কারখানার শ্রমিকদলকে দিনে ১২ ঘণ্টা কাজের বিজ্ঞাপন
গ্লোবাল রাইটস কমপ্লায়েন্সের (জিআরসি) এক তদন্তে বলা হয়েছে, রাশিয়ার একটি নিয়োগ ওয়েবসাইটে কারখানা ও কৃষিকাজের জন্য ৫০ থেকে ১০০ জন উত্তর কোরীয় শ্রমিকের দল নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। সেখানে মাসে ২৮ দিন, প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা কাজের শিফটের প্রতিশ্রুতি ছিল। হেগভিত্তিক সংস্থাটি মস্কোর কাছে সামরিক বাহিনীর খাবারের রেশন তৈরির কারখানা এবং পোষা প্রাণীর খাবার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন উৎপাদনকেন্দ্রে শ্রমিকদের কাজের প্রমাণ শনাক্ত করেছে।
সূচিপত্র
- কারখানার শ্রমিকদলকে দিনে ১২ ঘণ্টা কাজের বিজ্ঞাপন
- তদন্তকারীরা যেভাবে নিয়োগ নেটওয়ার্কের সূত্র খুঁজেছেন
- শ্রমিকদল থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ
- নথি নিয়ন্ত্রণ, বিচ্ছিন্ন রাখা ও হুমকি
- অর্থ কার কাছে যায়?
- বেসামরিক উৎপাদন ও সামরিক সরবরাহের যোগসূত্র
- বিরোধের পেছনে জাতিসংঘের বিধিনিষেধ
- অংশীদারত্বের বিকাশ
- অস্বীকার ও অমীমাংসিত প্রশ্ন
- মূল তথ্য
তদন্তে রুশ নিয়োগদাতা, শ্রমিক সরবরাহকারী মধ্যস্থতাকারী এবং উত্তর কোরীয় কর্মকর্তাদের যুক্ত করা একটি ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যদিও উত্তর কোরীয়দের বিদেশে কাজের ওপর জাতিসংঘের বিধিনিষেধ রয়েছে। বিজ্ঞাপনগুলোতে শ্রমিকদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণকে সুবিধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল: তাদের নথিপত্র উত্তর কোরীয় দূতাবাসের কাছে থাকবে, অন্য জাতীয়তার শ্রমিকদের থেকে আলাদা থাকতে হবে এবং সম্ভাব্য নিয়োগদাতাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে তারা কাজে থেকে যাবেন।
এসব প্রতিশ্রুতির আড়ালে জিআরসি জবরদস্তি, শ্রমিক ও তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে হুমকি এবং মজুরির বড় অংশ উত্তর কোরীয় রাষ্ট্রের হাতে চলে যাওয়ার অভিযোগ শনাক্ত করেছে। শ্রমিক নিয়োগের প্রচারে পরিবর্তনেরও সন্ধান পেয়েছে সংস্থাটি: শ্রমিকদলের কথা থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগের কথা বলা শুরু হয়, যা তাদের ভাষ্য অনুযায়ী চাকরিকে শিক্ষার আড়ালে ঢাকতে সহায়তা করেছে।
তদন্তের তথ্য রাশিয়ার দৈনন্দিন উৎপাদনকে উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র ও সেনা, রাশিয়ার অর্থ ও জ্বালানি এবং দুই সরকারের সহযোগিতার বৃহত্তর অংশীদারত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছে। শ্রমিকদের জন্য মূল প্রশ্নটি সরাসরি: তাদের নথি, কর্মঘণ্টা, বেতন এবং কাজ ছেড়ে যাওয়ার সক্ষমতা কার নিয়ন্ত্রণে?
তদন্তকারীরা যেভাবে নিয়োগ নেটওয়ার্কের সূত্র খুঁজেছেন
জিআরসি রাশিয়ার কোম্পানি ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নথির পাশাপাশি অনলাইন বিজ্ঞাপন, ছবি ও ভিডিও পরীক্ষা করেছে। উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের কীভাবে নিয়োগ ও কাজে পাঠানো যায়, তা জানতে তদন্তকারীরা সম্ভাব্য নিয়োগদাতার পরিচয়ে যোগাযোগও করেন। উত্তর কোরীয় কর্মকর্তাদের শনাক্ত করতে তদন্তে মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
জিআরসির ভাষ্য অনুযায়ী, নেটওয়ার্কটির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মস্কোর ব্যবসায়ী ভ্লাদিমির সোকোলভ, ব্ল্যাক হর্স গ্রুপ এবং নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম KNDR.su। তদন্তকারীরা মস্কোর কাছে রামেনস্কোয় পোষা প্রাণীর খাবার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কেপিপি রুসকন এবং সামরিক বাহিনীর খাবারের রেশন উৎপাদনকারী একটি কারখানায় উত্তর কোরীয়দের কাজ করার আলামত শনাক্ত করেছেন।
রাশিয়ার একটি কৃষি কোম্পানিতে ৫০ জন উত্তর কোরীয়কে কাজ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮০০ ডলারের একটি চুক্তিও শনাক্ত করেছে জিআরসি। চুক্তির মূল্য শ্রমিকসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রতি নিয়োগে দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৭৬ ডলার। এই অর্থ তাদের কাজে পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য, প্রত্যেক শ্রমিক যে পরিমাণ অর্থ পেতেন তা নয়।
এসব নথির কারণে তদন্তের পরিধি নিয়োগের বিজ্ঞাপনের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। অনলাইনে দেওয়া প্রস্তাবের সঙ্গে শ্রমিক খুঁজছিল এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট উৎপাদনকেন্দ্রের যোগসূত্র পাওয়া গেছে, যেখানে জিআরসি তাদের কাজের প্রমাণ পেয়েছে।
শ্রমিকদল থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ
জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে KNDR.su-তে ব্র্যান্ডিং বদলে উত্তর কোরীয় শ্রমিকদল বা শ্রমিক বাহিনীর বর্ণনার বদলে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখা বা ইন্টার্নশিপের কথা বলা শুরু হয়। জিআরসির ভাষ্য, উত্তর কোরীয়রা শিক্ষার্থী ভিসায় রাশিয়ায় প্রবেশ করলেও তাদের কারখানায় কাজের জন্য নিয়োগদাতাদের কাছে পাঠানো হতো।
ক্রেতার পরিচয়ে যোগাযোগ করা তদন্তকারীদের প্ল্যাটফর্মটির এক প্রতিনিধি বলেন, উত্তর কোরীয়রা কারখানার শিফটে কাজ করার পাশাপাশি দূরশিক্ষণে পড়াশোনা করতেন। আরেক প্রতিনিধি যুক্তি দেন, শিক্ষার্থীরা কর্মচারী নন, তাই তাদের ক্ষেত্রে শ্রম আইন প্রযোজ্য নয়।
শিক্ষার্থী ভিসা কোনো দেশে শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রবেশের অনুমতি। জিআরসির অভিযোগ, এই নেটওয়ার্কে শিক্ষার্থীর পরিচয়কে সংগঠিত কর্মসংস্থানের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। দূরশিক্ষা, দীর্ঘ কারখানা-শিফট এবং নিয়োগ ফি একসঙ্গে সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে ওই ব্যবস্থাটি কীভাবে উপস্থাপন করা হতো, তা তুলে ধরে।
নিয়োগে জড়িত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মসংস্থানের বিধিনিষেধ এড়াতে শিক্ষার্থীর পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে, তারা রুশ আইন মেনে চলেছে। তাদের জবাবে এই নিয়োগের আইনি মর্যাদা বিরোধের কেন্দ্রে এসেছে: জিআরসি বলছে, শ্রমিকদের প্রকৃত কর্মসংস্থান আড়াল করা হয়েছে; ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
নথি নিয়ন্ত্রণ, বিচ্ছিন্ন রাখা ও হুমকি
নিয়োগের বিজ্ঞাপনগুলোতে বলা হয়েছিল, পাসপোর্টের মতো নথি উত্তর কোরীয় দূতাবাসের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং অন্য জাতীয়তার শ্রমিকদের থেকে আলাদা থাকার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক বা সুপারিশ করা হয়েছে। রাশিয়ায় সম্ভাব্য কর্মস্থল পরিদর্শন করা দূতাবাসের কর্মকর্তাদেরও শনাক্ত করেছে জিআরসি।
পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরিচয়পত্র ও ভ্রমণ নথিতে প্রবেশাধিকার না থাকলে শ্রমিকের পক্ষে চাকরি বদলানো বা দেশে ফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। আলাদা আবাসনও কর্মীগোষ্ঠীর বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করতে পারে। জিআরসি এসব নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে শাস্তির হুমকি দেওয়ার কথাও জানিয়েছে।
বিজ্ঞাপনে বলা ২৮ দিন ধরে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টার কর্মসূচি মাসে ৩৩৬ কর্মঘণ্টার সমান। অন্য বিজ্ঞাপনে মাসে মাত্র দুই দিন ছুটির কথা বলা হয়েছিল। জিআরসি দিনে ১৮ ঘণ্টা, সপ্তাহে ছয় বা সাত দিন পর্যন্ত কাজের পরিস্থিতির কথাও জানিয়েছে, যা নিয়োগের বিজ্ঞাপনে দেওয়া কর্মসূচির চেয়ে আরও বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে।
জিআরসির আইনবিষয়ক উপদেষ্টা এলিস লরিও প্রেভো শ্রমিকদের কথিত আচরণের সঙ্গে দুই সরকারের অগ্রাধিকারের যোগসূত্র টেনেছেন। তদন্তের উপসংহার তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন:
এই তদন্ত দুই রাষ্ট্রের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপজ্জনক সমাপতন উন্মোচন করেছে।
জিআরসির উদ্বেগ, শ্রমিক সরবরাহ ও রাষ্ট্রীয় আয় বাড়ানোর চাপে শ্রমিকদের নিজেদের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ খুব কম থাকে। জোরপূর্বক শ্রম বলতে জবরদস্তি বা হুমকির মাধ্যমে আদায় করা কাজ বোঝায়, যে কাজ কোনো ব্যক্তি স্বাধীনভাবে প্রত্যাখ্যান করতে বা ছেড়ে যেতে পারেন না।
অর্থ কার কাছে যায়?
জিআরসির তথ্য অনুযায়ী, মধ্যস্থতাকারীরা প্রতি উত্তর কোরীয় শ্রমিকের জন্য ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার রুবল নিয়োগ ফি নিতেন। সর্বোচ্চ অঙ্কটি প্রায় ১ হাজার ৮৬০ ডলার বলে জানানো হয়েছে। ফলে উৎপাদনের মাধ্যমে শ্রমিকদের উপার্জিত মজুরির হিসাবের আগেই শ্রমিক পাওয়ার জন্য নিয়োগদাতাদের বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হতো।
জিআরসি বলেছে, শ্রমিকেরা তাদের আয়ের সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ উত্তর কোরীয় কর্তৃপক্ষকে দিয়ে দিতেন। কোরিয়া রিস্ক গ্রুপের শ্রেয়াস রেড্ডি আরও বিস্তৃত একটি হিসাব দিয়েছেন: শ্রমিকেরা সরাসরি পেতেন মাত্র ১০ থেকে ২৫ শতাংশ, আর বাকি অর্থ যেত উত্তর কোরীয় রাষ্ট্রীয় কোম্পানি ও কর্তৃপক্ষের কাছে।
কোনো শ্রমিক ১০০ ডলারের সমপরিমাণ আয় করলে, জিআরসির হিসাব অনুযায়ী তার কাছে থাকত প্রায় ১০ ডলার; রেড্ডির হিসাব অনুযায়ী থাকত ১০ থেকে ২৫ ডলার। দুই বর্ণনাতেই আয়ের বেশির ভাগ শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণকারী ১১টি দেশের জোট মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিম (এমএসএমটি) সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে অনুমান করেছে, ১২টি দেশে ৩৫ হাজার ৬০০ থেকে ১ লাখ ১ হাজার ২৮০ জন উত্তর কোরীয় কাজ করতেন। বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে বার্ষিক আয় ৪৫ কোটি থেকে ৮০ কোটি ডলার বলে হিসাব করেছে তারা। এই পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক কর্মীবাহিনী নিয়ে; ২০২৪ সালের শেষদিকে শুধু রাশিয়াতেই শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার বলে তাদের অনুমান।
বেসামরিক উৎপাদন ও সামরিক সরবরাহের যোগসূত্র
ব্ল্যাক হর্সের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের কাজের মধ্যে ছিল রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশে যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং উত্তর কোরিয়ায় কৃষিপণ্য রপ্তানি। তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো চীন ও ইউরোপ থেকে উৎপাদন সরঞ্জামও আমদানি করত; রাশিয়ার সামরিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্তত দুটি কেন্দ্র শনাক্ত করেছে জিআরসি।
সামরিক বাহিনীর খাবারের রেশন তৈরির কারখানাটি সশস্ত্র বাহিনীর কাজে সহায়তার সরাসরি উদাহরণ। রেশন হলো সেনাদের জন্য প্যাকেটজাত খাবার। পোষা প্রাণীর খাবার উৎপাদন ও কৃষিকাজ দেখায়, কথিত নিয়োগব্যবস্থাটি বেসামরিক উৎপাদনেও বিস্তৃত হয়েছিল।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও শিল্প সহযোগিতায় ভূমিকার কারণে অক্টোবরে সোকোলভের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। জিআরসির তদন্তে তাঁর যন্ত্রপাতি, কৃষিপণ্য ও শ্রমিক নিয়োগের ব্যবসাগুলো একই বৃহত্তর বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।
জিআরসির ব্যবসা ও মানবাধিকার বিভাগের প্রধান লারা স্ট্রেঞ্জওয়েজ রাশিয়ায় শ্রমিকদের কাজের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের রাজস্বের যোগসূত্র এভাবে বর্ণনা করেছেন:
উত্তর কোরীয় শ্রম রাশিয়ার সেই শিল্পগুলোকে টিকিয়ে রাখছে, যেগুলো ইউক্রেনের যুদ্ধে সংশ্লিষ্ট; আর উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের উপার্জিত মজুরি উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মসূচিতে অর্থায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তাঁর মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো দুটি সুবিধা পাচ্ছে: রাশিয়া উৎপাদনের জন্য শ্রমিক পাচ্ছে, আর উত্তর কোরিয়া বিদেশে উপার্জিত অর্থ থেকে আয় করছে। এই বিনিময়ের মাঝখানে থাকা শ্রমিকেরা, হিসাবগুলো অনুযায়ী, তাদের মজুরির সামান্য অংশই হাতে রাখছেন।
বিরোধের পেছনে জাতিসংঘের বিধিনিষেধ
২০১৭ সালে পিয়ংইয়ংয়ের ষষ্ঠ পারমাণবিক পরীক্ষার পর উত্তর কোরীয়দের বিদেশে কাজের ওপর বিধিনিষেধ আরও কঠোর করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। নতুন ওয়ার্ক পারমিট নিষিদ্ধ করা হয় এবং বিদেশে আয় করছেন এমন উত্তর কোরীয়দের ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরত পাঠাতে দেশগুলোকে বলা হয়।
উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও অস্ত্র কর্মসূচির জন্য অর্থের জোগান কমানোই ছিল এই বিধিনিষেধের উদ্দেশ্য। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীন দুটিই পদক্ষেপগুলোর পক্ষে ভোট দেয়। পরে দক্ষিণ কোরিয়া ও পশ্চিমা সরকারগুলো দুই দেশের বিরুদ্ধেই বিধিনিষেধ না মানার অভিযোগ তোলে।
কথিত বিকল্প ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে কারখানার শ্রমিকদের শিক্ষার্থীর পরিচয় দেওয়া যায়। জিআরসির যুক্তি, সংগঠিত শিফট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদল সরবরাহের চুক্তিসহ বাস্তব কাজের ধরন বিধিনিষেধের আওতাভুক্ত কর্মসংস্থান।
২০২৪ সালে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের কার্যকাল বাড়ানোর প্রস্তাবে ভেটো দিয়ে রাশিয়া আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থাও বদলে দেয়। ২০০৯ সাল থেকে প্যানেলটি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করে আসছিল। ওই বছর দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ১১টি দেশ জাতিসংঘের প্যানেলের বাইরে থেকে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যেতে এমএসএমটি গঠন করে।
অংশীদারত্বের বিকাশ
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে দেশটির সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর হয়। জিআরসির বর্ণনায়, পিয়ংইয়ং অস্ত্র ও জনবল দিয়েছে, আর মস্কো দিয়েছে অর্থ ও জ্বালানি।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার ভাষ্য, ২০২৪ সাল থেকে রুশ বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করতে উত্তর কোরিয়া ১০ হাজারের বেশি সেনা পাঠিয়েছে। অন্য প্রতিবেদনে সেনা মোতায়েনের সংখ্যা ১১ হাজার থেকে ২৫ হাজার বলা হয়েছে। রুশ কারখানা ও খামারে কাজ করা শ্রমিকদের হিসাবের বাইরে এই সামরিক সদস্যরা।
শ্রমিক নিয়োগের অভিযোগ যে কয়েক বছর ধরে বিস্তৃত হওয়া সম্পর্কের অংশ, প্রধান ঘটনাগুলোতে তা স্পষ্ট:
- ২০১৭: দেশটির ষষ্ঠ পারমাণবিক পরীক্ষার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বিদেশে উত্তর কোরীয়দের কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধ কঠোর করে।
- ডিসেম্বর ২০১৯: জাতিসংঘের পদক্ষেপ অনুযায়ী বিদেশে আয় করা উত্তর কোরীয়দের দেশে ফেরত পাঠানোর সময়সীমা শেষ হয়।
- ২০২২: রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করে; এরপর পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর হয়।
- ২০২৩: এক শীর্ষ সম্মেলনে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার নেতারা নতুন করে সহযোগিতার অঙ্গীকার করেন।
- ২০২৪: ভ্লাদিমির পুতিন ও কিম জং উন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারসহ একটি অংশীদারত্ব চুক্তিতে সই করেন। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ প্যানেলের কার্যকাল বাড়ানোর প্রস্তাবও রাশিয়া আটকে দেয়।
- ২০২৪ সালের শেষ: রাশিয়ায় উত্তর কোরীয় শ্রমিকের সংখ্যা ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার বলে এমএসএমটি অনুমান করে।
সশস্ত্র সংঘাত হলে দুই দেশকে একে অপরকে সহায়তা করতে বাধ্য করে এই চুক্তি। শ্রমিক নিয়োগ সামরিক সরবরাহ, সেনা মোতায়েন এবং আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা অঙ্গীকারের পাশাপাশি এই অংশীদারত্বে অর্থনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে।
অস্বীকার ও অমীমাংসিত প্রশ্ন
নেটওয়ার্কটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত দুই রুশ নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জিআরসি। তাঁদের একজন জবাব দিয়ে অভিযোগ অস্বীকার করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বলেছে, তারা রুশ আইন মেনে চলেছে এবং কর্মসংস্থানের বিধিনিষেধ এড়াতে শিক্ষার্থীর পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
মন্তব্য জানতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মস্কোয় উত্তর কোরীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি। তদন্তে নথিপত্র নিয়ন্ত্রণ ও কর্মস্থল পরিদর্শনের মাধ্যমে দূতাবাসের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছে, ফলে প্রতিবেদনে দূতাবাসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বর্তমানে ঠিক কতজন উত্তর কোরীয় কাজ করছেন, নিয়োগদাতাদের পূর্ণ তালিকা কী এবং পিয়ংইয়ংয়ে কত রাজস্ব পাঠানো হয়েছে, তা অজানা। রাশিয়ায় ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার শ্রমিকের হিসাবটি ২০২৪ সালের শেষ সময়ের; আর বছরে ৪৫ কোটি থেকে ৮০ কোটি ডলার আয়ের অনুমানটি ১২টি দেশে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের নিয়ে।
রুশ নিয়োগদাতাদের ক্ষেত্রে তদন্তটি জাতিসংঘের বিধিনিষেধ অমান্য করে পরিচালিত নিয়োগব্যবস্থায় সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ করেছে। উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের জন্য প্রতিবেদনে আরও তাৎক্ষণিক কিছু পরিস্থিতির বর্ণনা রয়েছে: অত্যন্ত দীর্ঘ শিফট, নথিপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগে বাধা এবং আয়ের বড় অংশ রাষ্ট্রের হাতে চলে যাওয়া।
মূল তথ্য
- জিআরসি রাশিয়ার এমন একটি নেটওয়ার্কের সূত্র পেয়েছে, যেখানে কারখানা ও কৃষিকাজের জন্য ৫০ থেকে ১০০ জনের উত্তর কোরীয় শ্রমিকদলের বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো।
- দিনে ১২ ঘণ্টা করে ২৮ দিনের কর্মসূচি মাসে ৩৩৬ কর্মঘণ্টার সমান।
- মস্কোর কাছে সামরিক বাহিনীর খাবারের রেশন তৈরির কারখানা ও পোষা প্রাণীর খাবার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে কাজের প্রমাণ শনাক্ত করেছেন তদন্তকারীরা।
- জিআরসির অভিযোগ, শিক্ষার্থী ভিসার আড়ালে কর্মসংস্থান লুকানো হয়েছিল এবং শ্রমিকদের নথিপত্র নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
- মধ্যস্থতাকারীরা প্রতি শ্রমিকের জন্য সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার রুবল নিয়েছেন; বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী শ্রমিকেরা তাঁদের আয়ের সামান্য অংশই হাতে রাখতেন।
- ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মসংস্থানের বিধিনিষেধ এড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তারা রুশ আইন মেনে চলেছে।
- জাতিসংঘের পদক্ষেপ অনুযায়ী, বিদেশে আয় করা উত্তর কোরীয়দের ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা ছিল।






