কার্বন তীব্রতা নিয়ে সমঝোতা
নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি শতাংশ, যা বিশ্বজুড়ে জলবায়ু বিশ্লেষকদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির প্রতি একক উৎপাদনে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ১৭ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার করেছে বেইজিং। আগের পরিকল্পনার ১৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি কিছুটা কম। এই সামান্য হ্রাস চীনের জলবায়ু নীতিতে আরও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনকে আড়াল করছে।
সূচিপত্র
অর্থনীতির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ হবে—এমন পূর্বাভাস ধরে নিলে, এ লক্ষ্যমাত্রায় আগামী পাঁচ বছরে চীনের মোট নির্গমন ৩ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সুযোগ থাকছে। এই গতিপথ ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০৫ সালের তুলনায় কার্বন তীব্রতা ৬৫ শতাংশ কমানোর জন্য প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ২০২১ সালের অঙ্গীকারের চেয়ে পিছিয়ে। প্যারিস চুক্তির আওতায় এই অঙ্গীকার করা হয়েছিল।
মূল্যায়ন আরও জটিল করেছে পরিকল্পনা প্রকাশের ঠিক আগে কার্বন তীব্রতা হিসাবের পদ্ধতিতে চীনা কর্তৃপক্ষের সংশোধন। নতুন সংজ্ঞায় প্রচলিত জ্বালানি খাতের নির্গমনের পাশাপাশি সিমেন্ট ও রাসায়নিক শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়াজনিত নির্গমনও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগত সমন্বয়ের ফলে বেইজিং আগের পরিকল্পনা চলাকালে ১৭.৭ শতাংশ হ্রাসের দাবি করতে পেরেছে, যদিও আগের তথ্য অনুযায়ী হ্রাস ছিল মাত্র ১২.৪ শতাংশ।
এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার গবেষণা কেন্দ্রের (সিআরইএ) প্রধান বিশ্লেষক লরি মিলিভির্তা ব্যাখ্যা করেন, আগের পদ্ধতি বহাল থাকলে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে চীনকে কার্বন তীব্রতা ২৩ শতাংশ কমাতে হতো। এর বদলে নতুন কাঠামো নির্গমন বাড়তে থাকার সুযোগ দিচ্ছে।
সহজ কথায়, গত ২০, ১০, এমনকি পাঁচ বছরেও চীন উন্নয়ন ও নির্গমনের মধ্যে সংঘাতের মুখে পড়েছে: নির্গমন খুব কঠোরভাবে কমালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কার্বন তীব্রতার লক্ষ্যমাত্রাটি ছিল একটি সমঝোতা।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের চায়না ক্লাইমেট হাবের পরিচালক লি শুও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে বেইজিংয়ের ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টার এই মূল্যায়ন দিয়েছেন।
কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে জ্বালানি নিরাপত্তা
জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা শিথিল করার পেছনে রয়েছে আরও জরুরি এক প্রেরণা, যা চীনের জ্বালানি নীতিকে নতুন রূপ দিচ্ছে: আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো। দেশটি তার অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি করে। এর উল্লেখযোগ্য অংশ আসে ইরান ও ভেনেজুয়েলা থেকে—যেসব অঞ্চল সম্প্রতি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টিকারী সংঘাতসহ বৈশ্বিক তেলের বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতা চীনের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। বিদ্যুতায়ন ও দেশের ভেতরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে রূপান্তর ত্বরান্বিত করে এসব ঝুঁকি মোকাবিলার কথা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
গ্রিনপিস ইস্ট এশিয়ার বৈশ্বিক নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ইয়াও ঝে পরিকল্পনায় সবুজ জ্বালানির ওপর জোর দেওয়ার সঙ্গে এসব নিরাপত্তা উদ্বেগের সরাসরি যোগসূত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সবুজ জ্বালানির ওপর জোর দেওয়া আমদানি করা তেলের ওপর নির্ভরতা আরও কমানোর চীনের ইচ্ছার ইঙ্গিত দেয়।
