ডিজিটাল যুগে একাকী জীবনযাপনের উদ্বেগ মোকাবিলায় চীনের ‘তুমি কি মারা গেছ?’ অ্যাপ

পড়তে 4 মিনিট
ডিজিটাল যুগে একাকী জীবনযাপনের উদ্বেগ মোকাবিলায় চীনের ‘তুমি কি মারা গেছ?’ অ্যাপ

‘তুমি কি মারা গেছ?’ নামে নতুন এক উসকানিমূলক স্মার্টফোন অ্যাপ চীনে অপ্রত্যাশিতভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একা মারা যাওয়ার গভীর ভয়কে সামনে এনে অ্যাপটি দেশটির দ্রুত পরিবর্তনশীল সামাজিক পরিস্থিতিও তুলে ধরেছে। ব্যবহারকারীরা বেঁচে আছেন কি না তা নিশ্চিত করতে প্রতি দুই দিনে একবার অ্যাপে চেক-ইন করতে হয়। চীনের পেইড অ্যাপ স্টোর তালিকার শীর্ষে উঠে আসা অ্যাপটি আধুনিক চীনা শহুরে সমাজে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অ্যাপটির ধারণা সহজ: ব্যবহারকারীরা একজন জরুরি যোগাযোগের ব্যক্তির নাম দেন এবং নিরাপদে আছেন জানাতে প্রতি ৪৮ ঘণ্টায় একটি বড় বোতামে ট্যাপ করেন। তাঁরা চেক-ইন না করলে অ্যাপটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁদের যোগাযোগের ব্যক্তিকে সতর্ক করে জানায়, কোনো সমস্যা হয়ে থাকতে পারে। মাত্র ৮ ইউয়ান (প্রায় ১.১৫ ডলার) দামের অ্যাপটি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কয়েক লাখবার ডাউনলোড হয়েছে বলে জানিয়েছেন এর নির্মাতারা।

চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘এমন আশঙ্কা আছে যে একা থাকা মানুষ মারা গেলে কেউ তা টেরই পাবে না, সাহায্যের জন্য কাউকে ডাকতেও পারবে না।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘মাঝেমধ্যে ভাবি, আমি যদি একা মারা যাই, আমার মরদেহ কে নিয়ে যাবে?’

চীনে ক্রমবর্ধমান বাস্তবতার কথা বলছে বলেই এই সাধারণ অ্যাপটি মানুষের মনে সাড়া ফেলেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত গবেষণা সংস্থাগুলোর হিসাবে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশটিতে একক ব্যক্তির পরিবারের সংখ্যা ২০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। নগরায়ণ, বিয়েতে দেরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং চাকরির জন্য অভিবাসনের কারণে একা বসবাস বাড়ছে; এসব কারণে মানুষ প্রচলিত পারিবারিক সহায়তার নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

বেইজিংয়ে কর্মরত ৩৮ বছর বয়সী পেশাজীবী উইলসন হৌ পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে থাকেন। গত মে মাসে অ্যাপটি প্রকাশের পরপরই কেন ডাউনলোড করেছিলেন, তা তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।

হৌ বিবিসিকে বলেন, ‘আমার কিছু হলে ভাড়া বাসায় একা মারা যেতে পারি, আর কেউ তা জানতেও পারবে না—এই দুশ্চিন্তা হয়। সে কারণেই অ্যাপটি ডাউনলোড করে জরুরি যোগাযোগের ব্যক্তি হিসেবে মায়ের নাম দিয়েছি।’

অ্যাপটির নির্মাতা তিনজন প্রোগ্রামার ১৯৯৫ সালের পর জন্মেছেন। তাঁরা প্রায় এক মাসে এবং প্রায় ১,০০০ ইউয়ান (১৪০ ডলার) খরচে অ্যাপটি তৈরি করেন। হেনান প্রদেশের ঝেংঝৌ থেকে ছোট একটি দল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একা বসবাসকারীদের জন্য জরুরি সরঞ্জাম নিয়ে আলোচনা লক্ষ করেন। এরপর অ্যাপটি তৈরির উদ্যোগ নেন।

‘আমরা হালকা, কিন্তু কাজে লাগে এমন কিছু তৈরি করতে চেয়েছিলাম,’ গুয়াংঝৌ ডেইলিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লিউ পদবির এক নির্মাতা বলেন। ‘নামটি সরাসরি, তবে মৃত্যুর প্রসঙ্গ এড়িয়ে না গিয়ে তা সরাসরি মোকাবিলা করাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছি।’

অ্যাপটির অকপট নামটি বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কিছু ব্যবহারকারী নামটিকে অশুভ বলে সমালোচনা করেছেন এবং সাংস্কৃতিকভাবে বেশি মানানসই বিকল্প হিসেবে ‘তুমি কি বেঁচে আছ?’ বা ‘কেমন আছ?’ প্রস্তাব করেছেন। চীনা সংস্কৃতিতে ভাষার প্রায়ই প্রতীকী তাৎপর্য থাকে; তাই সরাসরি মৃত্যুর উল্লেখকে দুর্ভাগ্য ডেকে আনার মতো মনে করা হতে পারে।

অ্যাপটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মুনস্কেপ টেকনোলজিস সমালোচনার কথা স্বীকার করে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। চীনা নাম ‘সি-লে-মা’ আসলে জনপ্রিয় খাবার সরবরাহকারী অ্যাপ ‘ই-লে-মা’—যার অর্থ ‘তোমার কি ক্ষুধা লেগেছে?’—এর সঙ্গে শব্দের খেলা। এতে তৈরি হয়েছে কালো রসিকতার এক মোড়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিচুয়ান প্রদেশের ব্যবহারকারী ঝাও বলেন, ‘মৃত্যুর আক্ষরিক ও সামাজিক—দুই ধরনের অর্থই আছে। নামটি “তুমি কি বেঁচে আছ?” করা হলে আমি এটি ডাউনলোড করতে টাকা দিতাম।’

বিতর্ক সত্ত্বেও অ্যাপটি প্রাথমিক লক্ষ্যগোষ্ঠীর বাইরেও ব্যবহারকারী পেয়েছে। তরুণ শহুরে পেশাজীবীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি হলেও একা থাকা বয়স্ক চীনা নাগরিক, বিষণ্নতায় ভোগা মানুষ, অন্তর্মুখী এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা অন্যদেরও এটি আকৃষ্ট করেছে।

নির্মাতারা এখন বয়স্কদের বাজারে সম্প্রসারণের কথা ভাবছেন। সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেছেন, ‘বাড়িতে থাকা বয়স্কদের দিকে আরও বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, যাতে তাঁদের আরও যত্ন ও বোঝাপড়া দেওয়া যায়। তাঁদের স্বপ্ন আছে, তাঁরা বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করেন এবং তাঁদের দেখা, সম্মান ও সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।’

বয়স্ক ব্যবহারকারীদের প্রতি এই মনোযোগ চীনের জরুরি জনমিতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশটির জনসংখ্যার এখন এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি মানুষের বয়স ৬০ বছরের বেশি। শিগগিরই দেশটিতে পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটিতে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা পরিবার ও সামাজিক সেবাব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

আন্তর্জাতিকভাবে অ্যাপ স্টোরগুলোতে অ্যাপটি ডেমুমু নামে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, হংকং, অস্ট্রেলিয়া ও স্পেনসহ কয়েকটি দেশে শীর্ষ পেইড ইউটিলিটি অ্যাপের তালিকায়ও স্থান পেয়েছে। বিদেশে বসবাসরত চীনা ব্যবহারকারীরাই মূলত এর আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছেন বলে মনে হয়।

‘তুমি কি মারা গেছ?’ অ্যাপটির সাফল্য সামাজিক পরিবর্তনের ফলে তৈরি শূন্যতা পূরণে প্রযুক্তির এগিয়ে আসার বৃহত্তর প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে। আধুনিক চীনে প্রচলিত পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক সহায়তার নেটওয়ার্ক বদলে যাওয়ায় ডিজিটাল সরঞ্জাম ক্রমেই নিরাপত্তার জাল ও যোগাযোগের মাধ্যমের ভূমিকা নিচ্ছে।

গ্লোবাল টাইমসকে দেওয়া মন্তব্যে ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞ লিউ ডিংডিং বলেন, ‘অ্যাপটি একটি জরুরি প্রয়োজন মেটায়। এই গোষ্ঠীর [একা বসবাসকারী মানুষদের] জন্য সবচেয়ে বড় অদৃশ্য ঝুঁকি হলো, হঠাৎ অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার ঘটনা কেউ টের না-ও পেতে পারে। অ্যাপটির সরাসরি নামটি এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে।’

আপাতত অ্যাপটির দল কার্যকারিতা উন্নত করা, এসএমএস বিজ্ঞপ্তি যোগ করা এবং হৃদ্‌স্পন্দন পর্যবেক্ষণের মতো অন্যান্য সুবিধা বিবেচনা করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ডাউনলোডের সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরিষেবাটি আরও বড় পরিসরে নিতে বিনিয়োগ-সহযোগীও খুঁজছে তারা।

দ্রুত নগরায়ণ ও বদলে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্কের সঙ্গে লড়াইরত এক সমাজে এই সাধারণ অ্যাপটি উল্লেখযোগ্য একটি কাজ করেছে—মৃত্যু, বিচ্ছিন্নতা এবং ক্রমেই ডিজিটাল হয়ে ওঠা বিশ্বে পরস্পরের যত্ন নেওয়ার প্রকৃত অর্থ নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা শুরু করেছে।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে