অনেক তরুণ কোরীয়ের কাছে একটি চাকরিই যথেষ্ট নয়

পড়তে 12 মিনিট
অনেক তরুণ কোরীয়ের কাছে একটি চাকরিই যথেষ্ট নয়

এন-জববারদের উত্থান: তরুণ কোরীয়রা কীভাবে কাজের জগতে বিপ্লব আনছেন

৩০ বছর বয়সী কিম সন্ধ্যা ৬টায় পূর্ণকালীন বিপণন চাকরির কাজ শেষ করলেও তাঁর দিন তখনো অর্ধেক বাকি। সপ্তাহে তিন সন্ধ্যায়, প্রায়ই ছুটির দিনসহ, তিনি সিউলজুড়ে ছুটে বেড়ান মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি পড়াতে। তিনি বলেন, "সাত বছর ধরে পড়াচ্ছি। মূল চাকরি থেকে যে ৩০ লাখ ওন (২,০৭৪ ডলার) আয় করি, তা দিয়ে কখনো বাড়ি কিনতে পারব বা পরিবার শুরু করতে পারব বলে মনে হয় না। ভবিষ্যতের জন্য শুধু একটি চাকরি আর যথেষ্ট বলে মনে হয় না।"

সূচিপত্র
  1. এন-জববারদের উত্থান: তরুণ কোরীয়রা কীভাবে কাজের জগতে বিপ্লব আনছেন
  2. একাধিক আয়ের পথে এক দেশ
  3. জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকটে টিকে থাকার কৌশল
  4. প্রচলিত ক্যারিয়ারপথের প্রতি আস্থা কমছে
  5. অর্থের বাইরেও: তৃপ্তি ও নিয়ন্ত্রণের খোঁজ
  6. একাধিক চাকরির মূল্য
  7. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও নিয়োগকর্তাদের মনোভাব
  8. উত্তর কোরিয়ার বিপরীত চিত্র: রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বনাম বাজারের স্বাধীনতা
  9. কোরিয়ায় কাজের ভবিষ্যৎ
  10. সারকথা

৩২ বছর বয়সী লি একটি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিক্রয়কর্মী। রাতের সময়টা তিনি ল্যাপটপে কাটান, অ্যামাজনে কোরীয় সৌন্দর্যপণ্য আপলোড ও নিবন্ধন করেন। কাজটি একঘেয়ে, আর প্ল্যাটফর্মটির মানদণ্ডও কঠোর; ফলে তিনি প্রায়ই মানসিক চাপে থাকেন। তবু তাঁর কথায়, বিকল্প তেমন নেই। তিনি বলেন, "বাড়িভাড়া, বাজার-সদাই আর মাঝেমধ্যে বাইরে খাওয়ার খরচ মেটানোর পর সঞ্চয়ের জন্য প্রায় কিছুই থাকে না। এটা উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। প্রয়োজনের তাগিদেই করছি।"

কিম ও লি ব্যতিক্রম নন। একসময় খণ্ডকালীন কাজকে ফ্রিল্যান্সার বা চাকরির মধ্যবর্তী সময়ে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যুক্ত করা হতো। এখন তা দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণ বয়সের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। আর্থিক প্রয়োজন, প্রচলিত অফিসব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব, এমনকি নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তোলা বা ব্যক্তিগত স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষাও একাধিক চাকরিতে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। তাঁদেরই বলা হচ্ছে "এন-জববার"—অর্থাৎ যাঁরা একাধিক চাকরি করেন।

চাকরির ওয়েবসাইট ইনক্রুটের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, কোরীয় কর্মীদের প্রায় অর্ধেকের এখন বাড়তি কাজ রয়েছে। অংশগ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে (৫৫.২ শতাংশ) এবং ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে (৫৭ শতাংশ)। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বাইরেও এই প্রবণতার ব্যাপ্তি স্পষ্ট করে এমন নানা তথ্য-উপাত্ত রয়েছে।

অতিরিক্ত আয়ের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার প্রমাণও রয়েছে। তথ্য ও পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের মাইক্রোডেটা অনুযায়ী, নিয়মিত ও অস্থায়ী কর্মীসহ দ্বিতীয় চাকরিতে যুক্ত কর্মীর সংখ্যা ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৪,০৪,৪০৯-এ পৌঁছেছে। স্বল্পমেয়াদি কাজ খোঁজার প্ল্যাটফর্ম নিউওয়ার্কার ডিসেম্বরে ৭২৮ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর জরিপ চালায়। এতে দেখা যায়, উত্তরদাতাদের ৪৯.৫ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের বাড়তি কাজে যুক্ত, যা যুক্ত নন—এমন ৫০.৫ শতাংশের প্রায় সমান।

বিশেষ করে পূর্ণকালীন অফিসকর্মীদের মধ্যে ৪৮.৪ শতাংশ জানিয়েছেন, মূল চাকরির বাইরে তাঁদের বাড়তি কাজ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হতে পারে, কারণ নিয়োগকর্তার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় অনেক কর্মী বাড়তি আয়ের উৎসের কথা জানাতে চান না।

একাধিক আয়ের পথে এক দেশ

বাড়তি কাজে যুক্ত তরুণ কোরীয়দের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের কাজের বৈচিত্র্যও বেড়েছে। ডিজিটাল দক্ষতা বা ব্যক্তিগত আগ্রহের উপযোগী কাজ অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই পাওয়া যাচ্ছে। একবারের জন্য বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে পারিশ্রমিক নেওয়া বা ব্যক্তিগতভাবে পড়ানোর মতো কাজ থেকে শুরু করে স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখা, ইন্টারনেট ঘাঁটা কিংবা হেঁটে অল্প অর্থ উপার্জনের সুযোগও রয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই বাড়তি আয়ের জন্য ইউটিউবের কনটেন্ট তৈরি, ব্লগিং কিংবা অনলাইন দোকান চালানোর পথও বেছে নিচ্ছেন। ব্লগ লিখে মাসে বাড়তি ১০ লাখ ওন আয় করেন ৩৪ বছর বয়সী লি জি-ওন। তিনি বলেন, "সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এই বৈচিত্র্য আরও বেড়েছে। এটি একই সঙ্গে বাজার ও শেখার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। কর্মীরা অ্যাপভিত্তিক আয়, ডিজিটাল বিক্রির কৌশল কিংবা কনটেন্ট তৈরির অভিজ্ঞতা নিয়ে পরামর্শ ভাগ করে নেন। এতে আরও অনেকে সহজে শুরু করা যায় এমন বাড়তি আয়ের কাজে যুক্ত হতে উৎসাহিত হন।"

ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট থেকে আয় করার কৌশল নিয়ে প্রতিশ্রুতিমূলক পোস্টের ছড়াছড়ি। সফল ব্যক্তিরা প্রায়ই বই প্রকাশ করেন বা নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলেন; নির্দিষ্ট আগ্রহের গোষ্ঠীতে তাঁরা ক্ষুদ্র পরিসরের তারকাও হয়ে ওঠেন। ফ্লি মার্কেটের এক জরিপ অনুযায়ী, সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজের মধ্যে রয়েছে ব্লগ বা ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরি (২০.২ শতাংশ)। এতে গড় মাসিক আয় প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার ওন।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকটে টিকে থাকার কৌশল

এই প্রবণতা বাড়ছে কেন? বিশেষজ্ঞরা সরকারি মূল্যস্ফীতির হিসাব ও মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধানের কথা বলছেন। গত বছর ভোক্তা মূল্য ২.১ শতাংশ বেড়েছে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবু কর্মীদের ভাষ্য, দৈনন্দিন খরচ বাস্তবে অনেক বেশি বেড়েছে বলে মনে হয়।

শিল্প ও শ্রমনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক কিম সঙ-হি বলেন, "জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, মজুরি বৃদ্ধির গতি তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।" তাঁর মতে, তাই আরও বেশি কর্মী ‘মূল চাকরির পাশাপাশি বাড়তি কাজ’ মডেলটিকে স্বাভাবিক ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করছেন। তিনি ধারণা করছেন, এ প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে শ্রমবাজারকে বদলে দিতে পারে।

কেবি ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের গবেষণাও কিমের ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বেতনভুক্ত ২,০০০ কর্মীর ৫৪.৮ শতাংশ বাড়তি কাজে যুক্ত ছিলেন—২০২২ সালের একই জরিপের তুলনায় যা ১২.৮ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ছিল জরুরি সময়ের জন্য সঞ্চয় (৩৮.৭ শতাংশ), অবসর সময়ে কাজ করা (১৮.৭ শতাংশ) এবং জীবনযাত্রার খরচ মেটানো (১৩.২ শতাংশ)।

সিউলে এই চাপ বিশেষভাবে তীব্র। সেখানে ভোক্তা মূল্য বেশি এবং আবাসন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। রিয়েল এস্টেট ১১৪-এর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে একটি অ্যাপার্টমেন্টের গড় দাম ছিল ১৪৬ কোটি ওন। সিউলের একজন কর্মীর গড় বার্ষিক বেতন প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ ওন। সাধারণ হিসাবেই দেখা যায়, ৩০ বছর ধরে পুরো বেতন সঞ্চয় করলেও বাড়ি কেনার জন্য তা কোনোমতে যথেষ্ট হবে।

আগে উল্লেখ করা কিম ও লির মতো অনেক বেতনভুক্ত কর্মীরই সিউলের ব্যয়বহুল পরিবেশে টিকে থাকা কঠিন মনে হয়। এই আর্থিক বাস্তবতায় জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান ধরে রাখতে চাওয়া মানুষের কাছে বাড়তি কাজ আর পছন্দের বিষয় নেই, বরং প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।

প্রচলিত ক্যারিয়ারপথের প্রতি আস্থা কমছে

আর্থিক চাপের বাইরেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এন-জববারদের উত্থান কাজ সম্পর্কে তরুণ কোরীয়দের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনকে তুলে ধরে। আবাসনের উচ্চমূল্য, স্থবির মজুরি এবং চাকরির অনিশ্চয়তা প্রচলিত সেই ধারণার ওপর আস্থা কমিয়েছে যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার বিনিময়ে স্থিতিশীলতা মিলবে।

স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২০এস ল্যাব ২০ ও ৩০ বছর বয়সী ৮৫০ জন অফিসকর্মীর ওপর জরিপ চালায়। উত্তরদাতাদের ৩৬.৭ শতাংশ জানান, তাঁরা ব্যবস্থাপনা পদে পদোন্নতি চান না। পদোন্নতির সঙ্গে যুক্ত মানসিক চাপ, কাজের বোঝা ও কর্মদক্ষতার চাপকে অনাগ্রহের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন অনেকে।

কাজে বেশি কর্তৃত্ব পাওয়ার প্রতি অনাগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যায় চাকরি খোঁজার প্ল্যাটফর্ম জব কোরিয়ার ২০২৩ সালের তরুণ কর্মীদের ওপর চালানো জরিপেও। উত্তরদাতাদের ৫৪.৮ শতাংশ জানান, তাঁরা নির্বাহী পদে পদোন্নতি চান না।

কিম বলেন, "আগের প্রজন্মের তুলনায় এখনকার তরুণ কর্মীরা জানেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ই-কমার্সের মাধ্যমে অফিসের বাইরেও আয় করা সম্ভব। কর্মক্ষেত্রে আরও দায়িত্ব নেওয়াকে স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ার সেরা বা একমাত্র উপায় আর মনে করা হয় না।"

এই প্রবণতা কোরিয়ার বাইরেও দেখা যাচ্ছে। একাধিক চাকরিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে জেনারেশন জেড এগিয়ে রয়েছে। কান্টারের ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১০ হাজার কর্মীর ওপর চালানো বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, জেনারেশন জেডের ৪০ শতাংশ কর্মী অন্তত দুটি কাজ একসঙ্গে করছেন। তরুণ প্রজন্মের কাজ ও ক্যারিয়ার গড়ার দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন এটি।

অর্থের বাইরেও: তৃপ্তি ও নিয়ন্ত্রণের খোঁজ

কারও কারও কাছে বাড়তি কাজের প্রেরণা আর্থিক টিকে থাকার চেয়েও বেশি কিছু। এন-জববারদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ একাধিক চাকরিকে আত্মোন্নয়ন, ব্যক্তিগত পরিচিতি গড়ে তোলা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন পূরণের পথ হিসেবে দেখেন।

সিউলের ২৭ বছর বয়সী এক পেশাজীবী ইউটিউব চ্যানেল চালান, যার গ্রাহক প্রায় ২৭ হাজার। তিনি বলেন, "আমি বুঝতে পেরেছি, কোম্পানিই সবকিছু নয়; নিজের পেছনেও বিনিয়োগ করা দরকার। ভবিষ্যতের প্রস্তুতির জন্য শুধু মূল চাকরির আয় যথেষ্ট নয়। বাড়তি কাজের মাধ্যমে আর্থিক স্থিতি গড়ছি এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করছি।"

৩৩ বছর বয়সী কিম সল-নিম সন্ধ্যা ৬টার দিকে মূল চাকরি থেকে বাড়ি ফিরে হাসপাতাল ও আইন প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্লগ লেখেন। প্রতিদিন এক থেকে চার ঘণ্টা বাড়তি কাজ করে তিনি মাসে ৬ লাখ থেকে ৮ লাখ ওন (৪৩০-৫৭৫ ডলার) আয় করেন। তিনি কোরিয়া হেরাল্ডকে বলেন, "বাড়তি কাজ করার সবচেয়ে বড় কারণ অর্থ। মূল চাকরির বেতন দিয়ে আমার জীবনযাত্রার খরচ চলে, কিন্তু সিউলে বাড়ি কেনার জন্য তা যথেষ্ট নয়।"

অন্যরা বাড়তি কাজকে অসন্তোষজনক মূল পেশা ছেড়ে সত্যিকারের পছন্দের অন্য কাজে নিরাপদে যাওয়ার উপায় হিসেবে দেখেন। কোরিয়ার শীর্ষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর একটির ৩৭ বছর বয়সী এক প্রকৌশলী—যিনি ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম ব্রাঞ্চে আমতুন ছদ্মনামে লেখেন—বছরের পর বছর নানা বাড়তি কাজ করেছেন। তিনি বলেন, "আমি খুব পরিশ্রম করতাম, কিন্তু একদিন বাস্তবতা বুঝতে পারলাম। করপোরেট দৌড়ে দ্রুত ছুটছিলাম, কিন্তু হঠাৎ এক শূন্যতার অনুভূতি আমাকে গ্রাস করল।"

তিনি গ্যাংওন প্রদেশে ৮ কোটি ওনে সংস্কারযোগ্য একটি বাড়ি কিনে সেটিকে এয়ারবিএনবিতে ভাড়া দেওয়ার উপযোগী করে তোলেন। সেখান থেকে বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ ওন আয় করেন। তিনি বলেন, "এমন কিছু করছিলাম যা সত্যিই উপভোগ করতাম এবং অর্থবহ মনে হতো, তাই ততটা ক্লান্ত লাগত না।"

একাধিক চাকরির মূল্য

তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাকরির এই উত্থানের মূল্যও দিতে হচ্ছে। কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব লেবার সেফটি অ্যান্ড হেলথের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তরুণ এন-জববাররা এখন সপ্তাহে গড়ে ৫৮.৭ ঘণ্টা কাজ করেন; কেউ কেউ প্রায় ৯৭ ঘণ্টাও কাজ করেন। প্রচলিত কর্মঘণ্টার তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, এতে দক্ষিণ কোরিয়ার আগে থেকেই দীর্ঘস্থায়ী অতিরিক্ত কর্মচাপের সমস্যা আরও বাড়তে পারে, স্বাস্থ্যের অবনতি হতে পারে এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে। সপ্তাহে প্রায় ১০০ ঘণ্টা কাজের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতির মধ্যে রয়েছে শারীরিক অবসাদ, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং সম্পর্কে টানাপোড়েন।

ইয়ংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হো চ্যাং-দক বলেন, "একাধিক কাজ করে আয় সর্বোচ্চ করার চেষ্টা এমন এক সমাজে পিছিয়ে পড়ার উদ্বেগের প্রতিফলন, যেখানে অর্থনৈতিক ক্ষমতাই প্রধান। অথচ দীর্ঘ কর্মঘণ্টায় উৎপাদনশীলতা কমছে এবং সম্পর্কের ওপর চাপ পড়ছে। কর্মীদের মজুরি তাঁদের শ্রমের মূল্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত করছে কি না, তা আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার।"

কম বেতনের কাজ ও বাড়তি কাজের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেছে কোরিয়া লেবার ইনস্টিটিউট। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাড়তি কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা ঘণ্টায় গড়ে ১৩ হাজার ওন (৯.৪২ মার্কিন ডলার) আয় করেন। শুধু মূল চাকরির ওপর নির্ভরশীলদের ক্ষেত্রে এই আয় ১৬ হাজার ওন (১১.৫৯ মার্কিন ডলার)। এ ব্যবধান এ প্রবণতার পেছনে থাকা অর্থনৈতিক চাপকে স্পষ্ট করে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও নিয়োগকর্তাদের মনোভাব

এ প্রবণতা শুধু কোরিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। ভিসার গবেষণায় দেখা গেছে, জেনারেশন জেডের ৪৫ শতাংশের এখন বাড়তি কাজ রয়েছে, যাঁদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি (৩৭ শতাংশ) একাধিক বাড়তি কাজ করেন। ভিসার তথ্য অনুযায়ী, জেনারেশন জেডের পরিচালিত বাড়তি ব্যবসার মধ্যে শীর্ষ তিনটি হলো ই-কমার্স (৩৪ শতাংশ), সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার হওয়া (২৫ শতাংশ) এবং ব্যক্তিগত আগ্রহভিত্তিক প্রকল্প (১৯ শতাংশ)।

বাড়তি কাজ করা জেনারেশন জেডের প্রায় ১০ জনের মধ্যে সাতজন (৬৯ শতাংশ) মূলত অতিরিক্ত আয় করার উদ্দেশ্যে ব্যবসা শুরু করেছেন। এ ধরনের কাজ থেকে তাঁদের গড় আয় মাসে ২১৮.৬০ পাউন্ড। তবে ভিসার গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এক-চতুর্থাংশের বেশি (২৭ শতাংশ) নিজেদের আগ্রহের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উদ্যোগ শুরু করেন, আর কাছাকাছি সংখ্যক (২৬ শতাংশ) দক্ষতা আরও বাড়ানোর জন্য তা করেন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক নিয়োগকর্তাই কর্মীদের বাড়তি কাজের প্রতি এখন বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছেন। কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের টেপার স্কুল অব বিজনেসের উদ্যোক্তা বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক মেরেডিথ মেয়ার গ্রেলি বলেন, "মহামারির আগে কর্মীরা এমন কোনো বিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে চাইতেন না, যা তাঁদের পূর্ণকালীন চাকরির জন্য ব্যয় করা সময় বা মনোযোগ সরিয়ে নিতে পারে—এমনকি সন্তান লালন-পালন নিয়েও নয়। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের গভীরতর প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল ও গ্রহণশীল, যার মধ্যে পছন্দের প্রকল্পও রয়েছে।"

উত্তর কোরিয়ার বিপরীত চিত্র: রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বনাম বাজারের স্বাধীনতা

প্রতিবেশী উত্তর কোরিয়ার পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে তীব্র বৈপরীত্য তুলে ধরে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রটিতে সমাজতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক যুবলীগ (এসপিওয়াইএল) সম্প্রতি ‘একবোরি’ কাজে যুক্ত তরুণদের নির্ধারিত কর্মস্থলে হাজির হতে বলেছে; না হলে তাঁদের দলবদ্ধ শ্রমদলে কাজের দায়িত্ব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

একবোরি অনেকটা তথাকথিত ৮.৩ কাজের মতো। এ ব্যবস্থায় মানুষ আনুষ্ঠানিক কর্মস্থলে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেয়, যাতে তারা ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত থাকতে পারে; কাগজে-কলমে শুধু আনুষ্ঠানিক কর্মস্থলে হাজির হয়। উত্তর কোরিয়ায় অনেকেই এ ধরনের কাজ করেন, কারণ আনুষ্ঠানিক কর্মস্থলগুলো প্রায়ই বেতন দেয় না বা রেশন সরবরাহ করে না।

তরুণেরা এ আদেশের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের কথায়, নির্ধারিত কর্মস্থলগুলো "শুধু কাগজে-কলমেই আছে"। তাঁরা বলেন, "তারা আমাদের বেতন দেয় না, তাই কাজে হাজির হলেও কোনো লাভ হবে না। নিজেদের ব্যবসার জন্য পণ্য বহন করে আয় করতে হবে।"

তরুণীরা এমনও বলছেন, "এখন এসপিওয়াইএল খুব বেশি বিধিনিষেধ আরোপ করছে, তাই শুধু বিয়ে করে ব্যবসা করাই ভালো।" তাঁদের কাছে এটি ভালো বিকল্প, কারণ বিয়ের পর নির্ধারিত কর্মস্থল ছেড়ে দিলে কাজে হাজির হওয়ার চাপ ছাড়াই বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা করা যায়।

এই প্রতিরোধ দুই কোরিয়ার মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরে। দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণেরা বাজারের স্বাধীনতা ব্যবহার করে একাধিক আয়ের উৎস খুঁজতে পারেন, অথচ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দেয় এমন কর্মকাণ্ডের জন্য উত্তর কোরীয়দের রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখে পড়তে হয়।

কোরিয়ায় কাজের ভবিষ্যৎ

দক্ষিণ কোরিয়া যখন বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন এন-জববারদের উত্থান কঠিন কিছু প্রশ্ন সামনে আনছে—শুধু কাজ নিয়ে নয়, একটি পূর্ণকালীন চাকরি এখনো আগের মতো নিরাপত্তা দিতে পারে কি না, তা নিয়েও।

চুং-আং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের সম্মানসূচক অধ্যাপক লি বিয়ং-হুন বলেন, আর্থিক ও সাংস্কৃতিক—দুই ধরনের কারণ থেকেই এ প্রবণতার জন্ম। তিনি বলেন, "প্রথমত, মূল চাকরির আয় বা কাজের অর্থবোধ নিয়ে অসন্তুষ্টি থেকে মানুষ বাড়তি কাজ নেয় এবং নতুন কিছুর জন্য প্রস্তুতি নিতে চায়। দ্বিতীয়ত, মানুষ আর মূল চাকরিকে আজীবনের পেশা বলে মনে করে না। সময় উপযুক্ত মনে হলে চাকরি ছাড়ার জন্য তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত।"

লি এ প্রবণতার গভীরে থাকা সামাজিক কারণের কথাও বলেন। তিনি বলেন, "কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে বুঝতে সাহায্য করে না তারা কোন কাজ উপভোগ করে। তাই অনেকে কর্মজীবনে প্রবেশের পরই এসব প্রশ্ন করতে শুরু করে।"

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানসহ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রকে নতুনভাবে গড়ে তোলায় এ প্রবণতা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লি বলেন, "বিংশ শতাব্দীর তুলনায় আজকের চাকরি কম নিরাপদ এবং এআইয়ের মতো অগ্রগতির কারণে বদলে যাচ্ছে। সম্ভবত আরও বেশি মানুষ সারাজীবন একটি কোম্পানিতে না থেকে কাজের সুযোগ অনুযায়ী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবেন।"

সারকথা

এন-জববারদের উত্থান কেবল অর্থনৈতিক প্রবণতা নয়; কাজ, জীবন ও আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে তরুণ কোরীয়দের দৃষ্টিভঙ্গির প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রতিফলন। উচ্চ ব্যয়ের অর্থনীতিতে অনেকে প্রয়োজনের তাগিদে বাড়তি কাজ করছেন, আবার অন্যরা তৃপ্তি খুঁজছেন এবং প্রচলিত পথের বাইরে ক্যারিয়ার গড়ছেন।

এ প্রবণতা চলতে থাকলে কাজের কাঠামো, পারিশ্রমিক এবং সমাজে কাজের মূল্যায়ন নিয়ে কোম্পানি ও নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে হতে পারে। অর্থনৈতিক টিকে থাকা ও জীবনমানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা ভবিষ্যতের কোরীয় কর্মীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।

  • কোরিয়ার ২০ ও ৩০ বছর বয়সী কর্মীদের প্রায় অর্ধেক (৪৮.৪-৫৫.২ শতাংশ) এখন বাড়তি কাজ করেন
  • এন-জববাররা সপ্তাহে গড়ে ৫৮.৭ ঘণ্টা কাজ করেন; কেউ কেউ কাজ করেন ৯৭ ঘণ্টা পর্যন্ত
  • প্রধান প্রেরণার মধ্যে রয়েছে আর্থিক প্রয়োজন (৮২.৫ শতাংশ), ক্যারিয়ার পরিবর্তন (৩৮.৭ শতাংশ) এবং অবসর সময় কাজে লাগানো (১৮.৭ শতাংশ)
  • জনপ্রিয় বাড়তি কাজের মধ্যে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি (২০.২ শতাংশ), ই-কমার্স এবং পড়ানো
  • তরুণ কর্মীরা প্রচলিত পদোন্নতির ধাপগুলো ক্রমেই প্রত্যাখ্যান করছেন; ৩৬.৭ শতাংশ ব্যবস্থাপনা পদ এড়িয়ে চলছেন
  • অর্থনৈতিক চাপ ও কাজ সম্পর্কে প্রজন্মগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন—দুইয়েরই প্রতিফলন এ প্রবণতা
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে