ইরান যুদ্ধের ছায়ায় বাণিজ্য আলোচনা, বেইজিংয়ে বৈঠকে বসছেন ট্রাম্প ও শি

পড়তে 10 মিনিট
ইরান যুদ্ধের ছায়ায় বাণিজ্য আলোচনা, বেইজিংয়ে বৈঠকে বসছেন ট্রাম্প ও শি

কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ১৪ ও ১৫ মে বেইজিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক শীর্ষ বৈঠকে বসবেন। মার্চের শেষ দিকে বৈঠকটি হওয়ার কথা থাকলেও ইরানে চলমান যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ায় হোয়াইট হাউসকে সেই দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিতে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। এই বিলম্ব দেখিয়ে দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টায় দীর্ঘ ছায়া ফেলছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তাঁর চীন সফরের পর এই বৈঠকই হবে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর। বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব নিয়ে উত্তেজনা যখন দুই পরাশক্তির সহযোগিতা ভেস্তে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, তখন এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সূচিপত্র
  1. কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষা
  2. ইরানি তেল নিয়ে অচলাবস্থা
  3. অর্থনৈতিক প্রভাব ও বাণিজ্য বোর্ড
  4. মূল ইস্যু তাইওয়ানের মর্যাদা
  5. প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কূটনীতি
  6. মানবাধিকার ও শীর্ষ বৈঠকের আনুষ্ঠানিকতা
  7. সাফল্য বা ব্যর্থতার তিনটি সম্ভাব্য চিত্র
  8. মূল বিষয়গুলো

ইরানি তেল কেনা, তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণসহ ঠাসা আলোচ্যসূচি থাকা সত্ত্বেও দুই নেতা কম প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনায় বসছেন। ওয়াশিংটন গত অক্টোবরে স্বাক্ষরিত ভঙ্গুর বাণিজ্যবিরতি বাড়াতে চায়। অন্যদিকে, বেইজিং সম্পর্কের আরও অবনতি ঠেকাতে চায়, যা রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ক্ষতি করতে পারে। তবে ইরানে চলমান সংঘাত এসব জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক মনোযোগ গ্রাস করার হুমকি তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জামিসন গ্রিয়ার চলতি সপ্তাহে এক সাক্ষাৎকারে এ উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন।

আমরা চীনের সঙ্গে স্থিতিশীলতা চাই। এমন কিছু আমরা চাই না, যা বৃহত্তর সম্পর্ককে বা বেইজিংয়ের বৈঠক থেকে আসতে পারে এমন কোনো চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে।

গ্রিয়ার স্বীকার করেন, চীনের ইরানি অপরিশোধিত তেল কেনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুতর আপত্তি রয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই অর্থ রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন করে। সম্প্রতি মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় চীনের স্বতন্ত্র ‘টি-পট’ শোধনাগারগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গৌণ নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করেছে। অভিযোগ, এসব শোধনাগার বছরে কয়েক শ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল প্রক্রিয়াজাত করে। তবু তেহরানের প্রভাব যাতে বৃহত্তর কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় ভেস্তে না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক মার্কিন কর্মকর্তারা। অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা সামাল দিতে এবং বিপর্যয়কর ভুল হিসাব এড়াতে দুই দেশেরই এই সম্পর্ক পুনর্গঠন প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

ইরানি তেল নিয়ে অচলাবস্থা

ইরানি অপরিশোধিত তেল নিয়ে বিরোধ শীর্ষ বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। ২৮ এপ্রিল মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ইরানি অপরিশোধিত তেল কেনার অভিযোগে চীনের ‘টি-পট’ শোধনাগারগুলোর বিরুদ্ধে গৌণ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সতর্কতা জারি করে। এসব ছোট স্বতন্ত্র শোধনাগার আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য তেহরানকে একটি অস্বচ্ছ পথ দেয়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ১৩ শতাংশ এসব শোধনাগার প্রক্রিয়াজাত করে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, এসব লেনদেন এমন এক শাসনব্যবস্থাকে সরাসরি অর্থ জোগায়, যাকে তারা বিশ্বের সন্ত্রাসবাদের শীর্ষ রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক বলে আখ্যা দিয়েছে।

বেইজিং নজিরবিহীনভাবে আইনগত পথে এর বিরোধিতা করেছে। ২ মে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মূল ভূখণ্ডের পাঁচটি শোধনাগারের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ‘ব্লকিং রুলস’ প্রয়োগ করে। এসব শোধনাগারের মধ্যে হেংলি পেট্রোকেমিক্যালও রয়েছে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, সম্পদ জব্দ ও লেনদেন নিষিদ্ধ করার মতো যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ চীনের এখতিয়ারের মধ্যে স্বীকৃত, কার্যকর বা মান্য করা হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তের বাইরেও প্রযোজ্য নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এই সরাসরি চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পদক্ষেপের কড়া প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেন:

আমাদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করলে আপনাদের গৌণ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে। প্রতীকী কারণে আমরা এসব পদক্ষেপ নিই না।

পরিস্থিতি আরও জটিল করে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলা আলোচনা সম্পর্কে চীনা নেতৃত্বকে অবহিত করতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি চলতি সপ্তাহে বেইজিং সফর করেন। এই সফর ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্পের কাছ থেকে বাণিজ্য ছাড় আদায়ের বিনিময়ে বেইজিং ইরানের স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারে—এ নিয়ে তেহরান উদ্বিগ্ন। চীন অস্পষ্ট অবস্থান বজায় রেখেছে: ব্যক্তিগতভাবে ইরানকে শান্তিচুক্তি বিবেচনার আহ্বান জানালেও প্রকাশ্যে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে বিপজ্জনক বলে নিন্দা করেছে। চীনের আমদানি করা তেলের প্রায় অর্ধেক পারস্য উপসাগর দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই আঞ্চলিক বিষয়ে ট্রাম্পের কথামতো চলছে, এমন ধারণা না দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য শি জিনপিংয়ের ওপর তীব্র চাপ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক প্রভাব ও বাণিজ্য বোর্ড

ইরান নিয়ে অচলাবস্থার বাইরে, দ্বিপক্ষীয় স্থিতিশীলতার প্রমাণ হিসেবে দুই নেতাই সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ফলাফল ঘোষণার আশা করছেন। জাতীয় নিরাপত্তা বা গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে আপস না করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে পারে, এমন পণ্য চিহ্নিত করার লক্ষ্যে ‘বাণিজ্য বোর্ড’ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েক মাস ধরে কাজ করছেন মার্কিন ও চীনা কর্মকর্তারা। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে চীনের সম্ভাব্য মার্কিন মুরগির মাংস, গরুর মাংস ও সয়াবিনবহির্ভূত কৃষিপণ্য কেনা, পাশাপাশি আগামী তিন বছর বছরে ২ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন সয়াবিন কেনার অঙ্গীকার।

সম্ভাব্য চুক্তিগুলোর মধ্যে উড়োজাহাজ খাতের চুক্তিটিই প্রতীকী দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প খাতের সূত্র জানায়, চীন ও বোয়িং ৫০০টি ৭৩৭ ম্যাক্স জেট এবং কয়েক ডজন প্রশস্ত দেহের উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা করেছে। প্রায় এক দশকের মধ্যে এটিই হবে চীনের প্রথম বড় কেনাকাটা। এ ধরনের চুক্তি নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে তুলে ধরার মতো একটি সুনির্দিষ্ট সাফল্য এনে দেবে। এ ছাড়া বেইজিং দিনে প্রায় ৬ লাখ ব্যারেল মার্কিন অপরিশোধিত তেল আমদানি আবার শুরু করেছে। এতে ইরানি তেলের আংশিক বিকল্প মিলছে এবং বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগও কিছুটা কমছে।

তবে বাণিজ্য নিয়ে অন্তর্নিহিত উত্তেজনা এখনো তীব্র। মার্কিন গাড়ি, মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা শিল্পে অপরিহার্য বিরল মৃত্তিকা ধাতুর বৈশ্বিক উৎপাদনে চীনের আধিপত্য রয়েছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানিতে বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটিয়েছে। জবাবে ওয়াশিংটন চীনের অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা ও জোরপূর্বক শ্রমের চর্চা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। দুই পক্ষই অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের এমন হাতিয়ার হাতে রেখেছে, যা আলোচনা ভেস্তে গেলে সহজেই দর-কষাকষির উপকরণ থেকে সক্রিয় অস্ত্রে পরিণত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মূল ইস্যু তাইওয়ানের মর্যাদা

প্রকাশ্য আলোচনায় অর্থনৈতিক বিষয় প্রাধান্য পেলেও প্রকৃত সংকট তৈরি করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তাইওয়ান ইস্যুতে। শীর্ষ বৈঠকের আগে চীনা কর্মকর্তারা কথার চাপ বাড়িয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছেন, তাইওয়ান প্রশ্ন চীনের মূল স্বার্থের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তুলেছে। বেইজিং ব্যক্তিগতভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে, তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে না—এ কথা বলা থেকে সরে এসে ওয়াশিংটন যেন স্বাধীনতার বিরোধিতা করে, এমন ঘোষণানীতিতে পরিবর্তন চায়। কূটনৈতিক ভাষায় এটি সূক্ষ্ম হলেও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।

গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের জন্য ১১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করে। এর মধ্যে রয়েছে ৪২০টি আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম, ৮০টির বেশি হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম এবং দ্বীপটির অসমমিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের জন্য নকশা করা লয়টারিং মিউনিশন। খবর অনুযায়ী, কিছু সরঞ্জাম এখনো মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে আটকে আছে, যা বেইজিংয়ের জন্য দর-কষাকষির সম্ভাব্য হাতিয়ার তৈরি করেছে। চীনা বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ব্যস্ততার কারণে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ট্রাম্পের কৌশলগত মনোযোগ সরে যাওয়ায় তাইওয়ানের ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির প্রশাসন বড় শক্তিগুলোর দর-কষাকষির মুখে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর সঙ্গে এক ফোনালাপে চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই তাইওয়ানকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি ওয়াশিংটনকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান। ইরানে সহযোগিতার বিনিময়ে অস্ত্র বিক্রি কমানোর মতো বড় কোনো সমঝোতার চেষ্টা ট্রাম্প করতে পারেন—এ সম্ভাবনায় তাইপেইয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ক্ষয় হওয়া মার্কিন সামরিক মজুত পুনরায় পূরণ করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে—এ কথা তাইওয়ানের কর্মকর্তারা জানেন।

বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কূটনীতি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরেকটি বিরোধপূর্ণ ক্ষেত্র। সম্প্রতি হোয়াইট হাউস বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে শিল্পমাত্রায় মার্কিন এআই মডেল চুরির অভিযোগ তুলেছে। এদিকে ট্রাম্প রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার পরও চীনা নিয়ন্ত্রকেরা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এনভিডিয়ার এইচ২০০ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপ কেনা থেকে নিরুৎসাহিত করেছেন। এই বৈপরীত্য প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার জটিলতা তুলে ধরে: মার্কিন কোম্পানিগুলো চীনের ৫০ বিলিয়ন ডলারের এআই বাজারে প্রবেশাধিকার চায়, আর ওয়াশিংটন উন্নত কম্পিউটিং প্রযুক্তির সামরিক ব্যবহার ঠেকাতে বেইজিংয়ের সক্ষমতা কমানোর চেষ্টা করছে।

চীনের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত সম্ভাব্য দর-কষাকষির একটি হাতিয়ার হতে পারে। এতে প্রায় ১৪০ কোটি ব্যারেল তেল রয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে চাপে থাকা বৈশ্বিক জ্বালানির দাম কমাতে ট্রাম্প এ মজুত বাজারে ছাড়ার অনুরোধ করতে পারেন। বিনিময়ে শি এআই চিপ রপ্তানি ও উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন সরঞ্জামের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার দাবি জানাতে পারেন। সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের চীন-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল ক্লার্ক এই সম্ভাব্য বিনিময় বিশ্লেষণ করে বলেন:

আমরা চীনকে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি, আর এর সঙ্গে সামরিক সক্ষমতা উন্নত করার জন্য যা প্রয়োজন, ঠিক তা-ই দিয়ে দেব—সেটি হবে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

নির্দিষ্ট হার্ডওয়্যার নিয়ে বিরোধের বাইরেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে সুরক্ষা-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য দুই দেশের ওপর চাপ বাড়ছে। এআই-সমৃদ্ধ সাইবার হামলার সক্ষমতা এবং তুলনামূলক কম দক্ষ পক্ষের এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে নতুন ধরনের জৈব অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষকেরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। এআইয়ের অপব্যবহারের ঘটনা সম্পর্কে শীর্ষ বৈঠকে বাধ্যতামূলক নয় এমন নিরাপত্তা নির্দেশিকা বা সীমিত তথ্য বিনিময় চুক্তি হতে পারে। তবে প্রযুক্তির এই দুই পরাশক্তির মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

মানবাধিকার ও শীর্ষ বৈঠকের আনুষ্ঠানিকতা

মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিষয়, বিশেষ করে কারাবন্দী হংকংয়ের গণমাধ্যম ব্যবসায়ী জিমি লাইয়ের ঘটনা, কূটনৈতিক আলোচনায় নৈতিক জটিলতা যোগ করেছে। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি শির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে লাইয়ের বিষয়টি তুলবেন এবং চীনা নেতার জন্য একে সংবেদনশীল ইস্যু বলে উল্লেখ করেছেন। বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে লাই এখন ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তাঁর ছেলে বলেছেন, ৭৭ বছর বয়সী বাবার বয়স ও স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় এই সাজা মৃত্যুদণ্ডেরই শামিল। গত অক্টোবরে বুসানে বৈঠকের সময় ট্রাম্প লাইয়ের মুক্তির পক্ষে কথা বলেছিলেন। তবে বেইজিং ক্ষমা করার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।

ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোর আনুষ্ঠানিকতারও রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যেই বলেছেন, ইউনিফর্ম পরা রক্ষীদের কুচকাওয়াজসহ জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা এবং শির কাছ থেকে বড়সড় আলিঙ্গন পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি। তবে চীনা কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন, অতিরিক্ত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান এমন সময়ে বশ্যতা স্বীকারের ইঙ্গিত দিতে পারে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে নিরপেক্ষ শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চায় বেইজিং। বেইজিং বিমানবন্দরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সি-১৭ পরিবহন বিমান অবতরণের ছবি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। এতে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা দল ও যোগাযোগ সরঞ্জামের জন্য আগাম প্রস্তুতির ইঙ্গিত মিলেছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে যাওয়া ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলটি তাঁর ২০১৭ সালের সফরে যোগ দেওয়া প্রায় ৩০ জন প্রধান নির্বাহীর দলের চেয়ে ছোট বলে মনে হচ্ছে। সে সময় কোম্পানিগুলো ২৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের চুক্তি সই করেছিল। বর্তমান খবরে বলা হয়েছে, বোয়িং ও সিটিগ্রুপের প্রধান নির্বাহীদের পাশাপাশি এনভিডিয়া, অ্যাপল ও কোয়ালকমের প্রযুক্তি নেতারা সফরে থাকবেন। তবে হোয়াইট হাউস সতর্ক করেছে, আমন্ত্রণ চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রতিবেদনগুলো অনুমাননির্ভর।

বিজ্ঞাপন

সাফল্য বা ব্যর্থতার তিনটি সম্ভাব্য চিত্র

শীর্ষ বৈঠকের ফলাফল কী হতে পারে, তা নিয়ে বিশ্লেষকেরা তিনটি সম্ভাব্য গতিপথ তুলে ধরেছেন। প্রথমটি হলো বড় কোনো সমঝোতা: তাইওয়ানের মর্যাদা নিয়ে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং কিছু প্রযুক্তি শুল্ক শিথিল করার বিনিময়ে ট্রাম্প ইরানি তেল আমদানি ব্যাপকভাবে কমাতে ও তেহরানকে প্রকাশ্যে আলোচনায় চাপ দিতে শিকে রাজি করাবেন। দুই নেতাই এটিকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরবেন—ট্রাম্প শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী, আর শি বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকারী হিসেবে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞদের কাছে বেশি সম্ভাব্য মনে হওয়া দ্বিতীয় চিত্রটি হলো শীতল অচলাবস্থা, যেখানে বড় কোনো অগ্রগতি হবে না। চীন ধূসর বাজারের মাধ্যমে ইরানি তেল কেনা চালিয়ে যাবে, আর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখবে। উত্তেজনা না বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হবে। এতে মৌলিক বিরোধগুলোর মীমাংসা না করেই গত অক্টোবর থেকে চলে আসা অস্বস্তিকর শান্তি বজায় থাকবে।

তৃতীয় চিত্রটি হলো প্রকাশ্য তিক্ততায় শীর্ষ বৈঠক ভেস্তে যাওয়া এবং দুই দেশের ব্যাপক বিচ্ছিন্নতা। ট্রাম্প ইরানের রপ্তানির ওপর পূর্ণাঙ্গ নৌ অবরোধ কার্যকর করতে পারেন। জবাবে শি বিরল মৃত্তিকা ধাতু রপ্তানি সীমিত করতে এবং তাইওয়ানের কাছে সামরিক তৎপরতা বাড়াতে পারেন। এমন উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে, আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার সূচনা করতে পারে এবং নতুন স্নায়ুযুদ্ধের কাঠামোয় অন্য দেশগুলোকে পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত সাফল্য মাপা হবে ব্যাপক চুক্তি দিয়ে নয়; বরং ভুল হিসাব ঠেকাতে দুই নেতা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা-ব্যবস্থা কতটা গড়ে তুলতে পারেন, তা দিয়ে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সংঘাত ঠেকানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায় এখন প্রেসিডেন্ট পর্যায়ের যোগাযোগ। একবিংশ শতাব্দীর নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামো তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর নির্ভরশীল।

মূল বিষয়গুলো

  • ইরান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে পিছিয়ে যাওয়া শীর্ষ বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট শি ১৪ ও ১৫ মে বেইজিংয়ে মিলিত হবেন
  • ইরানি তেল কেনা কমানো এবং হরমুজ প্রণালি খুলতে চীনের সহযোগিতা চায় যুক্তরাষ্ট্র
  • ইরানি অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করা ‘টি-পট’ শোধনাগারগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে ব্লকিং রুলস প্রয়োগ করেছে চীন
  • কৃষিপণ্য কেনা এবং সম্ভাব্য ৫০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয় নিয়ে বাণিজ্য বোর্ড ব্যবস্থা আলোচনায় রয়েছে
  • তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন না করার অবস্থান থেকে সরে এসে স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে ওয়াশিংটনের নীতির ভাষা বদলাতে চায় বেইজিং
  • এআই প্রযুক্তিতে বিধিনিষেধ শিথিলের বিনিময়ে চীনের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত ছাড়তে ট্রাম্প অনুরোধ করতে পারেন
  • হংকংয়ের গণমাধ্যম ব্যবসায়ী জিমি লাইয়ের ঘটনা-সহ মানবাধিকার বিষয়গুলো বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি আলোচ্যসূচিতে রয়েছে
  • বিশ্লেষকদের ধারণা, বড় কোনো অগ্রগতির বদলে অক্টোবরে হওয়া বাণিজ্যবিরতি বাড়ানোয় সীমিত ফল মিলতে পারে
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে