ওয়াশিংটনে বিতর্কিত এক জোট
ওয়াশিংটনে কূটনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধারে সহায়তার জন্য অভিজ্ঞ রিপাবলিকান রাজনৈতিক কৌশলবিদ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠজন রজার স্টোনকে নিয়োগ দিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি প্রতিনিধি নিবন্ধন আইনের অধীনে সম্প্রতি দাখিল করা নথিতে দেখা গেছে, লবিং প্রতিষ্ঠান ডিসিআই গ্রুপের মাধ্যমে মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয়কে জনসংযোগসেবা দিতে স্টোন মাসে ৫০ হাজার ডলার পান। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মরিয়া হয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে নেপিডোর সই করা ৩০ লাখ ডলারের বৃহত্তর চুক্তির অংশ এই নিয়োগ। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পর থেকে বিপর্যস্ত শাসকগোষ্ঠীর ভাবমূর্তি নতুন করে গড়ার সবচেয়ে নির্লজ্জ প্রচেষ্টাগুলোর একটি এটি। অভ্যুত্থানে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হয়, নাগরিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয় এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার আওতায় মিয়ানমার একটি আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে রাষ্ট্রে পরিণত হয়। স্টোনকে দলে টেনে জেনারেলরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর বিশেষ যোগাযোগ এমন সব দরজা খুলে দিতে পারে, যা পদ্ধতিগত নৃশংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত সরকারের জন্য এত দিন দৃঢ়ভাবে বন্ধ ছিল।
সূচিপত্র
৭৩ বছর বয়সী স্টোন রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন নন। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর চার দশকের সম্পর্ক রয়েছে। প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক জীবনে তিনি নানা সময়ে উপদেষ্টা, ঘনিষ্ঠজন ও কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রচারশিবির রাশিয়ার সঙ্গে যোগসাজশ করেছিল কি না, তা নিয়ে কংগ্রেসের তদন্তে বাধা দেওয়ার দায়ে ২০১৯ সালে স্টোন দোষী সাব্যস্ত হন। তাঁকে ৪০ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তবে ২০২০ সালে ট্রাম্প ক্ষমা করে দেওয়ায় তাঁকে কারাভোগ করতে হয়নি। বছরের পর বছর রক্তপাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর জান্তা যখন বিশ্বের কাছে নতুন চেহারায় হাজির হওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই মিয়ানমার তাঁকে নিয়োগ দিল। সম্প্রতি কঠোর নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জান্তার মিত্ররা প্রত্যাশিত জয় পায়, আর সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর কিছুদিন পর অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং সামরিক পোশাক ছেড়ে প্রেসিডেন্ট পদে নিজেকে নিয়োগ দেন। সমালোচকদের ভাষায়, সামরিক আধিপত্য অব্যাহত রাখার আড়ালে এটি বেসামরিকতার একটি মুখোশমাত্র।
চুক্তি ও এর লক্ষ্য
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে দাখিল করা নথি থেকে জানা যায়, ডিসিআই গ্রুপ গত বছর মিয়ানমারের জন্য কাজ করার নিবন্ধন করে এবং যোগাযোগের প্রচেষ্টা জোরদার করতে এখন স্টোনকে পরামর্শক হিসেবে নিয়েছে। ঘোষিত লক্ষ্য স্পষ্ট: বাণিজ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানবিক সহায়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মিয়ানমার ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্গঠন। উগ্র রক্ষণশীল কর্মী হিসেবে পরিচিত স্টোন এমন একটি সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব নরম করতে পারবেন বলে জেনারেলরা আশা করছেন, যাকে পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এড়িয়ে চলে।
