ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌ সহযোগিতায় ঐতিহাসিক প্রস্তাব
জাপান ভারতকে তাদের উন্নত মোগামি শ্রেণির স্টেলথ ফ্রিগেটের সম্পূর্ণ নকশা এবং স্থানীয়ভাবে নির্মাণের অধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। টোকিওর পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিকে প্রথমবারের মতো কোনো বড় সম্মুখসারির যুদ্ধজাহাজ হস্তান্তরের প্রস্তাব এটি। ১৯ ও ২০ এপ্রিল প্রাথমিক আলোচনার সময় প্রস্তাবটি সামনে আসে, এর ঠিক এক দিন পর ২১ এপ্রিল জাপানের মন্ত্রিসভা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি রপ্তানিতে দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধ আরোপকারী নিয়ম সংশোধন করে। প্রতিটি জাহাজের আনুমানিক দাম ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। জাপানি উপকরণ ও বাছাই করা সংবেদনশীল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভারতের জাহাজ নির্মাণ কারখানায় এগুলো তৈরি হবে। বাস্তবায়িত হলে, দুই এশীয় শক্তির মধ্যে বিবেচনাধীন সবচেয়ে বড় ও উচ্চাভিলাষী প্রতিরক্ষা শিল্প উদ্যোগগুলোর একটি হবে এই চুক্তি।
সূচিপত্র
- ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌ সহযোগিতায় ঐতিহাসিক প্রস্তাব
- কেন মোগামি শ্রেণি নৌবাহিনীতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে
- অস্ট্রেলিয়ার চুক্তি ও জাপানের রপ্তানি নীতির বিবর্তন
- চীনের নৌ সম্প্রসারণ নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগ
- বেইজিং ও অন্যদের প্রতি স্পষ্ট বার্তা
- ভারতের জাহাজ নির্মাণ কারখানা ও আত্মনির্ভর ভারত ভাবনা
- দেশীয় জাহাজকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ
- বাধা ও জাহাজ সরবরাহের দীর্ঘ পথ
- মূল কথা
বিদেশি অস্ত্র আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানোর ভারতের প্রচেষ্টার সঙ্গে এই উদ্যোগের সরাসরি মিল রয়েছে। জাপানের জন্য এ প্রস্তাব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কয়েক দশক ধরে দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানি নীতিতে থাকা সতর্ক অবস্থান থেকে সুস্পষ্ট সরে আসার ইঙ্গিত। ২০১৪ সালে অস্ত্র রপ্তানির বিধিনিষেধ শিথিল করলেও ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের সঙ্গেও উন্নত যুদ্ধ প্ল্যাটফর্ম বা সংবেদনশীল নৌ প্রযুক্তি ভাগ করে নিতে জাপান অনিচ্ছুক ছিল। জাহাজের সম্পূর্ণ নকশার তথ্যের পাশাপাশি উৎপাদনে সহায়তার প্রস্তাব দিয়ে জাপান ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা এখন প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতাকে কেবল বাণিজ্যিক লেনদেন হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। কোনো সরকারই আলোচনার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। তাই আপাতত কোনো দরপত্র আহ্বান বা বাধ্যতামূলক চুক্তিও নেই। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকায় সময়সীমা, প্রযুক্তি হস্তান্তরের পরিধি এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য নির্মিতব্য জাহাজগুলোর চূড়ান্ত নকশা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তবু দুই দেশের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা প্রস্তাবটির দিকে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছেন। কারণ, এর মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে যে টোকিও শুধু যন্ত্রাংশ নয়, বরং পুরো সম্মুখসারির নৌযুদ্ধের নকশাও আস্থাভাজন ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অংশীদারদের রপ্তানি করতে প্রস্তুত।
কেন মোগামি শ্রেণি নৌবাহিনীতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে
জাপান মোগামি শ্রেণির নকশা করেছে একটি উচ্চমাত্রায় স্বয়ংক্রিয়, বহুমুখী স্টেলথ ফ্রিগেট হিসেবে। একটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই এটি সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ, জাহাজবিরোধী যুদ্ধ, মাইন প্রতিরোধ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে পারে। আদর্শ জাহাজটির স্বাভাবিক ওজন প্রায় ৩,৯০০ টন এবং পুরোপুরি বোঝাই অবস্থায় প্রায় ৫,৫০০ টন। এর দৈর্ঘ্য ১৩২.৫ মিটার এবং গতি ঘণ্টায় ৩০ নটের বেশি। রোলস-রয়েস এমটি৩০ গ্যাস টারবাইনের সঙ্গে দুটি এমএএন ডিজেল ইঞ্জিন যুক্ত করে এর সম্মিলিত ডিজেল ও গ্যাসচালিত প্রপালশন ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। নকশাটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো নাবিকের সংখ্যা কম রাখার অভিনব ব্যবস্থা। কাছাকাছি ওজনের প্রচলিত ফ্রিগেটে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন নাবিকের প্রয়োজন হলেও, ব্যাপক স্বয়ংক্রিয়তা, উন্নত সেন্সর সমন্বয় এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি ডিসপ্লেযুক্ত ভবিষ্যৎধর্মী বৃত্তাকার যুদ্ধ তথ্যকেন্দ্রের কারণে মোগামি শ্রেণির জাহাজ পরিচালনায় প্রায় ৯০ জন কর্মীই যথেষ্ট।
জনবল কম লাগার বিষয়টি ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের ক্ষেত্রে দক্ষ প্রযুক্তিগত নাবিক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও ধরে রাখার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে দেশটির নৌবাহিনী। যুদ্ধজাহাজটিতে স্টেলথ আকৃতির হাল এবং ইউনিকর্ন নামে পরিচিত সমন্বিত মাস্ট কাঠামো রয়েছে। এতে যোগাযোগ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও রাডার অ্যান্টেনা এক আবরণের ভেতরে রাখা হয়, ফলে রাডারে জাহাজটি শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। এর সাবমেরিনবিরোধী ব্যবস্থায় রয়েছে পরিবর্তনশীল গভীরতার সোনার, টোড-অ্যারে সোনার এবং পূর্ণাঙ্গ হেলিকপ্টার সহায়তা। ভারত মহাসাগরে চীনা সাবমেরিনের টহল বাড়তে থাকায় এসব সক্ষমতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বর্তমান অস্ত্রসজ্জায় রয়েছে ১২৭ মিলিমিটারের এমকে ৪৫ নৌকামান, আটটি টাইপ ১৭ জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, সি-র্যাম নিকটপাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, হালকা টর্পেডো এবং ১৬ কোষের উল্লম্ব উৎক্ষেপণব্যবস্থা। নিউ এফএফএম নামে উন্নত সংস্করণটির হালের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪২ মিটার, ওজন বেশি এবং উল্লম্ব উৎক্ষেপণব্যবস্থায় ৩২টি কোষ রয়েছে। ফলে টাস্ক গ্রুপের অভিযানে আকাশ প্রতিরক্ষা ও আঘাত হানার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
অস্ট্রেলিয়ার চুক্তি ও জাপানের রপ্তানি নীতির বিবর্তন
ভারতকে দেওয়া প্রস্তাবটির আগে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একটি যুগান্তকারী চুক্তি হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মোগামি শ্রেণি জাপানের যুদ্ধজাহাজ রপ্তানি কৌশলের আদর্শ হয়ে উঠেছে। ১৮ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের কর্মকর্তারা ১০ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার (৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের জাপানি নকশার ফ্রিগেট বহর তৈরির চুক্তি সই করেন। মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ জাপানে প্রথম তিনটি জাহাজ নির্মাণ করবে এবং পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো আরও আটটি তৈরি করবে। প্রথম জাহাজটি ২০২৯ সালে সরবরাহের কথা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস এই সময়সীমাকে রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান নেভিতে কোনো সারফেস কমব্যাট জাহাজ যুক্ত করার দ্রুততম সংগ্রহ প্রক্রিয়া বলে বর্ণনা করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার কর্মকর্তারা ফ্রিগেটগুলোর জন্য কম নাবিকের প্রয়োজনকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা জানান, প্রতিস্থাপন করা হতে যাওয়া পুরোনো এএনজ্যাক শ্রেণির জাহাজের প্রায় দ্বিগুণ জনবলের তুলনায় ৯২ জন নাবিকই যথেষ্ট।
নিউজিল্যান্ডও তাদের দুটি এএনজ্যাক শ্রেণির জাহাজের বদলে মোগামি শ্রেণি ও ব্রিটিশ টাইপ ৩১ ফ্রিগেটের মধ্যে কোনটি নেবে, তা বিবেচনা শুরু করেছে। ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ জাহাজ দুটির নকশাগত আয়ু শেষ হওয়ার কথা। প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার কথা উল্লেখ করে ওয়েলিংটন প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ২ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। জাপানের জন্য অস্ট্রেলিয়ার চুক্তিটি উন্নত নৌ প্ল্যাটফর্মের বিদেশি ক্রেতা পাওয়া সম্ভব—এমন ধারণার বাস্তব প্রমাণ দিয়েছে। ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়া সাবমেরিনের জন্য ফরাসি নকশা বেছে নেওয়ার পর দেশটির রপ্তানি শিল্প বড় ধাক্কা খেয়েছিল। ভারতকে দেওয়া প্রস্তাবটি অস্ট্রেলিয়ার চুক্তির চেয়েও বেশি উচ্চাভিলাষী বলে মনে হচ্ছে। কারণ, এতে শুরু থেকেই স্থানীয় উৎপাদন এবং সম্ভাব্যভাবে আরও বিস্তৃত প্রযুক্তি হস্তান্তরের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। জাপান ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি বিকেন্দ্রীভূত নৌ শিল্প নেটওয়ার্ক গড়তে চাইছে বলে মনে হচ্ছে। এতে আস্থাভাজন অংশীদারেরা অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যাতে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সংকটের সময় জাপানের জাহাজ নির্মাণ অবকাঠামোর ওপর চাপ পড়লে বিকল্প ব্যবস্থা থাকে।
চীনের নৌ সম্প্রসারণ নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগ
প্রস্তাবটির প্রযুক্তিগত ও শিল্পগত দিকের পেছনে রয়েছে চীনের সামুদ্রিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই দেশের অভিন্ন উদ্বেগ থেকে উদ্ভূত কঠোর ভূরাজনৈতিক হিসাব। চীনের নৌবাহিনী দ্রুত তাদের বিমানবাহী রণতরি, সাবমেরিন বাহিনী এবং দূরপাল্লার সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে তারা জাপান ও ভারতের জলসীমার কাছাকাছি ক্রমবর্ধমান তৎপরতা চালাচ্ছে। সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ ঘিরে পূর্ব চীন সাগরে জাপান ধারাবাহিক চাপের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে, ঘনঘন সাবমেরিন টহল ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনসহ ভারত মহাসাগরে চীনের নৌ তৎপরতা বাড়তে থাকায় উদ্বিগ্ন নয়াদিল্লি। বিশ্লেষকদের মতে, প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরে একই সময়ে বিশাল নৌবহর বজায় রাখতে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ভারতের দূরসমুদ্রগামী নৌ সক্ষমতা বাড়িয়ে টোকিও কার্যত একটি কৌশলগত শক্তিবর্ধক তৈরি করছে, যা নয়াদিল্লিকে নিজ সামুদ্রিক অঞ্চলে প্রধান নিরাপত্তা প্রদানকারী হিসেবে কাজ করতে সহায়তা করবে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে পারস্পরিকভাবে কার্যকর নৌবাহিনীর নেটওয়ার্ক গড়ার বৃহত্তর কোয়াড লক্ষ্যকে সমর্থন করে। ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া যদি প্রযুক্তিগতভাবে কাছাকাছি ধরনের জাহাজ পরিচালনা করে, তাহলে যৌথ নৌমহড়া, অভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র এবং সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থার আয়োজন অনেক সহজ হবে। আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী ভৌগোলিক কেন্দ্রে ভারতের অবস্থান। জাপানের অবাধ ও উন্মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় রূপকল্পে সমর্থিত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পরিকল্পনায় এই অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তাই ফ্রিগেটের প্রস্তাবটি বেইজিংয়ের উদ্দেশে শক্তিশালী কৌশলগত বার্তা বহন করছে। চীনের সামুদ্রিক সম্প্রসারণের জবাব বিচ্ছিন্ন জাতীয় কর্মসূচির মাধ্যমে দেওয়ার বদলে টোকিও ও নয়াদিল্লি একাধিক অঞ্চলে সামরিক শিল্পে সহযোগিতা আরও গভীর করতে চায় বলে মনে হচ্ছে।
বেইজিং ও অন্যদের প্রতি স্পষ্ট বার্তা
এই প্রস্তাবের তাৎপর্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও বিস্তৃত। চীনের নৌ সম্প্রসারণ এমন গতিতে এগোচ্ছে, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। নিয়মিত বিরতিতে নতুন বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার ও সাবমেরিন বহরে যুক্ত হচ্ছে। ভারতের জাহাজ নির্মাণ কারখানায় নিজেদের সবচেয়ে উন্নত স্টেলথ ফ্রিগেটের নকশা দেওয়ার মাধ্যমে টোকিও ঘোষণা করছে, তারা নয়াদিল্লিকে কেবল অংশীদার নয়, আঞ্চলিক সামুদ্রিক প্রতিরোধব্যবস্থার সহ-উৎপাদক হিসেবেও দেখে। এই শিল্পভিত্তিক ভাবনা কোয়াড সদস্যদের বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। আস্থাভাজন অংশীদাররা ক্রমেই আলাদাভাবে কাজ করার বদলে সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সহযোগিতা করছে।
ভারত মহাসাগরে ভারত-নির্মিত মোগামি শ্রেণির ফ্রিগেট টহল দেওয়ার সম্ভাবনা বেইজিংয়ের নৌ পরিকল্পনায় নতুন জটিলতা তৈরি করবে। বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক নৌবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার বদলে চীনকে একই ধরনের প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারী এবং অভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণকারী ক্রমবর্ধমানভাবে সংযুক্ত দক্ষ সামুদ্রিক বাহিনীর নেটওয়ার্কের মোকাবিলা করতে হবে। প্রস্তাবের পর্যায়েই সুরক্ষিত নৌ নকশা ভাগ করে নিতে জাপানের আগ্রহ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। স্থিতিশীল, নিয়মভিত্তিক সামুদ্রিক ব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ অংশীদারদের সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি দিতে টোকিও প্রস্তুত।
ভারতের জাহাজ নির্মাণ কারখানা ও আত্মনির্ভর ভারত ভাবনা
চুক্তি হলে নির্মাণের দায়িত্ব সম্ভবত ভারতের অভিজ্ঞ কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ নির্মাণ কারখানা পাবে। সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী মাজাগন ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড এবং গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স। মাজাগন ডক বর্তমানে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রজেক্ট ১৭এ নীলগিরি শ্রেণির স্টেলথ ফ্রিগেট তৈরি করছে। অন্যদিকে, গার্ডেন রিচ একাধিক বড় সারফেস কমব্যাট জাহাজ নির্মাণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। তাই একেবারে নতুন স্থাপনা ছাড়াই বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামোতে মোগামি শ্রেণির উৎপাদন লাইন চালু করা সম্ভব হতে পারে। স্থানীয়ভাবে ছয় থেকে আটটি ফ্রিগেট নির্মাণে মোট কর্মসূচির মূল্য দাঁড়াবে ২.৭ বিলিয়ন থেকে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ নৌ সংগ্রহ প্রকল্পগুলোর মধ্যে থাকবে এটি। স্থানীয় নির্মাণে উৎপাদন, ইলেকট্রনিকস, প্রপালশন ও সিস্টেম সমন্বয় খাতে হাজারো দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে। একই সঙ্গে উন্নত জাপানি স্বয়ংক্রিয়তা ও মডিউলার নকশার দর্শন স্থায়ীভাবে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তিতে যুক্ত হবে।
যৌথভাবে এই ফ্রিগেট তৈরি করলে ভারত প্রতিরক্ষা অংশীদারদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে এবং দেশের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা উন্নত করতে পারবে। এই মাপের জটিল যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ প্রকল্প সফলভাবে পরিচালনা করতে পারলে উন্নত প্রতিরক্ষা উৎপাদনের বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে ভারতের ক্রমবর্ধমান সুনামও প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে ভারতীয় পরিকল্পনাকারীরা প্রায় নিশ্চিতভাবেই দেশীয়ভাবে তৈরি অস্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য চাইবেন। এর মধ্যে কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধজাহাজে ইতিমধ্যে মোতায়েন করা সুপারসনিক ব্রাহ্মোস জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও থাকতে পারে। ভারতীয় সেন্সর, যুদ্ধ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা, ডেটালিংক বা অস্ত্র যুক্ত করতে উল্লেখযোগ্য পুনর্নকশার কাজ লাগবে, যদিও সম্পূর্ণ নকশা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কারণ, মোগামি শ্রেণির জাহাজে ব্যবহৃত জাপানি টাইপ ১৭ জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় ব্রাহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের আকার অনেক বড়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবে বড় নিউ এফএফএম সংস্করণটি রাখার কারণই হতে পারে এর সম্প্রসারিত হাল ও ৩২ কোষের উল্লম্ব উৎক্ষেপণব্যবস্থা ভারতীয় চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তনের সুযোগ বাড়ায়।
দেশীয় জাহাজকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ
জাপানি নকশা আমদানি করলে ভারতের শক্তিশালী প্রজেক্ট ১৭এ নীলগিরি শ্রেণির কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কি না, তা নিয়ে কিছু প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন। তবে দুই প্ল্যাটফর্মের কাজ আলাদা। মোগামি শ্রেণি এমন কিছু জরুরি সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করবে, যা বর্তমানে দেশীয় কর্মসূচিতে নেই। নীলগিরি শ্রেণির ফ্রিগেটগুলো ভারী ও সম্মুখসারির যুদ্ধজাহাজ, যা উচ্চমাত্রার দূরসমুদ্রের যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য তৈরি। এগুলোতে রয়েছে শক্তিশালী আকাশ, জাহাজ ও সাবমেরিনবিরোধী অস্ত্রসজ্জা। মোগামি শ্রেণির দর্শনে আধুনিক স্টেলথ ফ্রিগেটের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বিশেষায়িত মাইনযুদ্ধ সক্ষমতার সমন্বয় করা হয়েছে। এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ২০১৯ সালে শেষ সোভিয়েত আমলের মাইনসুইপার অবসরে যাওয়ার পর থেকে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে কোনো বিশেষায়িত মাইন প্রতিরোধী জাহাজ নেই। নৌ-মাইন থেকে সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ ও বন্দরের প্রবেশপথ সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতার ঘাটতি নয়াদিল্লির জন্য নথিভুক্ত দুর্বলতা।
শুধু মাইন অপসারণের কাজে ব্যবহৃত আলাদা বহর সংগ্রহের বদলে মোগামি শ্রেণির জাহাজ সক্ষম যুদ্ধ ফ্রিগেট থেকেই মনুষ্যবিহীন সারফেস ভেহিকল ও স্বয়ংক্রিয় আন্ডারওয়াটার ভেহিকল পাঠিয়ে পানির নিচের হুমকি শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে পারে। এই সমন্বিত পদ্ধতিতে পরিচালনাগত নমনীয়তা অনেক বাড়ে, পাশাপাশি বিশেষায়িত মাইনযুদ্ধ বহরের বিপুল ব্যয়ও এড়ানো যায়। মাইনযুদ্ধের বাইরেও, একটি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের যুদ্ধজাহাজ নকশার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে ভারতের। জাপানি জাহাজ নির্মাতারা দক্ষ নির্মাণপ্রক্রিয়া গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে এ ধরনের জটিল জাহাজ দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে তৈরি করা যায়। প্রযুক্তি হস্তান্তরের কাঠামোর মাধ্যমে দ্রুত নির্মাণের এই পদ্ধতি কাজে লাগাতে পারলে দেশের সামুদ্রিক শিল্পের জন্য তা অমূল্য হবে। প্রকৃত কৌশলগত অর্জন শুধু বহরে আরেকটি ফ্রিগেট শ্রেণি যুক্ত করা নয়। বরং ভারতীয় নৌ অভিযানের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে এমন উন্নত স্বয়ংক্রিয়তা, মডিউলার কাঠামো এবং সমন্বিত সেন্সর প্রযুক্তি স্থায়ীভাবে আয়ত্ত করাই আসল লক্ষ্য।
বাধা ও জাহাজ সরবরাহের দীর্ঘ পথ
প্রস্তাবটি ঘিরে আগ্রহ থাকলেও ভারতের কোনো জাহাজ নির্মাণ কারখানায় ইস্পাত কাটার আগে বড় বাধা রয়ে গেছে। টোকিও বা নয়াদিল্লি কেউই আলোচনার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। আমলাতান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটি নিষ্পত্তি হতে হতে প্রকল্পটি কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও আটকে থাকতে পারে। গোপনীয় প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ, নকশা হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট পরিধি এবং ভারতীয় ও জাপানি ব্যবস্থাগুলো একটি হালের মধ্যে কীভাবে কাজ করবে—এসব প্রশ্ন রয়েছে। দেশীয় সেন্সর বা অস্ত্র যুক্ত করার কোনো শর্ত থাকলে এমনিতেই জটিল প্রকল্পটি আরও কঠিন হবে; বাড়তে পারে উন্নয়নের সময় ও ব্যয়। ভারত কোন সংস্করণ পেতে পারে, সেটিও বিবেচনার বিষয়। আদর্শ মোগামি শ্রেণিতে পরীক্ষিত সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচিত বড় নিউ এফএফএম সংস্করণে ভারতীয় চাহিদা পূরণের জন্য উন্নয়নের সুযোগ বেশি। তাৎক্ষণিক প্রাপ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণ সক্ষমতার মধ্যে কোনটি বেছে নেওয়া হবে, তা ভারতীয় নৌ পরিকল্পনাকারীদের সতর্কভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
সবশেষে, জাপানে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা উপেক্ষা করা যায় না। ২০২৬ সালের এপ্রিলে মন্ত্রিসভা প্রতিরক্ষা রপ্তানির নিয়ম সংশোধন করলেও অস্ত্র রপ্তানির বিরোধিতা জাপানের রাজনীতিতে এখনো একটি বিষয়। এত বড় কর্মসূচির পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে দুই সরকারকেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শিল্প সহযোগিতার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট সুফল দেখাতে হবে। আনুষ্ঠানিক দরপত্র আহ্বান এবং চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত মোগামি শ্রেণির প্রস্তাব নিশ্চিত সংগ্রহ কর্মসূচি নয়, বরং উচ্চাভিলাষী সদিচ্ছার ঘোষণা হিসেবেই থাকবে।
মূল কথা
- জাপান ভারতকে মোগামি শ্রেণির স্টেলথ ফ্রিগেটের সম্পূর্ণ নকশা ও স্থানীয় উৎপাদনের অধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। টোকিওর জন্য এটি প্রথম।
- প্রতিটি ফ্রিগেটের দাম আনুমানিক ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। মেক ইন ইন্ডিয়া কাঠামোর আওতায় ভারতের জাহাজ নির্মাণ কারখানায় স্থানীয়ভাবে এগুলো তৈরি হওয়ার কথা।
- উচ্চমাত্রায় স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধজাহাজগুলোতে প্রায় ৯০ জন কর্মীই যথেষ্ট। এগুলোতে উন্নত সাবমেরিনবিরোধী, মাইন প্রতিরোধী ও স্টেলথ সক্ষমতা রয়েছে।
- এই প্রস্তাবের আগে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের যুগান্তকারী চুক্তি হয়েছে। এটি যুদ্ধোত্তর জাপানের প্রতিরক্ষা রপ্তানি নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
- ভারত মহাসাগর ও পূর্ব চীন সাগরে চীনের নৌ সম্প্রসারণ নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগ টোকিও ও নয়াদিল্লির সামরিক শিল্প সহযোগিতা আরও গভীর করছে।
- প্রযুক্তি হস্তান্তরের পরিধি, ব্রাহ্মোসের মতো ভারতীয় অস্ত্রের সমন্বয় এবং চুক্তির চূড়ান্ত সময়সীমা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।






