পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরির পথে চীনের অগ্রযাত্রা: নৌ-উচ্চাকাঙ্ক্ষার নতুন যুগ

পড়তে 15 মিনিট
পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরির পথে চীনের অগ্রযাত্রা: নৌ-উচ্চাকাঙ্ক্ষার নতুন যুগ

চীনের নৌবাহিনীর বিবর্তন: প্রচলিত থেকে পারমাণবিক শক্তিতে

চীনের সর্বাধুনিক বিমানবাহী রণতরি ফুজিয়ান নৌপ্রকৌশলে এক অসাধারণ অর্জনের প্রতিনিধিত্ব করছে। নভেম্বরে কমিশন পাওয়া ৮০ হাজার টন ওজনের এই জাহাজটি বিশ্বের বৃহত্তম প্রচলিত যুদ্ধজাহাজ এবং উন্নত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপল্টে সজ্জিত প্রথম মার্কিন-বহির্ভূত জাহাজ। তবে প্রযুক্তিগত এসব মাইলফলক সত্ত্বেও সামরিক বিশ্লেষকেরা নকশার উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করেছেন, যা কেবল প্রপালশন প্রযুক্তিতে মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। শিপবর্ন উইপনস ডিফেন্স রিভিউয়ের মতে, ফুজিয়ানের সীমাবদ্ধতা একটি অনিবার্য উপসংহারের দিকে ইঙ্গিত করছে: মার্কিন সমকক্ষদের সক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দিতে চীনের ভবিষ্যৎ বিমানবাহী রণতরিগুলোকে পারমাণবিক শক্তিচালিত হতে হবে।

সূচিপত্র
  1. চীনের নৌবাহিনীর বিবর্তন: প্রচলিত থেকে পারমাণবিক শক্তিতে
  2. পারমাণবিক প্রপালশনের কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা
  3. পারমাণবিক উন্নয়নের জোরালো প্রমাণ
  4. প্রযুক্তিগত বিবরণ ও সময়রেখা
  5. নির্মাণকাজের চিহ্ন উন্মোচন করেছে স্যাটেলাইট চিত্র
  6. প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও কৌশলগত প্রশ্ন
  7. অর্থনৈতিক ও প্রশিক্ষণের চাপ
  8. আঞ্চলিক নিরাপত্তায় প্রভাব
  9. যুক্তরাষ্ট্র-চীন রণতরি প্রতিযোগিতা
  10. ভবিষ্যৎ পথ ও অনিশ্চয়তা
  11. সারকথা

পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান ও নজরদারি বিমান থেকে শুরু করে ড্রোন পর্যন্ত সব ধরনের উড়োজাহাজ বহন করতে পারে ফুজিয়ান। চীনের আগের সোভিয়েত-অনুপ্রাণিত রণতরিগুলোর তুলনায় এটি এক বড় পরিবর্তন। তবে সবচেয়ে উন্নত মার্কিন জাহাজ, জেরাল্ড আর. ফোর্ড শ্রেণির রণতরিগুলোতে তিনটি ক্যাটাপল্ট রয়েছে, যেখানে চীনা জাহাজটিতে রয়েছে দুটি। ফলে সেগুলো থেকে দ্রুততর ও অধিক দক্ষভাবে উড়োজাহাজ উৎক্ষেপণ করা যায়। উড়োজাহাজ উৎক্ষেপণের সক্ষমতায় এই ব্যবধান চীনের নৌ-উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে থাকা বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের দিকটি তুলে ধরে, কারণ দেশটি আঞ্চলিক শক্তি থেকে সত্যিকারের বৈশ্বিক সামুদ্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে চাইছে।

চীনের রণতরি কর্মসূচির বিকাশ হয়েছে দ্রুত এবং পরিকল্পিতভাবে। দেশটির প্রথম দুটি রণতরি, লিয়াওনিং ও শানডং, সোভিয়েত আমলের নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে স্কি-জাম্প উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। চীনের নিজস্ব নকশায় তৈরি প্রথম রণতরি ফুজিয়ান এই ধারার বাইরে গিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যবহৃত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপল্টের মতো ব্যবস্থা যুক্ত করেছে। তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতিও চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। ফলে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে পারমাণবিক প্রপালশনের ওপর ক্রমেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

পারমাণবিক প্রপালশনের কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা

পারমাণবিক প্রপালশনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে, যা চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রচলিত রণতরির বিপরীতে, পারমাণবিক শক্তিচালিত জাহাজ জ্বালানি পুনরায় ভরা ছাড়াই বছরের পর বছর চলতে পারে। এতে কার্যত তাদের চলার সময়সীমা ও পাল্লা সীমাহীন হয়। এ সক্ষমতা চীনা রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপকে চীনের উপকূল থেকে অনেক দূরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে এবং ঘন ঘন জ্বালানি ভরার রসদগত চাপ ছাড়াই পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও এর বাইরেও শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ দেবে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো তং ঝাও এই পরিবর্তনের কৌশলগত গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি চীনকে প্রথম সারির নৌশক্তিগুলোর একচেটিয়া গোষ্ঠীতে স্থান দেবে, যে গোষ্ঠীতে বর্তমানে রয়েছে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স। চীনের নেতৃত্বের কাছে এ ধরনের উন্নয়ন জাতীয় মর্যাদার প্রতীক হবে; পাশাপাশি তা দেশের ভেতরে জাতীয়তাবাদকে উসকে দেবে এবং শীর্ষস্থানীয় শক্তি হিসেবে চীনের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি বাড়াবে।

প্রতীকী গুরুত্বের বাইরেও রয়েছে বাস্তব সুবিধা। পারমাণবিক প্রপালশনের ফলে রণতরিতে যথেষ্ট জায়গা খালি থাকে, যা অন্যথায় জ্বালানি তেল রাখার জন্য ব্যবহার করতে হতো। এই বাড়তি জায়গা বিমান জ্বালানি ও অস্ত্র রাখার কাজে ব্যবহার করা যায়, যা রণতরির বিমানবাহিনীর কার্যপরিধি ও যুদ্ধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের নৌবাহিনী ও সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো নিক চাইল্ডস বলেন, পারমাণবিক শক্তি শেষ পর্যন্ত চীনকে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক লঞ্চার, রাডার ও নতুন প্রযুক্তির অস্ত্রের মতো উন্নত ব্যবস্থা পরিচালনায় আরও সক্ষম করে তুলবে।

চীনের ক্রমবর্ধমান বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করা টাস্ক গ্রুপগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষার আওতা স্থলভিত্তিক প্রতিরক্ষার সীমার বাইরে প্রসারিত করে, ফলে চীনের উপকূল থেকে আরও দূরে অভিযান চালানো সম্ভব হয়—চীনের সামরিক শক্তি নিয়ে কংগ্রেসে জমা দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।

অভিযান পরিচালনার এই প্রসারিত পরিধি সরাসরি চীনের ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্যগুলোকে সহায়তা করে। ২০১৯ সালের জাতীয় প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রে বলা হয়, চীনা নৌবাহিনী “নিকটবর্তী সমুদ্রে প্রতিরক্ষা থেকে দূরবর্তী সমুদ্রে সুরক্ষা অভিযানে” নিজেদের কাজের রূপান্তর ত্বরান্বিত করে কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা সমন্বয় করছে। এই পরিবর্তন বাস্তবায়নে পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, বিশেষ করে তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগরের বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডসহ প্রথম দ্বীপমালার বিতর্কিত এলাকাগুলোতে।

বিজ্ঞাপন

পারমাণবিক উন্নয়নের জোরালো প্রমাণ

সাম্প্রতিক গোয়েন্দা অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে যে ভবিষ্যৎ রণতরির জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক প্রপালশন প্রযুক্তি চীন সক্রিয়ভাবে তৈরি করছে। ক্যালিফোর্নিয়ার মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষকেরা উপসংহারে পৌঁছেছেন, চীন বড় পৃষ্ঠজাহাজের জন্য বিশেষভাবে নকশা করা স্থলভিত্তিক একটি প্রোটোটাইপ পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করেছে। স্যাটেলাইট চিত্র ও চীনা সরকারি নথির ওপর ভিত্তি করে করা তাঁদের বিশ্লেষণই বেইজিংয়ের প্রথম পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি তৈরির দিকে অগ্রগতির প্রথম জোরালো নিশ্চিত প্রমাণ।

লংওয়েই বা ড্রাগন মাইট প্রকল্প নামে পরিচিত এই প্রকল্পটি দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সিচুয়ান প্রদেশের লেশান শহরের বাইরে একটি পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। চুল্লির প্রোটোটাইপটি বেস ৯০৯ নামে পরিচিত একটি স্থাপনায় রাখা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন পর্যায়ে চালু থাকা আরও ছয়টি চুল্লি রয়েছে। চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার করপোরেশনের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার ইনস্টিটিউট অব চায়নার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এই স্থাপনাটি। চুল্লির প্রকৌশল গবেষণা ও পরীক্ষার দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের।

মিডলবেরির অধ্যাপক এবং প্রকল্পের অন্যতম গবেষক জেফরি লুইস এই আবিষ্কারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। লেশানের চুল্লি প্রোটোটাইপই প্রথম জোরালো প্রমাণ যে চীন সত্যিই পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি তৈরি করছে। এ ধরনের জাহাজ পরিচালনার সুযোগ এত দিন ছিল কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের; এখন সেই গোষ্ঠীতে যোগ দিতে চলেছে চীন, যা দেশটির নৌবাহিনীর আধুনিকায়নে একটি বড় মাইলফলক।

গবেষক দলটি প্রকল্পের দরপত্র, কর্মীদের নথি, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং নির্মাণকাজের শব্দ ও অতিরিক্ত ধুলাবালি নিয়ে এক নাগরিকের অভিযোগসহ একাধিক উৎস থেকে উপসংহারে পৌঁছেছে। চীনের ৭০১ ইনস্টিটিউট, যার আনুষ্ঠানিক নাম চায়না শিপ রিসার্চ অ্যান্ড ডিজাইন সেন্টার, নিউক্লিয়ার পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় একটি বড় পৃষ্ঠজাহাজে স্থাপনের জন্য চুল্লির সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে—এমন তথ্য থাকা নথি চুল্লিটির উদ্দেশ্য নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তিগত বিবরণ ও সময়রেখা

বাষ্প জেনারেটর ও টারবাইন পাম্পের চুক্তি থেকে বোঝা যায়, লেশান প্রকল্পে দ্বিতীয় সার্কিটযুক্ত একটি প্রেশারাইজড ওয়াটার রিঅ্যাক্টর রয়েছে, যা নৌযানের প্রপালশন চুল্লির প্রচলিত বিন্যাসের সঙ্গে মেলে। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে লংওয়েই প্রকল্পকে গোপনীয় হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ জাতীয় প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা এর সামরিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।

২০২০ থেকে ২০২৩ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে বাড়িঘর ভেঙে ফেলা এবং চুল্লি স্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত পানি গ্রহণ অবকাঠামো নির্মাণের চিত্র দেখা গেছে। এসব দৃশ্যমান উন্নয়ন থেকে বোঝা যায়, প্রকল্পটি ধারাবাহিকভাবে এগোচ্ছে। ক্রয়সংক্রান্ত নথি ইঙ্গিত দেয়, চুল্লিটি শিগগিরই চালু হবে।

অনুসন্ধানের ফল পর্যালোচনা করা অসলো নিউক্লিয়ার প্রজেক্টের বিশ্লেষক জেমি উইথর্ন এই যুক্তিকে বিশ্বাসযোগ্য বলে বর্ণনা করেছেন। ওপেন নিউক্লিয়ার নেটওয়ার্কের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সারাহ ল্যাডারম্যান গবেষণাটিকে সতর্কভাবে পরিচালিত ও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা কাজ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, চীন নৌবাহিনীর পৃষ্ঠজাহাজ, সম্ভবত বিমানবাহী রণতরির জন্য পারমাণবিক প্রপালশন ব্যবস্থা তৈরির কাজ করছে—এমন দাবির পক্ষে জোরালো ভিত্তি রয়েছে।

তবে চীনের পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি কবে তৈরি হবে এবং চালু হবে, সে বিষয়ে গবেষণায় কোনো সূত্র দেওয়া হয়নি। উন্নয়নের সময়রেখা অনিশ্চিত। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, চীন একই সময়ে দুটি নতুন রণতরি তৈরি শুরু করতে পারে—ফুজিয়ানের মতো একটি প্রচলিত টাইপ ০০৩ এবং একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত টাইপ ০০৪।

নির্মাণকাজের চিহ্ন উন্মোচন করেছে স্যাটেলাইট চিত্র

চুল্লি প্রোটোটাইপের বাইরেও আরও কিছু প্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, চীন পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এনবিসি নিউজের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে উত্তর-পূর্ব চীনের ডালিয়ান জাহাজ নির্মাণ কারখানায় দুটি ট্র্যাক বা খাঁজযুক্ত একটি মডিউলের প্রকৌশলগত প্রোটোটাইপ দেখা গেছে। এগুলো ক্যাটাপল্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হয়। এ কারণে পাঁচজন বিশ্লেষক মনে করেন, ছবিগুলো এমন একটি নতুন জাহাজের নকশার ইঙ্গিত দেয়, যা বর্তমানে চীনা নৌবহরে থাকা যেকোনো জাহাজের চেয়ে আলাদা।

বিজ্ঞাপন

জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক মাইকেল ডয়েটসম্যান ব্যাখ্যা করেছেন, এই ট্র্যাকগুলো সম্ভবত আসন্ন টাইপ ০৪ রণতরির পরীক্ষার সরঞ্জাম ও বিন্যাসের অংশ। বিশ্লেষকদের মধ্যে সাধারণ ঐকমত্য হলো, নতুন রণতরিতে চারটি ক্যাটাপল্ট থাকবে, যার ফলে বেশি উড়োজাহাজ উড্ডয়ন করতে পারবে এবং মার্কিন ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডের মতো রণতরির সঙ্গে সক্ষমতার মিল হবে। চারটি ক্যাটাপল্ট বসানোর জন্য জাহাজটিকে ফুজিয়ানের চেয়ে বড় হতে হবে, মার্কিন রণতরির সমপরিমাণ ওজনের হতে হবে এবং পারমাণবিক চুল্লিতে চালিত হতে হবে।

সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা দুটি ট্র্যাক পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসা কোণে স্থাপিত। চারটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপল্ট থাকা মার্কিন সুপারক্যারিয়ারগুলোর সাধারণ বিন্যাসের সঙ্গে এটি মেলে—দুটি জাহাজের সামনের অংশে সমান্তরালভাবে এবং দুটি মাঝের অংশে। উড্ডয়ন ডেকে জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে এগুলো সমান্তরালভাবে চলে না, বরং পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসে। এ নকশার ফলে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ব্যবস্থা বসানো সহজ হয়।

জেমস মার্টিন সেন্টারের আরেক গবেষক শেঠ হসফোর্ড বলেন, জটিল ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপল্টের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অংশের প্রোটোটাইপ তৈরি করা যুক্তিযুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ফোর্ড শ্রেণির রণতরিতে এ ক্যাটাপল্ট ব্যবহার করে। এগুলো বড় চুম্বকের সাহায্যে বাষ্পচালিত পিস্টনের পরিবর্তে দ্রুত বিমানের নাকের অংশ ধরে সেটিকে সামনে ঠেলে দেয়। ডালিয়ানে দেখা মডিউলটিতে দুটি ট্র্যাক বেশ কাছাকাছি রয়েছে। হসফোর্ড সতর্ক করে বলেন, পরস্পরকে ছেদ করা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপল্টের চৌম্বক ক্ষেত্র থেকে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যা তৈরি হতে পারে।

জাপান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ফান্ডামেন্টালসের (জেআইএনএফ) বিশ্লেষণ থেকেও আরও সমর্থন মিলেছে। তাদের স্যাটেলাইট চিত্র মূল্যায়নে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ডালিয়ান শিপইয়ার্ডে চীন সম্ভবত প্রথম পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি নির্মাণ শুরু করেছে। ২৭০ মিটারের বেশি দীর্ঘ কিল ব্লক স্থাপন এবং ১৬ মিটার উঁচু ও ১৪ মিটার চওড়া অভ্যন্তরীণ কাঠামো তৈরির চিত্র যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে নির্মাণাধীন পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরির কাঠামোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও কৌশলগত প্রশ্ন

চুল্লি উন্নয়ন ও নির্মাণকাজের অগ্রগতির প্রমাণ থাকলেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি নির্মাণ প্রচলিত রণতরি তৈরির চেয়ে অনেক বেশি জটিল। পারমাণবিক প্রপালশন রণতরির ওজন, ভারসাম্য, অভ্যন্তরীণ বিন্যাস, রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন, প্রশিক্ষণের চাহিদা এবং রসদ পুনরায় সরবরাহের ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। প্রচলিত থেকে পারমাণবিক প্রপালশনে উত্তরণ, কোনো রণতরি না থাকা অবস্থা থেকে প্রচলিত রণতরি পরিচালনা শুরু করার চেয়েও বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশকের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই শিক্ষা পেয়েছে। পারমাণবিক প্রকৌশলে গভীর দক্ষতা ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পভিত্তি থাকা সত্ত্বেও পারমাণবিক রণতরি নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বিপুল অর্থ ও রসদ বিনিয়োগ করতে হয়েছে। জাহাজ নির্মাণে অসাধারণ দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও চীন কখনো পারমাণবিক শক্তিচালিত পৃষ্ঠজাহাজ তৈরি করেনি। দেশটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন পরিচালনা করলেও শব্দ কমানো, চুল্লির নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে সেগুলো মার্কিন ও রুশ নকশার চেয়ে এক প্রজন্ম বা তারও বেশি পিছিয়ে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চায়না পাওয়ার প্রজেক্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো ম্যাথিউ ফুনাইওলে চীনের অবিলম্বে পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর ধারণা, চীনের পরবর্তী রণতরি পারমাণবিক শক্তিচালিত হবে না। বরং পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির চতুর্থ রণতরি ফুজিয়ানের বিদ্যমান নকশাকে ছোটখাটো উন্নতির মাধ্যমে আরও কার্যকর করার দিকে মনোযোগ দেবে।

চীনের বর্তমান সামরিক লক্ষ্য অর্জনে আদৌ পারমাণবিক রণতরির প্রয়োজন আছে কি না, সে বিষয়েও কৌশলগত প্রশ্ন রয়ে গেছে। চীনের প্রধান কৌশলগত মনোযোগ এখনো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে, বিশেষ করে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর ও পূর্ব চীন সাগরে। এসব আঞ্চলিক ক্ষেত্রে প্রচলিত শক্তিচালিত রণতরিই যথেষ্টের চেয়ে বেশি হতে পারে। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপল্ট ব্যবস্থা ও বড় বিমানবাহিনীসমৃদ্ধ ফুজিয়ান পুরোপুরি চালু হলে চীনের অবিলম্বের আশপাশে কার্যকরভাবে শক্তি প্রদর্শন করতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজউইককে এক চীনা সামরিক পর্যবেক্ষক বলেন, চীন যদি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের বাইরে শক্তি প্রদর্শন করতে চায়, তাহলে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে না। বৈশ্বিক নৌবাহিনী পরিচালনায় প্রয়োজনীয় রসদ সহায়তা রণতরির নিজের জ্বালানির চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, এসকর্ট জাহাজ ও উড়োজাহাজও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি খরচ করে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিস্তৃত ও পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক রসদ নেটওয়ার্ক এখনো চীনের নেই। মার্কিন নৌবাহিনী বিদেশে অভিযান পরিচালনায় মিত্রদেশের ভূখণ্ডে জাহাজে জ্বালানি ভরতে পারে।

অর্থনৈতিক ও প্রশিক্ষণের চাপ

পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরির মূল্য অত্যন্ত বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের জন্যও ফোর্ড শ্রেণির রণতরি, তার সঙ্গে থাকা বিমানবাহিনী ও এসকর্ট জাহাজ নির্মাণ ও পরিচালনার খরচ বিপুল। ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, জনমিতিক অবনতি ও আর্থিক অস্থিতিশীলতাসহ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা চীনের জন্য পারমাণবিক সুপারক্যারিয়ারে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করা সম্পদের সবচেয়ে বিচক্ষণ ব্যবহার নাও হতে পারে।

জনবলও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে চীনা নৌবাহিনী ১২টি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন পরিচালনা করে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সংখ্যার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এ সীমিত অভিজ্ঞতা পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরির জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণকে প্রভাবিত করতে পারে। আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল চায়না হাবের সহযোগী পরিচালক কিচ লিয়াও বলেন, পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য প্রশিক্ষণব্যবস্থা বড় পরিসরে বাড়ানো সমস্যাজনক হতে পারে, বিশেষ করে চীন যদি একই সঙ্গে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন বহরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করে।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, আমেরিকার সঙ্গে জাহাজে জাহাজে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা না করে জাহাজবিরোধী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন ও সাইবার যুদ্ধের সরঞ্জামের মতো মার্কিন শক্তি প্রদর্শনকে জটিল করে তোলে এমন সক্ষমতায় বিনিয়োগ করাই বেইজিংয়ের জন্য অধিক বিচক্ষণ কৌশল হতে পারে। পারমাণবিক শক্তিচালিত সুপারক্যারিয়ার মর্যাদা এনে দিতে পারে, তবে মর্যাদা সব সময় কৌশলগত উপযোগিতায় রূপ নেয় না।

আঞ্চলিক নিরাপত্তায় প্রভাব

পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি যুক্ত হলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যাবে। ক্যাটাপল্ট ব্যবস্থা থাকা পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি ফুজিয়ানের মতো প্রচলিত শক্তিচালিত রণতরির তুলনায় প্রশান্ত মহাসাগরে দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকতে পারবে। এর ফলে জাপানের আশপাশে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় দ্বীপমালাজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী অভিযান চালানো সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

জাপান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ফান্ডামেন্টালসের গবেষক মাকি নাকাগাওয়া সতর্ক করে বলেন, চীনের বিমানবাহী রণতরি বহর এখনো মার্কিন সামরিক বাহিনীর চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও, চতুর্থ পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি কমিশন করা হলে জাপানের আশপাশে আরও দীর্ঘস্থায়ী অভিযান শুরু হতে পারে। এতে জাপানের সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সেস ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম আরও নিয়মিত হয়ে উঠবে, ফলে জাপানকে তার প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি বদলাতে হবে।

তাইওয়ানের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি চীনা সামরিক বাহিনীকে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়, বিশেষ করে প্রথম দ্বীপমালার আশপাশে, আরও নমনীয়তা ও দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা দেবে। চীনের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ অধিকাংশ ভূখণ্ডই এই দ্বীপমালায় অবস্থিত। তাইওয়ান নিয়ে সংঘাত হলে পারমাণবিক রণতরি দ্বীপটির পূর্বে ফিলিপাইন সাগরে উড়োজাহাজ মোতায়েন করতে পারবে, যা সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে বা বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

কার্নেগি এনডাউমেন্টের ঝাও ব্যাখ্যা করেন, এসব রণতরি চীনের অভিযান পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের আরও গভীরে প্রসারিত করতে পারে। এতে আঞ্চলিক বিষয়গুলো কেবল ওই অঞ্চলের দেশগুলোর মাধ্যমেই সমাধান হওয়া উচিত বলে মনে করা চীনের অবস্থানের ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের সক্ষমতা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এই বাড়তি কার্যপরিধি মার্কিন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে জটিল করবে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো সংঘাতের হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে।

নতুন রণতরির নকশা ও নির্মাণসহ চীনের নৌবহরের দ্রুত আধুনিকায়ন নিয়ে পেন্টাগন ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সামুদ্রিক ক্ষেত্রে চীনের বাড়তি গুরুত্ব এবং মূল ভূখণ্ড থেকে আরও দূরে নৌবাহিনীর অভিযান পরিচালনার ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে এ উন্নয়ন সামঞ্জস্যপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন রণতরি প্রতিযোগিতা

রণতরি সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে। দেশটি বর্তমানে ১১টি পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি পরিচালনা করে। এ বহরের কারণে মার্কিন নৌবাহিনী ইন্দো-প্যাসিফিকসহ সারা বিশ্বে একসঙ্গে একাধিক স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন রাখতে পারে। জেরাল্ড আর. ফোর্ড শ্রেণি মার্কিন রণতরি প্রযুক্তির শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। এর তিনটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপল্ট চীনের দুই ক্যাটাপল্টের ব্যবস্থার তুলনায় উন্নততর হারে উড়োজাহাজ উৎক্ষেপণ করতে পারে।

তবে চীনের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা মার্কিন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। চীনের জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো প্রতিবছর শত শত জাহাজ তৈরি করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বছরে পাঁচটি বা তারও কম জাহাজ নির্মাণ করে। এই শিল্পভিত্তিক সুবিধা চীনকে দ্রুত নৌবহর বাড়াতে সাহায্য করেছে। এরই মধ্যে জাহাজ ও সাবমেরিন মিলিয়ে চীনের বহরে রয়েছে ৩৭০টির বেশি যান, যা জাহাজের সংখ্যার হিসাবে দেশটিকে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনীতে পরিণত করেছে।

বিজ্ঞাপন

পেন্টাগনের চীনের সামরিক শক্তিবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে চীনের উচ্চাভিলাষী সম্প্রসারণ পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে চীন নয়টি বিমানবাহী রণতরির বহর গড়ে তুলতে চায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এটিই হবে রণতরি নির্মাণের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ। এ সম্প্রসারণে আগামী দশকের মধ্যে রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েনে বেইজিংয়ের সক্ষমতা তিন গুণ হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জয়েন্ট সোর্ড মহড়ার সময় তাইওয়ান অবরোধের অনুকরণে পরিচালিত অভিযানে চীন তার রণতরিগুলো মোতায়েন করেছিল। চীনের অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ ও উড়োজাহাজের পাশাপাশি পিএলএএন রণতরিগুলোর মোতায়েন সংঘাতের সময় সম্ভাব্য তৃতীয় পক্ষের প্রবেশাধিকারকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। এসব মহড়া দেখায়, আঞ্চলিক সংকটের ক্ষেত্রে চীন কীভাবে নিজেদের ক্রমবর্ধমান রণতরি সক্ষমতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে।

তবে মার্কিন ও চীনা রণতরির সক্ষমতার সরাসরি তুলনায় সূক্ষ্মতা প্রয়োজন। দ্য ডিপ্লোম্যাট উল্লেখ করেছে, শুধু জাহাজের সংখ্যার ভিত্তিতে চীনকে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী বলা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। ১,৪০০ টনের একটি করভেটকে যেমন একটি জাহাজ হিসেবে গণনা করা হয়, তেমনি ১,০০,০০০ টনের ফোর্ড শ্রেণির রণতরিকেও। কিন্তু তাদের সক্ষমতার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। টনেজ বা অস্ত্রসজ্জার মতো অন্য মাপকাঠি নৌক্ষমতার তুলনার জন্য আরও অর্থবহ।

ভবিষ্যৎ পথ ও অনিশ্চয়তা

চীনের রণতরি কর্মসূচি কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের কলিন কোহের মতো কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রথম দ্বীপমালার বাইরে দূরবর্তী সমুদ্রে শক্তি প্রদর্শনের দিকে চীনের ঝোঁক পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরির পথে এগোনোকে কৌশলগতভাবে যুক্তিসংগত করে তোলে। উচ্চ গতিতে অভিযান পরিচালনার জন্য পারমাণবিক চুল্লি স্থিতিশীল ও টেকসই শক্তির উৎস দেবে। চীনের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্যাটাপল্ট ব্যবহারও এতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো প্রচুর শক্তি খরচ করে।

অন্যরা আরও সতর্ক পন্থার পক্ষে। ন্যাশনাল সিকিউরিটি জার্নালের মতে, পারমাণবিক প্রপালশনের বোঝা না নিয়ে আঞ্চলিক জলসীমায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য চীন আগামী দশকে তিন থেকে ছয়টি প্রচলিত সুপারক্যারিয়ার তৈরি করে নিজেদের প্রচলিত রণতরি বহর আরও উন্নত করতে পারে। বিকল্পভাবে, ২০৩০-এর দশকে পরীক্ষামূলক একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি নির্মাণের মাধ্যমে চীন ধীরে ও সতর্কভাবে পারমাণবিক প্রপালশনের পথে এগোতে পারে। ১৯৬০-এর দশকে ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মতো কাজ করতে করতে শেখার পথ বেছে নিতে পারে দেশটি।

বিজ্ঞাপন

ভবিষ্যৎ যে আদৌ বিশাল রণতরির, তা নিয়েও কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোনের ঝাঁক এবং উন্নত সমুদ্রতলীয় অস্ত্র বড় পৃষ্ঠজাহাজগুলোকে ক্রমেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে চীন আরও ঝুঁকিপূর্ণ ভাসমান নগরী নির্মাণের বদলে রণতরি ডুবিয়ে দিতে সক্ষম অস্ত্র নিখুঁত করাকেই বুদ্ধিমানের কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যথাযথ প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ন্যাশনাল সিকিউরিটি জার্নাল আতঙ্ক বা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার বদলে কৌশলগত ধৈর্য ও সামুদ্রিক সংযমের পক্ষে মত দিয়েছে। চীনের পারমাণবিক রণতরি কর্মসূচি ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ ও মর্যাদাকেন্দ্রিক প্রকল্প হয়ে উঠতে পারে, যা প্রকৃত যুদ্ধক্ষমতার চেয়ে প্রতীকী গুরুত্বই বেশি দেবে। চীনের সঙ্গে রণতরি সংখ্যায় পাল্লা দেওয়ার বদলে শক্তি সংরক্ষণ এবং সাশ্রয়ী, স্থিতিস্থাপক ও বিকেন্দ্রীভূত সামুদ্রিক সক্ষমতায় মনোযোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হতে পারে।

এই অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও একটি বিষয় স্পষ্ট: বিশ্বমানের নৌবাহিনী গড়ে তোলার চীনের অঙ্গীকার একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পরিবর্তন। পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠুক বা ব্যাপক পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়বহুল ও জটিল প্রমাণিত হোক, চীনের নৌবাহিনীর রূপান্তর আগামী কয়েক দশক ধরে ইন্দো-প্যাসিফিকের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন আকার দিতে থাকবে।

সারকথা

  • প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও চীনের ফুজিয়ান রণতরির নকশায় এমন ত্রুটি রয়েছে, যা পারমাণবিক প্রপালশনের মাধ্যমে দূর করা যেতে পারে
  • স্যাটেলাইট চিত্র ও নথি নিশ্চিত করছে, বড় যুদ্ধজাহাজের জন্য চীন নৌবাহিনীর একটি চুল্লি প্রোটোটাইপ তৈরি করছে
  • ডালিয়ান শিপইয়ার্ডের নির্মাণকাজের চিহ্ন থেকে বোঝা যায়, পারমাণবিক শক্তিচালিত টাইপ ০০৪ রণতরির কাজ শুরু হয়েছে
  • পারমাণবিক প্রপালশন বেশি পাল্লা, দীর্ঘস্থায়ী চলার সক্ষমতা এবং বিমান জ্বালানি ও অস্ত্র রাখার বাড়তি জায়গা দেবে
  • প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে চুল্লির আকার ছোট করা, বিভিন্ন ব্যবস্থা একীভূত করা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ
  • চীনের আঞ্চলিক মনোযোগের জন্য পারমাণবিক রণতরি আদৌ প্রয়োজন কি না, তা নিয়ে কৌশলগত প্রশ্ন রয়ে গেছে
  • পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সংখ্যার তুলনায় বড় সম্প্রসারণ ঘটিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে চীন নয়টি বিমানবাহী রণতরি মোতায়েনের লক্ষ্য নিয়েছে
  • পারমাণবিক রণতরি তাইওয়ান ও প্রথম দ্বীপমালার আশপাশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দেবে
  • যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি রয়েছে, তবে চীনের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতার কারণে প্রতিযোগিতা বাড়ছে
  • প্রপালশনের ধরন যা-ই হোক, ভবিষ্যতের যুদ্ধপ্রযুক্তি বড় রণতরির কৌশলগত মূল্য কমিয়ে দিতে পারে
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে