বিশ্বব্যাপী ই-কমার্স বাজারের অংশীদারত্বে আমাজনের সমকক্ষ টেমু

পড়তে 11 মিনিট
বিশ্বব্যাপী ই-কমার্স বাজারের অংশীদারত্বে আমাজনের সমকক্ষ টেমু

বিশ্বের খুচরা বাজারে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থান

পিডিডি হোল্ডিংসের মালিকানাধীন সাশ্রয়ী কেনাকাটার প্ল্যাটফর্ম টেমু বিশ্বজুড়ে আন্তসীমান্ত বাজারের অংশীদারত্বে আমাজনের কাছাকাছি পৌঁছানোয় বৈশ্বিক খুচরা বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপ, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও উত্তর আমেরিকার ২৬টি জাতীয় ডাকসেবার প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল পোস্ট করপোরেশনের (আইপিসি) প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে যাত্রা শুরুর সময় আন্তসীমান্ত ই-কমার্সে টেমুর অংশীদারত্ব ১ শতাংশেরও কম ছিল; গত বছর তা বেড়ে ২৪ শতাংশে দাঁড়ায়। এতে চীনা প্ল্যাটফর্মটি যুক্তরাষ্ট্রের ই-কমার্স জায়ান্ট আমাজনের সমপর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে আন্তসীমান্ত বাজারের ২৫ শতাংশ ছিল আমাজনের দখলে, যা আগের দুই বছরের ২৬ শতাংশ থেকে সামান্য কম।

সূচিপত্র
  1. বিশ্বের খুচরা বাজারে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থান
  2. টেমু বিস্ময়: বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধির তিন বছর
  3. কম দামের পেছনের সরবরাহব্যবস্থা
  4. বাজার ও হউল দিয়ে পাল্টা জবাব আমাজনের
  5. গুণমান বনাম পরিমাণের সমঝোতা
  6. ডি মিনিমিস সংকট: সামনে নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জ
  7. ক্রেতার আচরণ ও বাজারের বিভাজন
  8. গেমিফিকেশনের প্রভাব
  9. বৈশ্বিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
  10. মূল বিষয়গুলো

এই দ্রুত উত্থান কয়েক দশক ধরে আমাজনের আধিপত্যের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়াসহ ৩৭টি দেশের ৩০,৯৭০ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা জরিপটি বিশ্বজুড়ে অনলাইনে কেনাকাটার অভ্যাসে চলমান গভীর পরিবর্তন তুলে ধরেছে। আমাজন তার বিস্তৃত পরিসর, গতি ও সেবার মাধ্যমে অবস্থান ধরে রেখেছে; অন্যদিকে, আগ্রাসী মূল্যনীতি এবং ই-কমার্সে মৌলিকভাবে ভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে টেমু বাজারের অংশীদারত্ব বাড়িয়েছে।

এর প্রভাব এই দুই প্ল্যাটফর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। আইকেইএর মতো প্রথাগত খুচরা বিক্রেতারাও চাপে পড়েছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দাম কমানোর পর সুইডিশ আসবাবপত্র জায়ান্টটির মুনাফা ২৬ শতাংশ কমেছে। এদিকে, ইবের মতো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারের অংশীদারত্ব ভেঙে পড়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আন্তসীমান্ত ব্যবসার ৬৮ শতাংশ হারিয়ে গত বছর তাদের অংশ নেমে এসেছে মাত্র ৫ শতাংশে।

বিজ্ঞাপন

টেমু বিস্ময়: বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধির তিন বছর

টেমুর অগ্রযাত্রা ই-কমার্সে প্রবৃদ্ধির প্রচলিত ধরনকে অস্বীকার করে। মাত্র তিন বছরে প্ল্যাটফর্মটি এমন সাফল্য পেয়েছে, যা অর্জন করতে অন্য মার্কেটপ্লেসগুলোর কয়েক দশক লেগেছে। চীনা প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করে ক্রেতাদের কাছে অত্যন্ত কম দামে বিক্রি করাই প্রতিষ্ঠানটির কৌশলের মূল। এসব পণ্যের দাম আমাজনের তুলনীয় পণ্যের চেয়ে প্রায়ই ২-৩ গুণ কম; কোনো কোনো পণ্যের দাম ১০ গুণ পর্যন্ত কম।

উদাহরণ হিসেবে, অ্যাপল ডিভাইসের একটি চার্জিং স্টেশনের দাম আমাজনে ২০ থেকে ৫০ ডলারের মধ্যে হলেও টেমুতে তা প্রায় ১০ ডলারে পাওয়া যায়। দামের এই বড় ব্যবধান বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ সাশ্রয়ী ক্রেতাকে আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে, যেসব জনগোষ্ঠীর চাহিদা শহুরে ও সচ্ছল ক্রেতাদের লক্ষ্য করে পরিচালিত প্রথাগত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো পূরণ করেনি, তাদের মধ্যে টেমু জনপ্রিয় হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির বিপণন কৌশলও সমান আগ্রাসী। ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে টেমু বিপুল অর্থ ঢেলেছে; শুধু ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের বিজ্ঞাপনেই গত বছর প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে সুপার বোলের বিজ্ঞাপনে "কোটিপতির মতো কেনাকাটা করুন" স্লোগান ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মটি আলোচনায় আসে। ইউগভের এক জরিপ অনুযায়ী, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের মধ্যে ব্র্যান্ডটি সম্পর্কে সচেতনতা ৮৮ শতাংশে পৌঁছায়।

ইন্টারন্যাশনাল পোস্ট করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী হোলগার উইঙ্কলবাউয়ার বলেন, "গত তিন বছরে চীন থেকে ই-কমার্স পণ্য রপ্তানি, বিশেষ করে টেমুর মাধ্যমে, উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এবং ২০২৬ সালেও শুল্কসংক্রান্ত পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক ই-কমার্স সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন আসছে।"

এই প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন দেখা যায় ব্যবহারকারীর সংখ্যাতেও। বিশ্বজুড়ে টেমুর সক্রিয় ব্যবহারকারী এখন ১১ কোটির বেশি, যেখানে আমাজনের প্রাইম গ্রাহক ১৭ কোটি। পরিসরে আমাজন এখনো এগিয়ে থাকলেও টেমুর অগ্রযাত্রা অনলাইনে কেনাকাটার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে, জরুরি নয় এমন পণ্যের ক্ষেত্রে, যেখানে দামের তুলনায় দ্রুত ডেলিভারি কম গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

কম দামের পেছনের সরবরাহব্যবস্থা

টেমুর নাটকীয়ভাবে কম দামে পণ্য দেওয়ার সক্ষমতার পেছনে রয়েছে সরলীকৃত সরবরাহব্যবস্থা। আমাজন যেখানে সরবরাহকারী থেকে বিক্রেতা, তারপর আমাজনের গুদাম হয়ে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছানোর কাঠামোয় কাজ করে, টেমু সেখানে চীনা প্রস্তুতকারকদের সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত করে। সরাসরি পণ্য পাঠানোর এই পদ্ধতিতে গন্তব্য দেশে গুদামজাতকরণের খরচ ও মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমে।

টেমুর অনেক সরবরাহকারী ঠিক সময়ে উৎপাদনের মডেল অনুসরণ করেন; অর্থাৎ, অর্ডার পাওয়ার পরই পণ্য তৈরি করেন। এতে মজুত পণ্যের ঝুঁকি ও প্রয়োজনীয় মূলধন কমে। বড় পরিসরে পণ্য পাঠানোর সুবিধা এবং বাণিজ্যিক ছাড়ের কৌশলগত ব্যবহারের সঙ্গে মিলিয়ে টেমু খুব কম মুনাফায় পণ্য বিক্রি করেও প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম দাম রাখতে পারে।

বিশ্লেষকদের ভাষায়, প্ল্যাটফর্মটি "সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপিত" মার্কেটপ্লেস মডেল ব্যবহার করে। বিক্রেতারা বিক্রয়মূল্যে সম্মত হয়ে পণ্য টেমুর পূরণকেন্দ্রে পাঠান; সেখান থেকে ক্রেতার কাছে পণ্য পাঠানোর পুরো দায়িত্ব নেয় প্রতিষ্ঠানটি। গুদামজাতকরণ, পণ্য পাঠানো ও গ্রাহকসেবার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ায় এই পদ্ধতি প্রস্তুতকারকদের আকৃষ্ট করেছে। তবে সরবরাহকারীদের মুনাফার হার নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাজার ও হউল দিয়ে পাল্টা জবাব আমাজনের

এই চ্যালেঞ্জের মুখে আমাজন নিষ্ক্রিয় থাকেনি। টেমুর স্বল্পমূল্যের বাজার অংশে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ই-কমার্স জায়ান্টটি কৌশলগত উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আমাজন তার স্বল্পমূল্যের ই-কমার্স সেবা আমাজন বাজার (যুক্তরাষ্ট্রে যা হউল নামে পরিচিত) আরও ১৪টি বাজারে সম্প্রসারণ করে। এর মধ্যে রয়েছে হংকং, ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া ও তাইওয়ান।

আমাজন বাজারের স্বতন্ত্র অ্যাপে আমাজন হউলের মতো পণ্য পাওয়া যায়। গত বছর চালু হওয়া আমাজনের মূল অ্যাপের ভেতরের সাশ্রয়ী কেনাকাটার বিভাগটির নাম আমাজন হউল। এই প্ল্যাটফর্মে ১০ ডলারের কম দামের পণ্য পাওয়া যায়; কোনো কোনো পণ্যের দাম মাত্র ২ ডলার। গৃহস্থালির সামগ্রী থেকে শুরু করে ফ্যাশনপণ্য পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্য রয়েছে এখানে। মেক্সিকোতে প্রথম চালুর পর বাজার সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও সম্প্রসারিত হয়েছে।

ডি.এ. ডেভিডসনের বিশ্লেষক গিল লুরিয়া এই সম্প্রসারণের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেন। লুরিয়া বলেন, "আমাজন বাজারের সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক বাজারে আমাজনের বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমাজন কেবল তখনই কোনো বাজারে প্রবেশ করেছে, যখন তাদের বিশ্বাস হয়েছে যে সেখানে এমন পর্যায়ে ব্যবসা বাড়ানো সম্ভব, যাতে ক্রেতারা সন্তুষ্ট হন এবং লাভজনক ব্যবসা গড়ে ওঠে।"

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের প্রভাব বাদ দিলে তৃতীয় প্রান্তিকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তাদের আয় ছিল ৪০.৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। আমাজনের কৌশল হলো, আন্তর্জাতিক পূরণকেন্দ্র থেকে সেবা-অংশীদারদের মাধ্যমে সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছাতে বিদ্যমান বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা কাজে লাগানো। এর মাধ্যমে টেমুর মতো দাম এবং আমাজনের কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্যতা একত্র করার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিজ্ঞাপন

গুণমান বনাম পরিমাণের সমঝোতা

আমাজন হউল কেবল মোবাইলে ব্যবহারের উপযোগী একটি সেবা, যার স্বতন্ত্র ইন্টারফেস দ্রুত কেনাকাটার জন্য তৈরি। ঘূর্ণায়মান চাকা ও গেমের মতো বৈশিষ্ট্যসম্বলিত টেমুর "স্লট মেশিন" ধরনের অভিজ্ঞতার বিপরীতে আমাজন হউল সরলতার ওপর জোর দেয়। তবে এই সরলীকৃত ব্যবস্থায় ক্রেতারা কম তথ্য পান। অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের গ্রাহক-পর্যালোচনা নেই এবং বিবরণও সংক্ষিপ্ত।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, আমাজন হউল মূল প্ল্যাটফর্মের উন্নত কেনাকাটার অভিজ্ঞতা থেকে কমদামি, ব্র্যান্ডবিহীন পণ্যগুলো আলাদা রাখার কৌশল। মানের মানদণ্ড পূরণ করে না এমন পণ্য আলাদা বিভাগে সরিয়ে আমাজন বাজেট পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা করেও নির্ভরযোগ্যতার সুনাম ধরে রাখতে পারে। অন্যদের আশঙ্কা, এতে আলাদা বিভাগটি "ফেলে দেওয়া পণ্যের জায়গা" হিসেবে পরিচিত হতে পারে, যা আমাজনের ব্র্যান্ডমূল্যের ক্ষতি করবে।

দুই প্ল্যাটফর্মের মৌলিক পার্থক্য এখনো একই: আমাজনের অগ্রাধিকার গতি ও সুবিধা, আর টেমুর জোর দাম ও ব্যবহারকারীর সম্পৃক্ততায়। আমাজন যেখানে ১-২ দিনের মধ্যে ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দেয়, প্রাইম সদস্যদের ক্ষেত্রে কখনো কখনো তা মাত্র ৮ ঘণ্টায় পৌঁছায়; সেখানে টেমুর পণ্য পৌঁছাতে সাধারণত ৪ থেকে ২২ দিন লাগে। এই বিনিময়-সমঝোতার ফলে অনেক ক্রেতার ক্ষেত্রে একে অপরের সরাসরি বিকল্প হওয়ার বদলে আলাদা ক্রেতাগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ডি মিনিমিস সংকট: সামনে নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জ

টেমু ও এর ছোট প্রতিদ্বন্দ্বী শেইন—দুই প্রতিষ্ঠানই এমন উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রক বাধার মুখে, যা তাদের স্বল্পমূল্যের ব্যবসায়িক মডেলকে হুমকিতে ফেলেছে। বছরের পর বছর এসব প্ল্যাটফর্ম "ডি মিনিমিস" বাণিজ্যিক ছাড়ের সুবিধা পেয়েছে। এর আওতায় ৮০০ ডলারের কম মূল্যের প্যাকেজ শুল্ক ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারত। এই ছাড়ের ফলে শুল্ক বা ব্যাপক শুল্ক-পরিদর্শন ছাড়াই চীনা কারখানা থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো সম্ভব হয়েছিল।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাইডেন প্রশাসন নিয়ম সংশোধন করে। এতে পণ্যের মূল্য যা-ই হোক, সব চালানের ওপর চীনা বিক্রেতাদের শুল্ক ও কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। এই পরিবর্তনে অতি সস্তা পণ্য বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যগত সুবিধা কার্যত বিলুপ্ত হয়েছে। পাশাপাশি, নতুন নিয়মে চীনা বিক্রেতাদের শুল্ক শ্রেণিবিন্যাসের বিস্তারিত নম্বর দিতে হবে এবং আমদানি করা পণ্যের জন্য ক্রেতাদের ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

প্রতিনিধি মাইক গ্যালাগার বলেন, "আমাদের আমদানি নীতির ডি মিনিমিস ফাঁককে কাজে লাগিয়ে টেমু ও শেইন সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে—আমেরিকানদের কাছে বিক্রি করা লাখ লাখ পণ্যের ওপর আমদানি কর ফাঁকি দিচ্ছে এবং নজরদারি এড়িয়ে যাচ্ছে।" এসব প্ল্যাটফর্ম নিয়ে রাজনৈতিক উদ্বেগ তুলে ধরতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। ইইউর বাইরের দেশ থেকে পাঠানো ১৫০ ইউরোর কম মূল্যের প্রতিটি ছোট পার্সেলের জন্য ৩ ইউরো নির্ধারিত ফি চালু করেছে তারা। এসব নিয়ন্ত্রক পরিবর্তনের কারণে চীনা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোকে সরবরাহব্যবস্থার কৌশল বদলাতে হয়েছে। এতে সরবরাহের খরচ বেড়েছে এবং ক্রেতাদের জন্য দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, টেমু ও শেইনের মতো প্ল্যাটফর্মের জন্য ২০২৬ সাল হবে কঠিন। ইসিডিবির প্রধান নির্বাহী ফ্রিডরিখ শ্ভান্ডট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, "প্রতিযোগিতার কারণে নয়, বরং তাদের ব্যবসায়িক মডেলের মূলে আঘাত করা শুল্ক ও বাণিজ্যবিধির কারণে ২০২৬ সাল হবে তাদের জন্য এ যাবৎকালের সবচেয়ে কঠিন বছর।"

বিজ্ঞাপন

ক্রেতার আচরণ ও বাজারের বিভাজন

আমাজন ও টেমুর প্রতিযোগিতা ভিন্ন অগ্রাধিকারের ক্রেতাগোষ্ঠীকে স্পষ্ট করে তুলেছে। ওমনিসেন্ডের এক জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ১০ জন ক্রেতার মধ্যে প্রায় ৯ জন আমাজনকে বিশ্বাস করেন; টেমুর ক্ষেত্রে একই মাত্রার আস্থা প্রকাশ করেন মাত্র ৬ শতাংশ। আস্থার এই ব্যবধান সত্ত্বেও গত এক বছরে ৪৮ শতাংশ ক্রেতা টেমু থেকে পণ্য কিনেছেন। তাঁদের প্রধান আকর্ষণ ছিল দাম (৫৩ শতাংশ), ব্যবহারের সহজতা (৩১ শতাংশ) এবং পণ্যের ছাড় (২৯ শতাংশ)।

ক্রেতা ধরে রাখার পরিসংখ্যানেও দুই প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন মূল্যপ্রস্তাব ফুটে উঠেছে। আমাজনের পুনরায় কেনাকাটার হার ৫৬ শতাংশ, যেখানে টেমুর ২৬ শতাংশ। এই ব্যবধানের পেছনে রয়েছে প্রাইম গ্রাহকদের আনুগত্য; তাঁদের বার্ষিক নবায়নের হার উল্লেখযোগ্যভাবে ৯৭ শতাংশ। টেমুর দামের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আমাজনের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড পরিচিতি, গ্রাহকসেবা অবকাঠামো ও নির্ভরযোগ্য পণ্য সরবরাহ ক্রেতাদের ধরে রাখতে সাহায্য করছে।

জনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্য ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছেও সফলভাবে পৌঁছেছে টেমু। শেইনের গড় ক্রেতা নারী, বয়স ত্রিশের গোড়ার দিকে এবং বার্ষিক আয় প্রায় ৬৫,০০০ ডলার। অন্যদিকে, টেমুর সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা ক্রেতাগোষ্ঠীর বয়স ৫৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। এই ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার ফলে সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করা ব্র্যান্ডগুলোর সাধারণ লক্ষ্য—শহুরে ও সচ্ছল ক্রেতাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পেরেছে টেমু।

বিজ্ঞাপন

গেমিফিকেশনের প্রভাব

প্রচলিত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে আলাদা হতে টেমু অভিনব ব্যবহারকারী-সম্পৃক্ততার কৌশল নিয়েছে। অ্যাপটিতে রয়েছে ঘূর্ণায়মান চাকা, রহস্যের খাম ও গুণক কার্ডের মতো গেমের উপাদান, যেগুলোর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা কুপন ও ছাড় জিততে পারেন। এসব বৈশিষ্ট্য বিনোদনের অনুভূতি তৈরি করে, ফলে ব্যবহারকারীরা প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় থাকেন।

শেইনও একই ধরনের কৌশল নিয়েছে। তাদের বিস্তৃত আনুগত্য-পুরস্কার কর্মসূচিতে গ্রাহকেরা প্রতিদিন অ্যাপে প্রবেশ, পণ্যের পর্যালোচনা ও কেনাকাটার মাধ্যমে পয়েন্ট অর্জন করতে পারেন। পরে এসব পয়েন্ট দিয়ে বিনা মূল্যে পণ্য নেওয়া যায়। ফলে সাধারণ লেনদেনভিত্তিক কেনাকাটার বাইরেও ব্যবহারকারীদের সম্পৃক্ততা বজায় থাকে।

এ পদ্ধতি আমাজনের নকশা-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে দক্ষতা ও গতির ওপর জোর দেওয়া হয়। "আবার কিনুন" উইজেট ও এক ক্লিকের "এখনই কিনুন" চেকআউটের মতো বৈশিষ্ট্য প্ল্যাটফর্মে কাটানো সময় কমানোর জন্য তৈরি। আমাজনের লক্ষ্য দ্রুত কেনাকাটা শেষ করা; অন্যদিকে, টেমু ও শেইন তাদের প্ল্যাটফর্মকে বিনোদনের গন্তব্য হিসেবে দেখে, যেখানে ব্যবহারকারীর সম্পৃক্ততা যতটা সম্ভব বাড়ানো হয়।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি

আমাজন ও টেমুর প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও পড়ছে। অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, ২০২৬ সালের মধ্যে আমাজন, টেমু ও শেইন অনলাইন খুচরা বাজারের এক-তৃতীয়াংশের বেশি দখল করবে এবং স্থানীয় বিক্রির পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। এতে স্থানীয় ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসগুলো বিশেষায়িত কোনো বাজার খুঁজে নেওয়া অথবা টিকে থাকতে ব্যবসার পরিসর বাড়ানোর চাপে পড়ছে।

সরবরাহব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব সমান উল্লেখযোগ্য। চীন থেকে আন্তসীমান্ত ই-কমার্সের উল্লম্ফনে বৈশ্বিক সরবরাহ অবকাঠামোর ওপর চাপ পড়েছে। বিভিন্ন দেশের ডাক বিভাগের কর্মীরা জানিয়েছেন, এসব প্ল্যাটফর্মের প্যাকেজের বিপুল পরিমাণ সামলাতে তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন। পরিবহনের সক্ষমতার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিমানপথে পণ্য পরিবহনের ভাড়াও বেড়েছে।

সামনে, নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন ও ক্রেতাদের পছন্দের সঙ্গে খাপ খাইয়ে প্রতিযোগিতার চিত্র বদলাতে পারে। বাজার ও হউলের মাধ্যমে আমাজনের পাল্টা উদ্যোগে বোঝা যায়, স্বল্পমূল্যের চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের হুমকিকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এদিকে, টেমু বিশ্বজুড়ে সম্প্রসারণ চালিয়ে যাচ্ছে এবং এখন অন্তত ৭০টি দেশে পণ্য পাঠায়। তবে নিয়ন্ত্রক বাধা বাড়লে এর প্রবৃদ্ধি ধীর হতে পারে।

আন্তসীমান্ত কেনাকাটা নিয়ে ক্রেতাদের প্রত্যাশা বদলের কথাও জানিয়েছে আইপিসির জরিপ। ৬১ শতাংশ ক্রেতার কাছে কেনার আগে ডেলিভারি চার্জের তথ্য জানা জরুরি; অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক কেনাকাটায় ডেলিভারির গতি কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি পাঁচজনের একজন জানিয়েছেন, তাঁদের পণ্য ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে পৌঁছেছে; আরও ১৯ শতাংশের ক্ষেত্রে লেগেছে ৪ থেকে ৫ দিন। এতে বোঝা যায়, কম দামের বিনিময়ে ক্রেতারা দীর্ঘ ডেলিভারি সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

মূল বিষয়গুলো

  • আইপিসির জরিপ অনুযায়ী, আন্তসীমান্ত বাজারে টেমুর অংশীদারত্ব ২০২২ সালের ১ শতাংশের কম থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; আমাজনের অংশীদারত্বের ২৪-২৫ শতাংশের সঙ্গে তা প্রায় সমান।
  • টেমুর দামের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আমাজন তার স্বল্পমূল্যের সেবা আমাজন বাজার আরও ১৪টি নতুন বাজারে সম্প্রসারণ করেছে; সেখানে ১০ ডলারের কম দামের পণ্য পাওয়া যায়।
  • যুক্তরাষ্ট্রে ডি মিনিমিস বাণিজ্যিক ছাড় বাতিল এবং ইউরোপে একই ধরনের বিধিনিষেধ টেমুর দ্রুত প্রবৃদ্ধির পেছনে থাকা স্বল্পমূল্যের মডেলকে হুমকিতে ফেলেছে।
  • প্রাইম সদস্যপদ ও নির্ভরযোগ্য পণ্য সরবরাহের কারণে আমাজনের পুনরায় কেনাকাটার হার ৫৬ শতাংশ; টেমুর ক্ষেত্রে তা ২৬ শতাংশ।
  • টেমুর সরবরাহব্যবস্থা চীনা প্রস্তুতকারকদের সরাসরি ক্রেতাদের সঙ্গে যুক্ত করে। এতে গুদামজাতকরণের খরচ এড়ানো যায় এবং আমাজনের তুলনায় ২-১০ গুণ কম দামে পণ্য দেওয়া সম্ভব হয়।
  • প্রতিযোগিতার চাপে প্রথাগত খুচরা বিক্রেতারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দাম কমানোর পর আইকেইএর মুনাফা ২৬ শতাংশ কমেছে।
  • ২০১৮ সালের পর ইবে আন্তসীমান্ত বাজারের ৬৮ শতাংশ অংশীদারত্ব হারিয়ে ২০২৫ সালে ৫ শতাংশে নেমেছে, যা বাজারে বৃহত্তর অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।
  • ক্রেতাদের আচরণে দেখা যায়, টেমুর ক্রেতাদের কাছে দামই প্রধান আকর্ষণ; আমাজনের ক্রেতারা গুরুত্ব দেন আস্থা, গতি ও সুবিধাকে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে