতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশ্রয়ের বিকল্পও কমে যাবে।
যা জানা জরুরি
- ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ৮৩,৯৮৪ জন সিউল থেকে গিয়ংগি প্রদেশে গেছেন। চার বছরের মধ্যে এ সংখ্যা সর্বোচ্চ এবং আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৩০.৯ শতাংশ বেশি।
- গৃহঋণের নতুন সর্বোচ্চ সীমা ৬০০ মিলিয়ন ওন হওয়ায় মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য সিউলের বাজার কার্যত নাগালের বাইরে চলে গেছে। সেখানে অ্যাপার্টমেন্টের গড় দাম ১.৪৬ বিলিয়ন ওন।
- ১৯ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বহির্গমন সবচেয়ে বেশি; ২০২৪ সালে সিউল থেকে আশপাশের এলাকায় নিট ১০,০০০ তরুণ বাসিন্দা চলে গেছেন।
- প্রথম প্রান্তিকে সুয়ন, গয়াং, ইয়ংগিন ও সিওংনামসহ গিয়ংগির প্রতিটি শহরে ১২,০০০-এর বেশি নতুন বাসিন্দা এসেছেন।
- গিয়ংগির কয়েকটি জেলায় অ্যাপার্টমেন্টের দাম সিউলের চেয়েও দ্রুত বাড়ছে; এ বছর ইয়ংগিনের সুজি-গুতে দাম বেড়েছে ৭.২৪ শতাংশ।
- দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশজুড়ে ১.৩৫ মিলিয়নের বেশি বাড়ি নির্মাণের অঙ্গীকার করেছে; রাজধানী অঞ্চলে সরবরাহ বাড়ানোর কাজও দ্রুততর হবে।
- জিডিপির তুলনায় গৃহস্থালি ঋণের অনুপাত ৯১.৭ শতাংশ, যা বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।






