৫৫ লাখ ডলারের সড়ক পৌঁছেছে চীনা সীমান্তে
আফগানিস্তান উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশের মধ্য দিয়ে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত ১২১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কাঁচা সড়ক উদ্বোধন করেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্য দিয়ে ট্রানজিটের বিকল্প দিতে পরিকল্পিত এই সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৬৫ মিলিয়ন আফগানি, যা প্রায় ৫৫ লাখ ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সড়কটি বোরোগিল সীমান্ত এলাকা, যার বানান ব্রোগিলও লেখা হয়, থেকে দুর্গম ওয়াখান জেলার মধ্য দিয়ে চীনা সীমান্তের দিকে গেছে।
সূচিপত্র
- ৫৫ লাখ ডলারের সড়ক পৌঁছেছে চীনা সীমান্তে
- সড়কটি কী সুযোগ তৈরি করে, আর কী করে না
- প্রকল্পটির অগ্রযাত্রা
- বাণিজ্যের পরিসংখ্যানে বড় ভারসাম্যহীনতা
- কেন পাকিস্তানের বিকল্প চাইছে কাবুল
- চীনের সঙ্গে যোগাযোগ মানেই গিরিপথ খোলা নয়
- পাহাড়ি পরিস্থিতিতে নিয়মিত চলাচলই আসল পরীক্ষা
- ওয়াখান অন্য পথগুলোর পরিপূরক, বিকল্প নয়
- অর্থনৈতিক লাভ মাপার আগে যা যা হতে হবে
- মূল বিষয়গুলো
সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছানো আর বাণিজ্যিক যান চলাচলের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়া—এই দুইয়ের পার্থক্য প্রকল্পটির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। উদ্বোধনসংক্রান্ত বিবরণে আফগানিস্তানের একটি সম্পূর্ণ সড়কের কথা বলা হয়েছে, কার্যকর আন্তর্জাতিক পণ্য পারাপারকেন্দ্রের কথা নয়। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) ২০২৫ সালের এপ্রিলের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ওয়াখজির গিরিপথে চীনের কোনো শুল্ক অবকাঠামো নেই। করিডরটি উন্নয়নের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়েও বেইজিংয়ের সংশয়ের কথা বলা হয়েছে সেখানে।
উদ্বোধনী ঘোষণাগুলো অনুযায়ী, উদ্বোধনের দুই বছর আগে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। অনুষ্ঠানের তারিখ নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে অমিল রয়েছে: দুটিতে বলা হয়েছে অনুষ্ঠানটি রোববার হয়েছে, আরেকটিতে বছর উল্লেখ না করে ৪ অক্টোবরের কথা বলা হয়েছে। সড়কের দৈর্ঘ্যও সামান্য ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—কোথাও ১২১ কিলোমিটার, কোথাও ১২১ কিলোমিটারের বেশি। এই অমিলগুলোর কোনোটিই মূল অর্জন—সীমান্ত পর্যন্ত সড়ক পৌঁছানো—বদলে দেয় না। তবে বিবরণগুলো থেকে উদ্বোধনের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ নিশ্চিত হওয়া যায় না।
অনুষ্ঠানে আফগানিস্তানের গ্রামীণ পুনর্বাসন ও উন্নয়নমন্ত্রী আবদুল লতিফ মনসুর বলেন, প্রকল্পটির কৌশলগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তিনি দেশের ভেতরের প্রকৌশল সক্ষমতার কথাও তুলে ধরেন:
“ইসলামি আমিরাত অব আফগানিস্তান এ ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, বিশেষ করে যেসব প্রদেশে এর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কোনো বিদেশি প্রকৌশলী বা উপদেষ্টা নেই; সব প্রকৌশলীই আফগান,” বলেন মনসুর।
বাদাখশানের গভর্নর রহমাতুল্লাহ নাজিব ৪৫ বছর যুদ্ধের পর দুর্গম এই অঞ্চলের জন্য সড়কটির নির্মাণ সম্পন্ন হওয়াকে বড় অর্জন বলে বর্ণনা করেন। তবে এর বাণিজ্যিক মূল্য নির্ভর করবে আফগানিস্তানের নির্মাণস্থলের বাইরের সিদ্ধান্ত ও অবকাঠামোর ওপর।
সড়কটি কী সুযোগ তৈরি করে, আর কী করে না
ওয়াখান করিডর হলো আফগান ভূখণ্ডের সেই সরু অংশ, যা উত্তরে তাজিকিস্তান ও দক্ষিণে পাকিস্তানের মাঝখান দিয়ে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলে পৌঁছেছে। এই করিডরে সড়ক নির্মাণ সীমান্ত পর্যন্ত সরাসরি যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করে। বাণিজ্য করিডর চালু করতে হলে দুই দেশকেই যান চলাচলের অনুমতি দিতে হবে, পণ্য খালাস করতে হবে এবং সংযোগকারী পরিবহনসেবা দিতে হবে।
২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল প্রকাশিত আয়াজ ওয়ানির ওআরএফ ইস্যু ব্রিফ নম্বর ৭৯৬-এ ওয়াখজির গিরিপথকে করিডরে চীনের একমাত্র প্রবেশপথ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং শিনজিয়াংয়ের নিকটতম বড় শহর হিসেবে তাশকুরগানের কথা বলা হয়েছে। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, পার্বত্য ভূপ্রকৃতির কারণে বেইজিং এই উন্নয়নকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে করে না এবং অর্থনৈতিক সুযোগের চেয়ে নিরাপত্তাঝুঁকি বেশি দেখে।
এটি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন, উদ্বোধন উপলক্ষে চীনা সরকারের নতুন কোনো ঘোষণা নয়। তবু এতে কাবুলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সীমান্ত পরিচালনা নিয়ে নিশ্চিত চুক্তির মধ্যকার ব্যবধান স্পষ্ট হয়। উদ্বোধনসংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোতে চীনের শুল্ক কার্যক্রম, নিয়মিত পণ্য পরিবহন কিংবা চীনা পাশে সংযোগকারী সড়কসেবা চালুর কোনো তারিখ নিশ্চিত করা হয়নি।
তাই সড়কটিকে আফগানিস্তানের অবকাঠামোগত একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা উচিত। একে চালু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হিসেবে বর্ণনা করলে তা প্রতিষ্ঠিত তথ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাবে।
প্রকল্পটির অগ্রযাত্রা
সরাসরি যোগাযোগপথ নির্মাণের প্রচেষ্টা বিভিন্ন সরকার, অর্থায়নের প্রস্তাব এবং নির্মাণপর্বের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। আগের প্রতিবেদনগুলোতে প্রায় ৪৯ বা ৫০ কিলোমিটার অংশের কথা বলা হয়েছে, আর উদ্বোধনসংক্রান্ত বিবরণে বলা হয়েছে ১২১ কিলোমিটার সড়কের কথা। সংখ্যাগুলো হয়তো ভিন্ন ভিন্ন অংশ বা প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায় বোঝায়, তবে এই বিবরণগুলোতে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়নি।
- ১৯৬৩: ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, আফগানিস্তান ও চীন আনুষ্ঠানিক সীমান্ত চুক্তিতে পৌঁছায়, তবে কোনো সরকারি সীমান্ত চৌকি স্থাপন করা হয়নি।
- ২০১৭: উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানে অবকাঠামো, যার মধ্যে ফাইবার-অপটিক সংযোগ ও ওয়াখান সড়কের একটি অংশও ছিল, নির্মাণে চীন প্রায় ৯০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। একটি বিবরণে অঙ্কটি ৯০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বলা হয়েছে।
- ২০২১: ওয়াখান হয়ে ইশকাশিম জেলা থেকে শিনজিয়াং পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। ওআরএফের গবেষণা অনুযায়ী, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে পরবর্তী সময়ে ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ লিটল পামির সড়কের কাজ স্থগিত করা হয়।
- সেপ্টেম্বর ২০২৩: তালেবান কর্তৃপক্ষ ৫০ কিলোমিটার অংশ পুনর্নির্মাণের ঘোষণা দেয়। ব্যয় ধরা হয় ৫.১৬ মিলিয়ন ডলার এবং অর্থায়নের দায়িত্বে ছিল গ্রামীণ পুনর্বাসন ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়।
- জানুয়ারি ২০২৪: কর্মকর্তারা জানান, সড়কটির কাজ প্রায় শেষ। অর্থনৈতিকবিষয়ক উপপ্রধানমন্ত্রী মোল্লা বারাদার ২ জানুয়ারি বলেন, নির্মাণকাজ তখনও চলছিল।
- আগস্ট ও ডিসেম্বর ২০২৪: কথিত সফর ও কূটনৈতিক বৈঠকের কারণে করিডরটি নিয়ে নতুন করে মনোযোগ তৈরি হয়। এর মধ্যে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানি ও চীনা রাষ্ট্রদূত ঝাও শিংয়ের বৈঠক।
- সর্বশেষ উদ্বোধন: কর্তৃপক্ষ বোরোগিল থেকে চীনা সীমান্ত পর্যন্ত কাঁচা সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দেয়। ব্যয় হয়েছে ৩৬৫ মিলিয়ন আফগানি।
অগ্রগতি নিয়ে আগের একটি বিবরণে পাঁচ মাসের কাজ, ৪৯ কিলোমিটার অংশ এবং ওই অংশের প্রায় ৪০ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এগুলো ছিল কাজের অগ্রগতির বিভিন্ন সময়ের চিত্র, পরবর্তী ১২১ কিলোমিটার প্রকল্প আগেই সম্পন্ন হয়েছিল—এমন প্রমাণ নয়। একইভাবে, আগের ডলারের হিসাবগুলো উদ্বোধনের সময় ঘোষিত ব্যয়ের সঙ্গে যোগ করা উচিত নয়; বাজেট দুটির মধ্যে কোনো মিল বা পুনরাবৃত্তি আছে কি না, তা জানা নেই।
বাণিজ্যের পরিসংখ্যানে বড় ভারসাম্যহীনতা
ওয়াখানের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো অর্থনৈতিক যুক্তি হলো, আফগানিস্তানের সঙ্গে আগে থেকেই বাণিজ্য রয়েছে এমন একটি বাজারে প্রবেশের সুযোগ। ওআরএফের ব্রিফ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দুই দেশের বাণিজ্য হয়েছে ১.৩ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০২২ সালের তুলনায় ১২৫ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধির হার থেকে হিসাব করলে ২০২২ সালের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৭৮ মিলিয়ন ডলার; ১.৩ বিলিয়ন ডলারকে ২.২৫ দিয়ে ভাগ করে এই হিসাব পাওয়া যায়।
২০২৩ সালে চীনে আফগানিস্তানের রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৬৪ মিলিয়ন ডলার, যা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রায় ৪.৯ শতাংশ। ব্রিফ অনুযায়ী, রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল খোসাসহ পাইন বাদাম। রপ্তানির অঙ্কের ওপর এই হার প্রয়োগ করলে একটি পণ্যশ্রেণিতে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৭.৬ মিলিয়ন ডলার।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, শুধু নতুন একটি পথ চালু করলেই বাণিজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য আনা সম্ভব নয়। চীনা পণ্য আমদানি সহজ করার পাশাপাশি আফগানিস্তানকে বিক্রিযোগ্য পণ্যের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। ওয়াখানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় কৃষিপণ্য, রত্নপাথর, খনিজ ও হস্তশিল্পকে রপ্তানির সম্ভাব্য খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; তবে সড়কটি অতিরিক্ত কত বাণিজ্য তৈরি করবে, তার কোনো পূর্বাভাস নেই।
ওআরএফের গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চীনে আফগান পণ্যে ১০০ শতাংশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে। আমদানি শুল্ক তুলে দিলে বাজারে প্রবেশ সহজ হতে পারে, তবে এতে পরিবহন ব্যয়, পণ্যের শর্ত কিংবা সীমান্তের প্রক্রিয়াগুলো দূর হয় না। ওয়াখান এই সরবরাহশৃঙ্খলের কেবল একটি অংশে কাজ করবে।
কেন পাকিস্তানের বিকল্প চাইছে কাবুল
আফগানিস্তানের জন্য প্রকল্পটি দেশের সীমানার বাইরের বিঘ্নের ওপর নির্ভরতা কমানোরও অংশ। পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান পথ তোরখাম ও চামান। এই দেশটির বন্দরগুলো সামুদ্রিক বাণিজ্যে প্রবেশের সুযোগ দেয়। বারবার সীমান্ত বন্ধ থাকায় আফগান ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ইরান, মধ্য এশিয়া ও চীনের মধ্য দিয়ে বিকল্প পথের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।
ওআরএফের ব্রিফে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তোরখাম ১০ দিন বন্ধ থাকার কথা বলা হয়েছে এবং অন্যান্য সীমান্ত পারাপারেও দীর্ঘস্থায়ী বিধিনিষেধের বিবরণ রয়েছে। কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে জঙ্গিবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পাকিস্তানে আফগান নাগরিকদের উপস্থিতি নিয়ে সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে এসব বিঘ্নের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তান দেশটির নিরাপত্তার জন্য হুমকি ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। কাবুল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ব্রিফে বলা হয়েছে, তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর প্রথম ২১ মাসে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা ৭৩ শতাংশ বেড়েছিল। এতে আরও বলা হয়েছে, খাইবার পাখতুনখোয়ায় ২০২১ সালে ৫৭২টি ঘটনা ঘটেছিল, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ২,১৭৩টিতে দাঁড়ায়; বৃদ্ধির হার প্রায় ২৮০ শতাংশ।
একই গবেষণায় বলা হয়েছে, পাকিস্তান প্রায় ৮০০,০০০ আফগানকে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আরও ৩ মিলিয়ন আফগানকে বহিষ্কারের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এসব ঘটনা বিকল্প পথ খুঁজতে কাবুলের রাজনৈতিক তাগিদ বোঝাতে সাহায্য করে। তবে এগুলো প্রমাণ করে না যে প্রতিষ্ঠিত সীমান্ত পারাপারের বিকল্প হতে ওয়াখান দিয়ে পর্যাপ্ত পণ্য পরিবহন সম্ভব।
চীনের সঙ্গে যোগাযোগ মানেই গিরিপথ খোলা নয়
তালেবান প্রশাসনের সঙ্গে চীনের ব্যাপক যোগাযোগ রয়েছে। ওআরএফের ব্রিফ অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তালেবান ৮০টি দেশের সঙ্গে ১,৩৮২টি কূটনৈতিক বৈঠক করেছে। এর মধ্যে চীনের সঙ্গে হয়েছে ২১৫টি, যা মোট সংখ্যার প্রায় ১৫.৬ শতাংশ।
এই সম্পর্কে বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা—দুটিই রয়েছে। ব্রিফে ২০২৩ সালের একটি চুক্তির কথা বলা হয়েছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী, জিনজিয়াং সেন্ট্রাল এশিয়া পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি তিন বছরে তেল উত্তোলনে ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে সম্মত হয়েছিল। আফগান কর্মকর্তাদের বরাতে এতে লিথিয়াম খাতে ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে চীনের আগ্রহের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি আফগান কর্মকর্তাদের বর্ণিত আগ্রহের বিষয়, সম্পন্ন বিনিয়োগ বা ওয়াখান প্রকল্পে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতির সমতুল্য নয়।
চীনের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট ও ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স; পাশাপাশি পাকিস্তানে চীনা কর্মী ও প্রকল্পগুলোর ওপর হুমকিও রয়েছে। ওআরএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শিনজিয়াংয়ে ব্যস্ত বাণিজ্যিক প্রবেশপথের বদলে বেইজিং ওয়াখানকে নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে দেখতে আগ্রহী হতে পারে।
প্রতিবেদনগুলোতে ২০২২ সালের শুরুর দিকে ওয়াখানের আফগান অংশে পাকিস্তানি ও চীনা তৎপরতার অভিযোগ এবং পরে তালেবানের প্রতিক্রিয়ার কথাও রয়েছে। এসব বিবরণে অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে নিশ্চিতকরণ কিংবা সীমান্ত এলাকায় কথিত তৎপরতা নিয়ে অভিন্ন সরকারি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এগুলোকে ভূখণ্ডের পরিবর্তনের প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বাস্তব টানাপোড়েনটি স্পষ্ট: কাবুল চায় পণ্য চলাচল ও বিনিয়োগ, আর গবেষণায় বেইজিংকে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক মুনাফা—দুই ক্ষেত্রেই সতর্ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ঘন ঘন কূটনৈতিক যোগাযোগ নিজে থেকেই এই মতপার্থক্য দূর করে না।
পাহাড়ি পরিস্থিতিতে নিয়মিত চলাচলই আসল পরীক্ষা
ওআরএফের ব্রিফে ওয়াখানের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ২০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বলা হয়েছে। সেখানে ১১০টি গ্রামে প্রায় ১২,০০০ মানুষ বাস করেন। সীমান্ত এলাকাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,০০০ মিটার উঁচুতে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকটি বিবরণে ওয়াখজির গিরিপথের উচ্চতা প্রায় ৪,৯০০ মিটার বলা হয়েছে।
অন্য জায়গাতেও ভৌগোলিক পরিসংখ্যানে অমিল রয়েছে। মূল অর্থনৈতিক গবেষণায় আফগান-চীন সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৯৬ কিলোমিটার বলা হয়েছে, আর ওআরএফে বলা হয়েছে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। প্রস্থের হিসাবও ভিন্ন: মূল গবেষণায় ১৬ থেকে ৬৬ কিলোমিটার বলা হয়েছে। পরিমাপের অভিন্ন পদ্ধতি না থাকায় এগুলোকে পরস্পরের বদলে ব্যবহারযোগ্য নির্ভুল সংখ্যা না ধরে ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত।
পরিবহনের বাধাগুলো তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। ভারী তুষারপাত, প্রচণ্ড ঠান্ডা, তুষারধস ও ভূমিধসে যাতায়াত বিঘ্নিত হতে পারে এবং নির্মাণের মৌসুম ছোট হয়ে আসতে পারে। উঁচু পার্বত্য সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছানো কাঁচা সড়ক সারা বছর নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের প্রমাণ নয়।
আফগানিস্তানের আরও প্রয়োজন হবে সেতু, যোগাযোগব্যবস্থা, পণ্য ওঠানো-নামানোর সুবিধা, শুল্ক সক্ষমতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা। ব্যাংকিং সেবা ও পণ্যবিমাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যবসায়ীদের সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধ এবং ক্ষতি বা বিলম্বের ঝুঁকি সামলাতে হবে। উদ্বোধনের পরিসংখ্যানের সঙ্গে যাচাই করা কোনো পণ্য পরিবহন সক্ষমতা, মৌসুমি চলাচলের সময়সূচি কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট প্রকাশ করা হয়নি।
ওয়াখান অন্য পথগুলোর পরিপূরক, বিকল্প নয়
প্রস্তাবিত পথটির উদ্দেশ্য, এর সঙ্গে প্রায়ই এক কাতারে রাখা কয়েকটি আঞ্চলিক প্রকল্পের চেয়ে আলাদা। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সিপিইসি চীনের স্বার্থকে পাকিস্তানের পরিবহন নেটওয়ার্ক ও গোয়াদর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করে। ওয়াখান আফগানিস্তানকে চীনের সঙ্গে সরাসরি স্থলপথে যুক্ত করবে, তবে সমুদ্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ দেবে না।
সড়কটি নিয়ে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে চীন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সিপিইসি আফগানিস্তান পর্যন্ত সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে। এতে ওয়াখানের সরাসরি সংযোগ ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যোগাযোগের মধ্যে সম্ভাব্য সংযোগ তৈরি হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে একটি পথ থাকলে অন্যটির প্রয়োজন থাকবে না। কোন পথে ব্যবসায়ীরা পণ্য পাঠাবেন, তা নির্ধারণ করবে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা, গন্তব্য, নির্ভরযোগ্যতা ও খরচ।
২০১৮ সালে উদ্বোধন করা লাপিস লাজুলি পথটি পশ্চিম দিকে তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, জর্জিয়া ও তুরস্ক হয়ে ইউরোপের বাজারে পৌঁছায়। ইরানের চাবাহার বন্দর পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে না গিয়েও সামুদ্রিক বাণিজ্যের সুযোগ দেয়। শিনজিয়াংমুখী একটি সড়ক একা এসব প্রয়োজন মেটাতে পারে না।
তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত প্রকল্প বা টিএপিআই আবার ভিন্ন ধরনের উদ্যোগ: এটি গ্যাস পাইপলাইনের প্রস্তাব, সাধারণ পণ্য পরিবহন করিডর নয়। আঞ্চলিক সহযোগিতা বোঝার জন্য ওয়াখানের সঙ্গে এর তুলনা করা যায়, তবে প্রতিদ্বন্দ্বী পণ্য পরিবহন সক্ষমতা পরিমাপে নয়।
আফগানিস্তানের সঙ্গে চীনের আরেকটি সংযোগ আগে থেকেই রয়েছে। ওআরএফের ব্রিফে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে কাশগড় থেকে কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান হয়ে হেয়ারাতান পর্যন্ত চালু হওয়া ট্রেনসেবার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ওয়াখান দ্বিপক্ষীয় পরিবহন একেবারে নতুন করে শুরু করবে না; বরং বিদ্যমান পরোক্ষ সংযোগগুলোর সঙ্গে সরাসরি আরেকটি বিকল্প যোগ করবে।
অর্থনৈতিক লাভ মাপার আগে যা যা হতে হবে
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ক্যারেক পারফরম্যান্স রিপোর্ট, যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত, করিডরের কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো দেয়। এতে ১১টি সদস্যদেশের ছয়টি করিডরে ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যপ্রক্রিয়া ও পরিবহন দক্ষতা পরীক্ষা করা হয়েছে; দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান ও চীন।
প্রতিবেদনটিতে করিডর পারফরম্যান্স মেজারমেন্ট অ্যান্ড মনিটরিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পরিবহনপথ ও সীমান্ত দিয়ে পণ্য বাস্তবে কীভাবে চলাচল করে, তা মূল্যায়ন করা হয়। এতে কাঠামোগত বাধা এবং কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সৃষ্ট বিঘ্নও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এটি ওয়াখানের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের গবেষণা নয় এবং সেখানে ব্যয় সাশ্রয় বা বাণিজ্য বৃদ্ধির কোনো নির্দিষ্ট পূর্বাভাসও যাচাই করে না।
সড়কটি ঘিরে অর্থনৈতিক দাবিগুলোর ক্ষেত্রে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিকভাবে কম দূরত্বের পথও ধীরগতির বা বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে, যদি পাহাড়ি এলাকায় চলাচল বন্ধ, পণ্য এক যান থেকে অন্য যানে তোলা বা সীমান্তে বিলম্বের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়। নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পেতে যাত্রার সময়, পণ্য পরিবহনের খরচ, চলাচলের মৌসুম এবং শুল্ক কার্যক্রমের তথ্য দরকার; নিয়মিত ওয়াখান বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এসবের কোনোটি এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
নির্মাণকাজ ও ভবিষ্যৎ পরিবহনসেবা বাদাখশানে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। ওয়াখানের মধ্যে একটি জাতীয় উদ্যানের অংশও রয়েছে এবং সেখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা ইতিমধ্যে যান। যোগাযোগ উন্নত হলে স্থানীয় বাণিজ্য ও পর্যটনে সহায়তা মিলতে পারে, তবে কর্মসংস্থান বা পর্যটকের সংখ্যা নিয়ে কোনো পূর্বাভাস নিশ্চিত হয়নি।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলো হলো সীমান্ত পরিচালনা নিয়ে সম্মত ব্যবস্থা, চীনা শুল্ক অবকাঠামো, ব্যবহারযোগ্য সংযোগকারী অবকাঠামো এবং বাস্তবে বাণিজ্যিক পণ্য চলাচল। এসব কবে হবে, তার কোনো নিশ্চিত সময়সীমা দেওয়া হয়নি। তত দিন পর্যন্ত সড়কটির সবচেয়ে জোরালো প্রমাণিত মূল্য হলো উন্নত ভৌত যোগাযোগ এবং আলোচনায় নতুন একটি বিকল্প; রপ্তানি বৃদ্ধি বা ট্রানজিট আয় মাপার সুযোগ নয়।
মূল বিষয়গুলো
- আফগানিস্তান বোরোগিল থেকে ওয়াখান হয়ে চীনা সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ১২১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কাঁচা সড়ক উদ্বোধন করেছে।
- নির্মাণ ব্যয় হয়েছে ৩৬৫ মিলিয়ন আফগানি, যা প্রায় ৫৫ লাখ ডলার। উদ্বোধনের দুই বছর আগে কাজ শুরু হয়েছিল।
- উদ্বোধনের তারিখ নিয়ে প্রতিবেদনে অমিল রয়েছে; কোথাও রোববার, কোথাও বছর উল্লেখ না করে ৪ অক্টোবর বলা হয়েছে।
- ২০২৫ সালের এপ্রিলের ওআরএফ ব্রিফে বলা হয়েছে, ওয়াখজির গিরিপথে চীনা শুল্ক অবকাঠামো নেই। পথটির অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ব্যয় নিয়ে বেইজিংকে সতর্ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
- ২০২৩ সালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১.৩ বিলিয়ন ডলার, তবে আফগানিস্তানের রপ্তানি ছিল মাত্র ৬৪ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৪.৯ শতাংশ।
- সড়কটি নির্ভরযোগ্য পণ্য পরিবহন করিডরে পরিণত হবে কি না, তা নির্ধারণ করবে পাহাড়ি আবহাওয়া, সীমান্ত প্রক্রিয়া, অর্থায়ন ও সংযোগকারী অবকাঠামো।
- নিয়মিত বাণিজ্যিক সীমান্ত কার্যক্রম শুরুর কোনো নিশ্চিত তারিখ নির্ধারিত হয়নি।






