ইরানের নিখুঁত হামলা: চীনের বেইদৌ নেভিগেশন ব্যবস্থা কি গোপন অস্ত্র?

পড়তে 10 মিনিট
ইরানের নিখুঁত হামলা: চীনের বেইদৌ নেভিগেশন ব্যবস্থা কি গোপন অস্ত্র?

নির্ভুলতায় আকস্মিক উল্লম্ফন উদ্বেগ বাড়িয়েছে

চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানতে শুরু করলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের নজরে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় আসে। মাত্র কয়েক মাস আগেও যে নির্ভুলতা দেখা যায়নি, অস্ত্রগুলো এখন সেই নির্ভুলতায় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফ্রান্সের বৈদেশিক নিরাপত্তা মহাপরিদপ্তরের নেতৃত্ব দেওয়া দেশটির সাবেক বিদেশি গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান আলাঁ জুইয়ে এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সম্ভাব্য কারণ শনাক্ত করেছেন। ফ্রান্সের টকসাঁ পডকাস্টে কথা বলতে গিয়ে জুইয়ে ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানের সক্ষমতায় নাটকীয় পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন।

সূচিপত্র
  1. নির্ভুলতায় আকস্মিক উল্লম্ফন উদ্বেগ বাড়িয়েছে
  2. বেইদৌর ভেতরের কথা: বেইজিংয়ের ৪৫ স্যাটেলাইটের নেটওয়ার্ক
  3. ছায়ায় গড়া অংশীদারত্ব: ২০১৫ সালের চুক্তি
  4. ইনার্শিয়াল থেকে স্যাটেলাইট: নির্দেশনা ব্যবস্থা যেভাবে কাজ করে
  5. ২০২৫ সালের নজির: যখন জিপিএস জ্যামিং কার্যকর হয়েছিল
  6. অস্ত্রের হিসাব: টেকসই নয় এমন সমীকরণ
  7. লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে টেলিকম নেটওয়ার্ক
  8. বেইজিংয়ের ছায়া-পরীক্ষাগার
  9. সারকথা

জুইয়ে ব্যাখ্যা করেন, নির্ভুলতা বাড়ার অর্থ ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, "এই যুদ্ধে একটি বিস্ময়কর বিষয় হলো, আট মাস আগে যে যুদ্ধ হয়েছিল তার তুলনায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আরও নির্ভুল। এতে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে।" গোয়েন্দা বিভাগের এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নির্ভুলতা বাড়ার পেছনে একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত উৎসের দিকে ইঙ্গিত করেন: চীনের বেইদৌ নেভিগেশন স্যাটেলাইট ব্যবস্থা।

বিজ্ঞাপন

জিপিএস ব্যবস্থার বদলে চীনা ব্যবস্থা ব্যবহারের আলোচনা রয়েছে, যা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতার ব্যাখ্যা দেয়। গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।

এই সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রভাব বর্তমান সংঘাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র তার গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট নেভিগেশনে প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এর ফলে মার্কিন বাহিনী প্রতিপক্ষের জিপিএস ব্যবহারের সুযোগ যেকোনো সময় বন্ধ বা ব্যাহত করতে পারত। তেহরান যদি সত্যিই বেইদৌ ব্যবস্থায় চলে গিয়ে থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সুবিধা হারিয়ে থাকতে পারে।

বেইদৌর ভেতরের কথা: বেইজিংয়ের ৪৫ স্যাটেলাইটের নেটওয়ার্ক

ইরানের সম্ভাব্য বেইদৌ ব্যবহারের গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে, এই ব্যবস্থা তার মার্কিন প্রতিপক্ষ থেকে কীভাবে আলাদা। ২০২০ সালে চীন তার স্যাটেলাইট নেভিগেশন নক্ষত্রপুঞ্জের তৃতীয় প্রজন্মের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে। ওই বছরের জুলাইয়ে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিজে নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। চীনের প্রযুক্তিগত প্রভাব খাটানোর বিষয়ে উদ্বেগ থেকে কয়েক দশকের কৌশলগত বিনিয়োগের ফল এই ব্যবস্থা।

বেইদৌর সূচনা ১৯৯৬ সালের তাইওয়ান প্রণালি সংকটের সময়, যখন চীনা কর্মকর্তারা জিপিএসের বিঘ্নের মুখে পড়েছিলেন বলে খবর রয়েছে; এতে তাদের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বেইজিং তখন সিদ্ধান্ত নেয়, মার্কিন স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরতা কৌশলগতভাবে অগ্রহণযোগ্য দুর্বলতা। নিজস্ব বিকল্প তৈরির কাজ তখনই শুরু হয়। এর ফল হিসেবে এখন নেটওয়ার্কটিতে ৪৫টি সচল স্যাটেলাইট রয়েছে, যেখানে মার্কিন জিপিএস ব্যবস্থার ভিত্তি ২৪টি স্যাটেলাইট।

বিজ্ঞাপন

সংখ্যার এই সুবিধা বাস্তব কার্যক্রমেও সুফল দেয়। কক্ষপথে বেশি স্যাটেলাইট থাকায় বেইদৌ বিকল্প কভারেজ এবং উন্নত সিগন্যাল জ্যামিতি দেয়, ফলে অবস্থান আরও নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা যায়। স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, তিন স্তরের কাঠামো ব্যবহার করে ব্যবস্থাটি বিশ্বব্যাপী সেবা দেয়: কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের মহাকাশ অংশ, নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ স্টেশনের স্থলভিত্তিক অংশ এবং সামরিক ও বেসামরিক রিসিভার নিয়ে গঠিত ব্যবহারকারী অংশ।

ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক এলিয়াহ ম্যাগনিয়ের ব্যাখ্যা করেন, সিগন্যালের ধরন অনুযায়ী বেইদৌ ভিন্ন মাত্রার নির্ভুলতা দেয়। তিনি বলেন, "সাধারণত উন্মুক্ত বেসামরিক সিগন্যাল অবস্থান নির্ণয়ে প্রায় পাঁচ থেকে ১০ মিটার নির্ভুলতা দেয়, আর অনুমোদিত ব্যবহারকারীদের জন্য থাকা সীমিত সেবায় আরও অনেক বেশি নির্ভুলতা পাওয়া যায়।" কিছু মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সামরিক মানের বেইদৌ সিগন্যাল এক মিটারের মধ্যে নির্ভুলতা দিতে পারে। এই নির্ভুলতা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রাণঘাতী ক্ষমতা বদলে দেয়।

ছায়ায় গড়া অংশীদারত্ব: ২০১৫ সালের চুক্তি

ইরানের বেইদৌ ব্যবহারের বর্তমান জল্পনা শূন্য থেকে তৈরি হয়নি। বরং তেহরান ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রায় এক দশকের নীরব সহযোগিতায় গড়ে ওঠা সক্ষমতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনাই এতে ফুটে উঠেছে। এর ভিত্তি ২০১৫ সালের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত এক চুক্তি। সে সময় ইরানি ইলেকট্রনিকস কোম্পানি সালরান, যা ইরান ইলেকট্রনিকস ইন্ডাস্ট্রিজ নামেও পরিচিত, চীনা প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। এতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানে বেইদৌর অবস্থান নির্ণয়, নেভিগেশন ও সময় নির্ধারণ প্রযুক্তি যুক্ত করার কথা ছিল।

বিজ্ঞাপন

২০১৫ সালের এই চুক্তির আওতায় ইরানের ভেতরে বেইদৌ স্থল স্টেশন নির্মাণ এবং মহাকাশ-তথ্য সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপনের বিষয় ছিল। ২০২১ সালে ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব স্বাক্ষরের পর চীন-ইরান সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হয়; চুক্তিটি সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই হয়েছিল। ওই বছরের জানুয়ারির মধ্যে বেইজিংয়ের সূত্রগুলো নিশ্চিত করে যে ইরানকে বেইদৌর সামরিক মানের সিগন্যাল ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে স্থির ও চলমান সামরিক সম্পদ লক্ষ্যবস্তু করার জন্য প্রয়োজনীয় এনক্রিপ্ট করা, উচ্চ-নির্ভুলতার তথ্য পাওয়া যায়।

সহযোগিতা শুধু সিগন্যাল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি চীনা ফ্রন্ট কোম্পানিগুলো ঐতিহাসিকভাবে ইরানকে সরবরাহ করেছে। ২০১৪, ২০১৭ ও ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় ইরানের প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে নেভিগেশনে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি, নির্দেশনা ব্যবস্থা ও ইলেকট্রনিক উপাদান সরবরাহকারী বিভিন্ন চীনা সংস্থাকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। বেইজিং এসব লেনদেন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দূরত্ব বজায় রাখলেও, এই ধারাবাহিকতা ইরানের নির্ভুল হামলার সক্ষমতা বাড়াতে চীনের দীর্ঘস্থায়ী আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়।

ইনার্শিয়াল থেকে স্যাটেলাইট: নির্দেশনা ব্যবস্থা যেভাবে কাজ করে

বেইদৌ যুক্ত হওয়ার কৌশলগত গুরুত্ব বুঝতে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে পথ নির্ণয় করে, সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ঐতিহ্যগতভাবে ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মূলত ইনার্শিয়াল নেভিগেশন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করত। এতে অনবোর্ড জাইরোস্কোপ ও অ্যাক্সিলারোমিটারের সাহায্যে ত্বরণ ও ঘূর্ণন পরিমাপ করে অবস্থান নির্ণয় করা হয়। এই পদ্ধতিতে বাইরের সিগন্যাল জ্যাম করা যায় না এবং ব্যবস্থা নিজেই সম্পূর্ণ, তবে সময় ও দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্রুটিও জমতে থাকে।

বিশ্লেষক এলিয়াহ ম্যাগনিয়ের বলেন, "সময় ও দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিমাপের ছোটখাটো ত্রুটি জমে, ফলে নির্ভুলতা ক্রমে কমে যায়। স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিগন্যাল এই সমস্যার সমাধান করে।" আধুনিক ব্যবস্থায় সাধারণত দুটি পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়: ইনার্শিয়াল নেভিগেশন অস্ত্রের সাধারণ গতিপথ ধরে রাখে, আর স্যাটেলাইট সিগন্যাল ক্রমাগত উড্ডয়নপথ আরও নির্ভুল করে এবং বিচ্যুতি সংশোধন করে। এই সমন্বিত পদ্ধতিতে নির্ভুলতা বহু গুণ বেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

নিছক নির্ভুলতার বাইরেও বেইদৌর বাড়তি সুবিধা রয়েছে। ব্যবস্থাটির সামরিক স্তরের B3A সিগন্যালে জটিল ফ্রিকোয়েন্সি হপিং এবং নেভিগেশন মেসেজ অথেনটিকেশন রয়েছে। এর ফলে প্রতিপক্ষ মিথ্যা স্থানাঙ্ক পাঠিয়ে আসন্ন অস্ত্রের গতিপথ বদলে দেওয়ার জন্য যে "স্পুফিং" হামলা চালায়, তা ঠেকানো যায়। সামরিক বিশ্লেষক প্যাট্রিসিয়া মারিন্স bne IntelliNews-কে বলেন, ২০২৫ সালের সংঘাতে ইসরায়েলি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা বেসামরিক মানের জিপিএস সিগন্যাল সফলভাবে ব্যাহত করলেও, "BDS-3-এর সামরিক স্তরের B3A সিগন্যাল কার্যত জ্যাম করা যায় না।"

বেইদৌতে স্বল্প বার্তা আদান-প্রদানের সুবিধাও রয়েছে। এর মাধ্যমে অপারেটররা দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারেন। এই সুবিধা উৎক্ষেপণের পর অস্ত্রের গতিপথ রিয়েল-টাইমে বদলানোর সুযোগ দেয়। ফলে হালনাগাদ গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী কমান্ডাররা লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করতে পারেন, কিংবা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শনাক্ত হলে এড়ানোর কৌশল নিতে পারেন।

২০২৫ সালের নজির: যখন জিপিএস জ্যামিং কার্যকর হয়েছিল

২০২৫ সালের জুনের সংঘাতের সঙ্গে বর্তমান অভিযানগুলোর পার্থক্য দেখায়, বেইদৌতে সম্ভাব্য পরিবর্তনটি কেন এত কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সক্ষমতা জিপিএস সিগন্যাল জ্যাম করে ইরানের হামলা সফলভাবে ব্যাহত করেছিল। পশ্চিমা ব্যবস্থাগুলো "স্পুফিং"-সহ বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেছিল। এ পদ্ধতিতে বিভ্রান্তিকর স্থানাঙ্ক পাঠিয়ে আসন্ন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রকে ভুল পথে চালিত করা হয়, যাতে সেগুলো বিধ্বস্ত হয় বা গতিপথ থেকে সরে যায়।

তবে এসব প্রতিরক্ষামূলক সাফল্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, এরপর থেকে ইরান পরিকল্পিতভাবে জিপিএসনির্ভর নির্দেশনা ব্যবস্থা বদলে বেইদৌ-সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকল্প ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালের সংঘাতের পর ইরানের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটি "বিশ্বের বিদ্যমান সব সক্ষমতা ব্যবহার করে এবং কোনো একটি প্রযুক্তির উৎসের ওপর নির্ভর করে না।" এই বহুমুখীকরণ কৌশল পশ্চিমা ইলেকট্রনিক যুদ্ধের কৌশলকে অনেক কম কার্যকর করে তুলেছে বলে মনে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এর ফলে ইরানের হামলার কার্যকারিতা পরিমাপযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সংঘাতের শুরুর দিকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এমন আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক ভেদ করে, যেগুলো এর আগে দুর্ভেদ্য বলে প্রমাণিত হয়েছিল। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক অবকাঠামো এবং বেসামরিক স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়। অস্ত্রগুলো আর আগের দশকগুলোর লক্ষ্যভ্রষ্ট ব্যালিস্টিক রকেট নয়; নির্দিষ্ট ভবন ও অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম নির্ভুল অস্ত্র।

অস্ত্রের হিসাব: টেকসই নয় এমন সমীকরণ

ইরানি অস্ত্রের নির্ভুলতা বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য আরেকটি সংকট তৈরি হয়েছে: প্রতিরক্ষামূলক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন হুমকি ঠেকাতে মার্কিন বাহিনী টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (THAAD) এবং প্যাট্রিয়টের মতো ব্যয়বহুল ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। প্রতিটি THAAD ইন্টারসেপ্টরের দাম ১২ মিলিয়ন ডলারের বেশি, অন্যদিকে ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দাম হতে পারে মাত্র এক থেকে দুই মিলিয়ন ডলার। ড্রোনের ক্ষেত্রে ব্যবধান আরও বেশি: ইরান ও রাশিয়া প্রতিটি শাহেদ-১৩৬ লয়টারিং মিউনিশন প্রায় ৫০ হাজার ডলারে তৈরি করে, অথচ সেগুলো ঠেকাতে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজন হয়।

২০২৫ সালের সংঘাতের মাত্র ১২ দিনে যুক্তরাষ্ট্র তার THAAD ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যবহার করে। বর্তমান অভিযান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অবশিষ্ট মজুত শেষ করে দেওয়ার হুমকি তৈরি করেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনের তৈরি ইন্টারসেপ্টর ড্রোন প্রযুক্তি ভাগ করে নিতে ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বলে খবর রয়েছে। এতে স্বীকার করা হয়েছে, প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে এই ব্যয়বহুল বিনিময় অনুপাতের চাপ সামলানো সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

কৌশলগত বিশ্লেষকদের সতর্কতা, এই অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ২০২৬ সালের জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, সমপর্যায়ের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে কয়েক দিনের মধ্যেই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টারসেপ্টর শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইরানি হামলা ঠেকাতে প্রতিরক্ষামূলক মজুত খরচ করে যুক্তরাষ্ট্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সামরিক পদক্ষেপ ঠেকানোর কিংবা ইউরোপে ন্যাটোর বিরুদ্ধে রুশ আগ্রাসন মোকাবিলার সক্ষমতা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বেইজিং সতর্কভাবে এই মজুত কমার হিসাব রাখছে এবং তাইওয়ান নিয়ে সংকট তৈরি হলে মার্কিন অস্ত্রভান্ডার ফাঁকা থাকবে কি না, তা বিবেচনা করছে।

লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে টেলিকম নেটওয়ার্ক

স্যাটেলাইট নেভিগেশন ইরান যে প্রযুক্তিগত সহায়তা পায়, তার একটি মাত্র দিক। তদন্তে বেসামরিক টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে সমান্তরাল একটি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার তথ্য পাওয়া গেছে। ইরানের বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর MTN Irancell-এর সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিক ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, যার মালিকানার মাধ্যম ইরান ইলেকট্রনিকস ইন্ডাস্ট্রিজ। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, এমন সব বড় টেলিকম অপারেটরের সঙ্গে MTN Irancell-এর সক্রিয় রোমিং চুক্তি রয়েছে।

এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের ফলে SS7 এবং Diameter সিগন্যালিং প্রোটোকলে সম্ভাব্য প্রবেশাধিকার তৈরি হয়। বিশ্বজুড়ে মোবাইল রোমিং চালু রাখতে এই মানক ব্যবস্থাগুলো ব্যবহৃত হয়। প্রোটোকলগুলোতে শক্তিশালী যাচাইকরণ ব্যবস্থা না থাকায় বৈধ নেটওয়ার্ক পরিচয়পত্র থাকা কোনো অপারেটর অবস্থানের তথ্য চাইতে, বার্তা আটকাতে এবং সীমান্ত পেরিয়ে চলাচলের ধরন অনুসরণ করতে পারে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই প্রবেশাধিকার ইরানি গোয়েন্দা সংস্থাকে উপসাগরীয় নেটওয়ার্কে নিবন্ধিত ফোন ব্যবহারকারী সামরিক সদস্যদের অবস্থান শনাক্ত করতে, ঘাঁটির কার্যক্রমের ধরন মানচিত্রে চিহ্নিত করতে এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তথ্য সংগ্রহ করতে সহায়তা করতে পারে।

করপোরেট সম্পর্কগুলো এই সক্ষমতাকে সরাসরি ইরানের সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের সঙ্গে যুক্ত করেছে। MTN Irancell-এর সহ-মালিক IEI-ই ওই ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনা ব্যবস্থাও তৈরি করে। এতে একটি বদ্ধ চক্র তৈরি হয়েছে: উপসাগরীয় নেটওয়ার্কে টেলিযোগাযোগ-সুবিধা দেওয়া একই সংস্থা গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় পরিচালিত অস্ত্রও তৈরি করছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে MTN Irancell-এর নেতৃত্বে রয়েছেন ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য। এতে এই বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

বেইজিংয়ের ছায়া-পরীক্ষাগার

কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানকে চীনের সমর্থন নিছক মিত্রতার সংহতির চেয়ে বেশি হিসাবি। তাদের ভাষায়, ইরান একটি "ছায়া-পরীক্ষাগার", যেখানে চীনা সামরিক প্রযুক্তি সরাসরি সংঘাতে পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরীক্ষা করা যায়, অথচ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি থাকে না।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে বেইজিং মার্কিন, ইসরায়েলি ও পশ্চিমা অস্ত্রব্যবস্থা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে। চীনের সরবরাহ করা রাডার, নেভিগেশন ব্যবস্থা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম স্টেলথ বিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ইলেকট্রনিক পাল্টা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেমন কাজ করে, তা দেখে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য নিজেদের সক্ষমতা আরও উন্নত করতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে সংঘাতের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ।

এই ব্যবস্থা দুই পক্ষকেই লাভবান করে। চীনের ৫০০টিরও বেশি কক্ষপথে থাকা সম্পদ থেকে জ্যাম-প্রতিরোধী নেভিগেশন এবং সম্ভাব্য স্যাটেলাইট গোয়েন্দা সহায়তা পায় ইরান। চীন পায় নিজের সরঞ্জামের বাস্তব যুদ্ধের তথ্য এবং ছায়া-সংঘাতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি দুর্বল করার সুযোগ। এক বিশ্লেষকের ভাষায়, বেইজিং কার্যত সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে "মার্কিন সামরিক ও প্রতিরক্ষা সম্পদ নিঃশেষ" করছে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে মনোযোগ ও অস্ত্র সরিয়ে নিচ্ছে।

সারকথা

  • ২০২৫ সালের জুনের পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে; গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের মতে, এর কারণ চীনের বেইদৌ স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার
  • জিপিএসের ২৪টির বিপরীতে বেইদৌতে ৪৫টি স্যাটেলাইট রয়েছে; এর সামরিক সিগন্যাল জ্যাম-প্রতিরোধী এবং স্পুফিং বা ব্যাহত করা কঠিন
  • ইরানি ইলেকট্রনিকস প্রতিষ্ঠান সালরান ও চীনা প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালের চুক্তি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে বেইদৌ যুক্ত করার কাঠামো তৈরি করেছিল
  • নির্ভুলতা বাড়ায় ব্যয়ের ভারসাম্য টেকসই থাকছে না: কমদামি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকাতে মিলিয়ন ডলারের ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে যাচ্ছে
  • পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সামরিক প্রযুক্তি পরীক্ষা এবং মার্কিন অস্ত্রের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে চীন সংঘাতকে "ছায়া-পরীক্ষাগার" হিসেবে ব্যবহার করতে পারে
  • MTN Irancell-এর টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো উপসাগরীয় অপারেটরদের নেটওয়ার্কে সিগন্যালিং প্রোটোকলের মাধ্যমে সমান্তরাল লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সক্ষমতা দেয়
  • জিপিএস থেকে বেইদৌতে পরিবর্তনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের স্যাটেলাইট নেভিগেশনে মার্কিন একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটতে পারে
  • ইরান সংঘাতে অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় তাইওয়ান নিয়ে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত কিংবা ইউরোপে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে