নীরব রূপান্তর
দশকের পর দশক ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলো ইসলাম ধর্মের উত্থানকে প্রধানত নিরাপত্তা-উদ্বেগের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ও সহিংস উগ্রবাদের আশঙ্কা নীতিনির্ধারণী আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে, যার ফলে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে সফলভাবে দমন করা সম্ভব হয়েছে। আজ এই অঞ্চলের ধর্মীয় পরিমণ্ডলে মৌলিকভাবে ভিন্ন এক পরিবর্তন ঘটছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই বৃহত্তম দেশ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম সহিংসতার মধ্য দিয়ে নয়, বরং আধুনিক জীবনের ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে নিজের উপস্থিতি জোরালো করছে। রাজনৈতিক প্রচারাভিযান, আইনি বিধিবিধান, ভোক্তাদের পছন্দ এবং সামাজিক রীতিনীতিতে ধর্মটির উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। এর ফলে ইসলামের প্রকাশের এমন এক নতুন ধরন তৈরি হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি বিকশিত হচ্ছে। এই শান্তিপূর্ণ, কিন্তু গভীর রূপান্তর ইঙ্গিত দিচ্ছে, ধ্রুপদি সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের পূর্বাভাস অনুযায়ী আধুনিকায়ন এ অঞ্চলকে ধর্মনিরপেক্ষ করে তুলছে না। বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল সংযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ধর্মীয় অভিব্যক্তির নতুন পথ তৈরি করছে, যার মাধ্যমে প্রায় ২৪ কোটি ২০ লাখ মুসলমানের আবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনজীবন ও ব্যক্তিজীবনে ইসলামী মূল্যবোধ আরও গভীরভাবে প্রোথিত হচ্ছে। এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪২ শতাংশ মুসলমান।
সূচিপত্র
ঐতিহাসিক ভিত্তি ও সমকালীন বিস্তার
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামের উপস্থিতি হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির আগমনের অনেক আগে আরব, পারস্য ও ভারতীয় বণিকেরা ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে সুমাত্রা থেকে মালাক্কা পর্যন্ত বন্দরনগরীগুলোতে নিজেদের অবস্থান গড়ে তোলেন এবং ইসলামকে এ অঞ্চলে নিয়ে আসেন। বিশ্বের অন্য কিছু অঞ্চলে দেখা বিজয়নির্ভর বিস্তারের বিপরীতে, এই দ্বীপপুঞ্জে ইসলাম মূলত বাণিজ্য এবং সুফি ধর্মপ্রচারকদের শিক্ষার মাধ্যমে ছড়িয়েছে। তাঁরা স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে ইসলামী নীতির দক্ষতার সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। শান্তিপূর্ণ একীভবনের এই ঐতিহাসিক ধারা সাম্প্রতিক অতীতের বিপরীত, যখন বোমা হামলা ও বিদ্রোহের মাধ্যমে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ইতিহাসের অধ্যাপক এরিক তাগলিয়াকোজ্জো বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যকার সম্পর্ক সব সময়ই বহুমাত্রিক ছিল; ধর্মের বাইরেও এর মধ্যে বাণিজ্য, হজযাত্রা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় অন্তর্ভুক্ত। হজ নিয়ে তাঁর গবেষণায় তাগলিয়াকোজ্জো দেখিয়েছেন, ১৭শ শতক থেকেই ইন্দোনেশিয়ার হজযাত্রীরা মক্কায় যাচ্ছেন। ১৯শ শতকে বাষ্পীয় জাহাজের বিপ্লব হজকে অভিজাতদের উদ্যোগ থেকে গণমানুষের যাত্রায় রূপান্তরিত করে। বর্তমানে প্রতি বছর ২ লাখের বেশি হজযাত্রী সৌদি আরবে পাঠায় ইন্দোনেশিয়া, যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। এতে এমন এক আধ্যাত্মিক বন্ধন আরও জোরালো হচ্ছে, যা ধর্মীয় অভিমুখ গঠনে ভূমিকা রাখছে। ইসলামের প্রাথমিক বিস্তারে সহায়তাকারী সুফি তরিকা ও সম্প্রদায়গুলো আধ্যাত্মিকতা ও সহনশীলতার ওপর জোর দিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে এমন এক ঐতিহ্য গড়ে ওঠে, যাকে বর্তমানে গবেষকেরা নুসান্তারা ইসলাম বলেন। ঐতিহাসিকভাবে এই ধারায় প্রথাগত ইসলামী অনুশীলনের পাশাপাশি স্থানীয় রীতিনীতিরও স্থান ছিল।
হালাল অর্থনীতি ও ভোক্তার ধর্মীয় অনুশীলন
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে ধর্মীয় অনুশীলন কীভাবে ভোক্তার আচরণ ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে মিশে গেছে। ওয়ান্ডারম্যান থম্পসন ইন্টেলিজেন্স ও মুসলিম ইন্টেল ল্যাবের গবেষণায় দেখা গেছে, এ অঞ্চলের ৯১ শতাংশ মুসলিম উত্তরদাতা আল্লাহর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন; বিপরীতে মাত্র ৩৪ শতাংশ সম্পদকে অগ্রাধিকার দেন। তথ্য বলছে, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ৮৪ শতাংশ মুসলিম দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, আর ৩৩ শতাংশ নিজেদের বাবা-মায়ের চেয়ে বেশি ধর্মপরায়ণ বলে মনে করেন। ধর্মীয় এই পুনর্জাগরণ বিশ্বাস ও আধুনিক বাণিজ্যের সমন্বয়ে লাভজনক বাজার গড়ে তুলছে। গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমি ইন্ডিকেটর অনুযায়ী, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের শীর্ষ চারটি হালাল বাজারের মধ্যে রয়েছে। এই খাতের আওতায় রয়েছে খাদ্য, ইসলামী অর্থায়ন, মুসলিমবান্ধব ভ্রমণ এবং ধর্মীয় গণমাধ্যম। শরিয়াহ-সম্মত তহবিলে বিনিয়োগ ২০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া এবং শিশুদের জন্য ইসলামী শিক্ষামূলক কনটেন্টের সাফল্যের সুবাদে মালয়েশিয়া শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। অর্থনৈতিক প্রভাব ঐতিহ্যগত খাতগুলোর বাইরেও বিস্তৃত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৬১ শতাংশ মুসলিম ব্যাংকিং ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হালাল সনদকে বিবেচনায় নেন, আর ৭৭ শতাংশ ভ্রমণের গন্তব্য বাছাইয়ের সময় হালাল-সুবিধার প্রাপ্যতা দেখেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ৮৫ শতাংশ উত্তরদাতা বিশেষভাবে মুসলমানদের জন্য তৈরি মেটাভার্সে আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং ৫৩ শতাংশ নিয়মিত স্মার্টফোনে নামাজ ও কোরআনবিষয়ক অ্যাপ ব্যবহার করেন। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, ডিজিটাল আধুনিকায়ন ধর্মীয় অভিব্যক্তির বিকল্প হয়ে উঠছে না, বরং এর বাহন হিসেবে কাজ করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ
অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও ইসলামী নৈতিকতার সংযোগ অপ্রত্যাশিতভাবেই জনপরিসরের আলোচনায় এসেছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম সম্প্রতি সফটওয়্যার নির্মাতাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাব্যবস্থায় ইসলামী মূল্যবোধ যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, এমন সমন্বয় প্রযুক্তিকে নৈতিকভাবে মানবকল্যাণে কাজে লাগানো নিশ্চিত করবে। ২০২২ সালের শেষ দিকে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আনোয়ার মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে এআই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধর্মীয় কাঠামো দিকনির্দেশনা দিতে পারে। এই প্রস্তাব যন্ত্রশিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতার চূড়ান্ত মানদণ্ড প্রোগ্রাম করার বিষয়ে জটিল প্রশ্ন তুলেছে। সমালোচকেরা বলছেন, সব ধর্মীয় ঐতিহ্যের মতো ইসলামী আইনেও বিভিন্ন মাজহাব ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলভেদে ব্যাখ্যার ভিন্নতা রয়েছে। এআইয়ে একটি নির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো যুক্ত করলে এমন বিশেষ মতবাদগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রোথিত হতে পারে, যা সব মুসলমানের অভিন্ন নয়; এমনকি অমুসলিম সংখ্যালঘুরা সেটিকে বর্জনমূলক বলে মনে করতে পারেন। এই প্রস্তাব এ অঞ্চলের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার আরও বিস্তৃত এক টানাপোড়েন তুলে ধরে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সরকারগুলো যখন প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে উৎসাহ দিচ্ছে, তখন রক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো চাইছে, উন্নয়ন যেন ইসলামী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। এর ফলে অর্থায়ন, শিক্ষা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো আধুনিক প্রতিষ্ঠানে ইসলামকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করার চাপ তৈরি হচ্ছে, যাতে ধর্মীয় পরিচয়ের বিনিময়ে অগ্রগতি অর্জন করতে না হয়।
আইনি জোর ও সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন
ইসলামের সঙ্গে আরও নিবিড় সামঞ্জস্যের চেষ্টা বিভিন্ন দেশের বাস্তবতায় ভিন্নভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। কখনো কখনো এর ফলে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও স্থানীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সংঘাতও তৈরি হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার শরিয়াহ আইন দ্বারা পরিচালিত একমাত্র প্রদেশ আচেহতে সাম্প্রতিক এক ঘটনায় এই টানাপোড়েন দেখা যায়। জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময় বৃষ্টি ঠেকাতে সরকারি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভাড়া করা এক বৃষ্টির ওঝাকে কর্তৃপক্ষ সেখান থেকে বের করে দেয়। ধর্মীয় নেতারা ওঝার জাভানিজ লোকাচারভিত্তিক আচারকে শিরক (বহুঈশ্বরবাদ) বলে নিন্দা করেন, অথচ আরবি পরিভাষা ব্যবহার করা রুকইয়াহর (ইসলামী ঝাড়ফুঁক) মতো অনুরূপ আধ্যাত্মিক চর্চার বিষয়ে নীরব থাকেন। ঘটনাটি আবাঙ্গান মুসলিমদের মধ্যে চলমান বিরোধের প্রতিফলন, যাঁরা নিজেদের ধর্মবিশ্বাসে স্থানীয় আধ্যাত্মিকতাকে অন্তর্ভুক্ত করেন, এবং সানত্রী গোঁড়াপন্থীদের সঙ্গে, যাঁরা ইসলামকে আরব-বহির্ভূত প্রভাব থেকে মুক্ত করতে চান। রাষ্ট্র পরিচালিত ইসলামায়নের ভিন্ন এক দৃষ্টান্ত ব্রুনেই। দেশটির নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র ২০১৩ সালের শরিয়াহ দণ্ডবিধি আদেশ কার্যকর করেছে। এতে অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও ইসলামী ফৌজদারি আইন সম্প্রসারিত হয়েছে এবং ডাকাতি থেকে ব্যভিচার পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধের জন্য শারীরিক শাস্তির বিধান এসেছে। প্রতিবেশী মালয়েশিয়ায় ইসলামী আইনের প্রয়োগ নিয়ে জনপরিসরে বিতর্ক হয়। কিন্তু ব্রুনেইয়ে ‘মেলায়ু ইসলাম বেরাজা’ (মালয় মুসলিম রাজতন্ত্র) মতাদর্শ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ বা সুলতানের ধর্মীয় ফরমানের সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ভিন্নমত দমন করে। সরকারি ইসলামী ব্যাখ্যার বিরোধিতা করলে এই আইন অনুযায়ী পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। এতে এমন এক একক ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রের ধর্মীয় নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অভ্যন্তরীণ কোনো আলোচনা হয় না।
মধ্যপন্থী বিকল্পধারা হিসেবে নুসান্তারা ইসলাম
ধর্মীয় ঐতিহ্যবাদ বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম ইসলামী সংগঠন নাহদলাতুল উলামা (এনইউ) নুসান্তারা ইসলামকে একটি স্বতন্ত্র ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে তুলে ধরেছে। এই ধারায় মধ্যপন্থা, বহুত্ববাদ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যের ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রায় ৬ কোটি সদস্যের সংগঠনটির যুক্তি, ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম বিজয়ের মাধ্যমে নয়, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সংলাপের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। এর ফলে এমন এক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, যা সহনশীলতাকে গুরুত্ব দেয় এবং উগ্রবাদ প্রত্যাখ্যান করে। এই ধারণার ছয়টি ভিত্তি রয়েছে: সহিংসতার বদলে শান্তি প্রতিষ্ঠা, সমন্বয়বাদ ছাড়া স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, রাষ্ট্রক্ষমতার বদলে নাগরিক সমাজের ওপর নির্ভর করা, ইসলামের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের সমন্বয়, ধর্মনির্বিশেষে নাগরিকদের সমতা নিশ্চিত করা এবং চরমপন্থা প্রত্যাখ্যান করা। এনইউ নেতাদের বক্তব্য, এই দৃষ্টিভঙ্গি মধ্যপ্রাচ্যের মৌলবাদ ও পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতা, উভয়েরই বিকল্প। এতে এমন এক আদর্শ তুলে ধরা হয়, যেখানে স্বদেশের প্রতি ভালোবাসাকেও ঈমানের অংশ হিসেবে দেখা হয়। প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো এই দর্শনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইন্দোনেশিয়ার ধর্মীয় চর্চাকে আরও কঠোর ব্যাখ্যা থেকে আলাদা করে দেখার একটি দৃষ্টিভঙ্গি ঘোষণা করেন।
আমাদের ইসলাম নুসান্তারা ইসলাম।
সংগঠনটি এই বার্তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। তারা মধ্যপন্থী ইসলামী নেতাদের সম্মেলনের আয়োজন করেছে এবং প্রস্তাব দিয়েছে, মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় সংস্কারের সূতিকাগার মধ্যপ্রাচ্যের বদলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সরাসরি ইসলামিক ডিফেন্ডার ফ্রন্ট ও হিজবুত তাহরির ইন্দোনেশিয়ার মতো গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতা করে। এসব গোষ্ঠী জাতীয় পরিচয় ও স্থানীয় রীতিনীতিকে ধর্মীয় অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মেনে নেওয়ার কারণে নুসান্তারা ইসলামের বিরোধিতা করে।
আন্তর্জাতিক সংহতি ও ফিলিস্তিনের প্রশ্ন
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধর্মীয় পুনর্জাগরণের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে, বিশেষ করে বিদেশে সংঘাতের মুখে থাকা মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংহতির প্রশ্নে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেইয়ের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেশগুলো ইসরায়েলি নাগরিক ও কোম্পানির প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। এই অবস্থানে ইসলামী ধর্মীয় সংহতির পাশাপাশি পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের নিজস্ব ঔপনিবেশিকতাবিরোধী ইতিহাসেরও প্রতিফলন রয়েছে। মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদের মতো নেতারা ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের নীতির নিন্দা করেছেন। সাম্প্রতিক ক্ষমতাকালে তিনি ইসরায়েলকে বিশ্ব অস্থিতিশীলতার মূল কারণ হিসেবে বর্ণনা করেন। এসব দেশ ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রত্বকে সমর্থন করে এবং ফিলিস্তিনি কূটনৈতিক মিশনকে স্বাগত জানায়; পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের শিক্ষা ও কাজের সুযোগও দেয়। পররাষ্ট্রনীতির এই অবস্থান দেখায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামী পরিচয় কীভাবে পশ্চিমা মিত্রদের অবস্থান থেকে ভিন্ন বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থানে রূপ নেয়। এই সংহতি সরকারি নীতির গণ্ডি পেরিয়ে জনমতেও বিস্তৃত, যেখানে জাতিগত ও জাতীয় সীমানার ঊর্ধ্বে ফিলিস্তিনের প্রশ্ন ঐক্য সৃষ্টিকারী ইস্যু হিসেবে কাজ করে। ধর্মীয় সংগঠনগুলো এ সংঘাতকে ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর প্রতিরক্ষা হিসেবে ধর্মতাত্ত্বিকভাবে তুলে ধরে, আর রাজনৈতিক নেতারা ঔপনিবেশিক অধীনতার অভিন্ন অভিজ্ঞতার ওপর জোর দেন। বিভিন্ন সরকার ও ভিন্ন ভিন্ন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এই অবস্থানের ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দেয়, ফিলিস্তিনপন্থী সংহতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইসলামী রাজনৈতিক পরিচয়ের স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, এমনকি সে ধরনের স্বাভাবিকীকরণে অর্থনৈতিক বা কৌশলগত সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও।
যা জানা জরুরি
- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম সহিংস উগ্রবাদের বদলে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক, আইনি ও ভোক্তাপর্যায়ের মাধ্যমে নিজের অবস্থান জোরালো করছে; এই রূপান্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া।
- এ অঞ্চলে প্রায় ২৪ কোটি ২০ লাখ মুসলমানের বসবাস, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনসংখ্যার ৪২ শতাংশ। ২৩ কোটি মুসলমান নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাস ইন্দোনেশিয়া।
- জরিপের তথ্য অনুযায়ী, তরুণ মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় অনুশীলন বাড়ছে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ৮৪ শতাংশ মুসলিম প্রতিদিন নামাজ পড়েন এবং ৩৩ শতাংশ জানান, তাঁরা তাঁদের বাবা-মায়ের চেয়ে বেশি ধর্মপরায়ণ।
- হালাল অর্থনীতি বড় ধরনের অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অর্থায়ন, খাদ্য, ভ্রমণ ও ডিজিটাল পরিষেবাসহ ইসলামী বাজারের দিক থেকে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের শীর্ষ চার দেশের মধ্যে রয়েছে।
- প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে ধর্মীয় চর্চার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মুসলমানদের ৫৩ শতাংশ নামাজবিষয়ক অ্যাপ ব্যবহার করেন এবং ৮৫ শতাংশ মুসলমানদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি মেটাভার্স প্ল্যাটফর্মে আগ্রহী।
- কঠোরভাবে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন ও স্থানীয় ঐতিহ্যের মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে। আচেহতে জাভানিজ আধ্যাত্মিক চর্চা প্রত্যাখ্যান এবং ব্রুনেইয়ে অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও ইসলামী ফৌজদারি আইন সম্প্রসারণ এর উদাহরণ।
- ইন্দোনেশিয়ার নাহদলাতুল উলামা সহনশীলতা, গণতন্ত্র ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যের ওপর জোর দিয়ে নুসান্তারা ইসলামকে মধ্যপন্থী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরে, যা আরও রক্ষণশীল ব্যাখ্যাগুলো থেকে আলাদা।
- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো ফিলিস্তিনের প্রতি পররাষ্ট্রনীতিগত সংহতি বজায় রেখেছে। ধর্মীয় ও ঔপনিবেশিকতাবিরোধী নীতির ভিত্তিতে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করে।






