জাতীয়তাবাদী জোয়ারে রক্ষণশীলদের জয়
রোববার থাইল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল। তাঁর রক্ষণশীল ভুমজাইথাই পার্টি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রায় দ্বিগুণ আসন পেয়েছে। কয়েক মাসের জনমত জরিপের পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ করে এই ফল দেশটির রাজনৈতিক দৃশ্যপট নতুন করে সাজিয়েছে। প্রায় ৯৪ শতাংশ ভোট গণনা শেষে প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, ৫০০ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে ভুমজাইথাই ১৯২ থেকে ১৯৪টি আসন পেতে যাচ্ছে। এতে আনুতিনের সামনে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরে দুই দশকের মধ্যে প্রথম থাই নেতা হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
সূচিপত্র
রোববার রাতে ব্যাংককে দলের সদর দপ্তরে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে জয়ের দাবি করলেও উদার মনোভাব দেখান আনুতিন।
আজ ভুমজাইথাইয়ের জয় সব থাই জনগণের জয়, আপনারা ভুমজাইথাই পার্টিকে ভোট দিয়ে থাকুন বা না-ই দিয়ে থাকুন। থাই জনগণের সেবা করতে আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করতে হবে।
নির্বাচনের আগে অধিকাংশ জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা প্রগতিশীল পিপলস পার্টি প্রায় ১১৬ থেকে ১১৮টি আসন নিয়ে পিছিয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালের জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার আশা ছিল দলটির। একসময়ের প্রভাবশালী ফেউ থাই পার্টি, ধনকুবের সিনাওয়াত্রা পরিবারের রাজনৈতিক বাহন, গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে। দলটি মাত্র প্রায় ৭৪ থেকে ৮৬টি আসন পেয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে।
জরিপ ও পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণ
নির্বাচনী প্রচারজুড়ে জরিপগুলোতে ধারাবাহিকভাবে পিপলস পার্টিকে এগিয়ে দেখা গিয়েছিল। কাঠামোগত সংস্কার ও অর্থনীতির আধুনিকায়নের বার্তা বিশেষ করে নগর এলাকার তরুণ ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল। থাইল্যান্ডের কঠোর রাজপরিবার অবমাননা-সংক্রান্ত আইন সংস্কারের অবস্থানের কারণে সাংবিধানিক আদালত মুভ ফরোয়ার্ড পার্টিকে বিলুপ্ত করার পর তার উত্তরসূরি হিসেবে পিপলস পার্টি গঠিত হয়। প্রগতিশীল সমর্থনের ‘কমলা জোয়ার’ নিয়ে জয়ের আশা করেছিল দলটি।
কিন্তু ভোটাররা এমন ফল দিয়েছেন, যাকে বিশ্লেষকেরা ১৯৯৬ সালের পর ভোটের মাধ্যমে রক্ষণশীলদের প্রথম জয় বলছেন। এতে ভোটারদের অগ্রাধিকারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষের পর জাতীয়তাবাদী আবেগের উত্থান, ব্যাপক অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবং আনুতিনের প্রাদেশিক ক্ষমতার নেটওয়ার্ক কৌশলে একত্র করার সমন্বয়ে এই পালাবদল ঘটেছে। প্রত্যাশা ও ফলের ব্যবধান ছিল স্পষ্ট। ব্যাংককে পিপলস পার্টি নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখে রাজধানীর সব ৩৩টি আসনেই জিতেছে। তবে শহুরে সমর্থনকে গ্রামীণ এলাকায় জয়ে রূপ দিতে পারেনি দলটি। সেখানে ‘বান ইয়াই’ বা বড় বাড়ি নামে পরিচিত স্থানীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ভুমজাইথাইয়ের জোটগুলো ৫০০ সংসদীয় আসনের ৪০০টিতে প্রযোজ্য থাইল্যান্ডের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটপদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ আসন এনে দিয়েছে।
সীমান্ত সংঘাত ও জাতীয়তাবাদের ঢেউ
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সংসদ ভেঙে দেওয়ার আনুতিনের সিদ্ধান্ত প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিনও পার হওয়ার আগে তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন। সীমান্ত বিরোধ সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার ভূমিকার কারণে সাংবিধানিক আদালত তাঁকে সরিয়ে দিলে সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী হন আনুতিন। সংখ্যালঘু সরকারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হওয়ার বদলে তিনি বাজি ধরেছিলেন, কম্বোডিয়ার সঙ্গে দুই দফা প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর জেগে ওঠা জাতীয়তাবাদী আবেগ তাঁর দলকে জয় এনে দেবে।
সেই বাজি কাজে দিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই ও ডিসেম্বরে সীমান্তে সংঘর্ষে দুই পক্ষের বহু মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। এতে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগায় ভুমজাইথাই। জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রচারের মূল বিষয় করে আনুতিন কম্বোডিয়া সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন এবং বেসামরিক তদারকি ছাড়াই সীমান্ত এলাকায় সেনাবাহিনীকে স্বাধীনভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমতি দেন। গত সপ্তাহে সীমান্তবর্তী সিসাকেত প্রদেশে এক সমাবেশে আনুতিন দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার অঙ্গীকার করেন। বিতর্কিত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে নিজের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর, একসময় যা যা হারিয়েছিলাম, সবই আবার আমাদের কাছে ফিরে এসেছে।
থাইল্যান্ডের জাতীয় পতাকার সঙ্গে মিল রেখে দলের নীল রং দেশপ্রেমের বার্তাকে আরও জোরালো করেছে। থাই সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সক্ষম প্রার্থী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে সফল হন আনুতিন। অন্যদিকে, সেনাবাহিনী সংস্কারের আহ্বান জানানোয় প্রগতিশীল প্রতিদ্বন্দ্বীদের দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে বলে চিত্রিত করেন তিনি।
ধাক্কায় প্রগতিশীল আন্দোলন
পিপলস পার্টির পরাজয় থাইল্যান্ডের সংস্কারপন্থী আন্দোলনের জন্য বড় ধাক্কা। সেনাবাহিনীর প্রভাব কমানো, ব্যবসায়িক একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙা এবং শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আন্দোলনটি তরুণ ভোটারদের কল্পনায় জায়গা করে নিয়েছিল। ৩৮ বছর বয়সী দলীয় নেতা নাত্তাফং রুয়েংপানিয়াওয়ুত রোববার রাতে পরাজয় স্বীকার করেন। তিনি জানান, আনুতিনের নেতৃত্বাধীন কোনো জোটে যোগ না দিয়ে তাঁর দল বিরোধী দলে থাকবে। রোববার রাতে অশ্রুসিক্ত সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্যে দলীয় নেতা এই ধাক্কা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক সংস্কারের অঙ্গীকার ধরে রাখতে অনুসারীদের আহ্বান জানান।
আশা হারাবেন না। আমরা অনেক দূর এগিয়েছি।
প্রগতিশীলদের সমর্থন কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। গত সেপ্টেম্বরে সংবিধান সংস্কার ও আগাম নির্বাচনের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আনুতিনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উদ্যোগে সমর্থন দিয়েছিল দলটি। এতে রক্ষণশীল নেতা ক্ষমতাসীন থাকার সুবিধা পান, আর পিপলস পার্টির আদর্শিক স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাথিস লোহাতেপানন এটিকে বড় ভুল সিদ্ধান্ত বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এর ফলে আনুতিন রক্ষণশীল ভোট একত্র করতে পেরেছেন, আর প্রগতিশীলদের সংস্কারপন্থী ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া সেনাবাহিনী সংস্কার নিয়ে অবস্থান নরম করতে এবং ১১২ ধারা সংস্কারের বিষয়ে পূর্বসূরি দলের অবস্থান পুরোপুরি ত্যাগ করতে বাধ্য হয় পিপলস পার্টি। রাজতন্ত্রের সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা কঠোর এই আইনের পক্ষে সওয়াল করায় সাংবিধানিক আদালত মুভ ফরোয়ার্ড পার্টিকে বিলুপ্ত করেছিল। ফলে তার উত্তরসূরি দলটি বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়। এইভাবে র্যাডিক্যাল কর্মসূচি নরম করায় ২০২৩ সালে সমর্থকদের উদ্দীপ্ত করা স্পষ্ট ও আবেগঘন ইস্যুগুলো থেকে দলটি বঞ্চিত হয়। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে মধ্যপন্থী ভোটারদের আস্থাও অর্জন করতে পারেনি।
ফেউ থাইয়ের নাটকীয় পতন
এই নির্বাচন থাইল্যান্ডের নির্বাচনে দুই দশক ধরে আধিপত্য বিস্তারকারী রাজনৈতিক বংশের অবসানের ইঙ্গিত দিতে পারে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার প্রতিষ্ঠিত এবং পরে তাঁর বোন ইংলাক ও মেয়ে পেতংতার্নের নেতৃত্বাধীন ফেউ থাই পার্টির আসনসংখ্যা ২০২৩ সালের ১৪১ থেকে কমে প্রায় ৭৪ থেকে ৮৬-তে নেমে এসেছে। স্মরণকালের মধ্যে প্রথমবারের মতো সিনাওয়াত্রা পরিবারের শক্ত ঘাঁটি চিয়াং মাইয়ে কোনো আসনেই জিততে পারেনি দলটি।
পরিবারটির জন্য ঘটনাবহুল এক বছরের পর এই পতন ঘটল। দুর্নীতির দায়ে কারাদণ্ড ভোগ করতে ১৫ বছর স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকার পর ২০২৩ সালে থাইল্যান্ডে ফেরেন থাকসিন। তবে রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে তিনি আগাম মুক্তি পেতে পারেন বলে অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা। ২০২৩ সালের নির্বাচনের পর তাঁর মেয়ে পেতংতার্ন প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু সাবেক কম্বোডীয় নেতা হুন সেনের সঙ্গে ফাঁস হওয়া এক ফোনালাপের জেরে সাংবিধানিক আদালত তাঁকে বরখাস্ত করলে কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর মেয়াদ শেষ হয়। ফোনালাপে তিনি হুন সেনকে ‘চাচা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন এবং থাই সেনা কমান্ডারদের সমালোচনা করেছেন বলে মনে হয়েছিল।
ফেউ থাই ও রক্ষণশীল অভিজাতদের মধ্যে হওয়া বড় সমঝোতা থাকসিনের দেশে ফেরা ও তাঁর মেয়ের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ করে দিয়েছিল। কিন্তু এতে দলের ঐতিহ্যবাহী লাল শার্ট সমর্থকেরা বিচ্ছিন্ন হন; একই সঙ্গে বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ থেকেও দলটি স্থায়ী সুরক্ষা পায়নি। কম্বোডিয়া সংঘাত সামলানোর জন্য ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে দলটি। পরিবারের ঋণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানো এবং গত বছর প্রবৃদ্ধি মাত্র ১.৫ শতাংশে স্থবির থাকায় অর্থনীতি অব্যবস্থাপনার অভিযোগে তাদের অবস্থান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংস্কারের চেয়ে স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার ভোটারদের
ভোটাররা নিজেদের পছন্দ যাচাই করেছেন থাইল্যান্ডের মন্থর অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে। একসময় এশিয়ার অসুস্থ মানুষ হিসেবে পরিচিত দেশটি দীর্ঘদিনের ধীর প্রবৃদ্ধির সঙ্গে লড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন খাত এখনো মহামারির আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি, আর উৎপাদন খাত ভিয়েতনামসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। পরিবারের ঋণ ঐতিহাসিক উচ্চতায় উঠেছে, অন্যদিকে বাণিজ্য অংশীদারদের মুদ্রার তুলনায় বাতের মূল্য বাড়ায় রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ভোক্তা ভর্তুকি কর্মসূচি ও নগদ অর্থ বিতরণসহ জনতুষ্টিবাদী পদক্ষেপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে সক্ষম বাস্তববাদী অভিভাবক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেন আনুতিন। পরিচিত ও খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞদের পাশে রেখে তিনি দক্ষ ব্যবস্থাপনার ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন। এর বিপরীতে ছিল পিপলস পার্টির পরীক্ষিত নয় এমন আদর্শবাদ এবং ফেউ থাইয়ের সাম্প্রতিক ব্যর্থতা। অর্থমন্ত্রী একনিতি নিতিথানপ্রাপাস জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ভর্তুকি প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপসহ প্রণোদনা পরিকল্পনা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ইতিমধ্যে করেছেন।
অনেক ভোটারের কাছে আমূল পরিবর্তনের আহ্বানের চেয়ে স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সরকারি কর্মকর্তা ফানানিয়া বুনথং বিবিসিকে বলেন, অর্থনৈতিক উদ্বেগ তাঁর ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেশী দেশে কারখানা স্থানান্তর নিয়ে মধ্যবিত্তের মধ্যে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে। অনিশ্চিত সময়ে ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ভেঙে দেওয়া ও আমলাতন্ত্র পুনর্গঠনের পিপলস পার্টির উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি অনেকের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা বলে মনে হয়েছে। এর বিপরীতে আর্থিক সহায়তা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে আনুতিনের সহজ বার্তা তাৎক্ষণিক আশ্বাস দিয়েছে।
গণভোটের ফলে নতুন রাজনৈতিক ক্ষেত্র
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ২০১৪ সালের অভ্যুত্থানের পর সামরিক শাসনামলে প্রণীত ২০১৭ সালের সংবিধান প্রতিস্থাপন করা হবে কি না, সে বিষয়ে গণভোটে অংশ নেন থাই নাগরিকেরা। প্রাথমিক গণনায় দেখা গেছে, প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোটার নতুন সংবিধান প্রণয়নের পক্ষে মত দিয়েছেন। আইনসভার নির্বাচনে রক্ষণশীলদের জয়ের পরও এই ফল পরিবর্তনের পক্ষে স্পষ্ট জনসমর্থন নির্দেশ করে।
এই ফল নতুন সরকারের জন্য জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ১৯৩২ সালে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে থাইল্যান্ডে ২০টি সংবিধান হয়েছে; অধিকাংশ পরিবর্তনই এসেছে সামরিক হস্তক্ষেপের পর। বর্তমান সংবিধানে অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরোক্ষ প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সিনেট, যা ২০২৩ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেও মুভ ফরোয়ার্ড পার্টিকে সরকার গঠন করতে বাধা দিয়েছিল।
তবে সংসদে সবচেয়ে বড় দলীয় ব্লক ভুমজাইথাইয়ের হাতে এবং সিনেটে রক্ষণশীল মিত্রদের আধিপত্য থাকায় সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেবেন আনুতিন। সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরও দুটি গণভোটের প্রয়োজন হবে। ফলে যেকোনো পরিবর্তনে অন্তত দুই বছর লাগবে এবং তা রক্ষণশীলদের ভেটোর মুখে পড়তে পারে। প্রগতিশীলেরা সিনেটের ক্ষমতা কমানো এবং রাজনীতিতে বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ হ্রাসের আশা করছেন। তবে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেবে এমন আমূল পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছেন আনুতিন। নতুন সংবিধানের কাজ বিলম্বিত না করার অঙ্গীকার করে তিনি বলেছেন, সরকার জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করবে।
পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক সম্পর্ক
আনুতিনের জয়ের ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে। এশিয়ায় থাইল্যান্ডের সবচেয়ে পুরোনো মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং আনুতিনের পূর্বপুরুষদের দেশ চীনের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। চীনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নিউইয়র্কে আট বছর পড়াশোনা ও কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ব্যক্তিগত টান রয়েছে আনুতিনের, তবে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় কোনো পক্ষ নিতে চান না তিনি।
নির্বাচনী প্রচারের সময় টাইম সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন আনুতিন।
নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের সম্মত রীতিনীতির পাশে আমরা ধারাবাহিকভাবে থাকি। মেরুকৃত বিশ্বে যারা বাস্তববাদী ও নির্ভরযোগ্য থাকে, তাদের গুরুত্ব কমে না, বরং বাড়ে।
সীমান্ত বিরোধ মেটাতে মানচিত্র সমন্বয়ের মাধ্যমে কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেতের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকারও করেছেন তিনি। হুন মানেতকে অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও দক্ষ বলে বর্ণনা করেছেন আনুতিন। একই সঙ্গে বিতর্কিত এলাকায় থাইল্যান্ডের সামরিক অবস্থান বজায় রাখার কথাও বলেছেন। সম্প্রতি জালিয়াতি বলে নিন্দিত নির্বাচনের আয়োজন করা মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে সমর্থন না জানিয়ে যোগাযোগের পক্ষে আনুতিন। মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসিয়ান-নেতৃত্বাধীন সমাধান সমর্থন করেন তিনি। দেশের ভেতরে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পরিচালিত বহু কোটি ডলারের সাইবার প্রতারণার নেটওয়ার্ক দমনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ।
পরবর্তী সরকার গঠন
ভালো ফল করলেও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৫১টি আসন পায়নি ভুমজাইথাই। তাই জোট গঠনে আলোচনা করতে হবে। সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের নাম জানাতে রাজি হননি আনুতিন। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদিত ফলাফলের অপেক্ষায় আছেন তিনি। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কমিশনের হাতে ৬০ দিন সময় রয়েছে। ফল অনুমোদনের ১৫ দিনের মধ্যে স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের জন্য সংসদের অধিবেশন বসতে হবে।
ছোট কয়েকটি দল মিলে ১১৭টি আসন পেয়েছে। ক্লা থাম পার্টি প্রায় ৫৭টি আসন পেতে পারে, যা ফেউ থাইকে ছাড়াই সরকার গঠনে আনুতিনের জন্য যথেষ্ট সমর্থন জোগাতে পারে। তবে ভুমজাইথাইয়ের সঙ্গে আগের জোট এবং সংসদীয় হিসাব-নিকাশের কারণে ফেউ থাইও সম্ভাব্য জোটসঙ্গী। আনুতিনের নেতৃত্বাধীন কোনো সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে নাকচ করে বিরোধী দলে শক্ত অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে পিপলস পার্টি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ক্ষমতা সংহত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন আনুতিন। ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অর্থ, পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রীদের দায়িত্বে রাখতেও পারেন তিনি। জয়ের ব্যাপ্তি বিনিয়োগকারীদের কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা দিতে পারে। ফল ঘোষণার পর থাই শেয়ারবাজার ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যাংককভিত্তিক থাইল্যান্ড ফিউচার থিংক ট্যাংকের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাপন জাতুসরিপিতাক বলেন, এই জয়ের ব্যাপ্তি থাই সরকারগুলোকে ভোগানো দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার অবসান ঘটাতে পারে।
অনেক দিন পর প্রথমবারের মতো, সম্ভবত আমরা এমন একটি সরকার পেতে যাচ্ছি, যার কার্যকরভাবে দেশ চালানোর মতো যথেষ্ট ক্ষমতা থাকবে।
এক নজরে
- আনুতিন চার্নভিরাকুলের ভুমজাইথাই পার্টি থাইল্যান্ডের ৫০০ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে প্রায় ১৯২-১৯৪টি আসন পেয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ
- প্রগতিশীল পিপলস পার্টি প্রায় ১১৬-১১৮টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় হয়েছে। পরাজয় মেনে নিয়ে জোটে যোগ না দিয়ে বিরোধী দলে থাকার অঙ্গীকার করেছে
- সিনাওয়াত্রা পরিবারের দল ফেউ থাই প্রায় ৭৪-৮৬টি আসন নিয়ে তৃতীয় স্থানে নেমেছে, যা দুই দশকের মধ্যে তাদের সবচেয়ে খারাপ ফল
- একই সময়ে ভোটাররা গণভোটে ২০১৭ সালের সামরিক শাসনামলে প্রণীত সংবিধান প্রতিস্থাপনের পক্ষে প্রায় ৬৫ শতাংশ সমর্থন দিয়েছেন
- কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতের পর জাতীয়তাবাদী মনোভাব কাজে লাগাতে দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিন না যেতেই আগাম নির্বাচন ডাকেন আনুতিন
- রক্ষণশীলদের এই জয় ১৯৯৬ সালের পর প্রথম, যখন রাজতন্ত্রপন্থী কোনো দল জাতীয় নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পেয়েছে
- অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও পরিবারের ঋণ ছিল ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ; আমূল সংস্কারের দাবির চেয়ে স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তাঁরা
- ২৫১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছাতে আনুতিনের জোটসঙ্গী দরকার; কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আলোচনা শেষ হতে পারে






