দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডিজিটাল অবকাঠামোয় যুগান্তকারী বিনিয়োগ
সিঙ্গাপুরভিত্তিক ডিজিটাল এজ ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির বৃহত্তম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-প্রস্তুত ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাসগুলোর একটি নির্মাণে ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। জাকার্তার পূর্ব প্রান্তে বেকাসির জিআইআইসি শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত সিজিকে ক্যাম্পাসটি কোম্পানির ইতিহাসে একক বৃহত্তম অবকাঠামো বিনিয়োগ। একই সঙ্গে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের গতি সঞ্চারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূচিপত্র
সম্পূর্ণ চালু হলে এ স্থাপনার তথ্যপ্রযুক্তি সক্ষমতা হবে ৫০০ মেগাওয়াট। এর নকশায় সক্ষমতা এক গিগাওয়াটে উন্নীত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ কারণে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম হাইপারস্কেল স্থাপনাগুলোর মধ্যে স্থান পাবে ক্যাম্পাসটি। জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিংয়ের কাজ এবং এন্টারপ্রাইজ ক্লাউড সেবার বিপুল গণনাগত চাহিদা মেটানোর জন্য বিশেষভাবে এটি নকশা করা হয়েছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক বিকল্প সম্পদ ব্যবস্থাপক স্টোনপিক পার্টনার্সের পোর্টফোলিও কোম্পানি হিসেবে পরিচালিত ডিজিটাল এজ ২০২০ সালের আগস্টে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এশিয়ার ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নয়টি দেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে নির্মাণাধীন বা চালু থাকা প্রকল্প মিলিয়ে তাদের নিশ্চিত আইটি বিদ্যুৎ সক্ষমতা ১.৪ গিগাওয়াটের বেশি।
ডিজিটাল এজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জন ফ্রিম্যান এ ঘোষণাকে প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কৌশলের এক নির্ধারক মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেছেন। ইন্দোনেশিয়ায় ডিজিটাল সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়ার সময়ে এ বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। এতে স্থানীয়ভাবে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা মেটাতে দেশীয় অবকাঠামো হিমশিম খাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার উন্নয়নের বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন এ ঘোষণা। বড় জনসংখ্যা, বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগের জন্য কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান রয়েছে এমন বাজারগুলোতে বিনিয়োগের অর্থ ক্রমেই বেশি প্রবাহিত হচ্ছে। ২৭ কোটির বেশি জনসংখ্যা এবং বাড়তে থাকা ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে ইন্দোনেশিয়া অবকাঠামো বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতা ও জটিল নিয়ন্ত্রক কাঠামো এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ডিজিটাল অবকাঠামোর প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতাও এ প্রকল্পে স্পষ্ট। প্রযুক্তি অবকাঠামোয় উল্লেখযোগ্য প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ইন্দোনেশিয়া তার বাজারের আকার ও কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগাচ্ছে।
এআই যুগের উপযোগী প্রকৌশল: কারিগরি বিবরণ
উন্নত কম্পিউটিংয়ের কাজের উপযোগী বৈশিষ্ট্যের কারণে সিজিকে ক্যাম্পাসটি আলাদা। এর নকশার কেন্দ্রে রয়েছে ১.২৫ পাওয়ার ইউসেজ ইফেক্টিভনেস (পিইই) অনুপাত অর্জনের লক্ষ্য। ডেটা সেন্টারের জ্বালানি দক্ষতা মাপার এ সূচকে স্থাপনার মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকে শুধু কম্পিউটিং যন্ত্রপাতির ব্যবহৃত বিদ্যুতের সঙ্গে তুলনা করা হয়। ১.০-এর কাছাকাছি পিইই তাত্ত্বিকভাবে নিখুঁত দক্ষতা বোঝায়। তাই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ায় এত বড় স্থাপনার জন্য ১.২৫ একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য।
এ দক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ক্যাম্পাসে সরাসরি চিপে তরল শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে। এতে পুরো সার্ভার কক্ষ ঠান্ডা করার বদলে শীতলকারী তরল সরাসরি প্রসেসরে পৌঁছায়। প্রচলিত শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার তুলনায় এ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার অনেক কমে আসে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণ হার্ডওয়্যারে সাধারণত যে উচ্চ তাপঘনত্ব তৈরি হয়, তা সামলানো যায়। স্থাপনায় পুনর্ব্যবহৃত পানির ব্যবস্থা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংযোগও থাকবে। হাইপারস্কেল গ্রাহকদের সাইট নির্বাচনে টেকসইতার বিষয়টি ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ক্যারিয়ার-নিরপেক্ষ নকশার কারণে একাধিক টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদানকারী ও ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ অপারেটর স্থাপনার ভেতরে আন্তঃসংযোগ করতে পারবে। এতে কোনো একটি বিক্রেতার ওপর নির্ভরশীলতা এড়ানো যাবে এবং গ্রাহকেরা বিভিন্ন সংযোগের বিকল্প পাবেন। বিশ্বব্যাপী ক্লাউড সেবা প্রদানকারী ও নিরবচ্ছিন্ন বিকল্প নেটওয়ার্ক পথ প্রয়োজন এমন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য তৈরি হাইপারস্কেল ক্যাম্পাসে এ ধরনের নকশা এখন প্রচলিত মানদণ্ড।
ডিজিটাল এজ ইন্দোনেশিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টেফানুস অস্কার বলেন, দেশীয় বাজারে সরবরাহের গুরুতর ঘাটতি মেটাতে এ স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতি অবকাঠামো নির্মাণের সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। এতে ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ও ডিজিটাল সেবার মান সীমিত হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতি অবকাঠামো সম্প্রসারণের গতির চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। হাইপারস্কেল ও এআই কার্যক্রমের জন্য নির্মিত ৫০০ মেগাওয়াটের টেকসই, ক্যারিয়ার-নিরপেক্ষ সক্ষমতার মাধ্যমে সিজিকে ক্যাম্পাস এ ব্যবধান ঘোচাবে। এআই যখন এন্টারপ্রাইজ ও ক্লাউড সেবার ভবিষ্যৎ গড়ছে, তখন ডিজিটাল এজ এ রূপান্তরের অগ্রভাগে রয়েছে।
কৌশলগত অবস্থান ও নেটওয়ার্ক সংযোগ
বেকাসির জিআইআইসি শিল্পাঞ্চল নির্বাচন করার পেছনে ভৌগোলিক, ভূতাত্ত্বিক ও নেটওয়ার্ক বিন্যাসসংক্রান্ত বিষয়গুলো সতর্কভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। মধ্য জাকার্তায় ডিজিটাল এজের বিদ্যমান ইডিজিই১ ও ইডিজিই২ স্থাপনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এবং অন্যান্য বড় ডেটা সেন্টার ক্লাস্টার থেকে ১৫ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত ক্যাম্পাসটি। ফলে যাতায়াতের সুবিধা এবং সম্প্রসারণের জন্য জায়গা, দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য রয়েছে।
বিদ্যমান অবকাঠামোর কাছাকাছি হওয়ায় জাকার্তার প্রধান ব্যবসায়িক এলাকাগুলোর সঙ্গে কম বিলম্বের সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এটি আরও বিস্তৃত জাতীয় ডিজিটাল ব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে উঠবে। পশ্চিম জাভা প্রদেশের অংশ বেকাসি রাজধানী অঞ্চলের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত। ফলে শহরের কেন্দ্রস্থলে নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত জমির সীমাবদ্ধতা ও আবাসন ব্যয় এড়িয়েও জাকার্তা মহানগর এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়।
ডিজিটাল এজের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন ইন্দোনেশীয় টেলিযোগাযোগ সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্দোনেট ক্যাম্পাসে সংযোগ দেবে। প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি ভূগর্ভস্থ নির্মাণপদ্ধতিতে জিআইআইসি ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য বিশেষ ফাইবার রুট তৈরি করেছে। আকাশপথে স্থাপিত তারের তুলনায় এ নকশা ভৌত নিরাপত্তা ও দুর্যোগ-সহনশীলতা বাড়ায়। আকাশপথের তার আবহাওয়ার বিপর্যয়, যানবাহন দুর্ঘটনা ও ইচ্ছাকৃত ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকে।
প্রচলিত আকাশপথের সংযোগের তুলনায় ভূগর্ভস্থ ফাইবার স্থাপনে উল্লেখযোগ্য মূলধন বিনিয়োগ দরকার। এ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ কাজের নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনার ওপর ডিজিটাল এজের গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে। একক কোনো সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে যাতে পুরো ব্যবস্থা অচল না হয়, সে জন্য বিকল্প সংযোগ পথ ও ভৌত রুটের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার যে শর্ত টিয়ার ৩ ও টিয়ার ৪ ডেটা সেন্টার শ্রেণিবিন্যাসের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রয়েছে, এ অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইন্দোনেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যান্ডি রিগোলি ভূগর্ভস্থ পদ্ধতির কারিগরি সুবিধা ব্যাখ্যা করেছেন।
জিআইআইসি ক্যাম্পাসে আমাদের নতুন রুটগুলো শতভাগ ভূগর্ভস্থভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রচলিত স্থাপনার তুলনায় এ নকশা নির্ভরযোগ্যতা ও স্থিতিস্থাপকতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। শিল্পের শীর্ষস্থানীয় সরঞ্জাম ও উন্নত পর্যবেক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে এ সংযোগ ডিজিটাল এজকে এমন ক্যারিয়ার-নিরপেক্ষ সমাধান দিতে সক্ষম করবে, যা হাইপারস্কেল ও এন্টারপ্রাইজ গ্রাহকদের সর্বোচ্চ মান পূরণ করে।
ধাপে ধাপে নির্মাণ ও সেবা শুরুর সময়সূচি
বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সক্ষমতা সরবরাহ করতে সিজিকে ক্যাম্পাসের উন্নয়ন একাধিক নির্মাণপর্যায়ে সম্পন্ন হবে। প্রথম পর্যায়ে থাকবে তিনটি স্বতন্ত্র ডেটা সেন্টার ভবন। একসঙ্গে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি না করে ধাপে ধাপে সক্ষমতা দিতে ভবনগুলোর কাজ শেষ করার তারিখ আলাদা রাখা হয়েছে।
প্রথম ভবনটি ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে চালু হওয়ার কথা। এতে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রধান ভাড়াটেদের জন্য সক্ষমতা থাকবে। দ্বিতীয় ভবনটি প্রায় তিন মাস পর, ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে চালু হবে। প্রথম পর্যায়ের তৃতীয় ভবনটির কাজ শেষ হবে ২০২৭ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে। ধাপে ধাপে নির্মাণের এ পদ্ধতিতে ডিজিটাল এজ পরিচালনগত প্রক্রিয়া পরিমার্জন এবং নির্মাণপর্যায়গুলোর মধ্যবর্তী সময়ে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্থাপনাগুলো থেকে আয় করে পরবর্তী উন্নয়নে অর্থ জোগানো যাবে।
ইন্দোনেশিয়ার বাজারে প্রবেশের বিষয়টি মূল্যায়ন করছে এমন বড় ক্লাউড সেবা প্রদানকারী ও এন্টারপ্রাইজ গ্রাহকদের সম্ভাব্য চাহিদার সঙ্গে নির্মাণসূচির সামঞ্জস্য রয়েছে। ১৮ মাস ধরে ধাপে ধাপে সক্ষমতা চালু করায় প্রাথমিক স্থাপনাগুলোর অভিজ্ঞতা এবং বিদ্যুতের ঘনত্ব ও শীতলীকরণ ব্যবস্থার বিষয়ে গ্রাহকের পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী পরবর্তী ভবনগুলোর বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে পারবে ডিজিটাল এজ। প্রকৃত চাহিদা তৈরি হওয়ার আগেই অতিরিক্ত নির্মাণের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি বাজারের সুযোগ তৈরি হলে তা কাজে লাগানোর মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা রাখার সুযোগও দেবে এ নমনীয় পদ্ধতি। ধাপে ধাপে নির্মাণের কৌশলে মূলধন ব্যয়ও সর্বোত্তমভাবে পরিচালনা করা যাবে। হাইপারস্কেল স্থাপনা চালুর আগে সাধারণত নিশ্চিত হওয়া গ্রাহক প্রতিশ্রুতি ও আগাম ইজারা চুক্তির সঙ্গে নির্মাণব্যয় মেলানো সম্ভব হবে।
প্রতিটি ভবনে ঠিক কতটা সক্ষমতা বরাদ্দ থাকবে, তা ডিজিটাল এজ জানায়নি। তবে হাইপারস্কেল স্থাপনার শিল্পমান অনুযায়ী বিদ্যুতের ঘনত্ব ও শীতলীকরণ নকশাভেদে প্রতিটি ভবনের সক্ষমতা ১৫ থেকে ৩০ মেগাওয়াটের মধ্যে হতে পারে। ৫০০ মেগাওয়াটের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জনে প্রাথমিক তিনটি ভবনের পর আরও কয়েকটি পর্যায়ে নির্মাণকাজ চালাতে হবে। গ্রাহকদের প্রতিশ্রুতির হারের ওপর নির্ভর করে উন্নয়নকাজ ২০২০-এর দশকের শেষভাগ, এমনকি ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত চলতে পারে।
মূলধন কাঠামো ও আঞ্চলিক সম্প্রসারণ কৌশল
ইন্দোনেশিয়ায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ বৃহত্তর মূলধন ব্যবহারের কৌশলের অংশ। সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য অর্থায়ন কার্যক্রম থেকে এ কৌশলে সমর্থন মিলেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারির শুরুতে ডিজিটাল এজ ১.৬ বিলিয়ন ডলারের মূলধন সংগ্রহ সম্পন্ন করার ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে প্রায় ৬৪০ মিলিয়ন ডলার ইকুইটি এবং ১ বিলিয়ন ডলার ঋণসুবিধা ছিল। ইকুইটি অংশে চাহিদা বরাদ্দের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ডিজিটাল অবকাঠামো প্রবৃদ্ধিতে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে থাকা বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলো এতে অংশ নেয়।
ইকুইটির ক্ষেত্রে বরাদ্দের চেয়ে বেশি চাহিদা থেকে উদীয়মান এশীয় বাজারে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ সামলানোর উপযোগী ডিজিটাল অবকাঠামো সম্পদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রবল আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব ও কৌশলগত দিকনির্দেশনার মাধ্যমে স্টোনপিকের অব্যাহত সহায়তা ডিজিটাল এজকে পুঁজিবাজারবিষয়ক অতিরিক্ত দক্ষতা এবং অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের অন্যান্য পোর্টফোলিও কোম্পানি থেকে পরিচালনাগত উত্তম চর্চা কাজে লাগানোর সুযোগ দেয়।
ডিজিটাল এজের চেয়ারম্যান এবং স্টোনপিকের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যান্ড্রু থমাস বলেন, বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ কোম্পানিটির বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর আস্থার প্রতিফলন।
বিদ্যমান ও নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পাওয়া আগ্রহ ডিজিটাল এজের প্রমাণিত সাফল্য, সম্প্রসারণের সক্ষমতা এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার প্রতি নিরলস মনোযোগের প্রমাণ। ২০২০ সালে ডিজিটাল এজে প্রতিষ্ঠাকালীন বিনিয়োগ করার পর থেকে ছয়টি দেশে এবং পুরো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে প্ল্যাটফর্মটির সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পেরে স্টোনপিক গর্বিত।
ইন্দোনেশিয়ার বাইরেও এশিয়ার একাধিক বাজারে ডিজিটাল এজের উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচনে ১০০ মেগাওয়াট ক্যাম্পাসের প্রথম ভবন হিসেবে ৩৬ মেগাওয়াটের এসইএল২ চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। ভারতের ৩০০ মেগাওয়াটের নাভি মুম্বাই ক্যাম্পাসে প্রথম স্থাপনাটি ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে চালু করার আশা করছে কোম্পানিটি। একই সময়ে টোকিওর কেন্দ্রস্থলে হাইপারস্কেল এজ স্থাপনা টিওয়াই০৭ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা জাপানে কোম্পানিটির নবম ডেটা সেন্টার হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, থাইল্যান্ডজুড়ে হাইপারস্কেল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-প্রস্তুত ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে থাই জ্বালানি প্রতিষ্ঠান বি গ্রিম পাওয়ারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে ডিজিটাল এজ। এ প্রকল্পে বিনিয়োগ হবে ১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ব্যাংককের পূর্বে চোনবুরি প্রদেশে ১০০ মেগাওয়াটের একটি স্থাপনার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। ইন্দোনেশিয়ায় সম্প্রসারণে সহায়তা এবং বিদ্যমান দায় পুনঃঅর্থায়নের জন্য ২০২৪ সালের শেষদিকে পিটি ব্যাংক সেন্ট্রাল এশিয়ার কাছ থেকে ৩২৫ মিলিয়ন ডলারের করপোরেট ঋণসুবিধাও পেয়েছে কোম্পানিটি। ৩২৫ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ইন্দোনেশীয় রুপিতে নির্ধারিত এ ঋণসুবিধা স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের সুযোগ দিচ্ছে। এতে দেশীয় নির্মাণব্যয় ও পরিচালন ব্যয়ের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকি কমে। এ অর্থায়ন কাঠামো থেকে প্রযুক্তি অবকাঠামোর জামানত ও নগদ প্রবাহ মূল্যায়নে ইন্দোনেশিয়ার ব্যাংকগুলোর ক্রমবর্ধমান দক্ষতা বোঝা যায়।
প্রাথমিক মূলধন সংগ্রহের সময় ডিজিটাল এজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী স্যামুয়েল লি বলেন, এ অর্থায়ন কোম্পানিটির কৌশলগত অবস্থানের স্বীকৃতি।
ডিজিটাল এজের জন্য এটি একটি বড় মাইলফলক এবং আমাদের প্ল্যাটফর্ম ও দলের মানের স্বীকৃতি। আমরা যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত। এআই-প্রস্তুত ডেটা সেন্টার উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায় বাস্তবায়নে আমরা উচ্ছ্বসিত।
ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল রূপান্তরের অপরিহার্যতা
ইন্দোনেশিয়ার প্রযুক্তিগত উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সিজিকে ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে। মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়ায় ই-কমার্স, আর্থিক প্রযুক্তি, স্ট্রিমিং মিডিয়া ও এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যারসহ নানা ক্ষেত্রে ডিজিটাল সেবার ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। এতে স্থানীয় তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতার চাহিদা উপলব্ধ সরবরাহকে ছাড়িয়ে গেছে। দ্বীপপুঞ্জের দেশটির শেষ ব্যবহারকারীদের কাছে কম বিলম্বে পৌঁছানো দরকার এমন কাজের ক্ষেত্রে এ ঘাটতি বিশেষভাবে প্রকট।
অবকাঠামোর বর্তমান সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ইন্দোনেশীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুর বা অঞ্চলের অন্য কেন্দ্রগুলোতে অবস্থিত ডেটা সেন্টারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়। এতে সংযোগে বিলম্ব বাড়ে এবং তথ্যের সার্বভৌমত্ব নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তার মানদণ্ড মেনে তৈরি নতুন ক্যাম্পাসটি দেশীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে এসব সীমাবদ্ধতা দূর করবে।
ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো থেকে শুরু করে শহরের যানজট ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে মেশিন লার্নিংয়ের ব্যবহার খতিয়ে দেখছে। এ প্রেক্ষাপটে স্থাপনাটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-প্রস্তুত সক্ষমতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। চাহিদা বাড়াতে পারে এমন নির্দিষ্ট এআই প্রয়োগের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশীয় ভাষার উপাত্তে প্রশিক্ষিত বৃহৎ ভাষা মডেল, উৎপাদনের মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণে কম্পিউটার ভিশন ব্যবস্থা এবং দেশের বিস্তৃত কৃষি খাতের জন্য পূর্বাভাসভিত্তিক বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম। এসব কাজের জন্য বিশেষায়িত গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিটের ক্লাস্টার দরকার। এগুলো প্রচলিত কেন্দ্রীয় প্রসেসিং ইউনিটভিত্তিক সার্ভারের তুলনায় অনেক বেশি তাপঘনত্ব তৈরি করে। তাই সিজিকে ক্যাম্পাসের জন্য নির্ধারিত উন্নত তরল শীতলীকরণ অবকাঠামোর প্রয়োজন।
বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল প্রশিক্ষণ ও চালাতে বিশেষায়িত অবকাঠামো, বেশি বিদ্যুৎ ঘনত্ব এবং উন্নত শীতলীকরণ সক্ষমতা দরকার, যা পুরোনো ডেটা সেন্টারগুলোতে প্রায়ই থাকে না। ডেটা সেন্টার উন্নয়নে সম্প্রসারণশীল প্রিন্সটন ডিজিটাল গ্রুপ, এয়ারট্রাঙ্ক ও স্থানীয় ইন্দোনেশীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোসহ আঞ্চলিক অন্যান্য অপারেটরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে ডিজিটাল এজ। তবে সিজিকে ক্যাম্পাসে বিনিয়োগের পরিমাণ ছোট প্রতিযোগীদের জন্য প্রবেশের বড় বাধা তৈরি করছে। পাশাপাশি ১০০ মেগাওয়াটের বেশি একটানা বিদ্যুৎ বরাদ্দ দরকার এমন হাইপারস্কেল গ্রাহকদের কাছে ডিজিটাল এজকে পছন্দের অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
স্থানীয় উপস্থিতির শর্ত পূরণে আগ্রহী আন্তর্জাতিক ক্লাউড সেবা প্রদানকারী, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার সক্ষমতা প্রয়োজন এমন ইন্দোনেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জাকার্তায় আঞ্চলিক সদর দপ্তর স্থাপনকারী বহুজাতিক করপোরেশনসহ বিভিন্ন ধরনের গ্রাহককে সেবা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে ক্যাম্পাসটি। নির্দিষ্ট আর্থিক ও ব্যক্তিগত তথ্য দেশে সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতাসহ ডিজিটাল অর্থনীতির উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগও দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর চাহিদা তৈরি করছে। একক কোনো গ্রাহকগোষ্ঠী বা শিল্প খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এ বিস্তৃত সম্ভাব্য বাজার ধাপে ধাপে উন্নয়নের কৌশলকে সমর্থন দিচ্ছে।
জন ফ্রিম্যান বলেন, এ বিনিয়োগ ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
সিজিকে ক্যাম্পাস আমাদের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশলের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক এবং এখন পর্যন্ত আমাদের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ। এ যুগান্তকারী বিনিয়োগ ইন্দোনেশিয়া ও বৃহত্তর অঞ্চলে আগামী দশকের উদ্ভাবন, ক্লাউড ব্যবহার এবং ডিজিটাল সেবা এগিয়ে নিতে আমাদের সক্ষম করবে।
মূল তথ্য
- ইন্দোনেশিয়ার বেকাসিতে সিজিকে ক্যাম্পাস নির্মাণে ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৫.৬৮ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার) বিনিয়োগ করবে ডিজিটাল এজ। এটি এখন পর্যন্ত কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ।
- সম্পূর্ণ নির্মিত হলে স্থাপনাটির আইটি সক্ষমতা হবে ৫০০ মেগাওয়াট। নকশাগতভাবে তা এক গিগাওয়াটে উন্নীত করা যাবে। ফলে এটি ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম এআই-প্রস্তুত হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাসগুলোর একটি হবে।
- প্রথম পর্যায়ে তিনটি ভবন থাকবে। প্রথমটি ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে চালু হওয়ার কথা। পরের দুটি ভবন চালু হবে যথাক্রমে ২০২৭ সালের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকে।
- ক্যাম্পাসটির লক্ষ্য বাজারের শীর্ষস্থানীয় ১.২৫ পাওয়ার ইউসেজ ইফেক্টিভনেস অর্জন করা। এতে সরাসরি চিপে তরল শীতলীকরণ, পুনর্ব্যবহৃত পানির ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংযোগ থাকবে।
- ডিজিটাল এজের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন ইন্দোনেশীয় টেলিযোগাযোগ সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্দোনেট নির্ভরযোগ্যতা ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে শতভাগ ভূগর্ভস্থ ফাইবার রুটের মাধ্যমে সংযোগ দেবে।
- ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সম্পন্ন হওয়া ১.৬ বিলিয়ন ডলারের মূলধন সংগ্রহের পর এ বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। এ অর্থের মধ্যে ছিল ৬৪০ মিলিয়ন ডলার ইকুইটি এবং ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ অর্থায়ন।






