চার দশকের জোট আধুনিক হুমকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম ও দীর্ঘতম বহুজাতিক সামরিক মহড়া কোবরা গোল্ডের ৪৫তম পর্বে অংশ নিতে ৩০টি দেশের ৮ হাজারের বেশি সামরিক সদস্য থাইল্যান্ডে সমবেত হয়েছেন। রয়্যাল থাই সশস্ত্র বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের যৌথ আয়োজনে বার্ষিক এ মহড়া ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রায়ং প্রদেশের ইউ-তাপাও রয়্যাল থাই বিমানঘাঁটিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। চনবুরি ও সাত্তাহিপসহ থাইল্যান্ডের একাধিক প্রদেশে এ মহড়া ৬ মার্চ পর্যন্ত চলবে।
সূচিপত্র
এ বছর মহড়াটিতে উল্লেখযোগ্য বিবর্তন ঘটেছে। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সীমিত পরিসরের সামুদ্রিক প্রশিক্ষণ হিসেবে এর সূচনা হয়েছিল। চার দশক পর কোবরা গোল্ড ২০২৬ রূপ নিয়েছে জটিল, বহুমাত্রিক অভিযানে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকির পরিবর্তনশীল ধরনকে প্রতিফলিত করে। প্রচলিত স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথের কৌশল থেকে সরে এসে মহড়ায় যুক্ত হয়েছে উন্নত সাইবার যুদ্ধ প্রশিক্ষণ ও মহাকাশভিত্তিক অভিযান। সামরিক পরিকল্পনাকারীরা যাকে সম্মিলিত যৌথ সর্বক্ষেত্র অভিযান বা সিজেএডিও (CJADO) বলেন, তা মোকাবিলাই এর লক্ষ্য।
অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর তালিকা মহড়াটির ব্যাপক আঞ্চলিক আকর্ষণ তুলে ধরে। সাতটি দেশ পূর্ণ অংশগ্রহণকারী: থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়া। চীন, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া—এই তিনটি দেশ মানবিক সহায়তা কর্মসূচিসহ নির্দিষ্ট কিছু কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। বহুজাতিক পরিকল্পনা সম্প্রসারণ দলের কাঠামোর আওতায় রয়েছে বাংলাদেশ, কানাডা, ফিজি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, নিউজিল্যান্ড ও ফিলিপাইন। জার্মানি, সৌদি আরব ও ভিয়েতনামসহ আরও ১০টি দেশ সম্মিলিত পর্যবেক্ষক-সংযোগ দলের মাধ্যমে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নিচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাইল্যান্ডে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত শন ও'নিল অনিশ্চিত বিশ্বে মহড়াটির প্রাসঙ্গিকতা বজায় থাকার ওপর জোর দেন।
বিশ্ব বদলাচ্ছে, তাই কোবরা গোল্ডকেও বদলাতে হবে। নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং এখন ও ভবিষ্যতে আমাদের সার্বভৌমত্ব ও সমৃদ্ধি রক্ষায় প্রয়োজনীয় আন্তঃকার্যক্ষমতা উন্নত করতে কোবরা গোল্ড যেন সব সময় খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
থাইল্যান্ডের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান জেনারেল উক্রিত বুনতানন রাষ্ট্রদূত ও'নিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট কোরের কমান্ডিং জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল ম্যাথিউ ম্যাকফারলেনের সঙ্গে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। ইন্দো-প্যাসিফিকজুড়ে জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতাদের উপস্থিতি এ বছরের কার্যক্রমের উচ্চ গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়। এ বছরকে ‘হেভি ইয়ার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে প্রতি বছর পালাক্রমে অনুষ্ঠিত তুলনামূলক হালকা কমান্ড পোস্ট সিমুলেশনের পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ মহড়া হবে।
ডিজিটাল ক্ষেত্রে উন্নত যুদ্ধকৌশল
২০২৬ সালের মহড়ায় এমন সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, যা ৪০ বছরেরও বেশি আগে কোবরা গোল্ড শুরুর সময় কল্পনাও করা যেত না। এ বছরের সম্মিলিত যৌথ সর্বক্ষেত্র অভিযানের ওপর জোর দিয়ে প্রচলিত গতিশীল যুদ্ধের সঙ্গে মহাকাশ ও সাইবার ক্ষেত্রে অভিযানকে একীভূত করা হয়েছে। এতে প্রতিফলিত হয়েছে, আধুনিক সংঘাতে কীভাবে ভৌত ও ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
হাট ইয়াও সমুদ্রসৈকতে উদ্বোধনী উভচর আক্রমণের সময় সামরিক সদস্যরা প্রচলিত অবতরণযানের পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তির ব্যবস্থা মোতায়েন করেন। প্যাসিফিক মাল্টি-ডোমেইন ট্রেনিং এক্সপেরিমেন্টেশন ক্যাপাবিলিটির মহাকাশ সমন্বয়ক অ্যান্ড্রু এমসলি জানান, মহড়ায় প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বহুমাত্রিক টাস্কফোর্সের মহাকাশ ব্যবস্থা সমন্বিত হয়েছে। মোতায়েনযোগ্য এই প্রযুক্তি অভিযানজুড়ে যোগাযোগ সংকেত পর্যবেক্ষণ করে, তড়িৎচুম্বকীয় হস্তক্ষেপ শনাক্ত করে এবং মিত্রপক্ষের সংকেতকে শত্রুপক্ষের সংকেত থেকে আলাদা করে।
ক্যাম্প রেড হর্স থেকে সামরিক সংবাদমাধ্যমকে এমসলি বলেন, “তড়িৎচুম্বকীয় যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ আমাদের সক্ষমতা, যোগাযোগের ক্ষমতা—এ ধরনের সবকিছু ব্যাহত করতে চাইবে।” এই ব্যবস্থা অপারেটরদের সংকেতের উৎস শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে দেয়। তারা হয় যোগাযোগ সমন্বয়ের জন্য মিত্রদের সঙ্গে কাজ করতে পারে, নয়তো শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক যুদ্ধের প্রচেষ্টা চিহ্নিত করতে পারে।
কোবরা গোল্ডে সাইবার যুদ্ধ প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে যোগাযোগ নেটওয়ার্কে কৃত্রিম আক্রমণ এবং ডিজিটাল অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা। প্রতিপক্ষ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত করার চেষ্টা করলে নিরাপদ যোগাযোগ বজায় রাখার প্রোটোকল তৈরি করতে এসব মহড়া অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে সহায়তা করে। মহাকাশ উপাদানে রয়েছে স্যাটেলাইট যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ এবং জিপিএসের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা। ভৌগোলিকভাবে জটিল দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রণাঙ্গনে দিকনির্দেশনা ও নিখুঁত অভিযান পরিচালনার জন্য এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা।
উদ্বোধনী বক্তব্যে জেনারেল বুনতানন নতুন এই মাত্রাগুলোর ওপর বিশেষভাবে জোর দেন। তিনি বলেন, মহড়ায় স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণভাবে মহাকাশ ও সাইবার ক্ষেত্র নিয়ে যৌথ বহুমাত্রিক অভিযানে সামরিক সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। ভূস্থানিক গোয়েন্দা তথ্য ও সংকেত গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আগের বছরগুলোর তুলনায় মহড়ার পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে এমন পরিস্থিতির জন্য বাহিনীকে প্রস্তুত করা হচ্ছে, যেখানে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল অবকাঠামো যুদ্ধের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মিত্রবাহিনীর সৈকতে অবতরণ
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরপরই অভিযানের গতি দ্রুত বেড়ে যায়। বহুজাতিক বাহিনী হাট ইয়াওয়ে প্রথম বড় ধরনের উভচর অবতরণ অভিযান পরিচালনা করে। ২৬ ফেব্রুয়ারি কয়েক ডজন উভচর যান, জাহাজ থেকে উপকূলে যাওয়ার যান ও অবতরণযান দুর্গম সৈকতটিতে নামে। যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি অনুকরণে আগে থেকে সাজানো আতশবাজি ও ধোঁয়ার পর্দা এতে সহায়তা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন সেনারা থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাদের সঙ্গে উপকূলে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রযুক্তিগত বিবর্তন সত্ত্বেও মহড়ার কেন্দ্রীয় অংশে থাকা সমন্বিত আক্রমণ পরিচালনার সক্ষমতা এতে প্রদর্শিত হয়। উভচর অভিযান প্রশিক্ষণে রয়্যাল থাই নৌবাহিনী ও মার্কিন নৌবাহিনীর সম্পদের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় করা হয়। এর মধ্যে ছিল উভচর ডক অবতরণ জাহাজ ইউএসএস অ্যাশল্যান্ড (LSD-48), যা প্রায় ২০০ মেরিন সেনা ও নাবিক নিয়ে থাইল্যান্ডে পৌঁছায়। তাঁরা ১৫তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট, তৃতীয় অ্যাসল্ট অ্যামফিবিয়ান ব্যাটালিয়ন এবং কমব্যাট লজিস্টিকস রেজিমেন্ট ১৭-এর সদস্য।
অ্যাশল্যান্ডের অধিনায়ক ইউএস নেভি কমান্ডার অ্যাডাম পিপলস নৌ উপস্থিতির কৌশলগত গুরুত্বের ওপর জোর দেন। পিপলস বলেন, “থাইল্যান্ড রাজ্যে আসতে এবং রয়্যাল থাই নৌবাহিনীর সহকর্মী ও বহুজাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কোবরা গোল্ডে অংশ নিতে পেরে আমরা সম্মানিত। আন্তঃকার্যক্ষমতা জোরদার, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও দৃঢ় এবং ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতি আমাদের অভিন্ন অঙ্গীকার তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ করে দেয় কোবরা গোল্ড।”
টাস্কফোর্স অ্যাশল্যান্ডের সেনাদের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ম্যাট ব্রাইড মোতায়েনকে আরও জোরালো ভাষায় ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “টাস্কফোর্স অ্যাশল্যান্ড কেবল একটি অংশীদারত্ব নয়। বাস্তব পরিস্থিতির কঠিন পরীক্ষায় গড়ে ওঠা অঙ্গীকারের ঘোষণা এটি। কোবরা গোল্ড ২৬-এ আমরা বর্শাকে শান দিচ্ছি, আমাদের সম্মিলিত সামরিক শক্তির ধারকে আরও তীক্ষ্ণ করছি। এই জোটগুলো শুধু কাগজে-কলমে নেই। আমাদের মেরিন সেনা, নাবিক, অংশীদার ও মিত্রদের ঘাম এবং অভিন্ন দৃঢ় সংকল্পের ওপর এগুলো গড়ে উঠেছে। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার এমন এক অটল ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যা সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের নজরে পড়বে।”
উভচর অবতরণ ছিল কোবরা গোল্ডের সামুদ্রিক অংশের সমাপনী গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। এতে কৃত্রিম যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জাহাজ থেকে উপকূলে সেনা ও সরঞ্জাম স্থানান্তরে চারটি দেশের সমন্বয়ের সক্ষমতা যাচাই করা হয়। নৌবাহিনীর গোলাবর্ষণ সহায়তা, আকাশপথে নজরদারি এবং সৈকতে আক্রমণকারী দলের মধ্যে নিখুঁত সময়ানুবর্তিতা দরকার ছিল। সম্মিলিত বাহিনীতে প্রতিটি দেশ নির্দিষ্ট সক্ষমতা নিয়ে অংশ নেয়।
মানবিক সহায়তা ও বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা
যুদ্ধের প্রস্তুতি প্রধান লক্ষ্য হলেও কোবরা গোল্ড ২০২৬-এ মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সম্পদ বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান এবং সমন্বিত জরুরি সাড়াদান সক্ষমতার প্রয়োজন এতে প্রতিফলিত হয়েছে। মহড়ায় বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার অভিযান এবং মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলার একটি বড় প্রদর্শনী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সংঘাতপূর্ণ এলাকা বা দুর্যোগকবলিত অঞ্চল থেকে দ্রুত বেসামরিক মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতি নিয়ে এনইও প্রশিক্ষণে কাজ করা হয়। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকটের পর এ সক্ষমতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। মহড়াস্থল পরিদর্শনের সময় রাষ্ট্রদূত ও'নিল এসব অভিযানের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন। তিনি তুলে ধরেন, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় মিত্রদের সহযোগিতা কীভাবে বৃহত্তর নিরাপত্তা অংশীদারত্বের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
মানবিক কার্যক্রমে বিশেষায়িত অনুসন্ধান ও উদ্ধার সক্ষমতাও রয়েছে। কে৯ ইউএসএআর থাইল্যান্ড দল উভচর মহড়ায় অংশ নিয়ে ভয়াবহ সুনামির পরবর্তী পরিস্থিতির অনুকরণে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী কুকুরের দল মোতায়েন করে। স্থানীয়দের নজর কেড়েছে এমন এক উল্লেখযোগ্য ঘটনায় মহারানি সিরিভান্নাভারি নারিরাতানা রাজাকন্যার রাজকীয় পোষা কুকুর এমআই-৬-ও মহড়ায় যোগ দেয়। উভচর হামলাযানে করে কে৯ দলগুলোকে জাহাজ থেকে উপকূলে পৌঁছে এমন একটি কৃত্রিম দুর্যোগ এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে স্থলপথ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এরপর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের সন্ধানে তারা নিয়মতান্ত্রিক তল্লাশি চালায়।
রাজকীয় কে৯ দলের অংশগ্রহণ থাইল্যান্ডের রাজতন্ত্র ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরই প্রতিফলন। মহারানি সিরিভান্নাভারি নারিরাতানা রাজাকন্যা দীর্ঘদিন ধরে প্রাণীকল্যাণ ও কর্মরত কুকুরের কর্মসূচিতে সহায়তা দিয়ে আসছেন। দুর্যোগ মোকাবিলায় এসব রাজকীয় উদ্যোগের বাস্তব প্রয়োগ দেখিয়েছে এমআই-৬-এর অংশগ্রহণ। কুকুরটির অংশগ্রহণ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেরও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে, যা থাই জনগণের কাছে মহড়ার মানবিক দিকগুলো তুলে ধরতে সহায়তা করেছে।
মানবিক কার্যক্রমের দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এসব কার্যক্রম চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু পর্বে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এতে আস্থা ও যোগাযোগের প্রোটোকল গড়ে ওঠে, যা প্রকৃত আঞ্চলিক সংকটের সময় অপরিহার্য হতে পারে।
সরঞ্জাম ও আন্তঃকার্যক্ষমতার মাইলফলক
যুক্তরাষ্ট্র-থাইল্যান্ড প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সঙ্গে এ মহড়ার সময় মিলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এক্সেস ডিফেন্স আর্টিকলস কর্মসূচির আওতায় রয়্যাল থাই সেনাবাহিনী সম্প্রতি আরও ১৭টি স্ট্রাইকার পদাতিক যুদ্ধযান পেয়েছে। এ কর্মসূচিতে উদ্বৃত্ত সামরিক সরঞ্জাম মিত্র দেশগুলোর কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত এ সরবরাহের ফলে থাইল্যান্ডের বাহিনীতে উন্নত সাঁজোয়া যানগুলোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।
জেনারেল ডাইনামিক্স ল্যান্ড সিস্টেমসের তৈরি ৮x৮ চাকার সাঁজোয়া প্ল্যাটফর্ম স্ট্রাইকার যানগুলো রয়্যাল থাই সেনাবাহিনীর সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি এনেছে। এতে রয়েছে দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রব্যবস্থা, নেটওয়ার্ককেন্দ্রিক যুদ্ধের উন্নত সক্ষমতা এবং পুরোনো সাঁজোয়া কর্মীবাহী যানের তুলনায় বেশি গতিশীলতা। কোবরা গোল্ড এবং একই সময়ে চলা হনুমান গার্ডিয়ান মহড়ার সঙ্গে সরবরাহের সময় মিলে যাওয়ায় যৌথ প্রশিক্ষণ পরিস্থিতিতে এসব সরঞ্জাম দ্রুত যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
স্ট্রাইকার সরবরাহ রয়্যাল থাই সেনাবাহিনীর বৃহত্তর আধুনিকায়ন প্রচেষ্টার অংশ। মার্কিন ব্যবস্থার সঙ্গে আন্তঃকার্যক্ষমতা বজায় রেখে সাঁজোয়া সক্ষমতা উন্নত করার চেষ্টা করছে থাই সেনাবাহিনী। এসব যান থাইল্যান্ডের বিদ্যমান সাঁজোয়া কর্মীবাহী যানবহরের পরিপূরক এবং প্রচলিত অভিযান ও শান্তিরক্ষা মিশন—উভয় ক্ষেত্রেই পদাতিক ইউনিটকে বাড়তি সুরক্ষা দেয়। ট্র্যাকযুক্ত যানের তুলনায় ৮x৮ চাকার বিন্যাসে সড়কে চলাচল সহজ হয়। ফলে নগরকেন্দ্র থেকে গ্রামীণ সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত থাইল্যান্ডের বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডে দ্রুত মোতায়েন করা যায়।
সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় একটি স্ট্রাইকার ব্রিগেড কমব্যাট টিম থাইল্যান্ডে মোতায়েন হবে। তারা রক্ষণাবেক্ষণ ও নেটওয়ার্ককেন্দ্রিক যুদ্ধকৌশলে প্রশিক্ষণ দেবে, যাতে থাই বাহিনী নতুন সরঞ্জামের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারে। এই হস্তান্তর দেখায়, কোবরা গোল্ড কেবল বার্ষিক আয়োজন নয়; যুক্তরাষ্ট্র ও তার থাই মিত্রদের মধ্যে বছরজুড়ে সামরিক সহযোগিতা ও সক্ষমতা উন্নয়নের ভিত্তিও।
পরিবর্তনশীল বিশ্বে কৌশলগত গুরুত্ব
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কোবরা গোল্ড ২০২৬। অন্যত্র বৈশ্বিক উত্তেজনা সত্ত্বেও এ মহড়া এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত অঙ্গীকার তুলে ধরে। একই সঙ্গে মানবিক কার্যক্রমে চীন ও ভারতের পর্যবেক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যগত ভূমিকা বজায় রাখার সুযোগ করে দেয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ম্যাথিউ ম্যাকফারলেন বৃহত্তর কৌশলগত বার্তাটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি এবং এমন শান্তিপূর্ণ অঞ্চলের প্রতি আমাদের দেশগুলোর অভিন্ন অঙ্গীকার রয়েছে, যেখানে সব দেশ উন্নতি করতে পারে। এই মহড়া সেই অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। বিশ্বকে এটি দেখায় যে আমরা একসঙ্গে আছি।”
ব্যাংককে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এ বার্তা জোরালো করে। দূতাবাস জানায়, মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে শান্তি জোরদার করে কোবরা গোল্ড ২০২৬। পাশাপাশি এটি আন্তঃকার্যক্ষমতা উন্নত করে, উন্নত প্রযুক্তি সমন্বিত করে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি গড়ে তোলে।
২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদ্যাপনের সঙ্গে মহড়ার সময় মিলে যাওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতা তুলে ধরতে বছরজুড়ে স্মারক আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সামরিক কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনে পরিবর্তন হলেও মহড়া চলবে। উভয় দেশের একাধিক সরকার আমলে টিকে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-থাইল্যান্ড সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্রই এতে প্রতিফলিত হয়।
থাইল্যান্ডের জন্য এ মহড়া এ অঞ্চলে তার প্রাচীনতম সামরিক জোটের ধারাবাহিকতা। ১৯৫৪ সালের ম্যানিলা চুক্তি ও পরবর্তী সমঝোতার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক রূপ পাওয়া যুক্তরাষ্ট্র-থাইল্যান্ড অংশীদারত্ব সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন টিকে আছে। এ চুক্তিভিত্তিক সম্পর্কের বাস্তব রূপ কোবরা গোল্ড। সংকটের সময় প্রকৃত যৌথ অভিযান পরিচালনায় কাজে লাগতে পারে, এমন পদ্ধতি এ মহড়ায় যাচাই ও কার্যকর করা হয়।
যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো ন্যাটোর প্রধান মিত্র থেকে শুরু করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আঞ্চলিক শক্তি—৩০টি দেশের অংশগ্রহণ বহুপাক্ষিক সমন্বয়ের এক অনন্য মঞ্চ তৈরি করেছে। নির্দিষ্ট জোড়া দেশের সক্ষমতা নিয়ে কাজ করা দ্বিপক্ষীয় মহড়ার বিপরীতে কোবরা গোল্ডের বহুপাক্ষিক কাঠামো অংশগ্রহণকারীদের অভিন্ন মানদণ্ড ও যোগাযোগ প্রোটোকল গড়ে তুলতে বাধ্য করে। মানবিক দুর্যোগ থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি—প্রকৃত জরুরি পরিস্থিতিতে জোটবদ্ধ অভিযান পরিচালনায় এসব কাজে লাগতে পারে।
মূল কথা
- কোবরা গোল্ড ২০২৬ বার্ষিক মহড়ার ৪৫তম পর্ব। ৩০টি দেশের ৮ হাজারের বেশি সদস্য থাইল্যান্ডের একাধিক প্রদেশে ৬ মার্চ পর্যন্ত এতে অংশ নিচ্ছেন।
- ২০২৬ সালের মহড়ায় প্রথমবারের মতো সাইবার যুদ্ধ ও মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতার সঙ্গে প্রচলিত স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথের কৌশল যুক্ত করে সম্মিলিত যৌথ সর্বক্ষেত্র অভিযান চালানো হচ্ছে।
- থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ সাতটি দেশ পূর্ণ অংশগ্রহণকারী। চীন, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নির্দিষ্ট মানবিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে।
- প্রধান প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে হাট ইয়াও সৈকতে উভচর আক্রমণ, বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার অভিযান এবং বিশেষায়িত কে৯ দলের অনুসন্ধান ও উদ্ধার প্রদর্শনী।
- যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কর্মসূচির আওতায় থাইল্যান্ডে আরও ১৭টি স্ট্রাইকার সাঁজোয়া যান সরবরাহের সঙ্গে এ মহড়ার সময় মিলে গেছে, যা রয়্যাল থাই সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াবে।
- কর্মকর্তারা বলছেন, এ মহড়া ইন্দো-প্যাসিফিকের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী অঙ্গীকার তুলে ধরে এবং মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর আন্তঃকার্যক্ষমতা জোরদার করে।






