জাপানে রেকর্ডসংখ্যক বিদেশি পর্যটকের আগমনের ফলে অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ টোকিও ও কিয়োটোর মতো বড় শহর ছাড়িয়ে দেশের শান্ত গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্বাগত জানানো হলেও পর্যটকের আকস্মিক ঢল নিরিবিলি গ্রামগুলোকে ভিড়ভাট্টার পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিচ্ছে। এতে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা যায়, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
শিরাকাওয়া-গোর ওপর চাপ
গিফু প্রিফেকচারের শিরাকাওয়া গ্রাম, যেখানে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে পরিচিত শিরাকাওয়া-গো অবস্থিত, এই ক্রমবর্ধমান সংকটের দৃষ্টান্ত। ২০২৪ সালে গ্রামটিতে ২০ লাখের বেশি পর্যটক এসেছেন, যাদের অর্ধেকেরও বেশি বিদেশি। ২০১৪ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ৪০০ শতাংশ বেশি। বিখ্যাত খাড়া খড়ের ছাউনিওয়ালা গাশো-জুকুরি খামারবাড়িগুলোর আশপাশে বসবাসকারী প্রায় ৫০০ বাসিন্দার কাছে পর্যটকদের সঙ্গে সহাবস্থান কঠিন হয়ে উঠেছে। এক লেনের প্রধান সড়কে প্রায়ই যানজট হয়। বাসিন্দারা পর্যটকদের অনধিকার আচরণের কথাও জানিয়েছেন; যেমন, ব্যক্তিগত বাড়ির সামনে তুষার নিয়ে খেলায় মেতে ওঠা এবং তুষার গলে গেলে মাঠে ফেলে যাওয়া দস্তানা ও মোজা। স্থানীয় সরকারের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৯.৪ শতাংশ বাসিন্দার এখন বিদেশি পর্যটকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রভাব
কোচি প্রিফেকচারের কাছে নিকোবুচি জলকুণ্ড, যার উজ্জ্বল ‘নিয়োদো ব্লু’ পানির জন্য পরিচিত, একইভাবে জনপ্রিয়তায় বিস্ফোরণ দেখেছে। ২০১২ সালে একটি টিভি অনুষ্ঠানে দেখানোর পর একসময়ের নিরিবিলি জায়গাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ২০২৩ সালের মধ্যে সেখানে পর্যটকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখে। একইভাবে, উত্তর জাপানের কৃষিপ্রধান শহর বিয়েইতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে। ইনস্টাগ্রাম ও চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেখানকার মনোরম ঢেউখেলানো মাঠের ছবি ভাইরাল হওয়ার পর সেগুলোর ছবি তুলতে পর্যটকেরা সেখানে ভিড় করছেন। ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমিতে অনধিকার প্রবেশ ও ফসল মাড়ানো ঠেকাতে শহর কর্তৃপক্ষ একাধিক ভাষায় সতর্কবার্তা দেওয়া ক্যামেরা বসাতে বাধ্য হয়েছে।
বাসিন্দা বনাম আয়
অনন্য নৌকাবাড়ির কারণে ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ নামে পরিচিত মাছধরা শহর ইনে পরিস্থিতির বৈষম্য স্পষ্ট: ১,৮০০ বাসিন্দার এই শহরে ২০২৪ সালে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার পর্যটক এসেছেন, যা জনসংখ্যার প্রায় ২৭০ গুণ। পর্যটনের কারণে নতুন ব্যবসা ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর শহরে প্রাণচাঞ্চল্য এসেছে। তবে এর সঙ্গে এসেছে কোলাহল, যানজট—যার কারণে সপ্তাহান্তে বাড়ি থেকে বের হওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়ে—এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রতি অসম্মান। স্থানীয় এক জেলে আক্ষেপ করে বলেন, “এই নৌকাবাড়িগুলো আমরা সংরক্ষণ করছি। সরকারের উচিত আগে বাসিন্দাদের কথা ভাবা, তারপর পর্যটনের কথা।”
সরকারি পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ সমাধান
সমস্যার ভয়াবহতা স্বীকার করে জাপানের নতুন পর্যটনমন্ত্রী ইয়াসুশি কানেকো নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় পর্যটকদের অতিরিক্ত সমাগমকে “অত্যন্ত গুরুতর” বলে অভিহিত করেছেন। অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ কমাতে জরুরি পদক্ষেপের জন্য ২০২৪ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে সরকার ১৫.৮২ বিলিয়ন ইয়েন বরাদ্দ করেছে। ওকিনাওয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর যানজট পূর্বাভাস অ্যাপ এবং মাউন্ট হাকোদাতেতে রিয়েল-টাইম ডিজিটাল সাইনবোর্ডের মতো উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা—বিভিন্ন কৌশল নেওয়া হচ্ছে। হাকুবা গ্রামে গভীর রাতে উচ্চ শব্দের মতো বিরক্তিকর আচরণের জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ইয়েন জরিমানার বিধান অনুমোদিত হয়েছে। অন্যান্য এলাকায় চালু হচ্ছে আগাম সংরক্ষণব্যবস্থা, বাড়ানো হচ্ছে পার্কিং ফি এবং শিষ্টাচার উৎসাহিত করতে প্রচার করা হচ্ছে ‘দায়িত্বশীল পর্যটন’ কর্মসূচি। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ৬ কোটি পর্যটক আনার লক্ষ্য নিয়ে জাপান এগিয়ে চলেছে। তবে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, এই গন্তব্যগুলোকে অনন্য করে তোলা জনপদগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে কীভাবে অর্থনৈতিক সুফল ছড়িয়ে দেওয়া যায়।






