গুণগত পর্যটনে জোর দেওয়ার সুফল, সিঙ্গাপুরে পর্যটকদের ব্যয় রেকর্ড ২৩.৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার

পড়তে 11 মিনিট
গুণগত পর্যটনে জোর দেওয়ার সুফল, সিঙ্গাপুরে পর্যটকদের ব্যয় রেকর্ড ২৩.৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার

বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিকূলতার মধ্যেও পর্যটন আয় রেকর্ড গড়েছে

সিঙ্গাপুরের পর্যটন খাত ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে পর্যটকদের ব্যয় রেকর্ড ২৩.৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে (১৮.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) পৌঁছেছে। সিঙ্গাপুর ট্যুরিজম বোর্ড (এসটিবি) ৩ ফেব্রুয়ারি জানায়, ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় এই অঙ্ক ৬.৫ শতাংশ বেশি। নয় মাসের সময়সীমায় পর্যটন আয় হিসেবে এটিই সর্বোচ্চ। এই জোরালো ফলাফলে নগররাষ্ট্রটি পুরো বছরের জন্য নির্ধারিত ২৯ বিলিয়ন থেকে ৩০.৫ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে পুরো বছরের আয় রেকর্ড ২৯.৮ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে পৌঁছেছিল।

সূচিপত্র
  1. বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিকূলতার মধ্যেও পর্যটন আয় রেকর্ড গড়েছে
  2. অভিজ্ঞতানির্ভর অর্থনীতিতে বদলাচ্ছে ব্যয়ের ধরন
  3. প্রধান বাজারগুলো থেকে আয় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে
  4. বিশ্বমানের আয়োজন ও অবকাঠামোর বিস্তার
  5. ব্যবসায়িক আয়োজন থেকে মিলছে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুফল
  6. পর্যটন ২০৪০: সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার
  7. বিশ্ব অনিশ্চয়তার মধ্যে ২০২৬ নিয়ে সতর্ক পূর্বাভাস
  8. ডিজিটাল উদ্ভাবন ও টেকসই প্রবৃদ্ধি
  9. সারকথা

প্রবৃদ্ধির এই ধারা গণপর্যটন থেকে সরে এসে শিল্পবিশেষজ্ঞদের ভাষায় ‘গুণগত পর্যটন’-এর দিকে সচেতন কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতিফলন। ২০২৫ সালে ১৬.৯ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক পর্যটক সিঙ্গাপুরে এলেও আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা মাত্র ২.৩ শতাংশ বেশি। ২০১৯ সালে মহামারিপূর্ব সর্বোচ্চ ১৯.১ মিলিয়ন পর্যটক আগমনের চেয়েও এই সংখ্যা কম। তবে পর্যটকপ্রতি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পর্যটকসংখ্যা ও ব্যয়ের এই ব্যবধান দেখায়, প্রচলিত দর্শনীয় স্থান ঘোরার বদলে নিবিড় অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেন—এমন বেশি ব্যয়কারী পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে সিঙ্গাপুর সফল হয়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় পর্যটকপ্রতি ব্যয় বেড়েছে ২৪.৪ শতাংশ।

অভিজ্ঞতানির্ভর অর্থনীতিতে বদলাচ্ছে ব্যয়ের ধরন

পর্যটন আয়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভ্রমণ বাজেট বণ্টনের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। খাবার ও পানীয় খাতে ব্যয় প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। বছরওয়ারি এই ব্যয় বেড়েছে ১৫ শতাংশ; একই হারে বেড়েছে দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ, বিনোদন ও গেমিং খাতের ব্যয়। চীনা পর্যটকেরা এই প্রবণতার দৃষ্টান্ত। তাদের খাবার ও পানীয় খাতে ব্যয় ১৯ শতাংশ বেড়েছে, যা ওই বাজার থেকে সামগ্রিক ভোগব্যয় বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। নয় মাসে চীনা পর্যটকদের কাছ থেকে আয় হয়েছে ৩.৬৮ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার।

এই পরিবর্তন মহামারিপূর্ব ব্যয়ের ধরন থেকে স্পষ্ট বিচ্যুতি। ২০১৯ সালের তুলনায় খাবার ও পানীয় খাতে পর্যটন আয় ৭১ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে কেনাকাটায় ব্যয় কমেছে ৭.৮ শতাংশ এবং আবাসন খাতের আয় কমেছে ৭ শতাংশ। ই-কমার্সের প্রসারে কেনাকাটার জন্য পর্যটনের আকর্ষণ কমে যাওয়া এবং অনলাইনে পাওয়া যায় না—এমন খাঁটি, সরাসরি অভিজ্ঞতার প্রতি ভ্রমণকারীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহসহ শিল্পখাতের বৃহত্তর পরিবর্তন এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে। মিশেলিন-তারকাপ্রাপ্ত হকার স্টলে খাওয়া, বিশেষ কনসার্টে যোগ দেওয়া এবং বন্য প্রাণীর সঙ্গে দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতায় অংশ নেওয়ার মতো আয়োজন এখন পর্যটকদের বাজেটের বড় অংশ দখল করছে; ঐতিহ্যবাহী বিলাসবহুল কেনাকাটার তুলনায় এগুলোর গুরুত্ব বেড়েছে। সিঙ্গাপুরের ইউনেসকো-স্বীকৃত হকার সংস্কৃতি ও বিস্তৃত রন্ধনশৈলীর সঙ্গে এই প্রবণতা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

প্রধান বাজারগুলো থেকে আয় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে

মূল ভূখণ্ডের চীন, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে মূল্যবান পর্যটন বাজার হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। নয় মাসে এসব বাজার থেকে যথাক্রমে ৩.৬৮ বিলিয়ন, ২.০৯ বিলিয়ন ও ১.৫৪ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার আয় হয়েছে। এসব অঙ্কে লাভজনক দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ, বিনোদন ও গেমিং খাত অন্তর্ভুক্ত নয়। সমন্বিত রিসোর্টের কার্যক্রম হিসাব করলে এই বাজারগুলো থেকে মোট ব্যয় যে আরও অনেক বেশি, তা থেকে বোঝা যায়।

অস্ট্রেলিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য ফল এসেছে। ২০২৫ সালে দেশটি থেকে রেকর্ড ১.৩ মিলিয়ন পর্যটক এসেছেন, যা আগের বছরের চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি। ভারত থেকেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। দেশটি থেকে ১.২ মিলিয়ন পর্যটকের আগমনে পর্যটন আয় হয়েছে ১.১৭ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি। ১ লাখ ৩০ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইউপিআই পেমেন্ট চালু, ইন্ডিগো ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ৬০ বছর উদ্‌যাপনে “Just Between Us Friends” প্রচারণাসহ লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ ভারতীয় বাজারে সহায়ক হয়েছে। নিকেলোডিয়নের সঙ্গে “FamJam in Singapore” উদ্যোগটি পরিবারকেন্দ্রিক কনটেন্টের অভিনব সমন্বয়ের জন্য GEMA Asia Awards 2025-এ স্বর্ণপদক পেয়েছে।

তবে আঞ্চলিক সব বাজারে প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি। ভ্রমণ ব্যয়ের বিষয়ে বেশি মূল্য-সংবেদনশীলতার কারণে ভিয়েতনাম থেকে পর্যটকসংখ্যা ২০২৪ সালের ৩৯৩ হাজার থেকে কমে ৩৪৪ হাজার হয়েছে। একইভাবে, আগের বছর বড় পরিসরের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের কারণে পর্যটকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পর স্বাভাবিক পর্যায়ে ফেরায় ফিলিপাইন থেকে আগমন ৭৭৯ হাজার থেকে কমে ৭২৬ হাজার হয়েছে। এই পতনের বিপরীতে জাপান (১০ শতাংশ), মালয়েশিয়া (৮ শতাংশ), জার্মানি (৫ শতাংশ) ও যুক্তরাষ্ট্র (৪ শতাংশ) থেকে স্বাস্থ্যকর প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ দূরত্বের পর্যটকদের নিয়ে বৈচিত্র্যময় বাজারভিত্তি তৈরি হয়েছে।

বিশ্বমানের আয়োজন ও অবকাঠামোর বিস্তার

সিঙ্গাপুরের অনুষ্ঠানমালা বেশি ব্যয়কারী পর্যটক আকৃষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফর্মুলা ১ সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস সিঙ্গাপুর গ্রাঁ প্রিতে তিন দিনে মোট ৩ লাখ ৬৪১ জন দর্শক উপস্থিত ছিলেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১১.৭ শতাংশ বেশি। লেডি গাগার সফরের একমাত্র সিঙ্গাপুর আয়োজন এবং ব্ল্যাকপিংক ও সেভেন্টিনের কনসার্টে হাজারো আন্তর্জাতিক ভক্ত এসেছেন। তাঁদের অনেকে আবাসন ও খাবারের প্যাকেজের জন্য বেশি দাম দিতে রাজি ছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক শিল্পমেলা ART SG-তে ৩০টি দেশের ১০৫টি গ্যালারি অংশ নেয়। সিঙ্গাপুর আর্ট উইকে মেলাটি ৪১ হাজারের বেশি দর্শক টানে।

নতুন আকর্ষণগুলোও গন্তব্যটির আবেদন বাড়িয়েছে। রেইনফরেস্ট ওয়াইল্ড এশিয়া নগররাষ্ট্রটির পঞ্চম বন্য প্রাণী উদ্যান এবং এশিয়ার প্রথম দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতাভিত্তিক চিড়িয়াখানা হিসেবে চালু হয়েছে। এতে রয়েছে ওয়াইল্ড অ্যাপেক্স অ্যাডভেঞ্চার আরোহণের সুবিধা এবং AIA Vitality Bounce নেট। রিসোর্টস ওয়ার্ল্ড সেন্টোসার সিঙ্গাপুর ওশেনারিয়াম এবং মান্দাই ওয়াইল্ডলাইফ রিজার্ভের কিউরিওসিটি কোভ—৩০টির বেশি অভিজ্ঞতাভিত্তিক আয়োজনসহ সিঙ্গাপুরের বৃহত্তম ইনডোর খেলার জগৎ—অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য আরও বাড়িয়েছে। গার্ডেনস বাই দ্য বে-র ক্লাউড ফরেস্টে জুরাসিক ওয়ার্ল্ড: দ্য এক্সপেরিয়েন্স চালু হয়েছে। ইমারসিভ প্রদর্শনী ও চরিত্রনির্ভর ভ্রমণ আয়োজন নিয়ে আবার খুলেছে চায়নাটাউন হেরিটেজ সেন্টার।

আতিথেয়তা খাতে নতুন করে ৬৪৪টি হোটেল কক্ষ যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে র‍্যাফেলস সেন্টোসা সিঙ্গাপুর—দেশটির প্রথম শুধু ভিলাভিত্তিক বিলাসবহুল আবাসন এবং দ্বিতীয় র‍্যাফেলস হোটেল—পাশাপাশি মান্দাই রেইনফরেস্ট রিসোর্ট বাই বানিয়ান ট্রি, রিসোর্টস ওয়ার্ল্ড সেন্টোসার দ্য লরাস এবং মামা শেল্টার। ক্রুজ খাতেও জোরালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জাহাজ এসেছে ৩৭৫টি, যা বছরওয়ারি ১০ শতাংশ বেশি। যাত্রীসংখ্যা ৯ শতাংশ বেড়ে ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। রয়্যাল ক্যারিবিয়ান ইন্টারন্যাশনালের Ovation of the Seas এবং The Ritz-Carlton Yacht Collection-এর Luminara-সহ নতুন কয়েকটি জাহাজ সিঙ্গাপুরে তাদের কার্যক্রমের ঘাঁটি করেছে। এতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শীর্ষ ক্রুজ কেন্দ্র হিসেবে সিঙ্গাপুরের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়িক আয়োজন থেকে মিলছে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুফল

সভা, প্রণোদনামূলক ভ্রমণ, সম্মেলন ও প্রদর্শনী (মাইস) খাত সিঙ্গাপুরের গুণগত পর্যটন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়িক আয়োজনে আসা পর্যটকেরা সাধারণত অবকাশযাপনকারীদের দ্বিগুণ ব্যয় করেন। ফলে প্রতিবার আগমনে পর্যটন আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই খাতের মূল্য বিশেষভাবে বেশি। ২০২৫ সালে সান ফার্মা স্টার ক্লাব অ্যাওয়ার্ডসে ভারত থেকে ৬,১০০ জন অংশ নেন। ওই বাজার থেকে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় সভা ও প্রণোদনামূলক ভ্রমণ আয়োজন।

মিলকেন ইনস্টিটিউট এশিয়া সামিট, যা ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ITMA Asia + CITME এবং এশিয়ায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত HealthTechX Asia 2025 ও LSI Asia 2025-এর মতো বড় ব্যবসায়িক আয়োজন করপোরেট অনুষ্ঠানমালাকে সমৃদ্ধ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অ্যান্ড কনভেনশন অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রথম হয়েছে সিঙ্গাপুর। এতে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক আয়োজনের গন্তব্য হিসেবে এর অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে। পর্যটন শিল্প সম্মেলন ২০২৫-এ টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রী এবং বাণিজ্য সম্পর্কবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী গ্রেস ফু ব্যবসায়িক আয়োজনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন।

অবকাশযাপনকারীদের তুলনায় মাইস পর্যটকেরা দ্বিগুণ ব্যয় করেন, তাই সিঙ্গাপুরের জন্য এই খাতের মূল্য বিশেষভাবে বেশি।

সামনের দিকে এসটিবি ২০৪০ সালের মধ্যে মাইস থেকে পর্যটন আয় তিন গুণ করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মোট পর্যটন আয়ে এই খাতের অবদান ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১০ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ডাউনটাউন এলাকায় একটি বিশেষায়িত মাইস হাব গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাই, নতুন আন্তর্জাতিক আয়োজন গড়ে তুলতে SACEOS-এর সঙ্গে Business Events Inspired পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালু এবং দেশীয়ভাবে তৈরি আয়োজনের জন্য Kickstart Fund-এর সহায়তা তিন বছর থেকে বাড়িয়ে চার বছর করার পরিকল্পনা রয়েছে। মাইস আয়োজনের সম্ভাব্য গ্রাহক খুঁজতে ব্যবসা উন্নয়নের খরচ কমাতে সহায়তা করে Business Event in Singapore (BEiS) Build Foundation প্রণোদনা কর্মসূচি।

পর্যটন ২০৪০: সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার

সিঙ্গাপুরের রেকর্ড গড়া ফলাফল পর্যটন ২০৪০ রোডম্যাপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বছরে ৪৭ বিলিয়ন থেকে ৫০ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার পর্যটন আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এই রোডম্যাপ। দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনায় পর্যটকের নিছক সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি ও বেশি ব্যয়কারী পর্যটকদের স্পষ্টভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কৌশলটি কার্যকর বলেই মনে হচ্ছে: মোট পর্যটক আগমন মহামারিপূর্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে না পৌঁছালেও ২০১৯ সালের তুলনায় পর্যটকপ্রতি ব্যয় ২৪.৪ শতাংশ বেড়েছে।

সিঙ্গাপুর ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী মেলিসা ও বলেন, ২০২৫ সালের ফলাফল এই স্বতন্ত্র কৌশলের সাফল্য তুলে ধরে।

২০২৫ সালে পর্যটন আয়ে শক্তিশালী ফল আমাদের পর্যটন ২০৪০-এর লক্ষ্যের দিকে স্থিরভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। সিঙ্গাপুরের বিশেষ অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেন—এমন পর্যটকদের আমরা আকৃষ্ট করছি। প্রবৃদ্ধির এই গতি ধরে রাখতে এবং গন্তব্য হিসেবে আমাদের আবেদন ও বৈশ্বিক কেন্দ্রের মর্যাদা আরও জোরালো করতে আমরা স্বতন্ত্র পণ্য, অনুষ্ঠান ও অভিজ্ঞতার শক্তিশালী আয়োজন-ধারা গড়ে তুলব।

হোটেল খাতে গড় কক্ষ-দখলের হার ছিল ৮১.৯ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের ৮১.৪ শতাংশের চেয়ে বেশি। একই সময়ে হোটেল কক্ষের ৭৩ শতাংশের বেশি টেকসই সনদ পেয়েছে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের জন্য নির্ধারিত ৬০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। উদ্দেশ্যনির্মিত ছয়টি মাইস ভেন্যুই সনদ পেয়েছে এবং SACEOS-এর ৮০ শতাংশের বেশি সদস্য টেকসই সনদ অর্জন করেছেন। এসব সূচক থেকে বোঝা যায়, শুধু পর্যটকসংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করা গন্তব্যগুলোতে যে অতিরিক্ত ভিড়ের সমস্যা দেখা দেয়, তা ছাড়াই সক্ষমতার স্বাস্থ্যকর ব্যবহার হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব অনিশ্চয়তার মধ্যে ২০২৬ নিয়ে সতর্ক পূর্বাভাস

২০২৫ সালের রেকর্ড ফলাফলের পরও ২০২৬ সাল নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এসটিবি। সংস্থাটি ১৭ মিলিয়ন থেকে ১৮ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমনের পূর্বাভাস দিয়েছে এবং পর্যটন আয় ৩১ বিলিয়ন থেকে ৩২.৫ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার হবে বলে ধারণা করছে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের ধরনকে প্রভাবিত করছে; এই পূর্বাভাসে তা প্রতিফলিত হয়েছে। ডিবিএস ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ চুয়া হান তেং বলেন, বেশি ব্যয়কারী পর্যটকদের আকৃষ্ট করার সিঙ্গাপুরের কৌশল সুফল দিচ্ছে। আগমনের সতর্ক পূর্বাভাস দুর্বলতার নয়, বরং বাস্তবতার প্রতিফলন।

ব্যয়ের গতি ধরে রাখার লক্ষ্যে ২০২৬ সালের আয়োজনসূচিতে কয়েকটি বড় আকর্ষণ রয়েছে। কে-পপ তারকা দল বিটিএস সিঙ্গাপুরে চার রাত পরিবেশনা করবে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বাইরে এশিয়ায় এটিই হবে তাদের দীর্ঘতম অবস্থান। ডিজনি ক্রুজ লাইন নগররাষ্ট্রটিকে এশিয়ায় তাদের প্রথম কার্যক্রমের ঘাঁটি করবে, যেখানে থাকবে Disney Adventure। সার্ক দ্যু সোলেইয়ের KOOZA দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের একমাত্র আয়োজন নিয়ে ফিরছে। ফর্মুলা ১ সূচিতে যুক্ত হবে নতুন স্প্রিন্ট রেস। হারবালাইফ এক্সট্রাভ্যাগাঞ্জায় ২৫ হাজার অংশগ্রহণকারী আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা সিঙ্গাপুরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সভা ও প্রণোদনামূলক আয়োজন হবে। অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তাদের বার্ষিক সম্মেলন করেছে। ৪০ বছরের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এই প্রথম সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হলো।

বিশ্লেষকদের মতে, সিঙ্গাপুরের বৈচিত্র্যময় বাজারভিত্তি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক মন্দার বিরুদ্ধে স্থিতিস্থাপকতা জোগায়। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ দূরত্বের বাজার থেকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে পর্যটক আসায় কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়াতে পারে গন্তব্যটি। এনইউএস বিজনেস স্কুলের বিপণন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. সামের এল হাজ্জার বলেন, সিঙ্গাপুর এখন পুনরুদ্ধারের আরও পরিণত পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও পর্যটকের অভিজ্ঞতার জন্য পর্যটন থেকে কী পাওয়া উচিত, তা টেকসইভাবে আরও পরিমার্জন করছে দেশটি।

বিজ্ঞাপন

ডিজিটাল উদ্ভাবন ও টেকসই প্রবৃদ্ধি

প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ সিঙ্গাপুরের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। এসটিবির “We don't wait for fun” প্রচারণায় দ্রুতগতির ডিজিটাল গল্প বলার মাধ্যমে এবং Spotify, Grab ও Skyscanner-এর সঙ্গে অংশীদারত্বে জেন জেড ও মিলেনিয়াল প্রজন্মের পর্যটকদের লক্ষ্য করা হয়েছে। এতে স্বীকার করা হয়েছে, ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী পর্যটকেরা এখন আন্তর্জাতিক আগমনের ৪০ শতাংশের বেশি। কোল্ডপ্লের “Man In The Moon”, বিটিএসের জিনের “Don't Say You Love Me” এবং ব্ল্যাকপিংকের জিসুর “Your Love” গান নিয়ে সংগীত ভিডিওসহ ব্র্যান্ডেড বিনোদনমূলক অংশীদারত্বে সিঙ্গাপুরকে তুলে ধরা হয়েছে। এতে শতাধিক স্থানীয় প্রতিভার কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বড় পরিসরে অবকাঠামো বিনিয়োগ চলছে। মেরিনা বে স্যান্ডস ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অতি-বিলাসবহুল সম্প্রসারণকাজ শুরু করেছে। এতে থাকবে ৫৭০টি স্যুইট, ২ লাখ বর্গফুটের প্রিমিয়াম সভাকক্ষ এবং ১৫ হাজার আসনের একটি মঞ্চ। মেরিনা বে ক্রুজ সেন্টার সিঙ্গাপুরের ৪০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের সম্প্রসারণকাজ শেষ হয়েছে। এতে যাত্রী ধারণক্ষমতা ৬,৮০০ থেকে বেড়ে ১১,৭০০ হয়েছে। Porsche Experience Centre Singapore ২০২৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু করেছে, চালুর লক্ষ্য ২০২৭ সালে। এদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে মেরিনা সাউথে ১ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের সুস্থতাকেন্দ্রিক আকর্ষণ গড়ে তুলতে Therme Group দরপত্রে নির্বাচিত হয়েছে। এতে বছরে ২০ লাখ পর্যটক আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের গ্লোবাল ডেস্টিনেশন সাসটেইনেবিলিটি ইনডেক্সে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শীর্ষে এবং বিশ্বে সপ্তম হয়েছে সিঙ্গাপুর, আগের বছরের তুলনায় ১০ ধাপ এগিয়ে। Tourism Leadership Excellence and Advancement Programme (T-LEAP)-এ ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের ৭৫ জন অংশগ্রহণকারী নেতৃত্ব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। NTUC LearningHub-এর সঙ্গে অংশীদারত্বে টেকসই উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও সেবার উৎকর্ষ বিষয়ে ১,২০০টির বেশি প্রশিক্ষণ-সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুর ট্যুরিজম অ্যাক্সিলারেটরের সহায়তায় প্রযুক্তি পরীক্ষামূলক উদ্যোগের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এমন সমাধানও ছিল, যা হোটেলের বিক্রয়-সংক্রান্ত সম্ভাব্য গ্রাহক খুঁজতে প্রয়োজনীয় সময় ৮০ শতাংশ কমিয়েছে। প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি উদ্ভাবনে খাতটির অঙ্গীকার এতে স্পষ্ট।

সারকথা

  • ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে সিঙ্গাপুরের পর্যটন আয় রেকর্ড ২৩.৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৬.৫ শতাংশ বেশি। পুরো বছরের আয় ২৯ বিলিয়ন থেকে ৩০.৫ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।
  • আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন ১৬.৯ মিলিয়নে পৌঁছেছে। ২০১৯ সালের পর থেকে পর্যটকপ্রতি ব্যয় বেড়েছে ২৪.৪ শতাংশ, যা গুণগত পর্যটন কৌশলের সাফল্য তুলে ধরে।
  • খাবার ও পানীয় খাতে বছরওয়ারি ব্যয় ১৫ শতাংশ বেড়েছে; দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ, বিনোদন ও গেমিং খাতেও একই হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কেনাকাটা থেকে অভিজ্ঞতামুখী পর্যটনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত এটি।
  • পর্যটন আয়ে চীন, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া শীর্ষ তিনটি বাজার হিসেবে রয়েছে। গেমিং আয় বাদে এ তিন বাজার থেকে মোট ৭.৩১ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার এসেছে।
  • ব্যবসায়িক পর্যটকেরা অবকাশযাপনকারী পর্যটকদের দ্বিগুণ ব্যয় করায় মাইস খাত বেশি আয়ের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। ২০৪০ সালের মধ্যে এই খাতের আয় তিন গুণ করার লক্ষ্য এসটিবির।
  • বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ২০২৬ সালের পর্যটন আয় ৩১ বিলিয়ন থেকে ৩২.৫ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এসটিবি। পর্যটক আগমনের লক্ষ্য ১৭ মিলিয়ন থেকে ১৮ মিলিয়ন।
  • স্বতন্ত্র পণ্য, টেকসই উন্নয়নে নেতৃত্ব এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনের মাধ্যমে ২০৪০ সালের মধ্যে বার্ষিক পর্যটন আয় ৪৭ বিলিয়ন থেকে ৫০ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য সিঙ্গাপুরের পর্যটন ২০৪০ কৌশলের।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে