বিশ্বের সৌন্দর্যপণ্যের বাজারে বদলে যাওয়া চিত্র
বছরের পর বছর ধরে কে-পপ তারকা, কাচের মতো মসৃণ ত্বক এবং বহু ধাপের জটিল রূপচর্চার প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহের সুবাদে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসাধনী বাজারে আধিপত্য বিস্তার করেছে। পরিসংখ্যানেও এর প্রমাণ মেলে। ফ্রান্সের পর দক্ষিণ কোরিয়া এখনো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রসাধনী রপ্তানিকারক। ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে দেশটির রপ্তানি রেকর্ড ১০.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে উত্তরে নীরবে পরিবর্তন ঘটছে। দীর্ঘদিন রপ্তানিকারকের বদলে ভোক্তাদের বাজার হিসেবে বিবেচিত চীন দ্রুত শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। একই সময়ে চীনের প্রসাধনী রপ্তানি ৮.৭ শতাংশ বেড়ে ৩.৯৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ব্যবধান এখনো উল্লেখযোগ্য হলেও, এই প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নেতৃত্বের পালাবদল আসন্ন।
সূচিপত্র
এই পরিবর্তন কেবল পরিমাণের বিষয় নয়। এটি ভোক্তাদের পছন্দ এবং শিল্পকৌশলে মৌলিক রূপান্তরের প্রতিফলন। সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার চীন, যার বাজারমূল্য ২০২৫ সালের মধ্যে ৭৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনালের পরামর্শক ক্লো ঝুর মতে, এই বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এমন এক কাঠামোগত সুবিধা তৈরি করেছে, যার সঙ্গে খুব কম বাজারই পাল্লা দিতে পারে। দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো ঘরের বাজারে আরও বেশি অংশ দখল করছে—আমদানি ৩.৪ শতাংশ কমেছে—আর তারা এখন বিদেশি বাজারের দিকে নজর দিচ্ছে, কোরীয় ও পশ্চিমা জায়ান্টদের তাদের নিজস্ব বাজারেই চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত।
গুওচাওয়ের উত্থান ও দেশীয় ব্র্যান্ডের আধিপত্য
চীনের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভিত্তি হলো “গুওচাও” নামে পরিচিত একটি সাংস্কৃতিক প্রবণতা। ২০১০-এর দশকের শেষভাগে দেশপ্রেমভিত্তিক ভোগের এই ঢেউ দেখা দেয়। এতে ভোক্তারা দেশীয় ঐতিহ্য ও নান্দনিকতার শিকড়ে থাকা পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই কৌশল সফল হয়েছে। ২০২৪ সাল নাগাদ দেশীয় সৌন্দর্যপণ্য কোম্পানিগুলো বাজারের ৫৫.৭ শতাংশ দখল করে। এর ফলে বিদেশি ব্র্যান্ড, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের পর কোরীয় সাংস্কৃতিক রপ্তানি ও পণ্যের ওপর অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, যা কোরীয় ব্র্যান্ডগুলোকে পিছু হটতে বাধ্য করে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কোরীয় রপ্তানিতে চীনের অংশ ৬৯ শতাংশ থেকে কমে ২৩ শতাংশে নেমে আসে।
তবে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর সাফল্য এখন আর শুধু দেশপ্রেম থেকে পণ্য কেনা বা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির আকস্মিক সুবিধার ওপর নির্ভরশীল নয়। পেচোইন, চান্দো এবং হার্বোরিস্টের মতো ব্র্যান্ড স্থানীয় পছন্দ বুঝে সফলভাবে বাজারের অংশীদারত্ব বাড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ঐতিহ্যবাহী চীনা ঔষধি উপাদান ব্যবহারের কারণে পেচোইনের মাসিক বিক্রি দৌইনে ১০০ মিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়েছে। প্রাকৃতিক ও ভেষজ উপাদানের প্রতি এই মনোযোগ সুস্থতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া তরুণ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। দেশে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়া এবং ভোগব্যয় কমে আসায় চীনা কোম্পানিগুলো এখন দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করছে: দ্রুত বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ।
কৌশলগত আগ্রাসন ও মানের উন্নতি
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক ব্যবসায়িক কৌশল নিচ্ছে, যা চীনের অন্যান্য শিল্প পর্যবেক্ষকদের কাছে পরিচিত। পণ্যের মান ও কার্যকারিতার ব্যবধান দ্রুত কমানোর পাশাপাশি কোম্পানিগুলো দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখছে। এর ফলে চীনা ব্র্যান্ডগুলো একসময় যে নিম্নমূল্যের বাজারে সীমাবদ্ধ ছিল, তার বাইরে এগিয়ে যাচ্ছে। ভোক্তাদের আস্থা বাড়ায় তারা প্রিমিয়াম বাজারেও প্রবেশ করতে পারছে, আর কেবল কম দামে প্রতিযোগিতা করে—এমন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
এই আগ্রাসী কৌশলের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো উশোপাল গ্রুপের ফরাসি ত্বক পরিচর্যা ব্র্যান্ড পায়ো অধিগ্রহণ, যার ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। একইভাবে, ঐতিহ্যবাহী নান্দনিকতাকে ধারণ করা উচ্চমূল্যের ব্র্যান্ড মাও গেপিং আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতীকী এক পদক্ষেপে রাজকন্যাসুলভ প্যাকেজিংয়ের জন্য পরিচিত ফ্লাওয়ার নোজ সিউলে একটি অস্থায়ী দোকান খুলেছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য, কেবল সস্তা বিকল্প হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারের গুরুত্বপূ্র্ণ খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া। প্রতিযোগীদের জন্য বিনিয়োগের এই মাত্রা উদ্বেগজনক। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি শীর্ষস্থানীয় প্রসাধনী কোম্পানির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে স্থানীয় চীনা ব্র্যান্ডগুলো যে গতি ও ব্যাপকতায় বিনিয়োগ করছে, তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে এমন ব্র্যান্ডের সংখ্যা হাতে গোনা।
ভিন্ন পথ: ত্বক পরিচর্যা বনাম রঙিন প্রসাধনী
চীনা ব্র্যান্ডের উত্থান সত্ত্বেও, সব বিভাগে দুই দেশ সরাসরি প্রতিযোগিতা করছে না। কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার সুনামের কারণে কোরিয়ার রপ্তানিতে ত্বক পরিচর্যা পণ্যের আধিপত্য বজায় রয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো চোখের সাজের প্রসাধনী ও কৃত্রিম চোখের পাপড়ির মতো রঙিন প্রসাধনীতে প্রাথমিক সাফল্য পেয়েছে। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য তুলনামূলক কম, আর এগুলো এমন ভোক্তাদের আকৃষ্ট করে, যাঁরা নতুন প্রবণতা অনুসরণ করেন এবং ঘন ঘন ব্র্যান্ড বদলাতে আগ্রহী।
টেমু ও আলিএক্সপ্রেসের মতো প্ল্যাটফর্ম থেকে চোখের সাজের প্রসাধনী ও কৃত্রিম চোখের পাপড়ির মতো চীনা পণ্য কিনে তুলনামূলক কম দামে নতুন সাজ চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু বিদেশি নতুন ত্বক পরিচর্যার পণ্য ব্যবহার করতে এখনো দ্বিধা হয়, কারণ দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোর প্রভাব কী হবে তা নিশ্চিত নই।
এ কথা বলেছেন সিউলভিত্তিক নাট্য মেকআপ শিল্পী হং জু-মি। তাঁর মন্তব্য চীনা ব্র্যান্ডগুলোর সামনে থাকা একটি বড় বাধা তুলে ধরে। পারফেক্ট ডায়েরি ও ফ্লোরাসিসের মতো মেকআপ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে তারা বাজারের অংশীদারত্ব বাড়ালেও, প্রিমিয়াম ত্বক পরিচর্যা পণ্যে তুলনীয় ক্রেতা টানতে হিমশিম খাচ্ছে। এই বাজারে প্রবেশের জন্য ভোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা অর্জন জরুরি। কোরীয় সৌন্দর্যশিল্পে বিক্রয় ও বিপণন পেশাজীবী ভিনসেনশিয়া ভানিয়া নাতাশার মতে, এটাই দুই পক্ষের মধ্যে মূল পার্থক্য গড়ে দেয়। তাঁর বক্তব্য, কোরীয় ও চীনা প্রসাধনীর দাম এখন প্রায় একই পর্যায়ে থাকলেও বৈশ্বিক বাজারে ১৫ বছর ধরে অর্জিত আস্থার সুবিধা পাচ্ছে কোরীয় ত্বক পরিচর্যা পণ্য।
সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই
কে-পপ ও কোরীয় নাটকের “আকর্ষণ-প্রভাব” থেকে দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা পেয়েছে কোরীয় সৌন্দর্যপণ্য। এই সাংস্কৃতিক রপ্তানির বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা বিদেশে ব্র্যান্ড পরিচিতি জোরদার করার একটি শক্তিশালী বিপণনমাধ্যম তৈরি করেছে। চীনা ব্র্যান্ডগুলোও এই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা করছে। তারা দৌইন ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগিয়ে স্বতন্ত্র চীনা নান্দনিকতায় তৈরি নাটকীয়, পুতুলের মতো সাজের প্রচার করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কোরীয় ঢেউয়ের মতো বৈশ্বিক বিস্তারসম্পন্ন কোনো “সাংস্কৃতিক বাহক” এখনো তাদের নেই।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ শু তিয়ানচেন চীনের মাইক্রো ড্রামাকে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দেখছেন। দ্রুতগতির এই ধারাবাহিকগুলো ২০২৪ সালে চীনে ৬৬২ মিলিয়ন দর্শকের কাছে পৌঁছেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। এসব জনপ্রিয় নাটকের অভিনেত্রীরা চীনা প্রসাধনী ব্যবহার করলে তা দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোকে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে পারে। এদিকে উভয় দেশই পশ্চিমা বাজারে সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে কোরীয় রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, প্রোয়া ও এস’ইয়াংয়ের মতো চীনা জায়ান্ট উন্নত বাজারে অবস্থান তৈরি করতে উচ্চমূল্যের পশ্চিমা ব্র্যান্ড অধিগ্রহণ করে বিদেশের দিকে নজর দিচ্ছে।
ডিজিটাল ও উদ্ভাবনের সুবিধা
চীনা ব্র্যান্ডগুলোর একটি স্পষ্ট সুবিধা হলো দেশটির ডিজিটাল ব্যবস্থা। চীনে চুল ও ত্বক পরিচর্যার মোট বিক্রির উল্লেখযোগ্য ৮৭ শতাংশই অনলাইনে হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ৪১ শতাংশ। ডিজিটালনির্ভর এই পরিবেশ চীনা ব্র্যান্ডগুলোকে সামাজিক বাণিজ্য, লাইভস্ট্রিমিং এবং ইনফ্লুয়েন্সার বিপণনে দক্ষ হতে বাধ্য করেছে। লাইভ সম্প্রচারে ব্র্যান্ডগুলো অংশগ্রহণমূলক পণ্য প্রদর্শন ও তাৎক্ষণিক প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও এই দক্ষতা কাজে লাগছে, কারণ সেখানেও ই-কমার্সের বিস্তার বেশি।
এ ছাড়া, চীনা কোম্পানিগুলো গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। বাজারে প্রবেশ সহজ করা এবং উদ্ভাবন উৎসাহিত করতে সরকার সংস্কার বাস্তবায়ন করছে। ব্র্যান্ডগুলো ভোক্তাদের চারটি প্রধান চাহিদায় মনোযোগ দিচ্ছে: রোদ থেকে সুরক্ষা, ত্বক ফর্সা করা, ত্বকের পুনরুজ্জীবন এবং বয়সের ছাপ কমানো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও শিল্পটিকে বদলে দিচ্ছে; এর মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে অতিমাত্রায় ব্যক্তিগতকৃত পণ্যের সুপারিশ এবং ভার্চুয়ালভাবে পণ্য ব্যবহার করে দেখার সুবিধা। ভোক্তারা উপাদান সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ায়, প্রচারণার বাইরেও পণ্যের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে চীনা ব্র্যান্ডগুলো বিজ্ঞানসম্মত ফর্মুলা নিয়ে আসছে। এর উদাহরণ ডিআর প্ল্যান্টের উচ্চভূমির উদ্ভিদ থেকে নেওয়া নির্যাসের ওপর বিশেষ মনোযোগ।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ১০.৩ বিলিয়ন ডলারের প্রসাধনী রপ্তানি করে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রসাধনী রপ্তানিকারক হিসেবে রয়েছে।
- একই সময়ে চীনের প্রসাধনী রপ্তানি ৮.৭ শতাংশ বেড়ে ৩.৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, আর দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানি ৩.৪ শতাংশ কমেছে।
- “গুওচাও” আন্দোলনের ফলে চীনা ব্র্যান্ডগুলো দেশীয় বাজারের ৫৫.৭ শতাংশ দখল করতে পেরেছে।
- রঙিন প্রসাধনীতে বর্তমানে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে, আর ত্বক পরিচর্যার বাজারে কোরীয় ব্র্যান্ডগুলোর আধিপত্য রয়েছে।
- চীনে চুল ও ত্বক পরিচর্যা পণ্যের বিক্রির ৮৭ শতাংশ হয় ই-কমার্সের মাধ্যমে; যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ৪১ শতাংশ।
- ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে কোরীয় সৌন্দর্যপণ্যের রপ্তানি ৫৩ শতাংশ বেড়েছে।






