জাতীয় চেতনায় পরিবর্তন
অসারোগ্য অসুস্থতার ক্ষেত্রে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা না নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন করেছেন ৩২ লাখেরও বেশি দক্ষিণ কোরীয়। জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা জাতীয় সংস্থার প্রকাশিত এই পরিসংখ্যান জীবনের শেষ পর্যায় নিয়ে দেশটির দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধনকারীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নারী: ২১ লাখ ৩০ হাজার নারী এবং ১০ লাখ ৭০ হাজার পুরুষ নিজেদের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরা মোট নিবন্ধনকারীর দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি, যা ইঙ্গিত করে, বয়স্ক জনগোষ্ঠী জীবনের শেষ অধ্যায়ের জন্য সক্রিয়ভাবে পরিকল্পনা করছে।
সূচিপত্র
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যবস্থা চালুর পর থেকে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, ‘মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যু’র ধারণাটি ক্রমে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। প্রথম বছরে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৬ হাজার; ২০২১ সালের আগস্টে তা বেড়ে ১০ লাখে পৌঁছায় এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরে হয় ২০ লাখ। ২০২৫ সালের আগস্টে মোট সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। দ্রুত এই বিস্তার মৃত্যু, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং মৃত্যুর সময় চিকিৎসা ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে।
সাম্প্রতিক গবেষণাও এই প্রবণতার পক্ষে প্রমাণ দিয়েছে। কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ উত্তরদাতা শারীরিক যন্ত্রণা কমানো এবং পরিবারের আর্থিক চাপ লাঘব করাকে অগ্রাধিকার দেন। গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, অনেক কোরীয়ের কাছে ‘ভালো মৃত্যু’র সংজ্ঞা ঐতিহ্যগত পরিবারকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বস্তি এবং অপ্রয়োজনীয় কষ্ট এড়িয়ে চলার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
গবেষণায় বলা হয়েছে, “ক্রমেই বেশি সংখ্যক কোরীয় এখন ‘ভালো মৃত্যু’কে পরিবারকেন্দ্রিক মুহূর্ত হিসেবে কম, বরং যন্ত্রণামুক্ত ও আর্থিক চাপহীন মৃত্যু হিসেবে বেশি দেখছেন।” এতে ঐতিহাসিক রীতিনীতি থেকে উল্লেখযোগ্য সরে আসার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
জীবনের শেষ পর্যায়ের পরিচর্যা নিয়ে এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দক্ষিণ কোরিয়ায় চিকিৎসা নৈতিকতা ও পারিবারিক সম্পর্কের চিত্র বদলে দিচ্ছে। জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং চিকিৎসা প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণাত্মক চিকিৎসা প্রত্যাখ্যানের অধিকার রোগীর অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
আইনি কাঠামোর বিবর্তন
বর্তমান আইনি কাঠামো এক দিনে গড়ে ওঠেনি। বছরের পর বছর নৈতিক বিতর্ক এবং যুগান্তকারী কয়েকটি আইনি মামলার মধ্য দিয়ে এটি তৈরি হয়েছে; এসব মামলা দক্ষিণ কোরীয় সমাজকে মৃত্যু নিয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করেছিল। ২০১৮ সালের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা বিষয়ে সিদ্ধান্ত আইন প্রণয়নের পথ তৈরি করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আদালতের মামলা: ১৯৯৮ সালের বোরামে হাসপাতাল মামলা এবং ২০০৯ সালের সেভারেন্স হাসপাতাল মামলা।
১৯৯৮ সালের বোরামে হাসপাতাল মামলায়, আর্থিক সংকটের কারণে স্ত্রীর অনুরোধে এক রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর শল্যচিকিৎসকদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, চিকিৎসকেরা হত্যার সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন এবং স্ত্রীর অনুরোধকে অননুমোদিত প্রতিনিধির সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করে। এই রায় চিকিৎসা মহলে তীব্র আলোড়ন তোলে। ফৌজদারি দায় এড়াতে যেকোনো মূল্যে জীবন দীর্ঘায়িত করতে হবে, এমন ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয় চিকিৎসকদের মধ্যে।
এর এক দশক পর সেভারেন্স হাসপাতাল মামলায় আইনি পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘস্থায়ী অচেতন অবস্থায় থাকা এক নারীর পরিবার চিকিৎসা বন্ধ করার দাবিতে মামলা করে। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, রোগী মৃত্যুর অপরিবর্তনীয় পর্যায়ে পৌঁছালে তাঁর আত্মনির্ধারণের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। আদালত স্বীকার করে, রোগীর অনুমিত ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহার করা যেতে পারে; এর ভিত্তি মানবিক মর্যাদা এবং সুখের অন্বেষণের সাংবিধানিক অধিকার।
এই মামলাগুলো ২০১৬ সালে পাস এবং ২০১৮ সালে কার্যকর হওয়া আইনের বিচারিক ভিত্তি তৈরি করে। আইনটি রোগের ‘শেষ পর্যায়’ এবং ‘মৃত্যুপ্রক্রিয়ার’ মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করে। চিকিৎসা সত্ত্বেও কয়েক মাসের মধ্যে মৃত্যু হতে পারে, এমন অবস্থাকে শেষ পর্যায় বলা হয়। আর সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছাড়া মৃত্যু আসন্ন, এমন অবস্থাকে বলা হয় মৃত্যুপ্রক্রিয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইন অনুযায়ী শুধু ‘মৃত্যুপ্রক্রিয়ার’ সময়ই চিকিৎসা না দেওয়া বা প্রত্যাহার করা যায়। রোগীর স্বায়ত্তশাসন ও জীবনের সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখতেই এই সময়সীমা সংকীর্ণ রাখা হয়েছে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আইনটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা চালু করে। এর মধ্যে রয়েছে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা বিষয়ে অগ্রিম ইচ্ছাপত্র (ASLST) এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা বিষয়ে চিকিৎসকের নির্দেশ (POLST)। প্রক্রিয়াটি তদারকির জন্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা জাতীয় সংস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা কমিটির মতো কর্তৃপক্ষও গঠন করা হয়।
কনফুসীয় মূল্যবোধ বনাম আধুনিক ব্যক্তিস্বাধীনতা
ঐতিহ্যগতভাবে কনফুসীয় মূল্যবোধে প্রভাবিত সমাজে পশ্চিমা ধাঁচের আইনি কাঠামো বাস্তবায়ন করা বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। দক্ষিণ কোরিয়ায় কনফুসীয় মূল্যবোধে পিতামাতার প্রতি ভক্তি ও কর্তব্যের ওপর জোর দেওয়া হয়; সন্তানদের দায়িত্ব হলো মা-বাবার যত্ন নেওয়া এবং তাঁদের জীবন দীর্ঘায়িত করা। ঐতিহাসিকভাবে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত ছিল পরিবারের সম্মিলিত বিষয়, ব্যক্তির একক পছন্দ নয়। মৃত্যু নিয়ে আলোচনা প্রায়ই নিষিদ্ধ বিষয় বলে বিবেচিত হতো। হতাশা এড়াতে রোগীর অসুস্থতার পূর্বাভাস সম্পর্কে সত্যও অনেক সময় তাঁর কাছ থেকে আড়াল করা হতো।
এই সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও, তথ্য-উপাত্ত ব্যক্তিস্বাধীনতার দিকে স্পষ্ট অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণ হারে নারীদের নিবন্ধন করার বিষয়টি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় লিঙ্গভূমিকায় পরিবর্তন অথবা মৃত্যুচিন্তার মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের বেশি আগ্রহের ইঙ্গিত হতে পারে। এ ছাড়া, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতি চারজন প্রবীণ নারীর প্রায় একজন অগ্রিম নির্দেশনা জমা দিয়েছেন।
এই পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে পরিবারের ভূমিকা শেষ হয়ে গেছে। রোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অক্ষম হলে এবং তাঁর আগের ইচ্ছা নিশ্চিত করা না গেলে আইন অনুযায়ী পরিবারের সদস্যরা বিকল্প সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে কাজ করতে পারেন। তবে এতে মতবিরোধের ঝুঁকি থাকে। রোগীর আগে জানানো ইচ্ছার সঙ্গে পরিবার একমত না হলে, অথবা রোগীর সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হলে, তাঁর স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যুর পক্ষে বাড়তে থাকা আন্দোলন নিয়ে কোরিয়া জুংআং ডেইলি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা না নেওয়ার আইনি সুযোগের বাইরেও এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন রয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ কোরীয়দের ৯১.৯ শতাংশ বলেছেন, মরণাপন্ন অসুস্থ হলে তাঁরা জীবন দীর্ঘায়িত করার চিকিৎসা বন্ধ করবেন। জনসমর্থনের এই উচ্চ হার ইঙ্গিত করে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং অত্যাধুনিক চিকিৎসার বাস্তবতার সঙ্গে সেগুলো খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
আইন ও চিকিৎসা বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান
আইনি কাঠামো থাকলেও গবেষণায় আইনের উদ্দেশ্য ও চিকিৎসা-চর্চার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা গেছে। BMC Medical Ethics-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় ইলেকট্রনিক চিকিৎসা-নথি বিশ্লেষণ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জরিপ করে দেখা গেছে, রোগের গতিপথের একেবারে শেষ দিকে গিয়ে প্রায়ই চিকিৎসা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায়ই মৃত্যুর মাত্র এক বা দুই দিন আগে নেওয়া হয়। শেষ মুহূর্তের এই সময়সীমা অগ্রিম পরিকল্পনার ধারণাকে দুর্বল করে, কারণ আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময় রোগীরা প্রায়ই এতটাই অসুস্থ থাকেন যে অর্থবহভাবে সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারেন না। সিদ্ধান্ত কে নেন, তা নিয়েও গবেষণায় অসংগতি উঠে এসেছে। রোগী ও তাঁদের পরিবার মনে করেন, সিদ্ধান্তটি রোগীরই নেওয়া উচিত; কিন্তু চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ৮১.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেন পরিবারের সদস্যরা।
চিকিৎসকেরাও নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। রোগের পূর্বাভাস নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা নিয়ে আলোচনার ‘সঠিক সময়’ নির্ধারণ করতে চিকিৎসকদের প্রায়ই হিমশিম খেতে হয়। আইন অনুযায়ী, চিকিৎসা প্রত্যাহারের আগে রোগীকে ‘মৃত্যুপ্রক্রিয়ার’ মধ্যে থাকতে হবে; কিন্তু চিকিৎসাগতভাবে এই পর্যায় নির্দিষ্ট করা কঠিন।
গবেষণার লেখকেরা বলেছেন, “জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা বন্ধের বিষয়ে আলোচনার উপযুক্ত সময় রোগী সংকটাপন্ন, কিন্তু সচেতন থাকাকালীন হওয়া উচিত বলে অধিকাংশ চিকিৎসক ও নার্স মনে করেন।”
তবে বাস্তবে আইনি দায়ের ভয় এবং চিকিৎসাগত মানদণ্ডের অস্পষ্টতার কারণে রোগী অচেতন না হওয়া পর্যন্ত প্রায়ই এসব আলোচনা পিছিয়ে যায়। ফলে মৃত্যু আসন্ন না হওয়া পর্যন্ত আক্রমণাত্মক চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াই সাধারণ নিয়ম হয়ে থাকে, যদিও অনেক রোগী আরও আগে আরামদায়ক পরিচর্যা চাইতে পারতেন।
প্রশমনমূলক পরিচর্যায় অসম সুযোগ
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, হসপিস ও প্রশমনমূলক পরিচর্যা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য। ২০১৮ সালের আইনটির উদ্দেশ্য ছিল জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি হসপিস পরিচর্যার প্রসার ঘটানো। কিন্তু বর্তমান বিধি অনুযায়ী, সরকারি ব্যবস্থায় নির্ধারিত হসপিস সেবা নেওয়ার সুযোগ সীমিত মাত্র পাঁচটি রোগের রোগীদের জন্য: ক্যানসার, এইচআইভি, দীর্ঘস্থায়ী অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ, দীর্ঘস্থায়ী যকৃতের অকার্যকারিতা এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের অকার্যকারিতা।
এই বিধিনিষেধের ফলে হৃদ্রোগ বা ডিমেনশিয়ার মতো গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত বহু রোগী বিশেষায়িত প্রশমনমূলক পরিচর্যা পাওয়ার আইনি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। ২০২৪ সালে একটি চিকিৎসা সাময়িকীতে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে মরণাপন্ন রোগীদের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ প্রশমনমূলক পরিচর্যা পেয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে হৃদ্রোগ ও ডিমেনশিয়া থাকলেও এই সেবার ব্যবহার মূলত ক্যানসার রোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
প্রশমনমূলক পরিচর্যা না পেলে, কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে রোগীরা আক্রমণাত্মক জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বাধ্য বোধ করতে পারেন। গুরুতর স্বাস্থ্যজনিত কষ্টে থাকা সব রোগীর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রশমনমূলক পরিচর্যার সুপারিশ করে; তবে দক্ষিণ কোরিয়ার আইন এখনো এই বৈশ্বিক মানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। আওতাভুক্ত রোগের তালিকা বাড়ানোর উদ্যোগ ধীরগতির, ফলে প্রয়োজনীয় সহায়তাব্যবস্থা ছাড়াই অনেক পরিবারকে জীবনের শেষ পর্যায় সামলাতে হচ্ছে।
ব্যবস্থাগত ঝুঁকি ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা
অগ্রিম নির্দেশনা ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কার্যকর হলেও এতে ব্যবস্থাগত ঝুঁকি তৈরি হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি ঘটনা এই দুর্বলতা প্রকাশ করে। একটি তথ্যকেন্দ্রে আগুন লাগার ফলে ন্যাশনাল ইনফরমেশন রিসোর্সেস সার্ভিসের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সরকারের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রোগীরা অগ্রিম নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেছেন কি না, তা যাচাই করতে পারেনি হাসপাতালগুলো।
এই বিপর্যয়ে সারা দেশের চিকিৎসাকেন্দ্রে তাৎক্ষণিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। অচেতন রোগীরা জীবন দীর্ঘায়িত করার চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কি না, তা চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করতে পারেননি। যাচাইযোগ্য নথি না থাকায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পরিবারের সদস্যদের হাতে ফিরে যায়। যেসব রোগী আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন বা একা থাকতেন, তাঁদের ইচ্ছা উপেক্ষিত হওয়ার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়।
এমনই এক ঘটনায়, মরণাপন্ন পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি কয়েক মাস আগে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাখ্যানের নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া হলে, ব্যবস্থাটি বন্ধ থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁর নথি যাচাই করতে পারেনি। সংকটের মুহূর্তে চিকিৎসাকর্মীরা রোগী ও তাঁর পরিবারকে নতুন নথি তৈরি করতে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। ঘটনাটি ব্যবস্থাটির ভঙ্গুরতা এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে যত্নসহকারে করা পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে রোগীদের যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা স্পষ্ট করে।
বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সচেতন রোগীদের নিবন্ধন কার্ড সঙ্গে রাখা এবং সরাসরি হাসপাতালে নথিতে স্বাক্ষর করতে উৎসাহিত করেছে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা জাতীয় সংস্থা। তবে এ ঘটনা এমন মানুষের স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেছে, যাঁরা নিজের হয়ে কথা বলতে পারেন না।
আইন সম্প্রসারণের প্রস্তাব
এই সীমাবদ্ধতাগুলো স্বীকার করে আইনপ্রণেতা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আইনের আওতা বাড়ানোর সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছেন। ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টি অব কোরিয়ার সংসদ সদস্য নাম ইন-সুন ২০২৫ সালে আইন সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে শুধু তাৎক্ষণিক ‘মৃত্যুপ্রক্রিয়ায়’ থাকা রোগীদের নয়, ‘মৃত্যুর সম্ভাবনা আসন্ন’ এমন রোগীদেরও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমান আইন অনুযায়ী, চিকিৎসা বন্ধ করার আগে রোগীর মৃত্যু আসন্ন হতে হবে। এই সংকীর্ণ সংজ্ঞা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত করে এবং রোগীকে এমন চিকিৎসা নিতে বাধ্য করতে পারে, যাতে সামান্যই উপকার হয়। প্রস্তাবিত সংশোধনীর লক্ষ্য, অপরিবর্তনীয় অসুস্থতার গতিপথের আরও আগের পর্যায়েই রোগীদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা না নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। এতে আইনি কাঠামো ‘শেষ পর্যায়ে’র ধারণার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে; এ পর্যায়ে কয়েক মাসের মধ্যে মৃত্যু প্রত্যাশিত, তবে তা এখনো আসন্ন নয়।
কল্যাণমন্ত্রী জং উন-কিয়ংও আইনের আওতা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, সিদ্ধান্তকে রোগের শেষ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখলে রোগীর আত্মনির্ধারণের অধিকার সংকুচিত হয়। হসপিস ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা বিষয়ে সরকারের দ্বিতীয় সমন্বিত পরিকল্পনায় (২০২৪-২০২৮) চিকিৎসা প্রত্যাহারের সময় এগিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে। এতে ক্রমবর্ধমান ঐকমত্য প্রতিফলিত হয়েছে যে, যাদের সুরক্ষার জন্য আইনটি প্রণীত, তাদের আরও ভালো সেবা দিতে আইনটিরও পরিবর্তন প্রয়োজন।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোতে, বিশেষ করে নৈতিক সীমারেখা ও চিকিৎসার নিরর্থকতার সংজ্ঞা নিয়ে, চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে চিকিৎসা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো দক্ষিণ কোরীয়ের বিপুল সংখ্যা ইঙ্গিত দেয়, জীবনের শেষ পর্যায়ের পরিচর্যায় আরও নমনীয় ও মানবিক পদ্ধতির জন্য জনসাধারণ প্রস্তুত।
মূল বিষয়গুলো
- দক্ষিণ কোরিয়ার ৩২ লাখেরও বেশি মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন; নিবন্ধনকারীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নারী।
- চিকিৎসা অকার্যকর হয়ে পড়লে তা প্রত্যাখ্যানের অধিকার প্রতিষ্ঠাকারী গুরুত্বপূর্ণ আদালতের মামলার পর ২০১৮ সালে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা বিষয়ে সিদ্ধান্ত আইন কার্যকর হয়।
- গবেষণায় দেখা গেছে, যন্ত্রণা ও আর্থিক চাপ কমানোর আকাঙ্ক্ষায় ঐতিহ্যগত পরিবারকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে ব্যক্তিস্বাধীনতার দিকে ঝোঁক বাড়ছে।
- ২০২৫ সালে তথ্যকেন্দ্রে আগুন লাগায় ব্যবস্থাগত ঝুঁকি প্রকাশ পায়; অচেতন রোগীদের অগ্রিম নির্দেশনা যাচাই করতে না পারায় হাসপাতালগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
প্রশমনমূলক পরিচর্যার সুযোগ সীমিত; আইন অনুযায়ী মাত্র পাঁচটি নির্দিষ্ট রোগের রোগীরা এ সেবা পান। ফলে হৃদ্রোগ বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত বহু রোগী এর বাইরে থাকেন।
অসুস্থতার ‘শেষ পর্যায়ে’ পৌঁছানোর আগেই চিকিৎসা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে আইনপ্রণেতারা যোগ্যতার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন।






