পরিষ্কার আকাশ থেকে জলবায়ুর এক প্যারাডক্স
বায়ুদূষণ নাটকীয়ভাবে কমানো চীনের ইতিহাসের অন্যতম সফল পরিবেশগত উদ্যোগ। ২০১৩ সাল থেকে দেশটি সালফেট অ্যারোসলের নিঃসরণ প্রায় ৭৫% কমিয়েছে, ধোঁয়াশায় ঢেকে থাকা নগরদৃশ্যকে করেছে অনেক বেশি স্বচ্ছ। কিন্তু এই সাফল্যের জলবায়ুগত এক অপ্রত্যাশিত মূল্য রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন নিশ্চিত করেছেন, শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতা থেকে লাখো চীনা নাগরিককে রক্ষা করা দূষণ কমানোর এই উদ্যোগ বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরন বদলে দিয়েছে। এতে উষ্ণায়নের গতি বেড়েছে, একই সঙ্গে ধ্বংসাত্মক ঝড় থেকে আর্কটিকের সামুদ্রিক বরফও রক্ষা পেয়েছে।
সূচিপত্র
এই ঘটনার জটিলতা পৃথিবীর জলবায়ুব্যবস্থার ভেতরের সূক্ষ্ম আন্তঃসম্পর্কগুলো তুলে ধরে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে তৈরি অতি ক্ষুদ্র কণা অ্যারোসল সূর্যালোক প্রতিফলিত করে এবং মেঘ গঠনে পরিবর্তন এনে পৃথিবীর জন্য ছাতার মতো কাজ করে। চীনের শহরগুলোতে এসব কণা গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরি করলেও, এগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমিয়েছিল এবং প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে শীতকালীন ঝড়ের গতিপথেও প্রভাব ফেলেছিল। অ্যারোসলের পরিমাণ কমে যাওয়ায় গ্রিনহাউস গ্যাসের উষ্ণায়নের পুরো প্রভাব প্রকাশ পাচ্ছে। গবেষকেরা একে বলেন উষ্ণায়নের ‘মুখোশ উন্মোচন’ প্রভাব।
নরওয়ের সিআইসিইআরও সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ গবেষক বিয়র্ন সামসেট এই পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত আপসের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।
চীনের মানুষ কয়েক দশক ধরে খারাপ বায়ুমানের ভোগান্তি পোহেছেন," তিনি বলেন। "এই দূষণ সাময়িকভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি কমিয়েছিল এবং উষ্ণ জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে আমাদের বাকিদের একটু বেশি সময় দিয়েছিল। এখন যা ঘটছে তা হলো, গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে সৃষ্ট উষ্ণায়নের পুরো প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি, যার মুখোমুখি আমাদের শেষ পর্যন্ত হতেই হতো।
২০১৯ সালের বেরিং সাগর সংকট
২০১৯ সালের শুরুতে বরফের বিপর্যয়কর ক্ষয়ের এক ঘটনার সময় বিজ্ঞানীরা প্রথম বায়ুমণ্ডলীয় এই পরিবর্তন শনাক্ত করেন। ওই বছরের জানুয়ারির শেষ দিকে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর বায়ুপ্রবাহের ধরনে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে পরপর পাঁচটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দ্রুত বেরিং সাগরের দিকে ধেয়ে যায়। প্রতিটি ঝড় বরফের ওপর দিয়ে উষ্ণ দক্ষিণা বাতাস বইয়ে বরফ ভেঙে দেয় এবং উত্তর দিকে ঠেলে দেয়। উত্তর বেরিং সাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২১.৬ থেকে ২৮.৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি হয়ে যায়।
মার্চের শুরুতে স্যাটেলাইটের পরিমাপে দেখা যায়, বরফের আচ্ছাদন ৮২% কমে গেছে, অর্থাৎ প্রায় ১,৫৪,৪৪০ বর্গমাইল এলাকা থেকে বরফ সরে গেছে। বছরের ওই সময়ে স্যাটেলাইটে নথিভুক্ত হওয়া সবচেয়ে বড় পতন ছিল এটি। ওই শীতে কেন এত তীব্র ঝড় আর্কটিক অঞ্চলকে লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছিল, কিংবা চীনের বায়ুমান উন্নত হওয়ার পরের বছরগুলোতে কেন একই ধরনের ঘটনা কমে গিয়েছিল, তা ব্যাখ্যা করতে গবেষকেরা হিমশিম খাচ্ছিলেন।
শিল্পদূষণের কুয়াশা কীভাবে ঝড়ের গতিপথ বদলেছে
উত্তরটি নিহিত রয়েছে মধ্য-অক্ষাংশীয় ঘূর্ণিঝড়ের জটিল কার্যপ্রণালিতে। কমার মতো পাকানো আকৃতির এই ঝড়গুলো উত্তর গোলার্ধের শীতকালীন আবহাওয়ার বড় অংশ তৈরি করে। এগুলো তাপ ইঞ্জিনের মতো কাজ করে: সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছে বাষ্পীভূত হওয়া উষ্ণ, আর্দ্র বাতাস থেকে শক্তি টেনে নেয়। সেই বাতাস ওপরে উঠে মেঘে ঘনীভূত হয়। অ্যারোসল সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উপায়ে এই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনে।
স্বাভাবিক অবস্থায় জলীয় বাষ্প বাতাসে ভাসমান সীমিতসংখ্যক কণাকে ঘিরে ঘনীভূত হয়ে বড় ফোঁটা তৈরি করে, যা ঝড়ের দক্ষিণ প্রান্তে বৃষ্টি হিসেবে ঝরে পড়ে। কিন্তু বাতাসে অ্যারোসলের ঘনত্ব বেশি হলে প্রতিটি কণা মেঘের ফোঁটা তৈরির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এতে অনেক ছোট ছোট ফোঁটা তৈরি হয়, যেগুলো একত্র হয়ে বৃষ্টির ফোঁটা হতে চায় না। ঝড়ের দক্ষিণ প্রান্তে বৃষ্টিপাত কমে যায়, ফলে আর্দ্রতা ঝড়ের ‘কনভেয়ার বেল্ট’ ধরে আরও দূরে উত্তর-পূর্ব প্রান্তের দিকে যেতে পারে। সেখানে এটি ঠিক এমন অবস্থানে তাপ ছাড়ে, যা পুরো ঝড়ব্যবস্থাকে মেরুর দিকে ঠেলে দেয়।
প্রধান লেখক দিয়ানবিন কাও চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব টিবেটান প্লেটো রিসার্চের একজন গবেষক। তিনি চার দশকের পর্যবেক্ষণ-তথ্যের সঙ্গে জলবায়ু মডেলের সিমুলেশন মিলিয়ে এই সম্পর্কগুলো পরীক্ষা করেন। ২০০০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অ্যারোসলের মাত্রা বেশি থাকা ১৪ বছরের সঙ্গে আগের কয়েক দশকের অ্যারোসলের মাত্রা কম থাকা ১৫ বছরের তুলনা করে গবেষক দলটি দেখতে পায়, ঝড়গুলো মিলিয়ে যাওয়ার সময় পর্যন্ত তাদের গতিপথ ১.২৩ ডিগ্রি পর্যন্ত উত্তর দিকে সরে গিয়েছিল। দূষণ বেশি থাকা সময়ে এর ফলে আর্কটিকে প্রবেশ করা ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটেছিল।
ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক বরফের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাকারী ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবার আর্কটিক জলবায়ুবিজ্ঞানী অ্যালেক্স ক্রফোর্ড গবেষণাটির পর্যালোচনা করেছেন।
অ্যারোসলের কারণে ঝড়ব্যবস্থার ওপর এই ধাক্কা আমার ধারণার চেয়ে বেশি শক্তিশালী," তিনি বলেন। "অ্যারোসল কীভাবে বহিঃক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ে প্রভাব ফেলতে পারে, সেই প্রক্রিয়াটি তাঁরা খুব ভালোভাবে দেখিয়েছেন।
স্থানীয় নিঃসরণ থেকে বৈশ্বিক প্রভাব
চীনের নিঃসরণ কমানোর প্রভাব আর্কটিকের অনেক বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, পূর্ব এশিয়ায় অ্যারোসল কমে যাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ায় খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে ব্যাপক সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ তৈরি হয়েছে এবং আটলান্টিকে সমুদ্রের তাপমাত্রায় রেকর্ড উচ্চ অস্বাভাবিকতা দেখা দিয়েছে।
"দ্য ব্লব" নামে পরিচিত প্রশান্ত মহাসাগরের কুখ্যাত সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ এই দূরবর্তী প্রভাবের উদাহরণ। ২০১৩ সালে শুরু হয়ে কানাডার সমান আয়তনের এলাকাজুড়ে তিন বছর স্থায়ী এই উষ্ণ জলরাশি মাছের মজুত ধ্বংস করেছে, সামুদ্রিক পাখিদের খাদ্যসংকটে ফেলেছে, বিষাক্ত শৈবাল প্রস্ফুটন ঘটিয়েছে এবং তিমিদের জাহাজ চলাচলের পথে ঠেলে দিয়েছে। সম্প্রতি পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এই আকস্মিক উষ্ণতার পুরো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। নতুন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আগে সৌর বিকিরণ মহাশূন্যে প্রতিফলিত করে ফেরত পাঠানো অ্যারোসলের আবরণ সরিয়ে দিয়ে চীনের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অ্যারোসলের মাত্রা কমে গেলে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের মধ্যে তাপমাত্রা ও বায়ুচাপের পার্থক্য বদলে যায়। এতে এশিয়া থেকে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের দিকে বায়ুপ্রবাহ বেড়ে যায়। ফলে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরীয় উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য বায়ু শক্তিশালী হয়, যা অস্ট্রেলিয়ার ওপর আর্দ্রতার অপসারণ ঘটায়। এর ফলে সৃষ্ট শুষ্ক ও উষ্ণ পরিস্থিতি দাবানলের মৌসুমে আগুনের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। পৃষ্ঠের বেশি শক্তি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে শীতলতায় কাজে না লেগে সংবেদী তাপে রূপান্তরিত হচ্ছে।
একইভাবে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উত্তর আটলান্টিকে নজিরবিহীন উষ্ণতা দেখা দেয়, যা মাছকে আর্কটিকের পানির দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। গবেষণায় বলা হয়েছে, জাহাজ থেকে সালফার নিঃসরণ কমানোর আন্তর্জাতিক বিধিমালার কারণে এই সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। আগে জাহাজগুলো সালফার ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করত, যা সমুদ্রপথের ওপর প্রতিফলক মেঘ তৈরি করত। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির নতুন মানদণ্ডে এই শীতলকারী প্রভাব দূর হয়েছে, ফলে সৌর বিকিরণ সরাসরি সমুদ্রপৃষ্ঠের পানিকে উষ্ণ করতে পারছে।
উন্মোচিত উষ্ণায়ন
চীনে অ্যারোসল কমায় আর্কটিক কিছু ঘূর্ণিঝড়জনিত ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রেহাই পেতে পারে, তবে সামগ্রিক জলবায়ুগত প্রভাব উষ্ণায়নের গতি বাড়ানোর দিকেই যাচ্ছে। অ্যারোসল শীতলকারী প্রভাব তৈরি করে, যা গ্রিনহাউস গ্যাসের উষ্ণায়নকে আংশিকভাবে প্রশমিত করে। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তসরকার প্যানেলের হিসাবে, গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে বর্তমানে প্রায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়ন ঘটছে, যার ০.৪ ডিগ্রি অ্যারোসলের প্রতিফলনের আড়ালে রয়েছে। এই কণার ছায়া না থাকলে, প্যারিস চুক্তিতে বিপজ্জনক জলবায়ু পরিবর্তনের সীমা হিসেবে নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রির সীমা পৃথিবী ইতিমধ্যেই অতিক্রম করে ফেলত।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ল্যামন্ট-ডোহার্টি আর্থ অবজারভেটরির বায়ুমণ্ডলবিজ্ঞানী ড্যান ওয়েস্টারভেল্ট মনে করেন, ঝড়ের গতিপথের পরিবর্তনের চেয়ে উষ্ণায়নের প্রভাব শেষ পর্যন্ত বেশি প্রাধান্য পাবে।
উষ্ণায়নের মুখোশ উন্মোচনের প্রভাব সম্ভবত বেশি হবে, কারণ তা দীর্ঘস্থায়ী এবং সব ঋতুতেই ঘটতে পারে; অন্যদিকে, ঝড়ের গতিপথের পরিবর্তন সম্ভবত অনিয়মিত," তিনি ব্যাখ্যা করেন। "পূর্ব এশিয়ায় অ্যারোসল কমার গতি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে নিঃসরণ কমাতে যে কাজ করতে তিন দশক লেগেছে, পূর্ব এশিয়ায় তা হচ্ছে এক দশকে।
এই দ্রুত পরিবর্তনের অর্থ, উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন অঞ্চলে একই সময়ে উষ্ণায়নের প্রভাব বাড়ছে। চীনা গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সাল নাগাদ অ্যারোসল কমে যাওয়ায় পূর্ব চীনে বিদ্যমান গ্রিনহাউস উষ্ণায়নের প্রবণতা ইতিমধ্যেই ০.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে এই অতিরিক্ত উষ্ণতা ০.২ থেকে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। পরিবহন খাতেও দূষণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়লে ২০৬০ সালের মধ্যে তা ০.৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
প্রস্তাবিত পদক্ষেপ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
পরিচ্ছন্ন বাতাস বজায় রেখে তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের এই সংকটের মুখে কিছু গবেষক সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে সামুদ্রিক মেঘের উজ্জ্বলতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। এই ভূপ্রকৌশল কৌশলে সমুদ্রের নিচু স্তরের মেঘে সামুদ্রিক লবণের অ্যারোসল ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে মেঘের প্রতিফলনক্ষমতা বাড়ে। সিমুলেশনে দেখা গেছে, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর সতর্কতার সঙ্গে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করলে মানবসৃষ্ট অ্যারোসল কমানোর ফলে উন্মোচিত উষ্ণায়ন প্রশমিত করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এ ধরনের পদক্ষেপের নিজস্ব ঝুঁকিও আছে। জলবায়ু মডেল বলছে, সামুদ্রিক মেঘের উজ্জ্বলতা বাড়ালে অসম শীতলতার ধরন তৈরি হতে পারে। এতে আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন দ্রুততর হতে পারে, আর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের তাপমাত্রা পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। এই কৌশলে লা নিনার মতো বৃষ্টিপাতের ধরনও তৈরি হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এতে মেরিটাইম কন্টিনেন্ট ও অস্ট্রেলিয়ার আশপাশে বৃষ্টি বাড়ে, আর মধ্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রে বৃষ্টি কমে।
বিকল্প পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে মিথেন নিঃসরণ কমানো। কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় মিথেন বায়ুমণ্ডলে মাত্র প্রায় এক দশক থাকে; কার্বন ডাই-অক্সাইড সেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকে। মিথেনের উষ্ণায়নকারী প্রভাব বর্তমানে অবশিষ্ট অ্যারোসলের শীতলকারী প্রভাবের প্রায় সমান। তাই দ্রুত মিথেন নিঃসরণ বন্ধ করতে পারলে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের ফলে উন্মোচিত উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে সাময়িক সুরক্ষা পাওয়া যেতে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাসের কূপ ও পাইপলাইন থেকে গ্যাস ছাড়া বন্ধ করা কম খরচের একটি পদক্ষেপ।
আর্কটিকের বাতাস ও ভবিষ্যৎ জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি
আর্কটিক অঞ্চলের উষ্ণায়ন অব্যাহত থাকায় সেখানকার ভৌত পরিবেশও বদলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৬০-এর দশক থেকে আর্কটিক মহাসাগরজুড়ে ভূপৃষ্ঠ-সংলগ্ন বাতাসের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; এর সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি ঘটেছে প্রান্তিক সমুদ্রগুলোতে। হিমবাহ ও সামুদ্রিক বরফ গলে ভূপৃষ্ঠের খসখসে ভাব কমে যাওয়া এবং ঊর্ধ্বমুখী তাপপ্রবাহের কারণে বায়ুমণ্ডলের স্থিতিশীলতা হ্রাস পাওয়ায় বাতাসের গতি বাড়ছে।
বাতাসের এই পরিবর্তন আর্কটিক পেরিয়ে জাহাজ চলাচলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বরফ সরে কারা সাগর ও বিউফোর্ট সাগর দিয়ে নতুন নৌপথ খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী বাতাস বড় ঢেউ তৈরি করবে এবং উপকূলীয় ক্ষয় বাড়াবে। উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতির পূর্বাভাস অনুযায়ী, শতাব্দীর শেষ নাগাদ আর্কটিক অঞ্চলে বাতাসের গতি প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ০.৩ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। সমুদ্র এলাকায় এই বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হলেও স্থলভাগে পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে কম হবে।
ঝড়ের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বাতাসের গতি বেড়ে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাব বরফ গঠন ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করছে। কিছু বছরে ঘূর্ণিঝড় কম হলে বরফ যান্ত্রিকভাবে ভাঙার ঘটনা কমতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণায়ন ও বাতাসের গতি বৃদ্ধি বড় ঝড় না থাকলেও বরফ পুনরুদ্ধারে বাধা দিতে পারে। এই বিপরীতমুখী শক্তিগুলোর পরিবর্তন অব্যাহত থাকায় আর্কটিকের সামুদ্রিক বরফের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
মূল কথা
- ২০১৩ সাল থেকে চীনে সালফেট অ্যারোসলের নিঃসরণ ৭৫% কমায় উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে ঝড়ের গতিপথ বদলেছে; এতে আর্কটিকে পৌঁছানো এবং সামুদ্রিক বরফ ধ্বংস করা ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা কমেছে।
- একই দূষণ নিয়ন্ত্রণের ফলে আগে সূর্যালোক প্রতিফলিত করা অ্যারোসল কণা সরে গিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি বেড়েছে; এতে কয়েক দশক ধরে চাপা থাকা গ্রিনহাউস গ্যাসের উষ্ণায়ন উন্মোচিত হয়েছে।
- অ্যারোসল কমায় অস্ট্রেলিয়ায় খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ তৈরি হয়েছে এবং উত্তর আটলান্টিক উষ্ণ হয়েছে।
- গবেষণায় বলা হয়েছে, অ্যারোসলের শীতলকারী প্রভাব না থাকলে প্যারিস চুক্তির অধীনে নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের সীমা পৃথিবী ইতিমধ্যেই অতিক্রম করে ফেলত।
- প্রয়োজনীয় বায়ুমান উন্নয়নের ফলে সৃষ্ট উষ্ণায়ন মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা সামুদ্রিক মেঘের উজ্জ্বলতা বাড়ানো বা মিথেন নিঃসরণ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।
- ভূপৃষ্ঠের খসখসে ভাব ও বায়ুমণ্ডলের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ায় ১৯৬০-এর দশক থেকে আর্কটিকের ভূপৃষ্ঠ-সংলগ্ন বাতাসের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।