ডিসিআই গ্রুপকে বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে ইতিহাসের ভার। ২০০২ সালেও মিয়ানমারের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা একই প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করেছিল। তখন জেনারেলরা ওয়াশিংটনে নিজেদের ভাবমূর্তি ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন করে মধ্যপন্থী সংস্কারক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। সেই আগের প্রচারণা এক দশকের কূটনৈতিক যোগাযোগের ভিত্তি গড়তে সহায়তা করে; এর পরিণতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এবং প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মিয়ানমার সফর করেন। ২০১২ সালে ওবামা দেশটিতে সফরকারী প্রথম দায়িত্বরত মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন। সে সময় ওবামা দেশটির সংস্কারকে উল্লেখযোগ্য বলে প্রশংসা করেছিলেন, আর পরের বছর প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন হোয়াইট হাউস সফর করেন। তবে আশার সেই পুরো সময়কালকে এখন অনেক কর্মী সামরিক খাঁচার ভেতর তৈরি মরীচিকা হিসেবে দেখেন, যা ২০২১ সালে সেনাবাহিনী পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার পর পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
বিদেশি প্রচারণা মোকাবিলার উদ্দেশ্যে ১৯৩৮ সালে প্রণীত বিদেশি প্রতিনিধি নিবন্ধন আইনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে বিদেশি স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী যে কেউ নিজের কর্মকাণ্ড ও পারিশ্রমিক প্রকাশ করবেন। এসব নথি দাখিল করে ডিসিআই গ্রুপ ও স্টোন জান্তার সঙ্গে তাদের চুক্তিকে জনসমক্ষে এনেছেন। নথিতে দেখা যায়, চুক্তিটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হয়েছে। মন্ত্রণালয়টি সামরিক প্রচারযন্ত্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, কোনো বেসামরিক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নয়। এ থেকে বোঝা যায়, নেপিডো বিষয়টিকে নিয়মিত বাণিজ্যিক দর-কষাকষি নয়, বরং ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অভিজাতদের লক্ষ্য করে চালানো তথ্যযুদ্ধ হিসেবে দেখছে।
কর্মী ও মানবাধিকারকর্মীদের ক্ষোভ
স্টোনের সঙ্গে চুক্তির খবর মিয়ানমারের কর্মী এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র নিন্দার মুখে পড়ে। সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের ওপর নজর রাখা নাগরিক সমাজের সংগঠন জাস্টিস ফর মিয়ানমার এক কড়া বিবৃতিতে ডিসিআই গ্রুপ ও স্টোনের বিরুদ্ধে এমন এক কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন জান্তার কাছ থেকে মুনাফা নেওয়ার অভিযোগ তোলে, যে জান্তা দায়মুক্তির সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে। সংগঠনটি জানায়, স্টোন আন্তর্জাতিক অপরাধীদের সঙ্গে চুক্তিতে যুক্ত হয়েছেন এবং তাঁর কাজ থেকে সামরিক বাহিনীর অবৈধ দখল করা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রাকৃতিক সম্পদ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হচ্ছে। কর্মীদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান দেশজুড়ে স্কুল, গির্জা, মঠ ও হাসপাতালে ক্রমবর্ধমান হামলায় অর্থ জোগাতে সহায়তা করে।
সামরিক বাহিনীর নির্যাতন পর্যবেক্ষণকারী নাগরিক সমাজের সংগঠন জাস্টিস ফর মিয়ানমার স্টোন ও ডিসিআই গ্রুপের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নে অর্থ জোগানো আন্তর্জাতিক অপরাধীদের সঙ্গে চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ করেছে। কী ঝুঁকিতে রয়েছে, তা জানিয়ে সংগঠনটি একটি বিবৃতি দিয়েছে।
রজার স্টোন আন্তর্জাতিক অপরাধীদের সঙ্গে এই চুক্তিতে যুক্ত হয়েছেন। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন প্রাকৃতিক সম্পদ খাতের এমন সব প্রতিষ্ঠান লাভবান হচ্ছে, যেগুলো জান্তা অবৈধভাবে দখল করেছে এবং স্কুল, গির্জা, মঠ ও হাসপাতালে ক্রমবর্ধমান হামলায় অর্থ জোগাতে ব্যবহার করছে।
পদ্ধতিগত নির্যাতনের অভিযোগ কেবল কথার কথা নয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ইন্ডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার ২০২৪ সালে সতর্ক করে বলেছিল, অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর থেকে ৭,৭০০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং কয়েক হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। সংঘাত পর্যবেক্ষকদের হিসাবে, শুধু ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই বিমান ও ড্রোন হামলায় ৪৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। অভ্যুত্থানবিরোধী প্রতিরোধ শুরু হওয়ার পর কোনো এক মাসে এটিই ছিল সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা। সামরিক বাহিনী দাবি করে, দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চাওয়া সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করেই তাদের অভিযান চালানো হয়। তবে স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, সহিংসতা ব্যাপক ও নির্বিচার।
প্রতারণার চেনা কৌশল
মিয়ানমারের জেনারেলরা এর আগেও ভাবমূর্তি-পরামর্শক নিয়োগ করেছেন এবং রাজনৈতিক পালাবদল পরিচালনা করেছেন। বর্তমান লবিং প্রচেষ্টা সেই চেনা ধারারই অংশ। ১৯৮৮ সালের গণতন্ত্রপন্থী অভ্যুত্থানে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যার পর সামরিক বাহিনী পশ্চিমা দেশগুলোর কঠোর বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়ে। জবাবে ১৯৯৬ সালে জেনারেলরা ‘ভিজিট মিয়ানমার ইয়ার’ চালু করে পর্যটন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রচার করেন, আর আড়ালে চলতে থাকে জোরপূর্বক শ্রম, রাজনৈতিক বন্দিত্ব এবং জাতিগত এলাকায় নির্যাতন। বিদেশি দর্শকদের লক্ষ্য করে জান্তা প্রচারসামগ্রীও তৈরি করে; এর মধ্যে ছিল সামরিক শাসনের পক্ষে লেখা বই, যেখানে বিদেশি সমালোচনাকে মিয়ানমারের প্রতি শত্রুতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। মূল কৌশলটি সব সময়ই ছিল, পর্দার আড়ালে সেনাবাহিনীর প্রকৃত ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে সংস্কারের আশা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার মতো সামান্য বাহ্যিক পরিবর্তন দেখানো।
২০১১ থেকে ২০২১ সালের দশকটি এই ফাঁদকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ২০১৫ সালে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বিপুল ব্যবধানে জিতে সরকার গঠন করলেও সামরিক বাহিনী প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। পাশাপাশি, সংসদে অনির্বাচিত সেনাসদস্যদের একটি গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংবিধানে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের ছিল। সংসদে প্রবেশের জন্য অং সান সু চিকে ২০০৮ সালের সংবিধান রক্ষার শপথ নিতে হয়েছিল, যে সংবিধান সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখে। সমালোচকদের ভাষায়, মরীচিকাসদৃশ এই পালাবদলের সময়ও সংঘাত চলছিল। ২০১১ সালে কাচিন যুদ্ধ আবার শুরু হয়, উত্তর শান রাজ্যে বারবার ভয়াবহ সংঘর্ষ হয় এবং রাখাইন রাজ্যে আগুন জ্বলে ওঠে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পোড়ামাটি অভিযান চালিয়ে ৭ লাখের বেশি মানুষকে বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সের এক জরিপে দেখা যায়, শুধু প্রথম মাসেই অন্তত ৬,৭০০ রোহিঙ্গা নিহত হন। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক বাহিনী আবার ক্ষমতা দখল করলে মুখোশটি পুরোপুরি খুলে যায়। এটি ব্যবস্থার ছেদ নয়, বরং ব্যবস্থাটির প্রকাশ্যে নিজের ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল।
থেইন সেইনের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী সো থেইনকে কূটনীতিকেরা ব্যাপকভাবে সংস্কারপন্থী বলে মনে করতেন। অভ্যুত্থানের পর তিনি খোলাখুলিভাবে সেই মোহের কথা প্রকাশ করেন। ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির শাসনকাল নিয়ে লেখা এক বইয়ে তিনি মিন অং হ্লাইংয়ের ক্ষমতা দখলকে ‘খুবই বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ’ বলেন এবং জানান, সেদিনই মিয়ানমারের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার হয়েছিল। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যখন সংস্কারের ভাষায় কথা বলেন, তখন শব্দের আড়ালে হাতকড়ার শব্দ শুনতে হবে ওয়াশিংটনকে।
বিশ্লেষকেরা কেন সীমিত সাফল্য আশা করছেন
লাভজনক চুক্তি সত্ত্বেও খুব কম পর্যবেক্ষকই মনে করেন, স্টোন জান্তার জন্য প্রকৃত কোনো বড় অগ্রগতি এনে দিতে পারবেন। সিডনির লোয়ি ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক পরিচালক হান্টার মারস্টন বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিগতভাবে স্টোনকে চেয়েছিল, নাকি ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ডিসিআই তাঁকে নিয়োগ করেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যা-ই হোক, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে কাঠামোগত বাধা বিশাল। অভ্যুত্থানের জবাবে এবং রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীদের লক্ষ্য করে নানা স্তরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ-সংক্রান্ত মামলাটি এখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে বিচারাধীন।
ওয়াশিংটন কৌশলগত স্বার্থ দেখতে পারে, এমন ক্ষেত্রগুলোতেও জান্তা হয়তো প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে না। মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকার বেশির ভাগ সম্পদ এমন সংঘাতপূর্ণ এলাকায়, যেগুলোর ওপর সামরিক বাহিনীর নির্ভরযোগ্য নিয়ন্ত্রণ নেই। এসব সম্পদ সুরক্ষিত করার আলোচনা করতে গিয়ে কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মিকে যুক্ত করার প্রস্তাবও দিতে হয়েছে বলে খবর রয়েছে, কারণ সীমান্তের কাছে খনন এলাকাগুলোর বড় অংশে সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। আন্তদেশীয় সাইবার অপরাধ দমনে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা চাইলে মিন অং হ্লাইং আরও খারাপ অংশীদার হবেন। সাইবার প্রতারণা, মানবপাচার ও চোরাচালানে সহায়তার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় কারেন ন্যাশনাল আর্মি এবং এর নেতা সাও ছিত থুকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, গোষ্ঠীটি প্রতারণার আস্তানাগুলোতে নিরাপত্তা দেয় এবং অপরাধী সংগঠনগুলোর কাছে জমি ইজারা দেয়। তা সত্ত্বেও সাও ছিত থু জান্তার সঙ্গে যুক্ত সীমান্তশাসনব্যবস্থার অংশ হয়ে রয়েছেন এবং এর আগে মিন অং হ্লাইংয়ের কাছ থেকেই সম্মাননা পেয়েছেন।
চীনকে ঘিরে প্রশ্ন জেনারেলদের সঙ্গে যেকোনো ঘনিষ্ঠতার বিষয়কে আরও জটিল করে তোলে। ২০২১ সালে জান্তা ইসরায়েলি ও কানাডীয় নাগরিকত্বধারী লবিস্ট আরি বেন-মেনাশেকে নিয়োগ করেছিল। জেনারেলরা পশ্চিমের দিকে ঝুঁকতে এবং বেইজিং থেকে দূরে সরে যেতে চান, এই ভ্রান্ত ধারণা বিক্রি করাই ছিল তাঁর কাজ। তখনই সেই বয়ান বিশ্বাসযোগ্য ছিল না, এখন তা আরও কম বিশ্বাসযোগ্য। কূটনৈতিক সুরক্ষা, অস্ত্র ও রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য মিন অং হ্লাইং ব্যাপকভাবে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভর করেন। মিয়ানমার চীনের প্রতিবেশী হতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ এক স্বৈরশাসককে আলিঙ্গন করা উচিত। দুর্বল, নৃশংস ও আন্তর্জাতিকভাবে বিষাক্ত একটি শাসকগোষ্ঠী নির্ভরযোগ্য অংশীদার নয়। দেশকে যথেষ্ট ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করার মতো সক্ষমতা বা নিজেদের উসকে দেওয়া সংঘাত শেষ করার মতো বৈধতা, কোনোটিই তাদের নেই।
যা জানা দরকার
- ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে লবিং করতে ডিসিআই গ্রুপের মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রজার স্টোনকে মাসে ৫০ হাজার ডলার দিচ্ছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সই করা ৩০ লাখ ডলারের চুক্তির অংশ এটি।
- ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠজন স্টোন ২০১৯ সালে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ক্ষমা পান। বাণিজ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানবিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে।
- মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, স্টোন ও ডিসিআই গ্রুপ এমন এক নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে মুনাফা করছে, যারা দায়মুক্তির সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে।
- সম্প্রতি ব্যাপক নিন্দার মুখে জান্তা নির্বাচন আয়োজন করে এবং সামরিক শাসন অব্যাহত রাখার বৈধতা দেখাতে অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইংকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেয়।
- উচ্চপর্যায়ের এই লবিস্ট নিয়োগ সত্ত্বেও বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি এবং বাণিজ্য বা নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিশ্রুতি পূরণে শাসকগোষ্ঠীর অক্ষমতার কারণে বড় অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।