ক্লাইমেট এনার্জি ফাইন্যান্সের পরিচালক টিম বাকলি বলেন, প্রচলিত সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে চীনসহ দেশগুলোর জ্বালানি স্বনির্ভরতায় মনোযোগ দেওয়া যুক্তিসংগত। জলবায়ু নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পনায় কয়লার সক্ষমতা বজায় রাখার কারণ এই নিরাপত্তাগত প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় জীবাশ্ম জ্বালানির মজুতকে স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ ও তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ থেকে কার্বন নির্গমনের তীব্রতা ও মোট পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার যে বড় নীতিগত পরিবর্তন ‘দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ রূপান্তর’ নামে পরিচিত, নথিতে সেটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। কাঠামোতে মোট নির্গমনের সর্বোচ্চ সীমার উল্লেখ থাকলেও এর বাস্তবায়ন পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৭ সাল থেকে জাতীয় কার্বন বাজারের আওতায় থাকা নির্দিষ্ট খাতগুলোর জন্যই সম্ভবত বাধ্যতামূলক সীমা চালু হবে।
অভূতপূর্ব মাত্রায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার
নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা শিথিল করা হলেও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ধরে রাখতে চায় চীন। শুধু ২০২৫ সালেই দেশটি ৪৪৬ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা স্থাপন করেছে, যা বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সম্মিলিত সংযোজনের চেয়েও বেশি। নতুন পরিকল্পনায় ২০৩৫ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানিবহির্ভূত সক্ষমতা দ্বিগুণ করে ৩,৬০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে সমুদ্র উপকূলের বাইরে বায়ুবিদ্যুৎ সক্ষমতা ১০০ গিগাওয়াটের বেশি করা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ ১১০ গিগাওয়াটে উন্নীত করা এবং ১০০ গিগাওয়াট পাম্পড হাইড্রো সংরক্ষণ সক্ষমতা নির্মাণ। স্টেট গ্রিড করপোরেশন পরিকল্পনাকালে ৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বিনিয়োগের কথা জানিয়েছে। এর আওতায় অতি উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে, যার মাধ্যমে পশ্চিমাঞ্চলের উৎপাদন কেন্দ্র থেকে পূর্বাঞ্চলের চাহিদা কেন্দ্রগুলোতে ৪২০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ পাঠানো যাবে।
পরিকল্পনায় উত্তরের মরু অঞ্চলের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে উপকূলীয় শিল্প উৎপাদন কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করার সমন্বিত নেটওয়ার্কের রূপরেখা রয়েছে। পাশাপাশি প্রাদেশিক বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। আবহাওয়ার সঙ্গে উৎপাদন ওঠানামা করলেও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা—নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থার প্রধান চ্যালেঞ্জ—এই অবকাঠামো তা মোকাবিলা করবে।
তবে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জ্বালানি রূপান্তর গবেষক জোরিত গোজেন্স উল্লেখ করেছেন, সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের জন্য বছরে প্রায় ১৮০ গিগাওয়াট স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা গত তিন বছরে চীনের অর্জিত হারের প্রায় অর্ধেক। এর ইঙ্গিত, বেইজিং এসব খাতকে পরিণত শিল্প হিসেবে দেখছে, যেখানে আরও প্রণোদনার বদলে একীভূতকরণ প্রয়োজন।
লি শুও এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, অতিরিক্ত বিনিয়োগ বা সক্ষমতার আধিক্যের কারণে এসব খাতে ইতিমধ্যেই উত্তাপ বেড়েছে। উন্নয়ন চলবে, তবে এসব শিল্প পরিণত হওয়ায় অতিরিক্ত নীতিগত সহায়তার প্রস্তাব নেই।
কয়লার অব্যাহত আধিপত্য
কয়লা নিয়ে পরিকল্পনার অবস্থান জলবায়ু উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যকার টানাপোড়েন তুলে ধরে। কয়লা ও তেলের ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগের কথা বলা হলেও, এ সময়ের মধ্যে ধীরে ধীরে কয়লার ব্যবহার কমানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট শির আগের অঙ্গীকার থেকে পরিকল্পনায় সরে আসা হয়েছে। মোট ব্যবহার নিয়ে বাধ্যতামূলক কোনো সীমা কিংবা বিদ্যুৎ খাতের নির্গমন কখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমাও নেই।
২০২৫ সালে চীন ৩.১৭ বিলিয়ন টন কয়লা ব্যবহার করেছে। পরিকল্পনায় বছরে মাত্র ৩০ মিলিয়ন টন কয়লার বদলে পরিচ্ছন্ন বিকল্প ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে, যা ১ শতাংশেরও কম হ্রাস। এদিকে কর্তৃপক্ষ প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ হারে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অনুমোদন দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৩৩০ গিগাওয়াট সক্ষমতার প্রকল্প উন্নয়নাধীন।
তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্দেশ্যে কয়লাকে তরল জ্বালানি ও রাসায়নিক পদার্থে রূপান্তরের পক্ষে পরিকল্পনায় সমর্থন দেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় নির্গমন অনেক বেশি। ড. গোজেন্স কয়লা থেকে রাসায়নিক উৎপাদনের এই খাতকে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, অর্থনীতির তুলনামূলক ছোট হলেও অত্যন্ত দূষণকারী এই খাত কয়লা খননের চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
কর্মকর্তারা ক্রমেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বেসলোড বিদ্যুৎ উৎপাদনের বদলে গ্রিডের স্থিতিশীলতা রক্ষার মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। পরিকল্পনায় বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোতে বায়োমাস বা সবুজ অ্যামোনিয়ার সঙ্গে কয়লা পোড়ানোর সক্ষমতা যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে কেন্দ্রগুলো সারাক্ষণ চালানোর বদলে চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে নমনীয়ভাবে চালানো যেতে পারে।
অগ্রবর্তী প্রযুক্তি ও শিল্প রূপান্তর
প্রতিষ্ঠিত সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ শিল্পের বাইরেও পরিকল্পনায় সবুজ হাইড্রোজেন, নিউক্লিয়ার ফিউশন ও কেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎসহ উদীয়মান প্রযুক্তির দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুতায়ন কঠিন এমন পরিবহন ও শিল্প খাতের জন্য সবুজ হাইড্রোজেনের সরবরাহব্যবস্থা অ্যামোনিয়া, মিথানল ও টেকসই বিমান জ্বালানিতে সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উদ্যোগটির আওতায় প্রায় ১০০টি শূন্য-কার্বন শিল্পপার্ক এবং ১০ হাজার কিলোমিটার শূন্য-কার্বন পরিবহন করিডর গড়ে তোলা হবে। এসব অঞ্চলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সরাসরি ব্যবহারকে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে জ্বালানি-নিবিড় উৎপাদনে কাজে লাগানো হবে। এখন থেকে সব নতুন স্থায়ী সম্পদ বিনিয়োগ প্রকল্পকে অনুমোদন পাওয়ার আগে জ্বালানি সংরক্ষণ ও কার্বন নির্গমনবিষয়ক কঠোর মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে নতুন গাড়ি বিক্রির ৫০ শতাংশের বেশি ছিল ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস, ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ৮০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। পেট্রোকেমিক্যাল খাতের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও এতে প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত তেলের চাহিদা কমতে পারে।
পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির প্রধান বৈশ্বিক সরবরাহকারী হিসেবে চীন তার অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশ্বের সৌর উপকরণের ৮০ শতাংশ এবং লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও বায়ু টারবাইনের ৭০ শতাংশ দেশটি উৎপাদন করে। সরকারি গণমাধ্যমের তথ্যমতে, গত এক দশকে এই শিল্পের ব্যাপক উৎপাদনের ফলে বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুতের খরচ ৮০ শতাংশের বেশি এবং বায়ুবিদ্যুতের খরচ ৬০ শতাংশ কমেছে।
গবেষণা ও উন্নয়ন, উৎপাদন, সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তির উন্নয়নে চীনের বিপুল বিনিয়োগের ফলে জ্বালানি ব্যবস্থার সম্ভাবনায় অসাধারণ পরিবর্তন আমরা দেখেছি। তবে আমার মনে হয়, এখনো আসল পরিবর্তন দেখা বাকি।
টিম বাকলির পূর্বাভাস, এই পরিকল্পনা চলাকালে চীনা গবেষণাগার থেকে নতুন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি বেরিয়ে আসবে, যা অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য আমদানিকারক দেশ দেখতে পাবে।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধির ধারা
সম্পত্তি খাতের মন্দা, জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং সীমিত অভ্যন্তরীণ ভোগসহ কাঠামোগত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি এসেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। উন্নয়নের পরিমাপে পরিমাণের বদলে গুণগত মানের দিকে ঝোঁকের প্রতিফলন এটি।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাত এখন চীনের অর্থনীতির ১১.৪ শতাংশ। ২০২৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধির এক-তৃতীয়াংশের বেশি এসেছে এ খাত থেকে। এই সম্প্রসারণ না হলে চীন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি পূরণ করতে পারত না। এতে বোঝা যায়, সবুজ রূপান্তর কেবল পরিবেশগত সংযোজন নয়, বরং অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
তবে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি কার্বনমুক্তকরণের প্রচেষ্টাকে জটিল করছে। টানা পাঁচ বছর ধরে জিডিপির চেয়ে দ্রুত হারে বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়েছে; ২০২৫ সালে তা ১০ ট্রিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায়। সাম্প্রতিক চাহিদা বৃদ্ধির ১০ শতাংশের বেশি এসেছে অপ্রত্যাশিত কিছু উৎস থেকে, যার মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টার এবং সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির উৎপাদনকেন্দ্র।
সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমির উপপরিচালক তেং ফেই সতর্ক করেছেন, বিদ্যুতের চাহিদা বছরে ৫ শতাংশ হারে বাড়তে থাকলে, আর নবায়নযোগ্য উৎপাদন বর্তমান হারে বাড়লেও প্রায় ২০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা অতিরিক্ত সরবরাহের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উৎপাদন প্রয়োজন হবে। তাঁর মতে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ বছরে চাহিদা বৃদ্ধির হার ৪ শতাংশের নিচে রাখা।
বৈশ্বিক প্রভাব ও বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি
বৈশ্বিক জলবায়ু প্রচেষ্টায় চীনের জ্বালানি কৌশলের প্রভাব অনেক বেশি, কারণ বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৩০ শতাংশের জন্য দেশটি দায়ী। বিশ্বের বায়ুবিদ্যুৎ সরঞ্জামের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং ফটোভোলটাইক উপকরণের ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে চীন। ফলে অন্য দেশগুলোর কার্বনমুক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থার ওপর দেশটির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
এই আধিপত্য পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের জন্য দ্বিধা তৈরি করেছে। তাঁরা একদিকে কার্বনমুক্তকরণের সময়সীমা মেনে চলতে চান, অন্যদিকে চীনা উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা কমানোরও চেষ্টা করছেন। ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল ডিকার্বনাইজেশন প্রগ্রেসের বিশ্লেষণ বলছে, চীনের তুলনাহীন উৎপাদনমাত্রা ও সমন্বিত ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে চীনা পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা প্রশ্নবিদ্ধ অর্থনৈতিক অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার কাঠামোর মাধ্যমে সাশ্রয়ী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি সরবরাহ করাসহ বৈশ্বিক জনকল্যাণে ভূমিকা রাখার দেশ হিসেবে চীনকে পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই কূটনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সবুজ উন্নয়ন করিডরগুলোর সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকছে।
কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফ নেডোপিল ওয়াং বলেন, বাণিজ্য বাধা সামাল দেওয়া সম্ভব হলে চীনের স্বল্পমূল্যের প্রযুক্তি রপ্তানি থেকে অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো লাভবান হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে তেলের সরবরাহে ধাক্কা সামাল দেওয়ার উপযোগী অর্থনীতি গড়ে তুললে ভূরাজনৈতিক ওঠানামা যা-ই হোক, ঝুঁকি কমে।
এরপর কী
পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উচ্চপর্যায়ের নীতিগত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বিস্তারিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ২০২৭ সালে প্রত্যাশিত খাতভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আসবে। এসব নথিতে জ্বালানি খাত, বিদ্যুৎ গ্রিড, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার, পারমাণবিক উন্নয়ন ও কার্বন নির্গমন ব্যবস্থাপনা নিয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও বিনিয়োগ বরাদ্দ থাকবে।
চীনের নির্গমন ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে জ্বালানিসংশ্লিষ্ট কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ২১ মাস ধরে স্থিতিশীল রয়েছে বা কমেছে। নির্মাণকাজ কমে যাওয়া ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংযুক্তির ফলে কাঠামোগতভাবে নির্গমন একটি সমতল পর্যায়ে পৌঁছানোর ইঙ্গিত এটি। তবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত মোট নির্গমনের সর্বোচ্চ সীমা না থাকায় অনিশ্চয়তা রয়েছে: আরও গভীর হ্রাসের আগে উচ্চতর ভিত্তি তৈরি করতে বেইজিং প্রথম কয়েক বছরে নির্গমন আবার বাড়তে দিতে পারে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
২০২৭ সাল থেকে জাতীয় কার্বন বাজারের আওতায় থাকা নির্দিষ্ট শিল্প খাতের জন্য মোট নির্গমনের সর্বোচ্চ সীমা চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পরিকল্পনা। পরে তা পুরো অর্থনীতিতে আরও বিস্তৃত হতে পারে। এসব ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা—এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলতে হবে চীনকে।
বিশ্বের সর্বোচ্চ নির্গমনকারী দেশটি শিল্পে আধিপত্য বজায় রেখেও নির্গমনের রেখাকে নিম্নমুখী করতে পারে কি না, এই দশকে বৈশ্বিক জলবায়ু নীতির জন্য সেটিই মূল প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত হ্রাস ঘটাতে কঠোর নির্গমনসীমার বদলে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ওপর বেইজিংয়ের বাজি কতটা কার্যকর হয়, তা আগামী বছরগুলোতে স্পষ্ট হবে।
মূল তথ্য
- চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০২৬-২০৩০) কার্বন তীব্রতা ১৭% কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। এতে মোট নির্গমন ৩-৬% বাড়তে পারে, যা প্যারিস চুক্তির অঙ্গীকার পূরণে যথেষ্ট নয়
- ২০৩৫ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানিবহির্ভূত জ্বালানি সক্ষমতা দ্বিগুণ করে ৩,৬০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে; এজন্য বছরে প্রায় ২০০ গিগাওয়াট নতুন বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে হবে
- আমদানি করা তেলের ওপর নির্ভরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে তৈরি জ্বালানি নিরাপত্তা উদ্বেগ জলবায়ু লক্ষ্যের পাশাপাশি কৌশলকে প্রভাবিত করছে
- জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর বদলে পরিকল্পনায় কয়লা ও তেলের ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে; মোট নির্গমনে বাধ্যতামূলক সীমা বা বিদ্যুৎ খাতে নির্গমন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর স্পষ্ট সময়সীমা নেই
- নতুন উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ১০০টি শূন্য-কার্বন শিল্পপার্ক, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট সমুদ্র উপকূলের বাইরের বায়ুবিদ্যুৎ, ১১০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং সবুজ হাইড্রোজেন ও নিউক্লিয়ার ফিউশনের সম্প্রসারণ
- বিশ্বের সৌর প্যানেলের ৮০% এবং ব্যাটারি ও বায়ু টারবাইনের ৭০% উৎপাদন করে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় আধিপত্য ধরে রেখেছে চীন
- জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫-৫%, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন; পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাত এখন জাতীয় অর্থনীতির ১১%-এর বেশি






