জরিপে গভীর বৈষম্যের চিত্র
সম্প্রতি এক জরিপে দক্ষিণ কোরিয়ার উচ্চাভিলাষী বিদেশি গৃহকর্মী নিয়োগের পাইলট কর্মসূচির কঠোর বাস্তবতা উঠে এসেছে। এতে মজুরি ও কাজের পরিবেশে উল্লেখযোগ্য বৈষম্যের চিত্র দেখা গেছে। জেজু ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লি মি-এ পরিচালিত এবং Korea Association for Immigration Policy and Administration-এর সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশি গৃহকর্মীরা মারাত্মকভাবে কম মজুরি পেয়েছেন এবং সম্মত কাজের পরিধির বাইরেও কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন।
সূচিপত্র
জরিপে ২১ জন ফিলিপিনো গৃহকর্মী ও দুজন অনুবাদক অংশ নেন। তাঁরা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সিউল মহানগর সরকার চালু করা কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছিলেন। তথ্য-উপাত্তে কর্মীদের আর্থিক দুরবস্থার স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। অংশগ্রহণকারীরা জানান, কর্মসূচির প্রথম ছয় মাসে তাঁরা মাসে গড়ে ১৯ লাখ ২০ হাজার ওন মজুরি পেয়েছেন। এই অঙ্ক ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরীয়দের পাওয়া গড় মাসিক মজুরির অর্ধেকেরও কম; সে বছর গড় মজুরি ছিল ৩৭ লাখ ৪০ হাজার ওন।
আবাসন ও বিমার মতো বাধ্যতামূলক খরচ বাদ দিলে আর্থিক চাপ আরও স্পষ্ট হয়। এসব খরচ কাটার পর বিদেশি কর্মীদের নিট মাসিক মজুরি নেমে আসে মাত্র ১১ লাখ ৮০ হাজার ওনে। এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরগুলোর একটিতে জীবনধারণের জন্য এই অর্থ কেবল কোনোমতে যথেষ্ট। ফলে যেসব শ্রমিককে নিয়োগের জন্য কর্মসূচিটি তৈরি, তাঁদের জন্য এর অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মজুরির ব্যবধানের পাশাপাশি কাজের পরিধি নিয়েও উল্লেখযোগ্য সমস্যা তুলে ধরেছে জরিপটি। কয়েকজন অংশগ্রহণকারী জানান, তাঁদের প্রাথমিক চুক্তিতে ছিল না—এমন কাজ করতে বলা হয়েছে। এসব অতিরিক্ত কাজের মধ্যে ছিল বাসন ধোয়া, পোষা প্রাণীর দেখাশোনা, এমনকি শিশুদের ইংরেজি পড়ানোও। এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, দক্ষিণ কোরীয় পরিবারগুলোতে এসব কর্মীর ভূমিকা কী হওয়ার কথা, তা নিয়ে মৌলিক ভুল-বোঝাবুঝি বা যোগাযোগের ঘাটতি ছিল।
গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক লি মি-এ গৃহস্থালি শ্রমকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের সেবার টেকসই ব্যবস্থা গড়তে গৃহকর্মের অর্থনৈতিক মূল্যকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
শিশু যত্নের মূল্য নতুন করে বিবেচনা করতে হবে, গৃহকর্মের অর্থনৈতিক মূল্যকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং উচ্চমানের গৃহকর্মের সেবা ও কর্মসংস্থানের একটি ইতিবাচক চক্র গড়ে তুলতে হবে।
কর্মসূচিটি প্রথমে মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০০ জন কর্মী নিয়ে চালু হয়। সিউলের দেড় শতাধিক পরিবারকে সেবা দেওয়ার পর ডিসেম্বরে এর প্রাথমিক পর্যায় শেষ হয়। গৃহস্থালি কাজ করতে আগ্রহী স্থানীয় কর্মীর তীব্র সংকট মোকাবিলা এবং দক্ষিণ কোরীয় নারীদের কর্মজীবন চালিয়ে যেতে সহায়তা করার লক্ষ্য ছিল এই উদ্যোগের।
জনমিতিক প্রেক্ষাপট ও নীতিগত লক্ষ্য
বিশ্বের সর্বনিম্ন জন্মহার মোকাবিলার মরিয়া প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া বিদেশি গৃহকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৩ সালে দেশটির জন্মহার কমে ০.৭৮-এ দাঁড়ায়। সরকারের মতে, গৃহস্থালি কাজ ও শিশুর যত্নের বোঝা তরুণীদের সন্তান নেওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে থাকা থেকে বিরত রাখার প্রধান কারণগুলোর একটি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া পাইলট কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল ফিলিপাইন থেকে প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারী এনে এই চাপ কমানো।
কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী দ্বৈত-আয়ের দম্পতি, একক অভিভাবকের পরিবার এবং একাধিক সন্তান রয়েছে এমন পরিবারকে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, লক্ষ্য ছিল গৃহস্থালি দায়িত্বের বোঝা কমিয়ে পরিবার গঠন এবং মায়েদের কর্মজীবন ধরে রাখতে উৎসাহ দেওয়া। সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের ব্যবস্থাকে আদর্শ ধরে এই কৌশল নেওয়া হয়, যেখানে বিদেশি গৃহকর্মীরা নগরজীবনের পরিচিত অংশ।
সিউলের মেয়র ও সে-হুন এই উদ্যোগের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, দক্ষিণ কোরিয়া জনসংখ্যা বিলুপ্তির সতর্কসংকেত দেখছে। এশিয়ার অন্যান্য নগরকেন্দ্রে বিদেশি গৃহকর্মী নিয়োগের ব্যবস্থার সাফল্যের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এ ধরনের নীতি কম জন্মহারের প্রবণতা উল্টে দিতে না পারলেও পতনের গতি কমাতে সাহায্য করেছে। তবে এই নীতি বাস্তবায়ন বিদেশ থেকে শ্রমিক আনার চেয়ে অনেক বেশি জটিল প্রমাণিত হয়েছে।
সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, সস্তা বিদেশি শ্রমের ওপর নির্ভরতা জনমিতিক সংকটের মূল কারণগুলো দূর করে না। ইহওয়া ওমেন্স ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক লি জু-হি বলেন, বিদেশি কর্মী আনা জনমিতিক সমস্যার সমাধান করবে—এমন সম্ভাবনা কম; বরং স্থানীয় কর্মীদের কাজের পরিবেশ উন্নত করায় মনোযোগ দেওয়া উচিত। তাঁর মতে, মধ্যবয়সী কোরীয় নারীদের একটি বড় অংশ এসব কাজ করতে পারেন, যদি কাজগুলোতে পূর্ণকালীন কর্মঘণ্টা ও সুযোগ-সুবিধা থাকে।
সরকার আশা করেছিল, স্বীকৃত সংস্থার মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ ও নিবিড় তদারকির ফলে অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতায় দেখা সমস্যাগুলো এড়ানো যাবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি দেখিয়েছে, কঠোর নজরদারি ও পাইলট কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা থাকলেও গৃহকর্মীদের কাঠামোগত সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দূর করা কঠিন।
পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি ও কাজের পরিধি বৃদ্ধি
কর্মসূচিটির কেন্দ্রীয় টানাপোড়েনের একটি হলো কর্মীদের ভূমিকা কী—তা নিয়ে। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই পেশাদার পরিচর্যাকারীর লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফিলিপিনো নারী। তাঁরা নিজেদের প্রথাগত গৃহকর্মীর বদলে মূলত পরিচর্যাকারী হিসেবে দেখেন। এই পার্থক্য নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি করেছে; নিয়োগকর্তারা হয়তো আরও বিস্তৃত গৃহস্থালি সেবা আশা করেন।
দেশে আসার আগে নেওয়া সাক্ষাৎকারে মেরি ও বেলের মতো অংশগ্রহণকারীরা জোর দিয়ে বলেছিলেন, তাঁদের প্রধান দায়িত্ব গর্ভবতী মা বা শিশুদের যত্ন নেওয়া। তাঁদের বোঝাপড়া ছিল, গৃহস্থালি কাজ কেবল পরিচর্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হলেই করতে হবে। যেমন, তাঁরা শিশুর বোতল ধুতে বা খেলার জায়গা পরিষ্কার করতে পারেন; কিন্তু আবর্জনা ফেলা, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রান্না করা বা সাধারণ গুছিয়ে রাখার মতো কাজ চুক্তির অংশ নয় বলেই তাঁরা মনে করতেন।
তবে জরিপের ফলাফল ও পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, এসব সীমারেখা প্রায়ই অস্পষ্ট হয়ে গেছে। কর্মীরা জানান, তাঁদের পুরো পরিবারের বাসন ধুতে, শিশুদের ইংরেজি পড়াতে এবং পোষা প্রাণীর দেখাশোনা করতে বলা হয়েছে। এসব কাজ পরিচর্যার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞার বাইরে এবং কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
আমার প্রধান কাজ পরিচর্যা করা। প্রয়োজন হলে পরিচর্যার সঙ্গে সম্পর্কিত গৃহস্থালি কাজে আমি শুধু সহায়তা করব, এটাই বুঝেছি।
কর্মসূচি শুরুর আগেও কাজের বিবরণে অস্পষ্টতা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। কর্মসংস্থান ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক নির্দেশিকায় কেবল বলা হয়েছিল, কাজের মধ্যে শিশুর যত্ন ও হালকা গৃহস্থালি কাজ রয়েছে; কিন্তু সেগুলোর সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। এই অস্পষ্টতার কারণে অতিরিক্ত কাজের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে প্রতিক্রিয়া বা চাকরি হারানোর আশঙ্কা ছাড়া কর্মীদের পক্ষে তা করা কঠিন হয়েছে।
ভাষাগত বাধাও এই যোগাযোগকে আরও জটিল করে তোলে। কর্মীদের ইংরেজি ও কোরীয় ভাষায় দক্ষতার ভিত্তিতে বাছাই করা হলেও, গৃহস্থালি প্রত্যাশা নিয়ে সাংস্কৃতিক সূক্ষ্ম পার্থক্য ভুল-বোঝাবুঝির কারণ হতে পারে। নিয়োগকর্তার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে কোনো কর্মী যখন অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য বোধ করেন, তখন সম্মত শ্রমমান কার্যত ক্ষয় হতে থাকে।
বিদেশি গৃহকর্মীর সংখ্যা বেশি—এমন অন্যান্য অঞ্চলেও কাজের পরিধি এভাবে বেড়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা গেছে। কাজের বিবরণ কঠোরভাবে কার্যকর না করলে পেশাদার পরিচর্যাকারীর ভূমিকা দ্রুত সাধারণ গৃহকর্মীর কাজে পরিণত হতে পারে; এতে তাঁদের বিশেষ দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের মূল্য কমে যায়।
আর্থিক বাধা ও সেবায় প্রবেশাধিকার
কর্মীরা কম মজুরির মুখে পড়লেও কর্মসূচির উচ্চ ব্যয় নিয়োগকর্তাদের জন্যও সমস্যা তৈরি করেছে। ফলে এমন এক বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে, যেখানে সেবাটি কর্মীদের আকৃষ্ট করার মতো লাভজনক নয়, আবার গড় পরিবারের সাধ্যের মধ্যেও নেই। দক্ষিণ কোরিয়া আন্তর্জাতিক শ্রমচুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ায় বিদেশি কর্মীদেরও সমান ন্যূনতম মজুরির অধিকার নিশ্চিত করতে হয়; এতে সেবার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শুরুতে সেবার ফি নির্ধারণ করা হয় ঘণ্টায় ১৩ হাজার ৯৪০ ওন। এর মধ্যে ন্যূনতম মজুরি, বিমা ও অন্যান্য বাধ্যতামূলক খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২৫ সালে এই হার বেড়ে ঘণ্টায় ১৬ হাজার ৮০০ ওনে দাঁড়ায়। সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা সেবা নিলে একটি পরিবারের মাসিক খরচ হতো প্রায় ২৯ লাখ ২০ হাজার ওন। দক্ষিণ কোরিয়ার গড় পরিবারের জন্য এটি বড় অঙ্ক; চার সদস্যের একটি পরিবারের গড় আয় প্রায় ৫০ লাখ ৪০ হাজার ওন।
ফলে মূলত ধনীরাই এই কর্মসূচির সুবিধা নিতে পেরেছেন। নগর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৪৩ শতাংশ আবেদন এসেছে সিউলের মাত্র তিনটি ধনী এলাকা—গাংনাম, সছো ও সংপা—থেকে। এই জনমিতিক ভারসাম্যহীনতা কর্মজীবী অভিভাবক ও দ্বৈত-আয়ের পরিবারকে সহায়তা করার ঘোষিত লক্ষ্যকে দুর্বল করে। বরং কর্মসূচিটি উচ্চবিত্তের জন্য ভর্তুকি হিসেবে কাজ করেছে; অথচ কাজ ও শিশুর যত্নের ভারসাম্য রাখতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন বলে ধারণা করা হয় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।
উচ্চ খরচ নাগরিক ও রাজনীতিবিদদের মধ্যেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেক বাসিন্দার মত, স্থানীয় কর্মী নিয়োগের খরচ যদি কাছাকাছি হয়, তবে সাংস্কৃতিক মিলের কারণে তাঁরা কোরীয় কর্মীকেই পছন্দ করবেন। অন্যরা মজুরি এত বেশি হলে বিদেশ থেকে শ্রমিক আনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন; তাঁদের মতে, এতে পাইলট কর্মসূচির উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়।
একই সময়ে, নিয়োগকর্তারা বেশি ফি দিলেও তা কর্মীদের হাতে বেশি মজুরি হিসেবে পৌঁছায়নি। ঘণ্টাপ্রতি ফির উল্লেখযোগ্য অংশ গেছে ব্যবস্থাপনা সংস্থা, বিমা ও আবাসন খাতে। এই ব্যবধান বর্তমান ব্যবস্থার অদক্ষতা তুলে ধরে: মধ্যস্বত্বভোগীরা বড় অংশ রেখে দেওয়ায় কর্মীরা আইনত ন্যূনতম মজুরি পেলেও, কর্তনের পর বাস্তবে তা অপর্যাপ্ত থেকে যায়।
আবাসন পরিস্থিতি ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ
কর্মসূচি এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে কর্মীদের ওপর আরোপিত কঠোর আবাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শুরুতে কর্মীদের যৌথ আবাসনে রাখা হয়েছিল এবং রাত ১০টার কারফিউ জারি ছিল, যা রাতে তাঁদের আবাসস্থল থেকে বের হওয়া সীমিত করত। শ্রম অধিকারকর্মী ও কর্মীরা নিজেরাই এর সমালোচনা করেন। তাঁদের যুক্তি, প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে অবসর সময় কীভাবে কাটাবেন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাঁদের থাকা উচিত।
দুই গৃহকর্মী নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁদের অন্য একটি শহরে খুঁজে পাওয়া গেলে কারফিউ নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়। প্রতিক্রিয়া ও এই ঘটনার পর সিউল মহানগর সরকার ২০২৪ সালের শেষ দিকে কারফিউ তুলে নেয়। কর্তৃপক্ষ বেতন দেওয়ার ব্যবস্থাও বদলে মাসে একবারের বদলে দুবার বেতন পাওয়ার সুযোগ করে দেয়, যাতে দেশে টাকা পাঠানো কর্মীদের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহ ভালো থাকে।
এসব পরিবর্তনের পরও নির্যাতনের আশঙ্কা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়ে গেছে। কর্মী অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা হংকংয়ের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করতে দক্ষিণ কোরিয়াকে সতর্ক করেছেন। হংকংয়ে বিদেশি গৃহকর্মীদের নিয়োগকর্তার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতে হয়। হংকংয়ের ফিলিপিনো অধিকারকর্মী শিয়েলা তেবিয়া-বোনিফাসিও সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের নীতি আধুনিক দাসত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারে; কর্মীরা কর্মস্থল থেকে বেরোনোর সুযোগ না থাকায় শোষণের ঝুঁকিতে পড়েন।
দক্ষিণ কোরিয়ার পাইলট কর্মসূচিতে কর্মীরা নিয়োগকর্তাদের থেকে আলাদা থাকেন, যা তাঁদের সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়ায় দুজন কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়; তাঁরা অতিরিক্ত কর্মঘণ্টাসহ গুরুতর শোষণের অভিযোগ করেন। মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও, এর ফলে আরও কঠোর তদারকির দাবি জোরালো হয়েছে।
কোরিয়া কনফেডারেশন অব ট্রেড ইউনিয়নসহ শ্রমিক সংগঠনগুলো কর্মসূচি স্থগিত করে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, মজুরি দিতে দেরি, কাজের অস্পষ্ট বিবরণ এবং যথাযথ তদারকির অভাব—এমন কিছু স্থায়ী সমস্যা রয়েছে, যেগুলো সমাধান না করে কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথা বিবেচনা করা উচিত নয়।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ স্থগিত
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও প্রশাসন পরিবর্তনের কারণে বিদেশি গৃহকর্মী কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলের সময় প্রকল্পটি সমর্থন পেয়েছিল। তবে এপ্রিলে তিনি পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর উদ্যোগটি বড় বাধার মুখে পড়ে। তাঁর উত্তরসূরি, ডেমোক্রেটিক পার্টির লি জে-মিয়ং, ২০২৫ সালের জুনে দায়িত্ব নেন। তিনি এমন এক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধি, যারা এই উদ্যোগ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ জানিয়ে এসেছে।
কর্মসংস্থান ও শ্রম মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি কর্মসূচিটির দীর্ঘমেয়াদি রূপ চূড়ান্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সামনে আসেনি। শ্রম উপমন্ত্রী কিম মিন-সক জুনে বলেন, পাইলট কর্মসূচির বাইরে সম্প্রসারণ সহজ হবে না। খরচ ও কর্মীদের সুরক্ষা নিয়ে অমীমাংসিত সমস্যা দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার দেশব্যাপী কর্মসূচি চালুর অনুমোদন দিতে অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে।
এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বর্তমানে কর্মসূচিতে থাকা কর্মীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। অনুমোদনহীন অনুপস্থিতি ও স্বেচ্ছায় চলে যাওয়ার কারণে ২০২৫ সালের মার্চ নাগাদ কর্মীর সংখ্যা প্রাথমিক ১০০ থেকে কমে ৮৯-এ দাঁড়ায়। প্রায় ৫০০ পরিবারের অপেক্ষমাণ তালিকা থাকা সত্ত্বেও সরকার নতুন কর্মী নিয়োগ বা প্রাথমিক দলের চুক্তি নবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছে।
সিউলের কর্মকর্তারা কর্মসূচি সম্প্রসারণের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলছেন, পরিবারগুলোর জন্য এই সেবা জরুরি। নগর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবহারকারীদের মধ্যে সন্তুষ্টির হার বেশি। মেয়র ও সে-হুনের দাবি, সেবাগ্রহীতাদের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং কর্মীদের ৭০ শতাংশের বেশি সন্তুষ্ট। তবে সিউল নগর পরিষদের সদস্য আই সু লু সাম্প্রতিক এক পরিষদ অধিবেশনে কর্মসূচিটিকে নীতিগত ব্যর্থতা আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
কোরিয়ায় বর্তমানে থাকা কর্মীদের কাজের অনুমতির মেয়াদ ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, তাই তাঁদের থাকার কথা। তবে সামনে এগোনোর স্পষ্ট পথ না থাকায় নতুন কর্মীরা আসতে পারছেন না এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, কর্মসূচি শেষ হলে কর্মীদের হোটেল বা রেস্তোরাঁর মতো অন্য সেবাখাতে পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে; তবে পরিচর্যা সহায়তার মূল লক্ষ্য তখন হারিয়ে যাবে।
এই স্থবিরতা সমাজের আরও বিস্তৃত সিদ্ধান্তহীনতার প্রতিফলন। জন্মহার বাড়ানো ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য গৃহস্থালি সহায়তার যে স্পষ্ট প্রয়োজন রয়েছে, তা স্বীকার করা হলেও এর খরচ কীভাবে মেটানো হবে বা কাজটি করা শ্রমিকদের মর্যাদা ও অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে—তা নিয়ে ঐকমত্য নেই। অর্থনৈতিক প্রয়োজন, সামাজিক সংশয় ও রাজনৈতিক পালাবদলের মাঝখানে কর্মসূচিটি আটকে আছে।
মূল কথা
বিদেশি গৃহকর্মী নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পরীক্ষামূলক উদ্যোগ শ্রম অভিবাসনের মাধ্যমে জনসংখ্যা হ্রাস মোকাবিলার জটিলতা বোঝার একটি দৃষ্টান্ত। জরিপের ফলাফল মজুরি কাঠামো ও কাজের সংজ্ঞায় গুরুতর ত্রুটি প্রকাশ করেছে; একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথও দেখিয়েছে। এই কর্মসূচি লিঙ্গসমতা ও পরিবারকে সহায়তার দিকে অগ্রগতি, নাকি শ্রমিক শোষণের সম্ভাব্য পথ—তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
- জরিপে দেখা গেছে, বিদেশি গৃহকর্মীরা গড়ে নিট ১১ লাখ ৮০ হাজার ওন মজুরি পেয়েছেন, যা স্থানীয় গড় মজুরির অর্ধেকেরও কম।
- কর্মীরা চুক্তির বাইরের কাজ—যেমন পোষা প্রাণীর যত্ন ও ইংরেজি পড়ানো—করার কথা জানিয়েছেন।
- ঘণ্টায় ১৬ হাজার ৮০০ ওনের উচ্চ সেবা-ফির কারণে কর্মসূচিটি মূলত সিউলের ধনী এলাকাগুলোর মানুষের নাগালে ছিল।
- ২০২৫ সালের প্রশাসন পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পাইলট কর্মসূচির সম্প্রসারণ থমকে গেছে।
- সম্ভাব্য নির্যাতন ঠেকাতে হংকংয়ের মতো নিয়োগকর্তার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা চালু না করার সতর্কতা দিয়েছেন অধিকারকর্মীরা।






